• সাহিত্য পাতা

September 3, 2018 10:59 pm

প্রকাশকঃ

প্ল্যাটফর্ম সাহিত্য সপ্তাহ -১৭

“আমাদের ঈদ”

লেখকঃ
ডাঃ তারানা তাসনুবা
টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ।

ফোনটা বেজেই চলেছে ডাক্তার আবিরের । স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে একটা বাচ্চা ছেলের মুখ । স্ত্রীর ফোন নম্বরটা ছেলে আপনের ছবি দিয়ে সেভ করা ! ইরা এই নিয়ে কম ঠাট্টা করেনি । আউটডোরে রোগীর খুব চাপ । এই গ্রামের রোগী তো আছেই , শহর থেকে বেড়াতে আসা রোগী ও এসেছে । বেশ প্রত্যন্ত অঞ্চলের হেল্থ কমপ্লেক্সের সহকারী সার্জন ডা: আবির । ওর গ্রামের বাড়ি এখান থেকে চল্লিশ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু রাস্তা এত খারাপ যে আসতে যেতে অবস্থা কাহিল ।
ডাক্তর সাপ !
রোগীর কথায় সম্বিত ফিরল আবিরের । দরজার বাহিরের অপেক্ষমান রোগীর অসহিষ্ণুতা আজ আবির নিজে অনুভব করছে । আজ শেষ হাট বার । পরশু ঈদ । বাবা বৃদ্ধ মানুষ। আবির একমাত্র ছেলে । হাটে যাওয়ার মত কেউ নেই । অগত্যা আজ আল্লাহ যা কপালে রেখেছেন তাই কিনে আনবে । রোগী দেখতে দেখতে আড়াইটা বেজে গেছে । খিদেয় পেটে ছুচো কনসার্ট করছে । কিন্তু আজ সে বাসাতেই খাবে । ইরা অপেক্ষা করছে। আপন টা যে কি করছে । দাদা , দাদী আর মাকে বিরক্ত করে মারছে !

পৌনে চারটার দিকে বাসায় পৌছালো আবির । ছেলে উঠানেই দাঁড়িয়ে। বাবাকে দেখেই ছুটে এলো । বাবা আমার লাল গরু কই ? পরশু তো ঈদ !
জানি বাবা ! আমরা আজই যাব গরু কিনতে । বাইক পার্ক করে ছেলেকে কোলে নিল আবির ।
গরুটা অনেক বড় হবে ! তাইনা বাবা ! গরুর পিঠে চড়ব আমি । বড় বড় শিং থাকবে !
হ্যা বাবা সব হবে ।
এই নামো ! বাবার কোল থেকে । ভাত খেতে দাও বাবাকে । ইরা ধমকে উঠল ।
ইরার চোখেমুখে রাগ। একটা বার বাবার বাড়ি থেকে একটু ঘুরে আসতে চেয়েছিল বিকালে । ওর সব ভাই বোনেরা এসেছে । কিন্তু গরু কিনে ফিরতে ফিরতে কটা বাজে…

আহা এত রাগ করছ কেন ? কাল ইভেনিং করেই তিন দিন ছুটি । ও বাড়িতে যাব একদিন । সমস্যা তো নেই !
সবাই তো তোমার জন্য বসে থাকবে ! ঈদ করেই বড় ভাইয়া পরিবারসহ কলকাতা যাচ্ছে ! মেঝ আপুরা কক্সবাজার। মিরা যাচ্ছে বন্ধুদের সাথে সিলেট ।
ওহ ! তাহলে মহারানির এজন্য রাগ ? বেশ তো ! ছুটি পেলে আমরাও কোথাও যাব !
তোমার আর ছুটি ! মুখ ঝামটে ইরা তরকারি আনতে চলে গেল রান্নাঘরে।

গরুটাকি গুতো মারবে ?
নাহ ! তুমি ও কে ঘাস দাও । ও সুন্দর খেয়ে নেবে ।
যদি কামড়ে দেয় ?
আরে না । আপন বাবুকে চেনে তো গরুটা !
তুমি লাল গরু কেন আনলে না ?
এটাই তো সুন্দর বাবা ।
আরো বড় গরু কেন আনলে না ?

পরদিন ভোরে ফোন বাজছে আবিরের । এটা নতুন কিছু না । তার ফোন চব্বিশ ঘণ্টায় যেকোন সময়ই বেজে উঠতে পারে !
হ্যালো ! ( ঘুম জড়ানো কন্ঠ আবিরের)
ভাইয়া একটা উপকার করেন ।
কে ? পারভেজ?
জি ভাইয়া। গতকাল থেকে খুব জ্বর । আমার মর্নিং টা যদি করে দিতেন ।
আমার ইভেনিং। ইমার্জেন্সি, আউটডোর একা সামলাবো কি করে ? আবিরের অসহায় কন্ঠ ।
ভাইয়া লোকবল কম সেটা তো আমাদের দোষ না । কিন্তু ম্যানেজ তো করতেই হবে ।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল আবির।
আচ্ছা সকালেই যাচ্ছি। একেবারে ইভেনিং করে ফিরব । পলাশ নাইটে আসছে তো ?
পলাশ তো যাওয়ার কথা ভাই।
এই ঈদের আগের দিনটা তোমরা যদি এভাবে বিপদে ফেল….
ফোন কেটে দিল আবির । আপন কত শখ করেছিল আজকের সকালটা একসাথে কাটাবে। হল না । সবার ওঠার আগেই সদা সর্বদা তৈরি থাকা ব্যাগটা নিয়ে বাইকে চড়ে বসল । গন্তব্য চাকরিস্থল । সবার চোখের সামনে যেতে খুব কষ্ট হবে । ইরার চোখে তাকানোর সাহস নেই আবিরের ।

আউটডোর শেষ করে চায়ের দোকানে চা খাচ্ছে আবির ।
স্যার ঈদ কি এইখানেই করবেন ? বাড়ি যাবেন না ? চা ওয়ালার প্রশ্ন।
ইচ্ছে তো করে না । কিন্তু থাকতে হচ্ছে। পারভেজ আজ নাইট করে অসুস্থ হয়ে গেল।
হ ! যা গরম । তার উপর থাকে না কারেন্ট !
দাম মিটিয়ে চলে গেল আবির । হেল্থ কমপ্লেক্সের দোতলায় ডক্টরস রুম । একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য চেয়ারে গা এলিয়ে বসল । ওমনি কারেন্ট চলে গেল । অসহনীয় গরম । রুম বদলাতে হবে । দুপুরের রোদ এসে রুমটাকে নরক বানিয়ে দেয় । সব ডাক্তাররা মিলে কেনা চার্জ ফ্যানটা আছে বলে রক্ষা ।

রাত আটটা ,
পলাশের আসার কথা আরো আগে । ফোন বন্ধ। কি হল ? আসবে না ?
একটু পর পলাশ নিজেই ফোন করে বলল , সে দীর্ঘ জ্যামে পড়েছে । আসতে আসতে রাত দশটা বাজবে । ইতিমধ্যে বাসা থেকে অসংখ্য ফোন আসা শুরু হয়েছে। ইরা ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়িতে গেছে একাই । রাগ করেছে ভীষণ । দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুনকাম করা সিলিং এ অপলক তাকিয়ে আছে আবির । সিস্টার এসে জানালেন এক রোগী ছুটি চায় । আবির ফাইল দেখে অবাক , রোগী আজ সকালেই ভর্তি হয়েছে ডাইরিয়া নিয়ে। রোগীর কাছে গিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ছুটি দিল ।
সিস্টার বললেন , স্যার রোগীর তো ছুটি হল আপনার , আমার তো মাফ নেই । জবাবে আবির হাসল । প্রাণ ছিলনা সেই হাসিতে ।

রাত দশটা ,
বাবা ফোন করেছেন , কান্নাজড়ানো কন্ঠে বললেন ,
আসবি না বাবা ? তোর সাথে কি এবার ঈদ করা হবেনা ? এটুকু করতে পারিস না বুড়ো বাপ মায়ের জন্য ? সারা বছর চাকরি , কোচিং, ডিউটি । এই ঈদ একটা দিন । তাও তুই নেই ।
মরে গেলে কবরে মাটি দেওয়ার সময় পাবি তো ?
আবির নিশ্চুপ। চশমাটা ঘোলা হয়ে গেছে চোখের পানিতে ।

রাত দুটো , দরজায় খটখট শব্দে ঘুম ভাঙে আবিরের । দরজা খুলে দেখে পলাশ ।
আবির খুশিতে জড়িয়ে ধরে পলাশকে ।
যাক তুমি এলে অবশেষে।
ভাই কি ভয়াবহ জ্যাম । ঈদে তো ঢাকায় যাতায়াত করেন না ! আজ বাসায় গিয়ে টিভিতে দেখেন ।
হুম আমি এখনই যাব ।
না না ! এত রাতে বের হবেন না । ভোর হতে মাত্র দুই ঘন্টা বাকি । আপনি ঘুমিয়ে নেন । আমি তো আছিই ।
না না । তুমি জার্নি করে এলে । খালাম্মা কেমন আছেন ?
ভালো । ঐ কোমরের ব্যাথাটা আছেই । ভালো কথা মনে করেছেন। কি কি খাবার সাজিয়ে দিয়েছে। বের করি । রাতে খেয়েছেন ?
না রে ! বুঝতেই পারছ মনের অবস্থা।
জি ভাই । নেন হাত মুখ ধুয়ে শুরু করেন । দুজনের ভালোমত হয়ে যাবে।
আবির আর পলাশ খেতে খেতে দুজনের সুখ দুঃখের আলাপ সারতে লাগল । ধীরে ধীরে পুব আকাশে আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। আর তর সইল না আবিরের ব্যাগ নিয়ে এক ছুটে বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ল । বাবার সাথে সকাল সাতটার ঈদের নামাজ পড়তে হবে !

 

শেয়ার করুনঃ Facebook Google LinkedIn Print Email
পোষ্টট্যাগঃ প্ল্যাটফর্ম সাহিত্য সপ্তাহ,

পাঠকদের মন্তব্যঃ ( 0)




Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Advertisement
Advertisement
Advertisement
.