গভীর রাতের গল্প।

নিউজটি শেয়ার করুন

সামারা তিন্নি
ঢাকা মেডিকেল কলেজ
k-61
রেসিডেন্ট,ভিক্টোরিয়া , অস্ট্রেলিয়া

গভীর রাতের গল্প
————–

শিরোনাম দেখে ঘাবড়ানোর কিছু নেই, এটা কোনই প্রেমের উপন্যাস না। প্রথম বাক্যটি পড়ে প্লিজ হতাশ হবেন না; জগতে প্রেম ছাড়াও বলার মত অনেক গল্প আছে। যদিও ‘গভীর রাত’ শব্দ দু’টি বিশেষ সুবিধের নয়। এক হিমু ছাড়া ঘোরতর অমানিশায় চমৎকার অভিজ্ঞতার আশা করে নিরাশ হয়নি, সেরকম মানুষের সংখ্যা শূন্য না হলেও তার ধারে কাছেই হবে। কিন্তু একথাও সত্যি যে রাত-জাগা পাখিদের অভিজ্ঞতার ঝুলি আসলেই অন্যরকম। যে ধরণের কর্ম ক্ষেত্রেই থাকুক না কেন, গল্প-গাছার অভাব হবে না। অবশ্যই আমরা জানি হাসপাতালও তার ব্যতিক্রম না; ভয়াবহ খারাপ সমস্যা যেমন রাতেই হয়, সে রকম অদ্ভুত সমস্যাগুলোও সূর্য ডুবলেই উপস্থিত হয়। ভয়াবহ ঘটনাগুলো সাইডে রাখি, বরং কয়েকটা দিশেহারা ঘটনাই বলি।

ঘটনা একঃ
———
নার্স এসে খবর দিলো রুগী চুলকাতে চুলকাতে অস্থির হয়ে যাচ্ছে, এখনি দেখতে হবে। আমি প্রমাদ গুণলাম, এদের দেশে একেকজনের একশ আঠারো রকমের ওষুধে অ্যালার্জি; কি খেলো কে জানে! আমাদের দেশে যেমন প্রত্যেক মানুষ অন্তত একটি করে অ্যান্টিবায়োটিকে রেজিসটেন্ট, তেমনি এদের প্রায় সবারই অন্তত একটা না একটা জিনিসে অ্যালার্জি। গিয়ে দেখি সে চুলকে প্রায় ছাল তুলে ফেলার অবস্থা করেছে।

“কি ব্যাপার! তোমার কিসে অ্যালার্জি হলো বলো তো। ফাইলে তো লেখা তোমার কোন অ্যালার্জিই নাই।” ?

“হু আমার কিছুতে অ্যালার্জি নাই তো।”

“তাহলে হঠাৎ? ডিনারে বাইরের খাবার খেয়েছো?”

“নাহ, আসলে আমার মনটা ভালো না।” ?

ভাবলাম ‘শরীর’ শুনতে ভুল করে ‘মন’ শুনেছি; তাই বললাম, “শরীর ভালো নাই? কি সমস্যা হচ্ছে?”

“না না শরীর ঠিকই আছে, মন ভালো নাই। আমি যখন ‘স্যাড’ আর ‘স্ট্রেসড’ থাকি, তখন আমার অ্যালার্জি হয়।”?

“অ্যাঁ? ? স্ট্রেসে অ্যালার্জি?”

“হু।”

হতাশ গলায় বললাম, “তাহলে এখন উপায় কি? চুলকানির ওষুধই দেই? দেখি কি হয়।”

“দাও।”

শেষকালে একটি অ্যান্টি-হিস্টামিন ট্যাবলেটে রোগীর চুলকানি থুক্কু মন খারাপ ভালো হয়ে গেলো। এক ঘণ্টা পর উঁকি দিয়ে দেখি নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। আফসোস, আগে জানলে নিজেই খেতুম না গোটা কয়েক? ?

.
ঘটনা দুইঃ
——–
এক ওয়ার্ড থেকে আর্জেন্ট পেজ এসেছে রাত্রি দেড়টায় – এখনি আসতে হবে; এখনি মানে এখনি। হাতের কাজ শেষ না করেই হন্ত দন্ত হয়ে ছুটে গেলাম। কি সমস্যা? নার্স অস্থির গলায় বললো যে রুগী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রথমত কথা আমার মাথাতেই ঢুকলো না, রোগী আবার খুঁজে না পাওয়া যায় কেমন করে? ওয়ার্ড তো রাতে লক ডাউন থাকে, পালাতে হলে নার্স স্টেশনের সামনে দিয়েই পালাতে হবে। বিস্তর জিজ্ঞাসাবাদে সম্ভবনা পাওয়া গেলো যে রোগী সম্ভবত রাত্রি দশটাতেই পালিয়েছে, কেউ টের পায়নি। সাড়ে তিন ঘণ্টা পার হবার পর হাউ কাউ লেগেছে। রোগীর মোবাইল বন্ধ। তার ফার্স্ট কন্টাক্ট দিয়ে রেখেছে এক্স পার্টনারের যে কিনা মহা চটে নার্সকে বলেছে যে ডিভোর্স হয়েও কেন পিছু ছুটছে না? যে রোগী চিকিৎসা নিতে চায় না তার জন্য এত আহাজারির মানে আমার দেশী মাথায় প্রথমে ঢুকল না।

“ইয়ে, চলেই যখন গেছে, এখন আমরা কি করতে পারি? হ্যালুসিনেশনের রোগী তো আর না যে জোর করে আটকে রাখতে হবে।” ?

নার্স খাতা বাড়িয়ে হাজির। “একদম ঠিক বলেছো। এখন এইখানে লিখে দাও দেখি যে এতে কোন সমস্যা নাই।”

এইবারে আহাজারির মানে বুঝলাম, কেউ দায়িত্ব নিবে না। জীবনে এই রোগী আমি দেখিনি, কিছুই জানি না; আমারই নেয়ার দরকার কি? গম্ভীর মুখে বললাম, “কোঅর্ডিনেটরকে ফোন করো। তাকে বলো ব্যবস্থা নিতে।”

নার্স মাথা নাড়ল, “করা হয়েছে।”

“কি বললো?”

“বললো তোমাকে খবর দিতে। তুমি যা করার করবা।”

মনের ভুলে মুখ দিয়ে বাংলা বেরিয়ে গেলো – “আমি? আমি কি করবো?”?

উত্তেজনায় নার্স মনে হয় খেয়ালও করলো না যে বাংলা বলেছি, সেও উত্তর দিলো, “অবশ্য তুমি যদি খাতায় লিখে দাও যে রোগী পালালে কোন সমস্যা নাই তাহলে সব ল্যাঠাই চুকে যায়।”

বিরস বদনে রোগী হারালে কি করতে হয় সেই গাইড লাইন পড়তে বসলাম। পড়ে আমার মোটামোটি কালা ঘাম ছুটে গেলো। একমাত্র ডাক্তার যদি সার্টিফাই করে যে এই রোগী পথে ঘাটে ঘুরে বেড়ালে সমস্যা হবে না, তবে সবাই নিশ্চিন্ত। নতুবা পুলিশ থেকে শুরু করে সকল ধরণের কিচ্ছা করতে হবে। অত্যাচারের সীমা নাই। শেষ মেষ ঢোক গিলে ফাইল ঘাটতে বসলাম – কোনভাবে সার্টিফাই করা যায় কিনা; সেই ফাঁকে পেজারে কাজ জমে গেলো পাঁচটা। এক ঘণ্টা সময় নষ্ট করে রোগীর তিন পুরুষের ফাইল ঘেঁটে প্রায় দেড় পৃষ্ঠা রিপোর্ট যখন লিখে ফেলেছি, সেই সময় রোগী মনের আনন্দে গড়াতে গড়াতে এসে উপস্থিত। কারণ কি? রোগীর নাকি হাসপাতালের বালিশে ঘুম হচ্ছিলো না, তাই বাসা থেকে বালিশ আনতে গেছে! বালিশ আনতে গিয়ে তার খেয়াল হয়েছে যে মোবাইলটাও চার্জ দেয়া দরকার, তাই এত দেরী।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিপোর্টের নিচে অ্যাড করলাম – পেশেন্ট কেম ব্যাক সেফ এন্ড সাউন্ড। ওয়ান্টেট হার ওন পিলো।

কে দেবে আমার জীবনের ওই একটা ঘণ্টা ফেরত? ?

.
ঘটনা তিনঃ
———
রাত্রি দুইটা-তিনটার দিকে আর্জেন্ট ক্লিনিকাল রিভিউ – হার্ট বিট বেড়ে আর একটু হলেই ‘মেট কল’ ক্রাইটেরিয়ায় (মেডিকেল ইমার্জেন্সি টিম) যায় যায়। বয়স দেখে মনটা খারাপই হলো, ভাবলাম আরে এই বাচ্চা ছেলে এখনি হার্টে সমস্যা বাঁধিয়ে বসে আছে। গিয়ে দেখি রোগীর সব ঠিক, শুধু হার্ট বিটটাই বেশী; আর সেটি গত দুই দিন ধরেই বেশী। এ জগতে যত রকমের পরীক্ষা আছে সব কিছুই গত দুই দিন ধরে করা হয়েছে, কিন্তু কিছুই ধরা পড়ে নাই। রিপোর্ট অনুযায়ী রোগী মোটামোটিভাবে একজন আদর্শ মানুষ যার এক ভাঙা কনুই ছাড়া কোথাও কোন সমস্যা নেই। তারপরেও হট্টগোল করলাম; হার্ট নিয়ে রিস্ক কে নেবে? ইসিজি করোরে; ফ্লুইড চার্ট কই রে, ইলেক্ট্রোলাইটের অবস্থা কি- ইত্যাদি ইত্যাদি। সব স্বাভাবিক।

ভাঙা কনুই সারানোর পড়েও কেন হার্ট বিট বাড়তি সে প্রশ্ন করার জন্য রাত্রি তিনটা উপযুক্ত সময় না। আসলে রাত্রি তিনটা কোন কিছুর জন্যই ভালো সময় না; প্রয়োজনীয় প্রশ্নও পারিপার্শ্বিকতার জন্য উদ্ভুইট্টা শোনা যায়। আর কিছু না পেয়ে শেষ মেষ জিজ্ঞেস করেই বসলাম যে কিছু নিয়ে স্ট্রেসড কিনা। যে উত্তর পেলাম সেটির জন্য তৈরি ছিলাম না।

বেচারা হাসপাতালে, আর এর মাঝে তার বাগদত্তা গত পরশু দুপুরে তার সাথে ব্রেক আপ করেছে। আংটিও নিজে ফেরত দিতে আসেনি; এক বন্ধুর কাছে দিয়ে গেছে। বলতে গিয়ে রোগীর চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে আর আমি প্রাণপণে স্বান্তনা দেয়ার জন্য একটা ভালো ইংরেজি শব্দ খুঁজছি। বিপদে ব্রেইন বেইমানি করলো, কোন ভালো বাক্যই মনে পড়লো না। রাত বিরাতে কিছুই জায়গা মত পাওয়া যায় না, সুতরাং টেবিল মোছার ওয়েট টিস্যু ছাড়া কিছু খুঁজে পেলুম না। এএমসি পরীক্ষার স্টেশন মনে করে গ্লাসে পানি ঢালতে গিয়ে দেখি জগটাও শূন্য। যখন আমি মোটামোটি নিশ্চিত যে স্টেশনে এমপ্যাথিতে শূন্য পেয়ে ফেল করতে যাচ্ছি সেসময় ত্রাতা হিসেবে নার্সের আগমন ঘটলো। দূর থেকেই ঘটনা দেখে সে টিস্যু নিয়ে উপস্থিত। টিস্যু তে চোখ মুখে ছেলে ঠাণ্ডা হলো।

বেখাপ্পা ভাবে ‘ইমোশনাল’ ডায়াগনোসিস করে বিদায় হলাম।ভাঙা হৃদয় সারাবার মন্ত্র জানা থাকলে কি আর ডাক্তারি করি? শান্তিতে নোবেল প্রাইজ পেয়ে যেতুম না এতদিনে? ?

এত কিছুর পরেও রাত্রি রহস্যময়, গল্প-কবিতা লেখার শ্রেষ্ঠ সময়। রাত সম্পর্কে আমার সবচেয়ে প্রিয় বাক্যটি একটু বদলে দিয়ে লেখার ইতি টানি – বাক্যটির মালিক জহির রায়হান। ‘রাত বাড়তেই থাকে, হাজার বছরের পুরনো সে রাত।’

সোনালী সাহা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Next Post

মুগদা মেডিকেল কলেজে অনুষ্ঠিত হয়েছে "International Advanced Surgical Workshop 2018"

Sat Sep 22 , 2018
“steps toward better surgical care ” এই স্লোগানকে সামনে রেখে গত ১৯ সেপ্টেম্বর , মুগদা মেডিকেল কলেজে অনুষ্ঠিত হলো International Advanced surgical workshop 2018. সারাবাংলাদেশ থেকে আগত সার্জনদের পদচারনায় মুগদা মেডিকেলের ক্যাম্পাস ছিলো মুখরিত। Society of Surgeon of Bangladesh আয়োজিত এই ওয়ার্কশপে উপস্থিত ছিলেন International Society of University of colon […]

Platform of Medical & Dental Society

Platform is a non-profit voluntary group of Bangladeshi doctors, medical and dental students, working to preserve doctors right and help them about career and other sectors by bringing out the positives, prospects & opportunities regarding health sector. It is a voluntary effort to build a positive Bangladesh by improving our health sector and motivating the doctors through positive thinking and doing. Platform started its journey on September 26, 2013.

Organization portfolio:
Click here for details
Platform Logo