চোখের চিকিৎসায় এন্ড্রয়েড ফোন ব্যবহার, বাংলাদেশের চিকিৎসকের বিস্ময়কর আবিষ্কার

2
নিউজটি শেয়ার করুন

৮ ডিসেম্বর ২০১৯

সুক্ষ্ম মেধা বিকাশে বাংলাদেশ সবসময়ই এগিয়ে।পারিপার্শ্বিকতার ফলে সব মেধা হয়তো বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায় না। হয়তো পরিস্ফুটিত হতে যাওয়ার আগেই হয় অন্ধকারে নিমজ্জিত। তেমনি একটা সুক্ষ্ম মেধাময় কারুকাজ নিয়ে কাজ করেছেন একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. মমিনুল ইসলাম বাঁধন।

চোখ আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শারীরিক অঙ্গ। চোখের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা রয়েছে, রেটিনার সমস্যাগুলো তার মধ্যে অন্যতম। কালার ফানডাস ফটোগ্রাফ (colour fundus photograph) ‘রেটিনা বিশেষজ্ঞদের’ জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি যন্ত্র। যার সাহায্যে চোখের রেটিনার সকল প্রকার রোগের ছবি তোলা হয়ে থাকে যেমনঃ ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপজনিত কারণে চোখে রক্তক্ষরণ, চোখের মধ্যে ফরেন বডি রেটিনা ছিঁড়ে গেলে এমন অনেক কঠিন ও জটিল রোগের ছবি তোলা হয় এই যন্ত্রের সাহায্যে। কিন্তু এই কালার ফান্ডাস ফটোগ্রাফ যন্ত্রটি অত্যধিক মূল্যের হওয়ায় সকল প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির পক্ষে এই যন্ত্রটি কেনা সম্ভবপর হয় না।

স্বল্প মূল্যে এরকমই কার্যকরী ও সময়োপযোগী একটা যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. মমিনুল ইসলাম বাধন। যন্ত্রটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘স্মার্ট ফোন বেসড ফান্ডাস ক্যাম’। শুধুমাত্র ২০ ডাইঅপ্টার লেন্স ও স্মার্টফোন ব্যবহার করেই ডিভাইসটি তৈরী। মোবাইল ক্যামেরা থেকে লেন্সের নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে অত্যন্ত স্বল্পমূল্যে যন্ত্রটি তৈরী করা হয়েছে। করা হয়েছে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং এতে সম্পূর্ণ সফল এই চিকিৎসক ও আবিষ্কারক।

রেটিনা পরীক্ষার প্রতিটা যন্ত্রই অত্যন্ত ব্যায়বহুল। মূলত এই বাহুল্যতা কমাতে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই ডিজিটাল ডিভাইসটি পৌছে দিতেই এরকম একটা আবিষ্কারের চিন্তা মাথায় আসে ডা. মমিনুল ইসলাম বাধনের।

প্রথমে ২০১৫ সালের দিকে পানির বোতলে লেন্স লাগিয়ে পরীক্ষামূলক গবেষনা চালানো হয়। পরবর্তীতে মোবাইল ক্যামেরা ও লেন্সের দূরুত্বকে নির্দিষ্ট মাত্রায় রেখে ডিভাইসটি তৈরি করা হয়। স্মার্ট ফোন বেসড ফানডাস ক্যামেরা এমন একটি ডিভাইস যা দিয়ে মোবাইল ফোনের সাহায্যে চোখের রেটিনার ছবি অতি অল্প খরচে দ্রুত তোলা যায়। বিশেষ করে বাচ্চাদের চোখের সমস্যার ক্ষেত্রে এই যন্ত্র আশীর্বাদ হয়ে চিকিৎসকদের হাতের নাগালে পৌছেছে।

এ বিষয়ে ডা. মমিনুল ইসলাম বাধন বলেন, “২০১৫ সালের আগে বাংলাদেশের বাইরে এরকম একটি ডিভাইস নিয়ে অনেক আলোড়ন হয় যা শুধুমাত্র আইফোনের জন্য ব্যবহার হতো। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে হাসপাতালে কর্মরত অবস্থায় পানির বোতলের সাথে মোবাইল ফোন দিয়ে রেটিনার ছবি তুলতে সক্ষম হই।”

এরপর আর পিছনে তাকাতে হয় নি তাকে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েটের) একজন প্রাক্তন ছাত্র নওয়াব মো: আমিনুল হোল খালিদকে সাথে নিয়ে সর্বজনগ্রাহী একটি ডিজাইন করে পরিণত এক আকার দেওয়া হয় ‘স্মার্টফোন বেসড ফান্ডাস ক্যাম’ ডিভাইসটির। ইতোমধ্যে অনেক চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের চক্ষু চিকিৎসকগণ ডিভাইসটি ব্যবহার করছে, সেই সাথে এর সুফল ভোগ করছেন সাধারণ জনগণ।

এই ডিভাইসটার উপকারিতাঃ
১. স্বল্প মূল্যে পাওয়া যায়।
২. যেকোনো কোম্পানীর মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যায়।
৩. যেকোনো সময় চোখের রেটিনা পরীক্ষা করাসহ তার ছবি ডকুমেন্ট হিসেবে মোবাইল ধারণ করা যায়।
৪. পরবর্তীতে রিসার্চ কাজের জন্য, অথবা কাউকে মেইল, হোয়াইস আপ, ভাইবার এর মাধ্যমে চোখের ডাক্তারকে পাঠানো যায় আলোচনার জন্য।
৫. রোগিদের জন্য প্রিন্ট করে দেওয়া যেতে পারে এবং রেটিনার ছবি রোগীদের সাথে সাথেই কাউন্সিলিং করা যাবে চেম্বার অথবা হাসপাতালে বসেই।
৬. একটি মোটোরাইস ফান্ডাস ক্যামেরার দাম কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা। সেখানে এই ডিভাইসটি অনেক কম মূল্যে পাওয়া যায়।
৭. মেডিসিন, নিউরো মেডিসিন ও চক্ষু বিভাগের শিক্ষার্থীরা রেটিনা পরীক্ষা করতে যেই ‘অফথ্যালমোস্কোপ’ ব্যবহার করে, সেটাও কমপক্ষে ৩০ হাজার টাকা। কিন্তু এই ডিভাইসটি মাত্র ১৫ হাজার টাকাতেই পাওয়া যাচ্ছে।

কালার ফানডাস ফটোগ্রাফ যন্ত্রটির বাজার দাম আকাশচুম্বী(প্রায় ৫লক্ষ থেকে শুরু করে ২০ লক্ষ অবধি হয়ে থাকে)। অতিরিক্ত বাজার মূল্যের ফলে সব হাসপাতালে এই যন্ত্রটি ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। কিন্তু এখন সল্পব্যায়ে স্বল্পসময়ে সহজেই এই যন্ত্রের মাধ্যমে একই কাজ যেকোনো রেটিনা বিশেষজ্ঞগন নিজেই অনায়াসে করতে পারবে এই যন্ত্রের মাধ্যমে।বানাতে পারবে নতুন প্রযুক্তির কালার ফানডাস ফটোগ্রাফ। বাংলাদেশে এই পদ্ধতিতে সর্বোপ্রথম এটাই এতো সল্প খরচে ‘কালার ফানডাস ফটোগ্রাফ যন্ত্র’ তৈরী করা সম্ভব হয়েছে।

সার্বজনীন উপকারিতা
খুবই কম খরচে রেটিনার ছবি তুলতে পারার কারনে বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে যেকোন ডাক্তার নিমিষেই মোবাইলে রেটিনার ছবি তুলে বিভিন্ন মাধ্যমে (যেমনঃ ইমেইল,ফেসবুক,ভাইবার, হোয়াটস অ্যাপে) চক্ষু বিশেষজ্ঞ অথবা রেটিনা বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো এবং এই ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করে বাংলাদেশ এর যেকোন প্রান্তরে বসেই রোগ সনাক্ত করা ও চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। এতে খরচও কম হবে চিকিৎসা ও সহজলভ্য হবে।

সম্ভাবনাময় ও সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে বাংলাদেশের চিকিৎসক সমাজ সাধ্যের মধ্যে অধিক সংখ্যক জনগণকে বহু প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নিরলস ও অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে নীরবে-নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছেন। আর্তমানবতার সেবায় তাঁদের এই অবদান নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং গৌরবের। এই ডিজিটাল সহজলভ্য ও সল্প খরচের চিকিৎসা সেবা সফল ভাবে ব্যবহার করে সম্ভাবনাময় আরো একটি দিক চিকিৎসা শাস্ত্রকে করুক প্রজ্বলিত।

প্রতিবেদন/ওয়াসিফ হোসেন

Fateeha

2 thoughts on “চোখের চিকিৎসায় এন্ড্রয়েড ফোন ব্যবহার, বাংলাদেশের চিকিৎসকের বিস্ময়কর আবিষ্কার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Next Post

"তোমার কাছে তোমার বাচ্চা নিরাপদ না": ডিপ্রেশন থেকে ফিরে আসা মায়ের আত্মকাহিনী

Sun Dec 8 , 2019
৮ ডিসেম্বর ২০১৯ [পোস্ট পারটাম ব্লু, পোস্ট পারটাম ডিপ্রেশন কিংবা পোস্ট পারটাম সাইকোসিস এক ধরনের মারাত্মক কিন্তু নিরাময়যোগ্য মানসিক অসুস্থতা যা সন্তান জন্মের পর একজন মায়ের হতে পারে। পূর্বে কখনো কোন মানসিক রোগ না থাকা মায়েরও হঠাৎ করে এই রোগ হতে পারে। ভয়াবহ এই অভিজ্ঞতারই বর্ণনা দিয়েছেন একজন চিকিৎসক মা।] […]

Platform of Medical & Dental Society

Platform is a non-profit voluntary group of Bangladeshi doctors, medical and dental students, working to preserve doctors right and help them about career and other sectors by bringing out the positives, prospects & opportunities regarding health sector. It is a voluntary effort to build a positive Bangladesh by improving our health sector and motivating the doctors through positive thinking and doing. Platform started its journey on September 26, 2013.

Organization portfolio:
Click here for details
Platform Logo