• অভিজ্ঞতা

October 6, 2019 10:52 am

প্রকাশকঃ

১। ডাক্তারিবিদ্যা তখনও আমার কাছে বিরাট গোলকধাঁধা। গোলকধাঁধার চক্করে ঘুরতে ঘুরতে আমার সামনে উপস্থিত হয়ে গেলো ফার্স্ট ইয়ারের ফার্স্ট টার্ম পরীক্ষা মহাশয়। ১১ই জুন, ২০১১। অ্যানাটমি ভাইভা বোর্ড। খুব রাগী ম্যাডাম, হৃদপিণ্ড ধরতে বলেছেন, অ্যানাটমিক্যাল পয়েন্টসও ঠিকঠাক বলতে পারছি না। বিরক্ত হয়ে রেডিয়াস ধরালেন, তাও ধরলাম উল্টো। কোনোকিছুর জবাব ভালোভাবে দিতে পারছি না। অথচ আমি পড়ে এসেছি অনেক কিছু, ম্যাডাম যদি জানতেন! খুব স্বাভাবিকভাবেই চরমভাবে অপমানিত হলাম। ভাইভাবোর্ড থেকে বেরিয়ে সোজা হোস্টেলে নিজের রুমে। এতক্ষণ চাপিয়ে রাখা দুর্বিষহ কষ্টের মেঘগুলো অঝোর ধারায় বৃষ্টি হলো চোখের দুকোণ বেয়ে। মেডিকেলের প্রথম বড় পরীক্ষা তাতে কিছুই পারলাম না। ভেবে নিলাম, এখানেই বুঝি সব শেষ।

কিন্তু না; মহাপরিকল্পনাকারীর প্ল্যান বড় অন্যরকম হয়। নতুন ব্যাচ টিচার এসেছেন অ্যানাটমিতে। ভয়ে-সঙ্কোচে ক্লাসে যাই, স্যার যদি অপমান করেন ফেইল করেছি বলে। কিন্তু এ কী, স্যারের কথাবার্তায়-দৃষ্টিভঙ্গিতে তো এসবের কোনো লক্ষণ নেই, বরং তার অ্যাটিটিউড ছিল—আরে এসব কোনো ব্যাপার না, হতেই পারে। সাহস সঞ্চার হতে থাকলো, বারবার প্র্যাকটিস করে আইটেম দিতে থাকলাম। স্যার খুশি হতে থাকলেন আমার চেষ্টা দেখে। একদিন স্যার ক্লাসে সবার সামনে একটা কথা বললেন; যে কথাটি এখনও কান পাতলে যেন আমি শুনতে পাই, “সেকেন্ড টার্মে বাকি সবাই যদি ফেইলও করে, আর শুধু মারুফ যদি পাশ করে তাতেই আমি খুশি।” আমি থান্ডার্ড হয়ে গেলাম স্যারের কথা শুনে। মরে যেতে চাওয়া পড়াশোনায় আগ্রহ-চর্চা আরও বাড়তে থাকলো। আইটেম নিয়ে স্যার বলেন, মারুফ সবচেয়ে ভালো আইটেম দিয়েছে। এমনকি স্যার অন্য ব্যাচে ক্লাস নিতে গিয়েও আমার প্রশংসা করেন, বন্ধুদের কাছে শুনি। আমার মন ভরে যায় স্যারের প্রতি কৃতজ্ঞতায়। এরপর থেকে এমবিবিএস পাশ করা পর্যন্ত আল্লাহর রহমাতে আমাকে আর সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষায় বসতে হয়নি কখনও কোনো সাবজেক্টে। এসব হয়তো খুব বড় কিছু না, কিন্তু ঐ দুঃসহ সময়ে উত্তাল সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে খেতে আঁকড়ে ধরার বিশাল এক সত্ত্বা ছিলেন আমার স্যার।

২। ফার্স্ট প্রফের গণ্ডি পেরিয়ে তখন থার্ড ইয়ারে। মার্চ, ২০১৩। কলেজের কালচারাল উইকে একটা ইভেন্ট হয় “বর্ষভিত্তিক প্রতিযোগিতা” নামে। তো আমাদের ব্যাচ থেকে মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটা স্লাইড শো প্রেজেন্ট করা হবে। বন্ধুরা ধরলো সাথে কবিতা টাইপ কিছু একটা লিখে দিতে হবে। অনুরোধে ঢেঁকি গিলে লিখে ফেললাম মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিছু একটা। আমার বন্ধু সুফীল এত অসাধারণ আবৃত্তি করলো, মাঝে মাঝে অডিয়েন্স এমনভাবে গর্জে উঠছিল, তাতে মনে হচ্ছিল এখইনই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বেন তারা! যেটা বলার জন্য এ গল্প ফাঁদলাম, সেটা ঘটলো আবৃত্তি শেষে। অ্যানাটমির ঐ প্রফেসর ম্যাডাম সুফীলকে ডেকে বললেন, “কার লেখা এটা?” সুফীল এসে আমাকে ডেকে নিয়ে গেলো ম্যাডামের কাছে। ম্যাডাম আমার দিকে বিরাট বিস্ময় নিয়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বললেন, “অ্যাঁ তুমি লিখসো এইটা? খুব সুন্দর হইসে। খুব সুন্দর হইসে।” ম্যাডামের স্টুডেন্ট ছাড়া আমি কাউকে বোঝাতে পারব না ম্যাডামের কাছে অমন একটা কমপ্লিমেন্ট পাওয়া আমার জন্য কতটা অভাবনীয়, কতটা অনুপ্রেরণীয়।

ঠিক এক বছর পর একই অনুষ্ঠান। মার্চ,২০১৪। কলেজ অডিটোরিয়াম। গতবার প্রাইজ পাবার সুবাদে এবার আমাকে বসিয়ে দেওয়া হলো রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি নিয়ে একটা লেখা তৈরি করতে। সুফীল আবৃত্তি শুরু করলো। ও কাঁদতে কাঁদতে এত হাই স্কেলে আবৃত্তি করছিল যে, পুরো অডিয়েন্সকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় বানিয়ে ফেলেছে। হঠাত আমার চোখ এমন এক জায়গায় আটকে গেলো, যে দৃশ্য আমি জীবনেও দেখিনি। যে ম্যাডাম প্রায়শই আমাদেরকে ক্লাসে বকাঝকা করেন, তার চোখ বেয়ে টপটপ করে জল ঝরছে। এ দৃশ্য বেশিক্ষণ দেখার আমার সাধ্য নেই। আমি কেমন স্বার্থপর—ম্যাডামের চোখের পানি আমার অনুপ্রেরণা!

৭ মিনিট পর আবৃত্তি শেষ হলো। কী দেখলাম আমি! প্রায় পুরো অডিটোরিয়াম দাঁড়িয়ে গেছে। হৈ হৈ রৈ রৈ শব্দ হচ্ছে খুব জোরে। আমাদের সিনিয়র-জুনিয়র তো বটেই, শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানাচ্ছেন! ততক্ষণে আমার বুকে তৃপ্তির বান ডেকেছে, চোখে টলমল জল!

বিস্ময়ের পর বিস্ময়। বাংলাদেশের মেডিকেল জগতে যে কজন জীবন্ত কিংবদন্তী আছেন তাদের মধ্যে একজন আমাদের প্রিন্সিপাল প্রফেসর ডা. আবদুল মান্নান শিকদার স্যার (বর্তমান একাডেমিক এডভাইজার)। পরম শ্রদ্ধেয় এ মানুষটি পর্যন্ত প্রোগ্রাম শেষে প্রশংসা করে কংগ্র্যাচুলেট করলেন। আরও ৩ জন স্যার আমাকে জানালেন তাদের চোখে পানি আসার কথা। ফার্মাকোলজি স্যার ক্লাসে যেভাবে প্রশংসা করলেন, তাতে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়েছে।

অনেক দিনের প্ল্যান, ছক কষা, অনেক আয়োজনের পর ফিফথ ইয়ারে উঠেই আমরা একটা প্রোগ্রামের আয়োজন করেছিলাম “Battle against depressed & Suicide. ” অবস্থা এমন দাঁড়ালো প্রোগ্রাম শুরুর আগেই আমার কপালে ঘাম জমে যাচ্ছে। পুরো অডিটোরিয়াম তো ভরেছে ভরেছেই, অনেক বড় সংখ্যক একটা মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এমনকি আমার সিনিয়রদেরও। কিছু করারও ছিল না। কানায় কানায় ভর্তি। প্রোগ্রাম শুরু হলে সেখানে ঘোরের সৃষ্টি হয়, হাসি-কান্নার এক দ্বৈত অবস্থান। প্রিন্সিপাল স্যার উঠে বললেন, আমি আজ নিজেই ধন্য আমার এই ছাত্রদের সাথে থাকতে পেরে। স্পিচ শেষ করে ডায়াস থেকে নিচে নেমেছি, সুফীলের আবৃত্তিও শেষ–ফোনে মেসেজ এলো আমাদের মেডিকেলের সবচেয়ে নিয়মতান্ত্রিক একজন টিচারের। এতোদিন আগের মেসেজ এখনও আমার মনে আছে– Nice poetry, nice speech. Please keep it up. You have a very bright future.

মাঝেমাঝে চারপাশটা ঝাপসা লাগতো, সবকিছু বেসুরো, বেতাল, কেমন যেন ছন্দহীন। ক্লাসের একঘেয়েমি, প্রফের অসহ্য স্ট্রেস, বাস্তবতার কঠোরাঘাতে দিশেহারা লাগে সময় সময়। কলমও ধরতে ইচ্ছে করে না। প্রিয় পাঠক, জানেন, আমার যখন এসব মহান শিক্ষকের এসব অনুপ্রেরণার কথা হুট করে মনে পড়ে যায়, আমি ভেতর ভেতর অন্যরকম এক শক্তি পাই, সবকিছু পুনরোদ্যমে শুরু করতে এর চেয়ে আর বেশি কিছু লাগে কি?

৩। ‘লেজেন্ড অফ মেডিসিন’—শুধু এটুকু বলার সাথে সাথেই বাংলাদেশের অজস্র ডাক্তার-হবু ডাক্তারের মস্তিষ্কে হয়তো সদ্যপ্রয়াত প্রফেসর ডা. এ কে এম রফিক উদ্দিন স্যারের চেহারাটা ভেসে উঠবে। স্যার যখন আমাদের থার্ড ইয়ারে ক্লাস নিতেন, বলতেন—হিস্ট্রি হিস্ট্রি হিস্ট্রি; আর কিচ্ছু না এখন। সবচেয়ে বেশি শেখাতেন—রোগীকে কীভাবে সম্ভাষণ করতে হয়, কীভাবে তাকাতে হয়, কীভাবে বসতে হয়, কীভাবে কথা বলতে হয়, কীভাবে রোগীর কথা শুনতে হয়; সর্বোপরি কীভাবে রোগীর মনটা জয় করে নিতে হয় সেটা। স্যার বলতেন, রোগীর সাথে এমন সম্পর্ক তৈরি করো যেন সে তার পাশের বাড়ির বেড়ালের নামটিও তোমার কাছে বলে, তোমাকে যেন সে তার বাসায় দাওয়াত করে। গাছের আম খেতে কিংবা পুকুরের তাজা মাছ খেতে। প্রতিটি রোগীই স্যারের ব্যবহারে কীভাবে এতটা মুগ্ধ থাকতেন তা আজও এক রহস্য। আমার মতো কত শিষ্যের অন্তরে যে তিনি রোগীর সাথে ভালো আচরণ করার, প্রতিটি রোগীকে সম্মান করার, রোগীর পাশের বাসার বেড়ালের নাম জানার, রোগীর বাসায় দাওয়াত নেয়ার নেশা ঢুকিয়ে দিয়েছেন তা কে জানে। এ অনুপ্রেরণার নাম কী, পরিচয় কী কে জানে। উনার যত শিষ্য যতদিন যত রোগীর মুখে হাসি ফোটাবে, সে পূণ্যের একটা অংশ তার হিসেবের খাতাতেও যোগ করে দিন আল্লাহতায়ালা।

৪। খুব ছোটবেলায় অক্ষর লিখতে পারতাম না ঠিকমতো। আমাদের মা আমাদের হাত ধরে হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ‘অ আ ই ঈ’ লেখাতেন পরম ধৈর্যসহকারে। আজ যখন আমরা ঠিকভাবে লিভার প্যালপেট করতে পারি না, আমাদের মায়ের মতো ম্যাডাম হাতের উপর হাত দিয়ে কীভাবে রোগীর পেট চাপতে হবে তা শিখিয়ে দেন। প্রত্যেকের মা প্রত্যেকের জন্য অনুপ্রেরণা, আমাদের শিক্ষিকারা কম কিসে? হে বিশ্বজগত, তাকিয়ে দেখো তুমি, আমাদের এক মা-কে ছেড়ে আমরা দূর পরবাসে থাকি, আরও কত মা প্রতিদিন আমাদের পাশে আছেন!

৬। প্রফ পরীক্ষাগুলোর সময় দেখেছি সারা বছর আমাদেরকে শাসনে রাখা ঐ স্যার-ম্যাডামেরা কী পরিমাণ ভালোবাসেন আমাদের। একেকটা স্টুডেন্টকে উতরে নেবার জন্যে তাদের চেষ্টার সীমা থাকে না। একটা স্টুডেন্ট খারাপ করতে নিলে কতোভাবে ফেরানোর চেষ্টা করেন। কেউ খারাপ করে ফেললে কতোটা দুঃখবোধ হয় তাদের।

৭। ইন্টার্নশিপের গল্প শুরু করলে তো শেষ করা মুশকিল। শাহীন ম্যাডাম যখন বলতেন “এই আমার ছোট ডাক্তার কোথায়”, সোহেল ইকবাল স্যার যখন আমার হাতের উপর হাত রেখে ইনসিশান দিয়েছেন, মাহবুব স্যার যখন রনি স্যারকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন আমার পড়াশোনার ব্যাপারে বিশাল একটা কমপ্লিমেন্ট বলে তখন এক অন্য অনুপ্রেরণার জন্ম দেয়। জাইদা ম্যাডাম, হালিমা ম্যাডাম, দিনা ম্যাডাম, শিউলি ম্যাডাম, সুমি ম্যাডাম, সোনিয়া ম্যাডাম, মাহতাব স্যার কতোজনের কথা বলব!

৮। আমার আবারও এডাভাইজার স্যারের কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে। আমাদের মেডিকেলের প্রতিটা মানুষের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা বোধহয় তিনি। এ মানুষটির সাথে দেখা হলেই “তুমি অনেক ভালো লেখো, তোমার লেখা আমি নিয়মিত পড়ি, চালিয়ে যাবা” ধরনের কথা…অন্য টিচারদেরকেও বলেন…আমাকে ডাকেন, কথা বলেন, স্যারের গল্প তন্ময় হয়ে শুনি …স্যারের মতো মানুষের এমন বিশাল কমপ্লিমেন্ট আমার মতো তুচ্ছ ভীষণ রকমের লজ্জায় ফেলে…
উনারা আমাকে এই প্রফেশানকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন…

আরও অনেক অনেক গল্প এসে জমা হয়েছে। নিজের এতো ভেতরের কথা কাউকে বলা হয় না সাধারণত। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলো কেন সবার সাথে শেয়ার করলাম? এই গ্রুপের সবাই আমার আপন, ভাই-বোন, সবার কাছে প্রত্যাশা আমার অনেক বেশি। আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণকে কিছু বলার মতো ভাষাযোগ্যতা আমার নেই। আমার অনুরোধ হবু ডাক্তার/ সদ্য প্রস্ফুটিত ডাক্তারদের কাছে—জীবনের কোনো না কোনো সময় হয়তো আমরা প্রায় সবাই শিক্ষকতা করব। হে হবু শিক্ষক, আপনি জানেন আপনার শুধু একটি কথায় আপনার কোনো ছাত্রের জীবনের মোড় ১৮০ ডিগ্রি কোণে ঘুরে যেতে পারে? নতুন একটা জীবন সে শুরু করতে পারে? নিরাশ-জ্যোতিহীন-দিকভ্রান্ত নয়নে আপনি দৃঢ় সংকল্পের উজ্জ্বল আলোর বন্যা বইয়ে দিতে পারেন? আপনার একটুখানি উৎসাহে সে পৃথিবীর বুকে বৈপ্লবিক কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারে, নতুন ইতিহাস হতে পারে। এই যে হবু শিক্ষক, দেখুন স্রষ্টা আপনার হাতে কত্ত বড় একটা ক্ষমতা দিয়ে রেখেছেন। আমার বিশ্বাস এত বড় অনুগ্রহ আপনি হেলায় হারাবেন না। অন্তরের গহীন থেকে শুভ কামনা হবু শিক্ষক আপনার জন্য।

আমার সর্বস্তরের সকল শিক্ষক ভালো থাকুন। আসুন শ্রদ্ধা জানাই আমাদের শিক্ষকদের।

মারুফ রায়হান খান
এনাম মেডিকেল কলেজ ২০১০-১১

শেয়ার করুনঃ Facebook Google LinkedIn Print Email
পোষ্টট্যাগঃ

পাঠকদের মন্তব্যঃ ( 0)




Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Advertisement
Advertisement
Advertisement
.