চিকিৎসক প্রফেসর মোহাম্মদ হানিফ-সততায় দৃষ্টান্তমূলক ও সাহসী এক ব্যক্তি!

২১ বছর আগে বিষাক্ত উপাদান মিশ্রিত প্যারাসিটামল খেয়ে ৭৬ শিশু অকালে প্রাণ হারায়। পত্র-পত্রিকায় ‘অজ্ঞাত রোগে শিশু-মৃত্যু’ জাতীয় সংবাদ আতংক ছড়িয়ে যাচ্ছিল দেশময়। ঘটনাটা ঘটেছিল ১৯৮২ থেকে ১৯৯২ সালে!

মুভিতে এই দৃশ্য গুলো অহরহ দেখা যায়। অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা কোন কারন উদঘাটন করতে পারছেন না। জীবন কোন কাল্পনিক মুভি না। ঠিক একই একই ঘটনা ঘটেছিল এই দেশে।

বিশেষজ্ঞরা ফাইন্ড আউটই করতে পারেনি কেন এত শিশু হঠাত এভাবে মারা যাচ্ছে। প্রফেসর হানিফ শুরু করলেন তাঁর লড়াই। তিনি দেখলেন নির্দিষ্ট পাঁচটি কোম্পানির তৈরি প্যারাসিটামলেই এই সমস্যা। সমস্যাটা কি? এই কোম্পানিগুলো প্যারাসিটামল তৈরিতে প্রয়োজনীয় একটি উপাদান বদলে দিয়েছে কেবল আর্থিক লাভের হীন উদ্দেশে।ফাইন্ড আউট হল ভেজাল প্যারাসিটামল।কিন্তু কে লড়বে এই বিশাল শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। তিনি মামলা করলেন ওই কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে। প্রফেসর হানিফ নিজের বিবেকের কাছে পরাজিত হয় নি। আর্থিক লোভের শিকার পরিবারের পাশে গিয়ে দাড়িয়েছিলেন প্রফেসর মোহাম্মদ হানিফ। এই মামলার গুরুত্বপুর্ণ স্বাক্ষী ছিলেন তিনি।অনেক ভয়ভীতি দেখিয়েও তাকে নিবৃত্ত করা যায়নি। লড়ে গেছেন শেষ পর্যন্ত। আর তাই ভেজাল প্যারাসিটামল তৈরির অভিযোগে অ্যাডফ্লেম ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেডের পরিচালক ডা. হেলেন পাশাসহ তিনজনকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদন্ডের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত গত ২২ জুলাই। দন্ডের অতিরিক্ত প্রত্যেক আসামির ২ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৩ মাস বিনাশ্রম কারাদ- দেয়া হয়েছে। মামলা দায়েরের ২১ বছর পর আসামিদের সাজা দেয়া হল।

BP 13

যদিও মামলাটি ১৯৯৩ সালের ৭ জুলাই থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত ছিল। পরে বিচার চালু হলে চারজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের তত্ত্বাবধায়ক আবুল খায়ের চৌধুরী ১৯৯৩ সালের ২ জানুয়ারি ঢাকার ড্রাগ আদালতে মামলাটি দায়ের করেছিলেন। ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ ও ড্রাগ আদালতের বিচারক মোঃ আবদুর রশিদ এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ের পর্যালোচনায় বিচারক বলেন, ভেজাল প্যারাসিটামল ওষুধ তৈরি করা সমাজ ও মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ। তাই আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা দেয়া উচিত।

দন্ডপ্রাপ্ত আসামির মধ্যে নৃগেন্দ নাথ বালা পলাতক । হেলেন পাশা ও মিজানুর রহমান জামিনে থেকে আদালতে হাজির ছিলেন। রায় ঘোষণার পর তাদের সাজা পরোয়ানা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। খালাসপ্রাপ্ত দুই আসামি মামলার শুরু থেকেই পলাতক।

এ মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ঢাকা শিশু হাসপাতালের তৎকালীন প্রফেসর মোহাম্মদ হানিফ তার জবানবন্দিতে বলেন, “আমাদের হাসপাতালে ১৯৯২ সালের আগে থেকেই কিছু শিশু কিডনিজনিত সমস্যা নিয়ে আসে এবং কিছু শিশু কিডনি ছাড়া অন্যান্য সমস্যা নিয়ে আসে। সে সময় আমরা দেখতে পাই যে, কিছু শিশু হাসপাতালে আসার পর কিডনি ফেইলিউর হচ্ছে। বিষয়টি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় কিডনি ফেইলিউরের কারণ বের করতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি জানতে পারে, অনেক শিশু কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং পরে মৃত্যুবরণ করছে অথচ তাদের এ কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার কথা নয়। আমরা ওষুধ প্রশাসন এবং পাবলিক হেলথ ডিপার্টমেন্টকে বিষয়টি চিঠির মাধ্যমে অবহিত করি। প্যারাসিটামল সিরাপের নমুনা পাঠাই। যে শিশুদের হাসপাতালে শুধু প্যারাসিটামল সিরাপ খাওয়ানো হয় তাদের ক্ষেত্রে কিডনি ফেইলিউর হওয়ার ঘটনায় আমাদের সন্দেহ হয় যে, ব্যবহৃত সিরাপে কোনো সমস্যা আছে। এ বিষয়ে আদালতে সাক্ষ্য দেয়ার সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

পরবর্তীকালে শিশু হাসপাতাল থেকে পাঠানো প্যারাসিটামল সিরাপের স্যাম্পল ওষুধ প্রশাসন এবং ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন কর্তৃক পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষা শেষে ওই সিরাপে প্র্রোপাইলিন গ্লাইকল-এর পরিবর্তে Diethylene glycol পাওয়া যায়, যা ক্ষতিকারক এবং বিষাক্ত। আর এটাই শিশু মৃত্যুর কারণ।”

এ মামলার বাদী আদালতে দেয়া তার সাক্ষ্যে বলেন, ১৯৯১ সালের ৩ জুলাই আমি ওষুধ প্রশাসকের নির্দেশে হাসপাতালে পরিচালক ব্রিগেডিয়ার (অব.) মকবুল হোসেন চৌধুরীর কাছ থেকে তিন বোতল ফ্লামোডল সিরাপ সংগ্রহ করি। সাক্ষীদের সামনে ওই তিন বোতলের মধ্যে দুই বোতল আমি নিয়ে আসি এবং অন্য বোতলটি শিশু হাসপাতালের ডাইরেক্টর সাহেবকে দিয়ে আসি। ওই বোতল দুটির মধ্যে একটি বোতল ৭ জুলাই ওষুধ প্রশাসনের স্মারকমূলে ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে পাঠিয়ে দিই। ওই স্যাম্পলের রুটিন টেস্ট করা হয়েছিল। রুটিন টেস্টে শুধু কার্যকরী উপাদান টেস্ট করা হয়। এরপর খবরের কাগজে অবগত হয়েছিলাম যে শিশু হাসপাতালে প্যারাসিটামল সিরাপ খেয়ে অনেক শিশু মারা গেছ। পরে শিশু হাসপাতালে গিয়ে বিভিন্ন কোম্পানির প্যারাসিটামল সিরাপ সংগ্রহ করি। ওই সব স্যাম্পলের সঙ্গে ফ্লামোডল প্যারাসিটামলের বিষক্রিয়া পরীক্ষার জন্য পাঠাই। ড্রাগ অফিসের স্মারকমূলে ১৯৯২ সালের ২৫ নভেম্বর মহাখালী ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে তা পাঠানোর পর এসেনশিয়াল ড্রাগ কোম্পানির গ্যাস লিকুইড ও সেটোগ্রাফি মেশিনের সাহায্যে ওই সব ওষুধের বিষক্রিয়া পরীক্ষা করা হয়। ওই ল্যাবরেটরির প্রধান ডা. আবদুল মালেক ওই প্যারাসিটামল পরীক্ষা করে একটি প্রতিবেদন পাঠান। ওই প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, ফ্লামোডল প্যারাসিটামলে ডাই ইথিলিন গ্লাইকল রয়েছে যা একটি বিষাক্ত দ্রবণ যা মানুষ ব্যবহার করে এমন কোনো ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার হয় না। ফ্লামোডল সিরাপেও ডাই ইথিলিন গ্লাইকল ব্যবহারের কোনো অনুমতি ছিল না। ওই রিপোর্ট পাওয়ার পর আমরা নিশ্চিত হলাম, অ্যাডফ্লেম ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড অননুমোদিত ও বেআইনিভাবে ফ্লামোডল প্যারাসিটামল সিরাপে বিষাক্ত উপাদান মিশিয়ে তৈরির পর তা বাজারজাত করছে, যা মানবহির্ভূত ও ক্ষতিকর। পরে আমি আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করি।

মামলায় বলা হয়, অ্যাডফ্লেমের প্যারাসিটামলে বিষাক্ত উপাদান থাকায় বহু শিশু কিডনি সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে অন্তত ৭৬ জনের মৃত্যু হয়। যদিও ওই সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে কিডনি অকেজো হয়ে প্রায় ২ হাজার ৭০০ শিশুর মৃত্যু ঘটে।

২১ বছর অনেক সময়। এই দীর্ঘসময় একটি ন্যায়বিচারের জন্যে অপেক্ষা! এই অপরাধের শাশ্তি একমাত্র মৃত্যু দন্ড তবুও আইনের ফাকফোকর দিয়ে সাজা হলো মাত্র ১০ বছরের!

দন্ডটি কী লঘু হয়ে গেলো না? এই প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর হানিফ বললেন, মাননীয় বিচারক নিজেই এ বিষয়ে মতামত প্রকাশ করেছেন। এই আইনটিকে আরো বেশি যুগোপযোগী ও কার্যক্ষম করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আর সবচে বড় বিষয় একটা ভালো নজিরতো স্থাপন করা গেলো। এই মামলাটিআগামীতে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।

নিজের জীবন বিপন্ন করে এই ন্যায়বিচারের জন্যে লড়াই করে যাওয়া কখনো কী মনে হয়নি কী হবে এসব করে? না কখনোই এরকম মনে হয় নি। আমি আমার পেশার প্রতি আনুগত্য থেকে একজন সৎ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব পালন মাত্র।

প্রফেসর হানিফের এই সাহসী ভূমিকা দেশে-বিদেশে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। সাহসী এই মানুষটি এখন থাকেন কানাডাতে, কিছু দিন হলো বাংলাদেশে এসেছেন। সপ্তাহখানেক থাকবেন।

তিনি দ্বায়িত্বরত আছেন,

Prof. Mohammed Hanif.  Professor of Paediatric Nephrology. Bangladesh Institute of Child Health (BlCH). Dhaka Shishu Hospital. Sher-e Bangla Nagar, Dhaka

বিচারের ফল যত ছোট, সংগ্রামটা ছিল আরও দীর্ঘ! দীর্ঘদিন লড়েছেন এই মামলায় সসতা ও সাহসীকতার সাথে। নিজের জীবন বিপন্ন করে পেশার প্রতি আনুগত্য থেকে এই ন্যায়বিচারের জন্যে লড়াই করে যাওয়া একজন সৎ ও দেশপ্রেমিকের জন্য হাজার সালাম।


ওয়েব টিম

One thought on “চিকিৎসক প্রফেসর মোহাম্মদ হানিফ-সততায় দৃষ্টান্তমূলক ও সাহসী এক ব্যক্তি!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Next Post

চট্টগ্রামে এমবিবিএস সনদধারী ১০ ভুয়া চিকিৎসক!

Wed Sep 24 , 2014
60 SHARES Share on Facebook Tweet Follow us Share Share Share Share Share

সাম্প্রতিক পোষ্ট