ম্যাটস/ স্যাকমো- বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার এক ফ্রাঙ্কেস্টাইন

7

সবার জানা প্রয়োজন ম্যাটস কি কেন কিভাবে এবং কিভাবে ম্যাটস/স্যাকমো/মেডিকেল এসিস্ট্যান্টরা আজ চিকিৎসা ব্যবস্থার গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ম্যাটস কি?
ম্যাটস (MATS)- Medical Assistant Training School যা State Medical Faculty of Bangladesh এর অধীনে পরিচালিত হয়।

কেন ম্যাটস? 
ম্যাটসে মূলত এসএসসি পাশ করা একটা ছেলেকে মেডিক্যাল সায়েন্সের হাতে কলমে কাজ গুলোতে ট্রেইন আপ করা হয়। যাদের কাজই হল একজন চিকিৎসক কে চিকিৎসা কাজে সহযোগিতা করা। অনেকটা নার্সের আরেকটা সংস্করণ। তারপর ধরুন এম্বুলেন্স অফিসার হিসেবে কাজ করা, অর্থাৎ জরুরী রোগীকে এম্বুলেন্স আনতে গেলে তার সাথে থেকে হঠাৎ সমস্যা হলে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করে করনীয়  কাজ করা। বিভিন্ন মিশন বা ক্যাম্পে চিকিৎসককে ক্যাম্প পরিচালনায় সহযোগিতা করা। বিভিন্ন প্রোগ্রাম যেমন হিম্যানিটারিয়ান ক্যাম্প/মিশন, টিকাদান, মহামারী রোগের বিরুদ্ধে ক্যাম্প ইত্যাদিতে ফিল্ড লেভেলে কাজ করতে যেয়ে চিকিৎসক টিমকে লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া। চিকিৎসা উপকরণ ও যন্ত্রপাতির যথাযথ ভাবে সংরক্ষণ করা এবং চিকিৎসকের প্রদেয় চিকিৎসা ও পরামর্শ রোগীকে বুঝিয়ে দেওয়া (প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে)।

কেন ম্যাটস/স্যাকমোরা ভয়ঙ্কর হল?
এখানে সমস্যা হল সরকার তাদের তৈরি করলো  কিন্তু যথাযথ কাজে লাগালো না। যে যে কাজের উদ্দেশ্যে তাদের কোর্স সেই মত পোস্ট তৈরি হল না। চাকুরির ক্ষেত্র তৈরি করলো না- না সরকার, না বেসরকারি  হাসপাতাল। বেসরকারি হাসপাতাল/ক্লিনিক তো একবছরের নার্সকে দিয়ে মাঝে মাঝে ওটি এসিস্ট ও করায়। ফলে বিশেষ কাজে দক্ষ একটা জনবল হয়ে পড়ল বেকার। ফলে তারা কমিউনিটিতে ছড়িয়ে গেল। অল্প বিদ্যা বরাবরই ভয়ংকর। যে কারণে একজন এমবিবিএস ডাক্তার পাশ করেই রোগী দেখা শুরু করতে দ্বিধা করলেও তারা পাশ করার আগেই প্রাকটিস জুড়ে দেয়। ক্ষেত্র বিশেষে তারা এমবিবিএস দের চাইতে সফল কারণ তাদের শেখানোই হয় সিম্পটম্যাটিক চিকিৎসা। যেমন অল্প ব্যথা অমুক ওষুধ, বেশি ব্যথা অমুক। আর জ্বর বেশি হলেই এন্টিবায়োটিক- এই টাইপের প্রশিক্ষণ আর কি। ফলে যেখানে একজন এমবিবিএস পাশ চিকিৎসক নিশ্চিত রোগ নির্ণয় ছাড়া ওষুধ দিতে চান না। কারণ তিনি জানেন এই ওষুধের ম্যাকানিজম অফ একশন, সহ একশন, এফেক্ট, সাইড ইফেক্ট সব। ফলে যতক্ষণ না নিশ্চিত কোন ওষুধ প্রয়োজন হয় কোন এমবিবিএস ডাক্তার তা দেন না। কিন্তু তারা না জেনেই একটা দুটো ইন্ডিকেশন শুনেই দিয়ে দেয় চিকিৎসা। আর একারণেই তারা জনপ্রিয় হয় মূলত অশিক্ষিত অল্পশিক্ষিত মানুষের মাঝে, যারা এদেশের প্রধান অংশ। এছাড়া নবীন চিকিৎসকদের প্রাকটিস বিমুখিতাও বড় অংশে দায়ী এর জন্য। আর প্রশাসনের উদাসীনতা আর বিমাতাসুলভ নীতির জন্য তারা আরও প্রশ্রয় পায়। তবে সবচেয়ে বেশি প্রশ্রয় পায় মেরুদণ্ডহীন চিকিৎসক নেতৃত্ব ও কতিপয় ব্যক্তিত্বহীন সিনিয়র ব্যবসায়ী চিকিৎসকের কারণে। সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ ফ্রাংকেনস্টাইন তৈরি হয়ে গেছে ।

ফলাফলঃ
ব্যবসায়ী শ্রেণি বরাবরই অল্পে বেশি লাভের ধান্ধা খোঁজে। আর সরকারের উদাসীনতা আর প্রশাসনের দুর্নীতির সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা নেমে পড়ল চিকিৎসা ব্যবসায়ে। যেহেতু চিকিৎসকবৃন্দ জ্ঞান ও নৈতিকতার বন্ধনে আবদ্ধ তাই সহজে তাদের দিয়ে অনৈতিক ব্যবসা/অপারেশন, ওষুধ বিক্রি করানো যাবে না, অতএব ব্যবসায়ীরা তাদের প্যাট্রোনাইজ করলো । ফলাফল, আজ দেশের অধিকাংশ এন্টিবায়োটিক কাজ করে না। একজন আমেরিকান চিকিৎসক যখন দেড় টাকার এমোক্সাসিলিন দিয়ে রোগী সারায় সেখানে আমাদের থার্ড জেনারেশন এন্টিবায়োটিকও অকার্যকর হয়ে যায়। যত্রতত্র চিকিৎসা নিয়ে (পড়ুন অপচিকিতসা) অধিকাংশ রোগীই তার জীবনী শক্তি প্রায় নিশ্চিহ্ন করে তবেই আসে সঠিক চিকিৎসকের কাছে। ফলশ্রুতিতে চিকিৎসা সঠিক দিলেও তা আর কাজ করে না। এছাড়া ভুল ও অতিরিক্ত ওষুধের প্রভাবে কিডনি/লিভার/হার্ট প্রভৃতি প্রত্যঙ্গের নানা জটিল অসুখ সৃষ্টি করে ফেলে। অসুস্থতা  দীর্ঘায়িত হয়, নষ্ট হয় জীবন মান। অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিশাল ক্ষতির শিকার হয় দেশ ও জাতি।
কিন্তু সমস্যা হল- আমরা তাৎক্ষণিক সমাধানে মহাব্যস্ত এবং খুশিও- দীর্ঘমেয়াদী ও স্থায়ী সমাধানের চিন্তাও করি না। একারণেই জাতি হিসেবে আমরা পিছিয়ে আছি এবং পিছিয়ে যাচ্ছিও দ্রুতবেগে।

লিখেছেন:
ডা. অনুপম দাস, জনস্বাস্থ্য গবেষণা চিকিৎসক

7 thoughts on “ম্যাটস/ স্যাকমো- বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার এক ফ্রাঙ্কেস্টাইন

    1. BMDC registration je dei seta write na,toder moto bustard jnne country ai obbsta,practice jomaite paros na aijnne DMF mitth kta liksos bangla jongon jane what is SACMO..

  1. আর এর জন্য আপনারাই দায়ী কারন গ্রাম্য এলাকাতে ত আপনাদের লেজের নাগালই পাওয়া যায়না,তাই মানুষ বাধ্য হয় SACMO দের কাছে যেতে।আপনারা ত আবার অনেক বড় ডাক্তার তাই গ্রামে থাকলে লোকে যদি অন্য কিছু ভাবে আর তাদের কাছ থেকে ত আর বড় টাকা আশা করা যায়না এই ভাবনায় কি আপনাদের চন্দ্রমুখ গ্রামে দেখা যায়না??? নিজে ঠিক হন দেখবেন সব ঠিক হয়ে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Next Post

চিকিতসা পেশায় বাস্তবতা ও বিভ্রম

Tue Apr 4 , 2017
The_Illusion_and_Delusion. হাত ভেঙে ঘরে বসে থাকা কোনো কাজের কথা না।আপাতত সেটাই করতে হচ্ছে।সকাল সকাল উঠে একটু পড়তে চাইলাম, কনসেনট্রেট করতে পারলাম না।মনকে ডাইভার্ট করতে ইউটিউবে “The Amazon Tribe” লিখে সার্চ দিলাম…. অদ্ভুত অদ্ভুত সব ভিডিও দেখছি।আমাজন জঙ্গলের গভীরে এক উপজাতি বাস করে যাদের সাথে বহির্বিশ্বের কোনো যোগাযোগ নেই, প্লেন থেকে […]

সাম্প্রতিক পোষ্ট