শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি উৎসর্গকৃত চিকিৎসাপদ্ধতি

প্ল্যাটফর্ম নিউজ, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২০, মঙ্গলবার 

অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)

চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্যসচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

 

আজ ১৪ তারিখ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। একাত্তরের এ দিনটিতে পাকিস্তানিদের এদেশীয় দোসররা ঘর থেকে তুলে নিয়ে রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল আমার প্রয়াত শ্বশুর ডা. আব্দুল আলিম চৌধুরীসহ অগণিত বুদ্ধিজীবীকে। এ দিনটিতেই ‘ইউরোএশিয়ান জার্নাল অব হেপাটোগ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিতে’ এবার প্রকাশিত হবে লিভার রোগে স্টেম সেল থেরাপিবিষয়ক আমার পঞ্চম বৈজ্ঞানিক প্রকাশনাটি। একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্যই ছিল সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশটাকে মেধাশূন্য করে দিয়ে একটা অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করা। দুদিন আগে জার্নালটির ই-মেইলে স্টেম সেলের এই আর্টিকেলটি প্রকাশের কথা জানতে পেরে কেন যেন মনে হলো বাংলাদেশের লিভার বিশেষজ্ঞদের পক্ষে এবারের শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে শহীদ ডা. আব্দুল আলিম চৌধুরী আর শহীদ ডা. ফজলে রাব্বিদের প্রতি এর চেয়ে ভালোভাবে শ্রদ্ধা জানানো বোধ হয় সম্ভব ছিল না।

 

স্টেম সেল থেরাপি আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি নতুন এবং এখনো বিকাশমান জায়গা। শরীরের কোনো অসুস্থ অঙ্গকে কার্যকর করার চেষ্টায় দেশে দেশে নানাভাবে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। লিভারের একটা বড় সুবিধা হচ্ছে যে এটি গাছের মতো বেড়ে উঠতে পারে। গ্রিক মাইথোলজিতে আছে প্রমিথিউসের ওপর বিরক্ত হয়ে দেবতারা তাকে সাজা দিয়েছিলেন। তাকে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল। প্রতিদিন একটি ঈগল পাখি এসে প্রমিথিউসের লিভারের কিছু অংশ খেয়ে ফেলত। লিভারটি পরদিন আপনা-আপনি বড় হয়ে আগের আকৃতিতে ফিরে যেত এবং ঈগলটি ফিরে এসে আবারও তা খেয়ে যেত। অখ্যাত সেই কোনো গ্রিক পুরাণের জমানাতেও মানুষের লিভারের রিজেনারেশন সক্ষমতা সম্বন্ধে সম্যক ধারণা ছিল। আর এই জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে একদিন শুরু করা হয়েছিল লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন। একজন সুস্থ আত্মীয়র লিভারের কিছুটা অংশ কেটে নিয়ে তার অসুস্থ আত্মীয়র শরীরে সংযোজনের বিদ্যা এই লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন। তার আগে অবশ্য অসুস্থ ব্যক্তির লিভারটা কেটে বাদ দিয়ে দেয়া হয়। যার লিভারের কিছুটা অংশ কেটে নেয়া হয় তারটা তো বটেই, যাকে দেয়া হয় নতুন একটা আংশিক লিভার, দুজনের লিভারই একটা সময় বেড়ে গিয়ে স্বাভাবিক আকারে ফিরে যায়, কাজও করে দিব্বি স্বাভাবিক। এরই নাম লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন।

 

বাংলাদেশে দফায় দফায় শুরু হলেও বারবার হোঁচট খেয়ে থমকে গেছে ট্রান্সপ্ল্যান্টেশনের উদ্যোগ। তবে প্রতিবেশী ভারতের সাফল্য এই ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয়। বছরে প্রায় তিন হাজারের বেশি লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন করা হয় এই এক ভারতেই। বাংলাদেশে অনেক লিভার রোগীও ভারতের বিভিন্ন নামকরা হাসপাতাল থেকে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন করে সুস্থ হয়ে দেশে ফেরেন। কিন্তু এর বিপরীত বাস্তবতাটা হলো ভারতে নিজেদেরই ট্রান্সপ্ল্যান্টেশনের বাৎসরিক চাহিদা ২৫ হাজারের বেশি। কাজেই পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টিং নেশন ভারতে যে কস্মিনকালেও চাহিদা অনুযায়ী যথেষ্ট সংখ্যায় লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন করে কুলিয়ে ওঠা যাবে না, সেটা বলাই বাহুল্য। এর প্রধান কারণ অর্গান ডোনেশনে মানুষের অনীহা।

 

যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে আজকের বাংলাদেশ, তাতে এ কথাটি নিশ্চিত যে একদিন এ দেশেও সফল লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন প্রোগ্রাম গড়ে উঠবে। গড়ে উঠবে হয়তো শীঘ্রই। কিন্তু ভারতীয় অভিজ্ঞতাই আমাদের বলে দেয় আমাদের মানুষের জন্য যতগুলো প্রয়োজন ততগুলো লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন আমরা কখনোই করতে পারব না। যেমনটি পারেনি পৃথিবীর কোনো দেশই। পাশাপাশি এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ সার্জিক্যাল টিম, যা গড়ে তোলাও সময়সাপেক্ষ। খরচের ধাক্কাটাও অনেক বড়। এই সব বিবেচনাতেই স্টেম সেল আর রিজেনারেটিভ মেডিসিন নিয়ে গবেষণা। বিশেষ করে লিভারের নিজ থেকে বেড়ে ওঠার যে স্রষ্টা প্রদত্ত অসম্ভব সক্ষমতা, সেটিকে কাজে লাগিয়ে লিভার রোগের চিকিৎসায় স্টেম সেল ব্যবহারের আগ্রহ বিজ্ঞানীদের সংগত কারণেই অনেক বেশি। এ নিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের অর্জনও কিন্তু কম নয়। ইন্টারনেটে ঢুকে বৈজ্ঞানিক লিটারেচার ঘাঁটাঘাঁটি করলে নামীদামি বৈজ্ঞানিক জার্নালে এ-বিষয়ক অনেক বৈজ্ঞানিক নিবন্ধই চোখে পড়বে। এটি যেমন বাস্তবতা যে স্টেম সেলকে আমরা এখনো লিভারের ট্রান্সপ্ল্যান্টেশনের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করাতে পারিনি, তেমনি এটাও সত্যি যে স্টেম সেল চিকিৎসার মাধ্যমে একিউট এবং ক্রনিক লিভার ফেইলিউরের রোগীরা অনেকখানি সুস্থতা লাভ করেন, যাকে আমরা লিভার বিশেষজ্ঞরা আমাদের ভাষায় বলি ‘ব্রিজ টু ট্রান্সপ্ল্যান্ট’।

স্টেম সেল লিভারে ঠিক কীভাবে কাজ করে, তা এখনো গবেষণার বিষয়। অনেকে ধারণা করেন, এর মাধ্যমে লিভারের পুনর্গঠন হয়। লিভার অনেকটাই ফিরে যায় তার স্বাভাবিক আকার-আকৃতিতে, ফিরে পায় স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা। অনেকে আবার ততটা আশাবাদী নন। তাদের বক্তব্য, এতে যা হয় তা হলো, একদিকে যেমন লিভার সেলগুলোর স্বাভাবিক ক্ষয় বা অ্যাপোটসিস কমে আসে, তেমনি অন্যদিকে লিভারের ক্ষতি বা ফাইব্রোসিস এবং পাশাপাশি প্রদাহ বা ইনফ্লুমেশনও কমে যায়। ফলে বেড়ে যায় লিভারের কার্যক্ষমতা। তবে মেকানিজমটি যাই হোক না কেন, স্টেম সেল থেরাপির মাধ্যমে লিভার রোগীরা যে উপকৃত হন, তা বিতর্কাতীত।

 

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নানা সেন্টারে নানাভাবে স্টেম সেল দিয়ে লিভারের চিকিৎসা করা হয়। এ দেশে আমরা এখন যেভাবে লিভারের চিকিৎসায় স্টেম সেল ব্যবহার করছি, তার গালভরা নাম ‘অটোলোগাস হেমোপয়েটিক স্টেম সেল ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন’। মোদ্দা কথা আমরা গ্রানুলোসাইট কলোনি স্টিমুলেটিং ফ্যাক্টর ইনজেকশনের মাধ্যমে অস্থিমজ্জা বা বোনম্যারো থেকে প্রথমে রক্তে স্টেম সেল মোবিলাইজ করি। তারপর ওই স্টেম সেলগুলোকে মেশিনের সাহায্যে রক্ত থেকে ছেঁকে আলাদা করে নিয়ে সেগুলো সরাসরি লিভারে প্রয়োগ করা হয়। এ জন্য আমরা দুটি রুট ব্যবহার করি। হয় ক্যাথল্যাবে হেপাটিক আর্টারিতে অথবা ডপলার আল্ট্রাসনোগ্রাম গাইডেন্সে পোর্টাল ভেইনে দেয়া হয় স্টেম সেলগুলো।

 

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে এ দেশে লিভারে স্টেম সেল নিয়ে যাত্রা শুরু করি। আমাদের অভিজ্ঞতার ঝুড়িতে এখন পর্যন্ত জমা হয়েছে তিন শতাধিক সুখী লিভার রোগী। আমরা আমাদের অভিজ্ঞতার প্রকাশ করেছি হেপাটোলজি ইন্টারন্যাশনাল, ইউরোএশিয়ান জার্নাল অব হেপাটোগ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি আর এক্টা সাইন্টিফিক গ্যাস্ট্রোইনটেস্টিনাল ডিজঅর্ডার-এর মতো নামীদামি সব আন্তর্জাতিক লিভার ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি জার্নালে। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক জার্নালে আমাদের মোট প্রকাশনার সংখ্যা পাঁচটি। সঙ্গে লোকাল বৈজ্ঞানিক জার্নালে আছে আরো বেশ কটি। আছে দেশি-বিদেশি আন্তর্জাতিক লিভার, ট্রান্সফিউশন মেডিসিন আর হেমাটোলজি বিশেষজ্ঞদের নামকরা সব বৈজ্ঞানিক কনফারেন্সে ২০টির বেশি কনফারেন্স টক ও অ্যাবস্ট্রাক্ট। আমি গর্ব করে বলতে পারি আমাদের লিভার বিশেষজ্ঞরা এই একটি ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতায় আশপাশের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে। পাশাপাশি এ দেশে লিভার রোগীরা এই চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, এমনকি প্রতিবেশী ভারতের তুলনায় নামমাত্র খরচে।

 

পাশাপাশি স্টেম সেল চিকিৎসা এবং গবেষণাকে একটা প্রাতিষ্ঠানিক জায়গায় নিয়ে যাওয়ায়ও আমরা ভূমিকা রাখার চেষ্টা রাখছি। আমাদের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের উদ্যোগে এ-সংক্রান্ত যে ন্যাশনাল গাইডলাইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে, সেখানে আমরা ভূমিকা রেখেছি। আমরা উদ্যোগী হয়ে গঠন করেছি ‘বাংলাদেশ স্টেম সেল অ্যান্ড রিজেনারেটিভ মেডিসিন সোসাইটি’। এই সোসাইটির উদ্যোগে প্রতিবছর ২৬ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় একটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলন- ‘স্টেমকন’। দেশি-বিদেশি গবেষকরা এই সম্মেলনে যোগ দিয়ে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে একে অপরকে সমৃদ্ধ করেন। এতে অংশ নেন যেমন লিভার বিশেষজ্ঞরা, তেমনি আসেন অন্যান্য বিষয়ের বিশেষজ্ঞরাও। আসেন চিকিৎসা পেশার বাইরে পাবলিক-প্রাইভেট নানা বিশ্ববিদ্যালয়ের আগ্রহী গবেষকরাও। করোনার আজকের বাস্তবতায় এবারের স্টেমকন অনুষ্ঠিত হবে ভার্চ্যুয়াল প্ল্যাটফর্মে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে হাজার বছরের এই শ্রেষ্ঠ বাঙালি সন্তানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবারের স্টেমকনের নামকরণ করা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু স্টেমকন ২০২০’। এ জন্য অনুমোদন মিলেছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতীয় কমিটিরও। আর গত তিনটি স্টেমকনের ধারাবাহিকতায় এবারের স্টেমকনটির জন্য বিজ্ঞানুরাগী মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বাণীটিও এরই মধ্যে হাতে এসেছে।

 

বিজয়ের মাসে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে তাঁর নামে উৎসর্গীকৃত একটি আন্তর্জাতিক স্টেম সেল কনফারেন্সের আয়োজন করতে পারা আর দেশে লিভার রোগের চিকিৎসায় স্টেম সেল থেরাপির মতো হাইটেক বিষয় পঞ্চম গবেষণা নিবন্ধটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক জার্নালে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে প্রকাশিত হওয়াটা একজন পেশাজীবী হিসেবে আমার পেশাগত জীবনে আমার মূল্যায়নে এখন পর্যন্ত অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন।

 

 

তথ্য সূত্র: সারাক্ষণ, ১৪ ডিসেম্বর,২০২০

Gowri Chanda

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Next Post

জুনিয়র কনসালটেন্ট পদে পদোন্নতি দেওয়া হলো চিকিৎসকদের

Tue Dec 15 , 2020
প্ল্যাটফর্ম নিউজ, ১৫ ডিসেম্বর,২০২০, মঙ্গলবার   গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে চিকিৎসকদের  জুনিয়র কনসালটেন্ট পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। গত ১৪ ডিসেম্বর, ২০২০ তারিখে এক বিজ্ঞপ্তিতে এই পদোন্নতির আদেশ দেওয়া হয়। বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে কর্মরত চিকিৎসকদের জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ […]

Platform of Medical & Dental Society

Platform is a non-profit voluntary group of Bangladeshi doctors, medical and dental students, working to preserve doctors right and help them about career and other sectors by bringing out the positives, prospects & opportunities regarding health sector. It is a voluntary effort to build a positive Bangladesh by improving our health sector and motivating the doctors through positive thinking and doing. Platform started its journey on September 26, 2013.

Organization portfolio:
Click here for details
Platform Logo