• নির্বাচিত লেখা

June 22, 2017 9:33 pm

প্রকাশকঃ

ডা:মেহেদী হাসান বিপ্লব

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত বর্তমানে এক ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।সাম্প্রতিক সময়ে রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজনদের হাসপাতাল ভাংচুর ও চিকিৎসক লাঞ্চনার অসংখ্য ঘটনা চিকিৎসক ও চিকিৎসা সেবার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে করে রেখেছে আতঙ্কিত।

চিকিৎসা একটি অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ বিজ্ঞান।এখানে রোগীর অবস্থা যতোই জটিল বা খারাপ হোক না কেন চিকিৎসকের চেষ্টা থাকে রোগীকে সুস্থ্য করে তোলা।জীবন বা মৃত্যুর মালিক চিকিৎসক নন।রোগের চিকিৎসা করতে পারলেও পৃথিবীর কোন চিকিৎসকেরই মৃত্যু রোধ করার ক্ষমতা নেই।আমাদের জন্ম হয় একজন চিকিৎসকের হাতে আবার মৃত্যুর সময়ে একজন চিকিৎসকই আমাদের পাশে থাকেন।রোগীকে সুস্থ্য করতে পারার মধ্যেই চিকিৎসকের সুখ ও সাফল্য।কোন চিকিৎসকই চান না তার হাতে একজন রোগীর মৃত্যু হোক।শত সীমাবদ্ধতার মাঝেও রোগীর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টাটাই করেন চিকিৎসকরা।

 

সম্প্রতি সেন্ট্রাল হাসপাতালের ঘটনার ভিডিও ফুটেজ থেকে আমরা দেখেছি একজন ছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিভাবে নৃশংস ভাবে চিকিৎসককে প্রহার করা হয়েছে এবং হাসপাতাল ভাংচুর করা হয়েছে।

রোগীর মৃত্যু একটি স্বাভাবিক ঘটনা।পৃথিবীর সকল দেশেই রোগীর মৃত্যু ঘটে।কিন্তু রোগীর মৃত্যু হলেই এ মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে যেভাবে হাসপাতাল ভাংচুর,চিকিৎসক লাঞ্চিত করা সহ যেভাবে তান্ডব চালানো হচ্ছে তাতে করে অদূর ভবিষ্যতে কোন চিকিৎসক জটিল কোন রোগী চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানালে অবাক হবার কিছু থাকবেনা।

 

মেডিকেল ইথিকস চিকিৎসককে নিজের জীবনের ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর, ও নিজের রোগী বাছাই করার অধিকার দিয়েছে।চিকিৎসা দেয়ার সময় চিকিৎসককে নিজের পিঠ বাঁচানোর চিন্তা করতে হলে সেটা কোন অবস্থায় চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না।

এ ধরণের ঘটনাগুলো সাধারণত রোগীর স্বজনদের অসন্তোষকে কেন্দ্র করেই ঘটছে।এ অসন্তোষ্টি তৈরি হবার কারণগুলো যদি আমরা দেখি তাহলে আমরা দেখতে পাই এর কারণগুলোর বেশীরভাগই চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়।পুরো বিষয়টাই চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার উপর নিয়ন্ত্রনে যার উপর চিকিৎসকদের কোন নিয়ন্ত্রন নেই।

 

 

যেমন, একশত শয্যার একটি সরকারী হাসপাতালের কথা ধরা যাক।সেখানে রোগী ভর্তি থাকছে আড়াইশত থেকে তিনশত।হাসপাতালের বারান্দায়, মেঝেতে অমানবিক পরিবেশে রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে।
সাম্প্রতি কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালে বেড খালি না পাওয়ায় রোগীর স্বজনরা ক্ষুব্ধ হয়ে চিকিৎসককে ইচ্ছেমত পিটিয়েছে।
এ কোন দেশে বাস করছি আমরা।আবকাঠামোগত অপ্রতুলতার দায় কোনভাবেই চিকিৎসকের উপর বর্তায় না।কিন্তু এর জন্য মাসুল চিকিৎসককেই দিতে হচ্ছে।
সাধারণত সকল সরকারী হাসপাতালেই শয্যা সংখ্যার চেয়ে ৩-৪ গুন রোগ ভর্তি থাকেন এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই চিকিৎসক ও নার্স দের অনেক পদ চিকিৎসক সংকটের কারণে খালি থাকে।যেখানে ১০০ শয্যার হাসপাতালে যে সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য লোকবল থাকার কথা থাকছে তার চেয়ে অনেক কম এবং চিকিৎসা দিতে হচ্ছে কয়েক গুন বেশী রোগী, সেখানে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মাঝে বিশাল ব্যবধান থাকবে সেটাই স্বাভাবিক।

 

 

দেশে প্রায় আঁশি হাজার রেজিষ্টার্ড চিকিৎসক রয়েছেন।
তারা সকলে আমাদের সমাজেরই অংশ।তাদের মাঝেও একাংশ নিজের কর্তব্যে অবহেলা করতে পারেন,অসৎ কার্যকলাপে যুক্ত থাকতে পারেন।কিছু সংখ্যক চিকিৎসক যারা কমিশন বানিজ্যে যুক্ত আছেন,রোগীর প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ।এ সকল চিকিৎসকদের যেমন আত্নশুদ্ধির প্রয়োজন আছে তেমনি অনৈতিক ও আনইথিকাল কাজের জন্য তাদের শাস্তির ব্যবস্থাও থাকা উচিৎ।চিকিৎসকদের এসকল কার্যক্রম মনিটরিং এবং দোষীদের শাস্তি প্রদানের জন্য বিএমডিসিকে আরো শক্তিশালী এবং বিদ্যমান আইনকে আরো যুগোপযগী করতে হবে।

 

গত দশ বছরে দেশে একের পর এক মেডিকেল কলেজ তৈরি করা হয়েছে,হাসপাতাল গুলোর শয্যা সংখ্যা ইচ্ছেমত বৃদ্ধি করা হয়েছে কিন্তু জনবল শয্যা সংখ্যা অনুযায়ী বাড়ানো হয়নি।সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসকসহ অন্যান্য জনবল বৃদ্ধি করা হয়নি।বেশীরভাগ নতুন সৃষ্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে পদই সৃষ্টি করা হয়নি।

 

একজন কে দিয়ে যখন ১০ জনের কাজ করতে বাধ্য করা হবে তখন কাজের মান খারাপ হবে সেটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা।এরকম সাধ্যের অতিরিক্ত দায় চিকিৎসকদের উপর চাপিয়ে দেয়ার মত নিষ্ঠুর আচরণ আর কিছুই হতে পারেনা।

হাসপাতালে রোগী নিয়ে আসলে ট্রলিতে রোগী ওঠালে ট্রলিবয়কে টাকা দিতে হয়,লিফট ম্যানকে টাকা দিতে হয়,অপারেশনের পর আয়ারা রোগীর কাছ থেকে টাকা আদায় করে বখশিশের নামে, এরকমভাবে চতুর্থ শ্রেণীর অনেক কর্মচারী বিভিন্নভাবে রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে থাকে।তাদের সিন্ডিকেট এতই শক্তিশালী যে,চিকিৎসকরা এমনকি প্রশাসনও তাদের কাছে অসহায়।অথচ সকল দোষ চিকিৎসকের ঘাড়ে এসে পড়ে,যেখানে কিছুই তার হাতে নেই।

টয়লেটে লাইট নেই দোষ চিকিৎসকের,বিছানার চাদর নেই দোষ চিকিৎসকের,ঔষধ নেই বা নার্স ওষুধ দিতে দেরী করছে দোষ চিকিৎসকের।চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রণে নেই এসকল বিষয়ে চিকিৎসকের জবাবদিহি করা অত্যন্ত কঠিন। চিকিৎসকের সাথে, চিকিৎসা সেবার সাথে জড়িত এসকল কর্মচারীদের উপর প্রশাসনিকভাবে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই।

চিকিৎসা একটি টিমওয়ার্ক।এখানে রোগীকে একজন চিকিৎসকের নেতৃত্বে নার্স,ওয়ার্ডবয়,আয়া সবাই মিলেই সেবা দেবেন।চিকিৎসক রোগীকে পরীক্ষা করে ব্যবস্থাপত্র লেখেন এবং সেটা ফলো করেন নার্স,তাকে বিভিন্নভাবে ওয়ার্ডবয় ও আয়া সাহায্য করেন।এ ব্যবস্থার টিমলিডার চিকিৎসক হলেও টিমের অন্যান্য সদস্যের উপর তার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে।চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির স্বার্থে এ ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত হওয়া জরুরী।

 

আধুনিক পরীক্ষা নিরীক্ষার ব্যবস্থা বেশীরভাগ হাসপাতালেই অপ্রতুল।এক্সরে মেশিন থাকলে টেকনিশিয়ান নেই,টেকনিশিয়ান থাকলেও মেশিন নষ্ট,আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন থাকলেও সনোলজিস্টের পদ নেই,প্যাথলজি টেকনিশিয়ান থাকলেও রিএজেন্ট নেই,এনালাইজার মেশিন নেই।
৩১ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গুলোতে জরুরী বিভাগের কোন অর্গানোগ্রামই নেই।বহির্বিভাগ ও অন্ত:বিভাগের চিকিৎসকরা নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে জরুরী বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন।এই যে এত নেই নেই,এর দায় কার?
এ দায় অবশ্যই রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের যারা চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করেন।আরো স্পষ্ট করে বললে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের।

 

চিকিৎসা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সকল অসঙ্গতি ও সমস্যা পর্যালোচনা করে সমাধান করার জন্য নীতিনির্ধারক হিসেবে কাজ করেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাগণ।কিন্তু সেখানে যারা বসে আছেন চিকিৎসা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তাদের নূন্যতম ধারণাও নেই।জরুরী বিষয়গুলো সমাধানে তাদের দক্ষতা,আগ্রহ বা ইচ্ছা এখনো পর্যন্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাতে দেখা যায়নি।

চিকিৎসা ব্যবস্থায় চিকিৎসক একটি উপাদান মাত্র।চিকিৎসক ছাড়াও অন্যান্য জনবল,অবকাঠামো,প্রযুক্তি,সরঞ্জাম সকল বিষয়ের সন্নিবেশেই আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে।এ সকল বিষয় নিয়েই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা।এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ব্যাপারটি পুরোপুরি চিকিৎসা বিষয়ে মাঠ পর্যায় থেকে দক্ষতা অর্জন করা স্বাস্থ্য বিভাগের এক্সপার্ট কর্মকর্তাদের অধীনে না যাওয়া পর্যন্ত এ সমস্যার সমাধান হওয়া সম্ভব হবেনা।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতির সূচকে বাংলাদেশ অনেক উন্নতি করেছে।বাংলাদেশ বর্তমানে ৫৪ তম স্থানে অবস্থান করছে।পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে রয়েছি আমরা।

সকল বিষয় বিবেচনা নিয়ে গত ৩০/০৫/১৭ ইং তারিখে বিএমএ প্রেস কনফারেন্স করে অন্যান্য দাবীর সাথে জোরালোভাবে কৃত্য পেশাভিত্তিক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার দাবী জানিয়েছে।
কৃত্য পেশাভিত্তিক মন্ত্রণালয়ের ধারণাটি নতুন কিছু নয়।বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরপরই বঙ্গবন্ধু টেকনিক্যাল মন্ত্রণালয়গুলোর(স্বাস্থ্য,কৃষি ইত্যাদি) সচিবের দায়িত্ব অর্পন করেন সে বিষয়ে টেকনিক্যাল এক্সপার্টদের।এরই ধারাবাহিকতায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান ডা:তসাদ্দেক হোসেন।বঙ্গবন্ধু জানতেন যে একটি টেকনিক্যাল বিষয়ে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকের অবশ্যই সে বিষয়ে এক্সপার্ট হতে হবে।শুধু প্রশাসনিক নথি ব্যবস্থাপনায় দক্ষ ব্যক্তি দিয়ে এসকল বিষয়ে সঠিক পরিচালনা কোনভাবেই সম্ভব নয়।
সেই ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু যে দক্ষ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন সেরকম দক্ষ চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের দাবী।

 

 

চিকিৎসা ব্যবস্থায় সমস্যাগুলো সমাধানে যেসকল কাজ গুলো দ্রুত করা জরুরী:

১।কৃত্য পেশাভিত্তিক মন্ত্রণালয় গঠন।ক্যাডার যার,মন্ত্রণালয় তার।

২।আন্তর্জাতিক মানদন্ড মেনে রোগী সংখ্যার ভিত্তিতে(বা কাছাকাছি অনুপাতে)চিকিৎসক,নার্স ও অন্যান্য জনবল নিয়োগ দিতে হবে।

৩।চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।প্রয়োজনে স্বাস্থ্য পুলিশ নিয়োগ দিতে হবে।

৪।চিকিৎসা ব্যবস্থায় অরাজকতা সৃষ্টি হলে দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে।

৫।বিএমডিসি কে আরো শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে।প্রয়োজনে বিএমডিসি আইনকে আরো যুগপযোগী করে তুলতে হবে।রোগীর স্বজনদের কোন অভিযোগ থাকলে বিএমডিসিতে অভিযোগ জানাবেন এবং বিএমডিসি দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহন করবে।সকলে যেন অভিযোগ থাকলে আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে বিএমডিসিতে অভিযোগ জানাতে উৎসাহিত হন সে ব্যাপারে জনসচেতনতা বাড়াতে ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রচারণা চালাতে হবে।

৬।আন্তর্জাতিক মানদন্ড মেনে জিপি ও রেফারেল সিস্টেম কার্যকর করতে হবে।এ ব্যবস্থায় একজন রোগী চাইলেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখাতে পারবেন না।তিনি তার জন্য নির্ধারিত জিপি চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন ও তার রেফারেল ছাড়া বিশেষজ্ঞ দেখাতে পারবেন না(একজনের জন্য অপশন হিসেবে সর্বোচ্চ ৩ জন জিপি চিকিৎসক নির্ধারিত থাকবেন)।

৭।রোগী ও তার স্বজনদের সন্তুষ্টি অর্জনে সেবার মান ঠিক রাখতে ও সঠিক কাউন্সেলিং এর স্বার্থে একজন চিকিৎসক বহির্বিভাগে,জিপি চেম্বারে বা বিশেষজ্ঞ চেম্বারে সর্বোচ্চ কতজন রোগী একদিনে দেখবেন সেটা নির্ধারণ করে দিতে হবে।এর বেশী রোগী দেখতে তাকে কোনভাবেই বাধ্য করা যাবেনা।

৮।অবকাঠামোগত উন্নয়ন অত্যাবশ্যক।বারান্দায় বা মেঝেতে অতিরিক্ত রোগী সেবা দেয়া রোগী ও চিকিৎসক উভয়ের জন্যই অত্যন্ত অমানবিক।

৯।প্রয়োজনীয় জনবল,সরঞ্জাম,প্রযুক্তি ও ঔষধ সরবরাহ নিশ্চিৎ করতে হবে।এসকল বিষয় সমাধান না করে চিকিৎসকদের কোনভাবেই জনগনের মুখোমুখি দাড় করিয়ে দেয়া ঠিক হবে না।মনে রাখতে হবে, ‘চিকিৎসক’ চিকিৎসা ব্যবস্থার একটি উপাদান মাত্র।

১০।কোয়াক বা পল্লী চিকিৎসক দ্বারা যে অপচিকিৎসা সারা দেশে করা হচ্ছে তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।এসকল অপচিকিৎসা প্রদানকারীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ব্যতীত ওটিসি ড্রাগ ছাড়া সকল ঔষধ বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।

১১।সকল প্রকার দালাল কঠোরভাবে দমন করতে হবে।

১২।বেসরকারী চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সেবার মূল্য সরকার কতৃক নির্ধারণ করে দিতে হবে।

১৩।নির্ধারিত মানদন্ড অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও শিক্ষক এবং জনবল না থাকা স্বত্বেও যত্রতত্র সরকারী মেডিকেল কলেজ তৈরি ও বেসরকারী মেডিকেল কলেজ অনুমোদন দেয়া বন্ধ করতে হবে।বেসরকারী মেডিকেল কলেজগুলোর শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি সুষ্ঠুভাবে করতে হবে।

১৪।গ্রামে বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে যে সকল চিকিৎসক পদায়ন পাবে তাদের সেখানে থাকার জন্য উৎসাহিত করতে বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে।
চিকিৎসক সংকট থাকলে অতিরিক্ত কর্মঘন্টার জন্য আলাদা ভাতার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
এছাড়া বেসিক সাবজেক্টে শিক্ষক ঘাটতি সমাধানে যারা বেসিক সাবজেক্ট এ ক্যারিয়ার করবে তাদের আলাদা ভাতার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
সকল চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসকদের জন্য মানসম্মত বাসভবন,নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও যাতায়াতের সুবিধার্থে পরিবহন ব্যবস্থা থাকা বাঞ্চনীয়।

১৫।সকল জেলা সদর হাসপাতাল গুলোকে ৫০০ বেডের জেনারেল হাসপাতালে উন্নীত করতে হবে যেখানে অত্যাধুনিক জরুরী সেবা,আইসিইউ,সিসিইউ,ডায়ালাইসিস,সকল অপারেশনের ব্যবস্থা থাকতে হবে।চিকিৎসা ব্যবস্থার মূল কেন্দ্রই হবে এই সদর হাসপাতালগুলো।সেখানে পদায়িত চিকিৎসকরা সেখানে উচ্চতর প্রশিক্ষন প্রাপ্ত হতে পারবেন সে ব্যবস্থা থাকতে হবে।
এ জন্য দেশে প্রচুর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রয়োজন।চিকিৎসকদের উচ্চতর ডিগ্রি ও প্রশিক্ষণ গ্রহনে উৎসাহিত করতে হবে।
উচ্চতর শিক্ষা ব্যবহারিক ও বাস্তবমুখী করতে কোর্সকারিকুলাম স্নাতক ও স্নাতোকোত্তর উভয় ক্ষেত্রে আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন।

১৬।স্তরভিত্তিক চিকিৎসা সেবার মান নির্ধারণ করতে হবে।যেমন:
প্রাইমারী বা উপজেলা লেভেলে হাসপাতালগুলোতে জরুরী বিভাগের আলাদা অর্গানোগ্রাম থাকতে হবে।এক্সরে, ইসিজি,আল্ট্রাসনোগ্রাম ও প্যাথলজি সুবিধা থাকা আবশ্যক।
সেকেন্ডারী বা জেলা সদর হাসপাতালগুলোকে চিকিৎসার মূল কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।প্রথমেই ৫০০ বেডের জেনারেল হাসপাতালে উন্নীত করা সম্ভব না হলেও ইকোকার্ডিওগ্রাম,ইটিটি,সিসিইউ,আইসিইউ,ডিজিটাল এক্সরে,সিটি স্ক্যান,সকল প্যাথলজিক্যাল,বায়োকেমিক্যাল ও মাইক্রোবায়োলজিক্যাল পরীক্ষা নিরীক্ষার ব্যবস্থা অবশ্যই থাকতে হবে।
আর টারশিয়ারী লেভেলে অর্থাৎ মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে সকল ধরণের পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা এবং সে অনুযায়ী দক্ষ জনবল অবশ্যই থাকতে হবে।
উদাহরণস্বরুপ বলা যেতে পারে ক্যান্সার হাসপাতালে এখনো পর্যন্ত PET Scan করার ব্যবস্থা নেই।
অনেক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে MRI/CT scan মেশিন পর্যন্ত নেই।অনেক জায়গায় মেশিন থাকলেও সেটা নষ্ট।
বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সকল পরীক্ষা নিরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিৎ করতে হবে।

 

 

 

উপরে বর্ণিত সকল ব্যাপারে সমাধানই পারে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে যুগান্তকরী করে তুলতে।এ ব্যাপারে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।আর এ জন্য কৃত্য পেশাভিত্তিক মন্ত্রণালয় গঠনের কোন বিকল্প নেই।
চিকিৎসা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নের সূচক আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইলে আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজন।আর অতি দ্রুত সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী না হলে সে দিন বেশী দূরে নয় যেদিন এদেশের চিকিৎসকরা দলে দলে দেশ ছেড়ে নিরাপদ কর্মসংস্থানের খোজে অন্য দেশে পাড়ি জমাবে।সেটা এ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য কখনো কাম্য হতে পারেনা।

 

 

 

 

 

লেখক ঃডা:মেহেদী হাসান বিপ্লব(হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ)
সদস্য,কেন্দ্রীয় কাউন্সিল,
বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন।

শেয়ার করুনঃ Facebook Google LinkedIn Print Email
পোষ্টট্যাগঃ বাংলাদেশ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য,

পাঠকদের মন্তব্যঃ ( 0)




Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Advertisement
Advertisement
Advertisement
.