রোজায় ডায়াবেটিক রোগীর করণীয়

2

মুসলিমদের জন্যে ইবাদাতের এক ভরা মৌসুম রমাদান। কে না শরীক হতে চায় এই মহিমান্বিত মাসের রহমতে! তবে কিছুটা বিপাকে পড়ে যান ডায়াবেটিসের রোগীরা। অনেকগুলো প্রশ্ন আর সংশয় তাদের মনে উঁকি দিতে থাকে।

এবার চলুন এক এক করে আমরা প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি।

১। ডায়াবেটিসের রোগীরা কি রোজা রাখতে পারবে? কোন কোন ক্ষেত্রে পারবে না?
— সারা বিশ্ব জুড়ে ৫০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ রোজা রাখেন। প্রচুর পরিমাণ লিটারেচারে এসেছে যে, অধিকাংশ ডায়াবেটিক রোগীরাই রোজা রাখতে পারেন। তবে নির্দিষ্ট ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে তার রোজা রাখতে পারা বা না পারা। সেজন্যে প্রয়োজন রোজা শুরু হবার বেশ কিছুদিন আগেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে যাচাই-বাছাই (Pre-Ramadan Assessment) করিয়ে নেয়া যে তিনি রোজা রাখতে সক্ষম কিনা, রোজাতে কী কী নিয়মকানুন মেনে চলবেন, ওষুধ/ইনসুলিন কীভাবে নেবেন ইত্যাদি। রোগীর বিগত দিনগুলোতে ডায়াবেটিসের অবস্থা, জটিলতা, অন্যান্য রোগ, রক্তে চর্বির পরিমাণ, রক্তচাপ ইত্যাদি সবকিছু বিবেচনা করে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন রোগীটি রোজা রাখতে পারবে কি পারবে না। তবে খুব সাধারণভাবে বলতে গেলে যেসব ডায়াবেটিস রোগীরা ডায়াবেটিস অনেক কমে গেলেও বুঝতে পারেন না, যাদের ডায়াবেটিস একেবারেই নিয়ন্ত্রণে থাকে না, সম্প্রতি ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস হয়েছে, তাদেরকে রোজা না রাখতে বলা হয়। তাছাড়া যেসব ডায়াবেটিস রোগীদের কোনো অর্গান ফেইলিউর (যেমন : হার্ট ফেইলিউর, কিডনি ফেইলিউর, লিভার ফেইলিউর) আছে, তাদেরও রোজা না রাখাই শ্রেয়। এছাড়া যাদের মারাত্নক চোখের রেটিনায় সমস্যা, স্নায়ুতে সমস্যা, বড় ধরনের রক্তনালীতে সমস্যা, একিউট পেপটিক আলসার, মারাত্নক ধরনের ফুসফুসে যক্ষ্ণা, মারাত্নক ইনফেকশান, মারাত্নক হাঁপানি, বারবার পাথর হওয়া, যেসব ক্যান্সার রোগীদের শারীরিক অবস্থা বেশ খারাপ, সম্প্রতি হার্ট এটাক হয়েছে, লিভারে সমস্যা রয়েছে এবং মারাত্নক মানসিক সমস্যা যাদের রয়েছে, তাদেরও রোজা রাখতে নিরুৎসাহিত করা হয়। গর্ভবতী এবং যেসব মায়েরা শিশুকে বুকের দুধ পান করান, তারা রোজা রাখবে না।

২। রোজা রাখলে কী কী উপকার হবে?
— ডায়াবেটিস রোগীদেরও রোজা রাখলে বেশ কিছু উপকার হয়ে থাকে। যেমন :
– রোজা শরীরের বিপাকীয় (Metabolic) কাজের উন্নতি ঘটায়।
– শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমাতে সাহায্য করে।
– উচ্চ রক্তচাপের নিয়ন্ত্রণ ভালো হয়।
– শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ দূর করে।
– রোগ প্রতিরোধ-ক্ষমতা শক্তিশালী করে।
– সর্বোপরি রোজাতে নিয়মানুবর্তিতার এক অনন্য চর্চা হয়। আর আমরা সবাই জানি নিয়মানুবর্তিতা ডায়াবেটিসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা।

৩। কী কী ঝুঁকি থেকে যায়? কী করণীয় তখন?
— ডায়াবেটিস রোগীদের রোজা রাখলে যেসব ঝুঁকি থাকে :
– রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ অতিরিক্ত কমে যাওয়া (হাইপোগ্লাইসেমিয়া)।
– রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া (হাইপারগ্লাইসেমিয়া)।
– পানিশূন্যতা।
– ওজনের তারতম্য ঘটা।
রোজাতে ডায়াবেটিক রোগীর যে সমস্যাটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন থাকেন চিকিৎসকরা–তা হচ্ছে ‘হাইপোগ্লাইসেমিয়া’ (Hypoglycaemia)। সহজ ভাষায় বলতে গেলে রক্তে গ্লুকোজ/সুগারের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যাওয়া। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ৩.৫ মিলিমোল/লিটারের নিচে নেমে গেলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হিসেবে ধরা হয়। হাইপোগ্লাইসেমিয়া এতো মারাত্নক হতে পারে যে রোগী কোমায় চলে যেতে পারে, মস্তিষ্কের মারাত্নক ক্ষতি হতে পারে। তাই ডায়াবেটিস রোগীর এবং তার পরিবার-পরিজনের হাইপোগ্লাইসেমিয়া হলে কী কী লক্ষণ প্রকাশ পায় এবং করণীয় কী তা জানা অবশ্যই প্রয়োজন।
সচরাচর যে লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়:
– অতিরিক্ত ঘাম
– হাত-পা কাঁপা
– বুক ধড়ফড় করা
– বেশি ক্ষুধা লাগা
– উদ্বিগ্নতা
– ঝিমাতে থাকা
– কথা জড়িয়ে যাওয়া
– মনোযোগ প্রদানে বিঘ্ন ঘটা
– অল্পতে রেগে যাওয়া
– বমি বমি ভাব
– মাথা ব্যথা/ মাথা ঘোরা ইত্যাদি।
রোগীর হাইপোগ্লাইসেমিয়া হলে সাথে সাথে রোজা ভেঙে ফেলতে হবে। তা যদি ইফতারের ১০ মিনিট আগেও হয়।

৪। রোজা থাকা অবস্থায় রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা মাপা যাবে কি?
— শারীয়াহগত দিক থেকে রোজা রেখে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করতে কোনো বাধা নেই। ডায়াবেটিস রোগীদের রোজা থাকা অবস্থায় নিয়মিত রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে সেহরির ঘণ্টা দুয়েক পর এবং ইফতারের ঘণ্টাখানেক আগে গ্লুকোজের মাত্রা দেখা উচিত। এছাড়া অন্যান্য সময়েও পরীক্ষা করা যেতে পারে।

৫। কোন অবস্থায় রোজা অবশ্যই ভেঙে ফেলতে হবে?
— যেকোনো সময় রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ৩.৩ মিলিমোল/লিটারের নিচে নেমে গেলে রোজা ভেঙে ফেলতে হবে। এছাড়া সেহরি করার প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যদি ৩.৯ মিলিমোল/লিটারের নিচে নেমে যায় তখনও রোজা ভাঙতে হবে। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ১৬.৭ মিলিমোল/লিটারের বেশি বেড়ে গেলেও রোজা ত্যাগ করতে হবে।

৬। রোজাতে খাবার-দাবার কেমন হবে?
— ক্যালোরি এবং খাবারের গঠনগত দিক থেকে রমাদানের আগে যেমন স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ খাবার খেতেন, রমাদানেও তেমনটাই চলবে। সেহরির সময় অপেক্ষাকৃত জটিল শর্করা যেগুলো হজম ও শোষণ ধীরে ধীরে হয় তেমন খাবার খেতে হবে। সেহরির সময় ভাত, রুটি, নান, সবজি, ডাল, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ফল ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে।

ইফতারের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে :
– অনেক বেশি পরিমাণ শর্করা ও চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া যাবে না।
– মিষ্টিজাতীয় খাবার কম খেতে হবে।
– মিষ্টি পানীয় পরিহার করতে হবে। মিষ্টি শরবতের বদলে আল্লাহর দেওয়া ‘প্রাকৃতিক শরবত’ ডাবের পানি খাওয়া যেতে পারে।
– ইফতার থেকে সেহরির মধ্যবর্তী সময়ে প্রচুর পানি খেতে হবে।
আরেকটি বিষয় খুবই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। সেহরি যতোটা সম্ভব দেরিতে খেতে হবে আর ইফতার যতোটা সম্ভব তাড়াতাড়ি করতে হবে। আমাদের ধর্মীয় বিধানও তা-ই শিক্ষা দেয়। হাইপোগ্লাইসেমিয়া প্রতিরোধে এটি একটি খুবই কার্যকরী উপায়।

৭। রোজাতে শরীরচর্চা করা যাবে কীভাবে?
— রোজাতে প্রাত্যহিক জীবনের স্বাভাবিক কাজগুলো করতে কোনো বাধা নেই। তবে অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম হাইপোগ্লাইসেমিয়া করতে পারে। তাই দিনের বেলায় অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম না করাই ভালো। ইফতার এবং সেহরির মধ্যবর্তী সময়ে ঘণ্টাখানেকের জন্যে শরীরচর্চা করা যেতে পারে। তারাবীহ, তাহাজ্জুদ ইত্যাদি অতিরিক্ত নামাজও শরীরচর্চা হিসেবে বিবেচনায় রাখা উচিত।

৮। ওষুধ/ইনসুলিন কীভাবে, কখন, কতোটুকু নিতে হবে?
— সবশেষে আসা যাক ওষুধ/ইনসুলিন কীভাবে নিতে হবে। প্রত্যেকটা রোগীকে চিকিৎসকই ঠিক করে দেবেন এটা। তবে খুব সাধারণভাবে একটু আলোচনা করা যাক।
যারা নিয়মিত Sulfonylureas (Glipizide, Gliclazide, Glimeperide –ওষুধের প্যাকেটের গায়ে ছোট্ট করে ওষুধের এই জেনেরিক নেইম লেখা থাকে) প্রতিদিন সকালে খেতেন, তারা একই ডোজে ইফতারের সময় সেটা খাবেন। আর যারা এ ওষুধটি দুবেলা খেতেন, সকালে ও রাতে, তারা সকালের ডোজের পুরোটা ইফতারের সময় খাবেন। তবে রাতের ডোজের কেবল ‘অর্ধেকটা’ সেহরির সময় খাবেন।
যারা Metformin (Oramet, Comet, Metfo, Met, Informet ইত্যাদি নামে পাওয়া যায়) ৩ বেলা ৫০০ মিলিগ্রামের একটি করে ট্যাবলেট খেতেন, তারা ইফতারে একসাথে দুটো ট্যাবলেট অর্থাৎ মোট ১০০০ মিলিগ্রাম খাবেন। আর সেহরিতে ৫০০ মিলিগ্রামের ১টি ট্যাবলেট খাবেন।
যারা দুবেলা ইনসুলিন নিয়ে থাকেন, সকালের ডোজটা সমপরিমাণ ইফতারের আগে নেবেন। আর রাতের ডোজের ‘অর্ধেক’ পরিমাণ সেহরির সময় নেবেন। ধরা যাক, কেউ সকালে ৩০ ইউনিট এবং
রাতে ২০ ইউনিট ইনসুলিন পেতেন। রমাদানে তিনি ইফতারের আগে সকালের ডোজের পুরোটা অর্থাৎ ৩০ ইউনিট ইনসুলিনই নেবেন। আর সেহরির সময় রাতের ডোজের অর্ধেক (২০/২=১০) অর্থাৎ ১০ ইউনিট ইনসুলিন পাবেন।

মারাত্নক শারীরিক অসুবিধার কারণে চিকিৎসকের পরামর্শে যদি একান্তই রোজা রাখতে না পারেন, তাহলে পরবর্তী সময়ে সুস্থ অবস্থায় সে রোজাগুলো কাজা আদায় করা যাবে। এই রমাদানটি হোক এ যাবতাকালের আমাদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ রমাদান। আমীন।

ডাঃ মারুফ রায়হান খান
এনাম মেডিকেল কলেজ/ ২০১০-১১

প্ল্যাটফর্ম ফিচার রাইটার:
সামিউন ফাতীহা
শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ, গাজীপুর

Platform

2 thoughts on “রোজায় ডায়াবেটিক রোগীর করণীয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Next Post

স্কেচে চিকিৎসকের না বলা কিছু কথা

Mon May 6 , 2019
আমার কাজ ছবি তোলা ছবি আকা না ছবিটা BSMMU এর সেন্ট্রাল লাইব্রেরীর একটা রিডিং টেবিলে আকা ছিলো, কে একেছেন জানি না এইটুকু জানি যিনি একেছেন অবশ্যই একজন ডাক্তার কিন্তু যতবার টেবিলটার পাশ দিয়ে গেছি খালি এটাই মনে হইছে এই ছবি আকার সময় আসলে তিনি কি ভাবছিলেন লাইব্রেরী নামের বন্দীশালায় বসে […]

সাম্প্রতিক পোষ্ট