• নির্বাচিত লেখা

June 5, 2017 11:49 pm

প্রকাশকঃ

 
ঘটনা বাংলাদেশঃ
৬০-৭০ জন মিলে একজন চিকিৎসককে মারছে। তাঁর অপরাধ তিনি একজন চিকিৎসক। এবং তিনি কিন্তু কিছুক্ষণ আগে দুঃখজনক ভাবে মারা যাওয়া শিক্ষার্থীরা সরাসরি চিকিৎসক নন। ঘটনার ১৭ দিন পর লিখছি, কারণটি লেখার শেষে পাবেন।

দ্বিতীয় ভিডিওটি বাংলাদেশের নয়। তবে ঘটনা একই। ২০ জন মিলে একজন অর্থপেডিক বিশেষজ্ঞকে পেটাচ্ছে। পেটাতে পেটাতে ওটি থেকে পোস্ট অপারেটিভে নিচ্ছে। চিকিৎসকের অপরাধ, বাইক এক্সিডেন্টে মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়া রোগীকে সিটি স্ক্যান করে নিউরোসার্জনের কাছে রেফার করা। চিকিৎসকের অক্ষিকোটরের হাড় এবং খুলির হাড় ভেঙ্গেছে।

আসুন দেখি প্রায় একই রকম ঘটনায় কোন দেশে কি রকম শাস্তি বা প্রতিক্রিয়া হত।

ভারতঃ প্রথম ভিডিওতে আক্রমণকারী রোগীর ৯জন আত্মীয়কে ২৪ ঘন্টার মধ্যে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ ও মহারাষ্ট্র মেডিকেয়ার আইনের ৩ ও ৪ নং ধারায় গ্রেফতার করে। দুঃখজনক ভাবে গ্রেফতারকৃত একজন অনুশোচনায়(পুলিশী হেফাজতে) আত্মহত্যা করে।
হ্যাঁ ভারতের ১৮টি প্রদেশে চিকিৎসক ও হাসপাতালে হামলা প্রতিকারে পৃথক আইন আছে যার শাস্তি ৩ বছর জেল ও জরিমানা (৩ লাখ রুপী থেকে যত রুপী ক্ষতি করা হবে তার দ্বিগুণ)। সম্প্রতি চিকিৎসককে চর মারার অপরাধে বিজেপির একজন এমপির ৩ বছরের জেল হয়। এতেও সহিংসতা বন্ধ না হওয়ায় মহারাষ্ট্রের মূখ্যমন্ত্রী সংসদে একই অপরাধের শাস্তি ৭ বছর করা হচ্ছে ঘোষণা দেন। বোম্বেতে গত মাসে ৪টি হাসপাতালের নিরাপত্তায় ৪০০ প্যারামিলিটারিকে দায়িত্ব দেয়া হয়।

 

আমেরিকাঃ ক্যালিফোর্নিয়ার মার্টিনেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে এক রোগী ছুড়ি হাতে কর্তব্যরত এক নার্সের উপর আক্রমণ করে। সেখানে উপস্থিত স্থানীয় পুলিশ কয়েকবার সতর্ক করে নার্সের জীবন বাঁচাতে গুলি করে আক্রমণকারী রোগীকে হত্যা করে।
হ্যাঁ আমেরিকাতে প্রচলিত আইনেই পৃথকভাবে চিকিৎসক ও হাসপাতালে আক্রমণকারীদের শাস্তির ব্যবস্থা আছে, একটি স্টেটে সর্বোচ্চ ৩০ বছরের জেল, আরেকটিতে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার ডলার জরিমানা।

 

যুক্তরাজ্যঃ ব্রিটিশরা সবসময়ই এক কাঠি সরেস। মারধোর দূরের কথা, ব্রিটিশ হাসপাতাল, চিকিৎসকের চেম্বারের বাইরে রোগীর লোক কাউকে গালি দিলে বা বিরক্ত করলে ১ হাজার পাউণ্ড জরিমানা গুনতে হবে(ক্রিমিন্যাল জাস্টিস এন্ড ইমিগ্রশন এক্ট ২০০৮)। কেবল তাই নয় রোগীর এটেডেন্ট এমন কি রোগী উত্তেজিত আচরণ করলে তাদের লাল কার্ড(রেড কার্ড) দেখানো হয়। যুক্তরাজ্যের “জিরো টলারেন্স ক্যাম্পেইন” এর আওতায় চিকিৎসক এবং হাসপাতালে গণ্ডগোল করার অপরাধে ঐ রোগী এমনকি রোগীর সকল এটেডেন্টকে কোন রকম চিকিৎসা দেয়া থেকে বিরত থাকবে সংশ্লিষ্ট জিপি বা হাসপাতাল। চিকিৎসক ও হাসপাতাল আক্রান্ত হলে তাৎক্ষণিক সিকিউরিটি স্পেশালিস্ট পুলিশকে ডাকবে, পুলিশ আদালতের প্রতিনিধি যৌথভাবে ব্যবস্থা নেবে।

একই ঘটনা তুরস্কে হলে তুরস্কের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা সেবা(বিভিন্ন ভাতা এবং সুযোগ সুবিধা) ৬ মাসের জন্য স্থগিত থাকবে, নেপালে হলে নেপাল সরকার বাদী হয়ে মামলা করে শাস্তি নূন্যতম ১ বছরের জেল ও ৩ লাখ রূপী জরিমানা, সিঙ্গাপুরে হলে নূন্যতম ২ বছরের জেল ও ৫ হাজার ডলার জরিমানা, ইসরাইলে হলে নূন্যতম ৫ বছরের জেল, অস্ট্রেলিয়ায় হলে ১৪ বছরের জেল(সেফ নাইট স্ট্র্যাটেজি ২০১৪)।

আর বাংলাদেশে?
কোন আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয় নি। ও হ্যাঁ বাংলাদেশের চিকিৎসক ও হাসপাতালের নিরাপত্তার জন্য নির্দিষ্ট কোন আইন বা ব্যবস্থাই নেই। আইন আদালত দূরে থাকুক, ভিডিওতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনেই চিকিৎসককে দফায় দফায় মারা হলো।

এই পর্যন্ত পড়ে আমার উপর হয়ত অনেকে ক্ষুব্ধ। আমি হয়ত লেখায় কাউকে আঘাত করছি, অথবা কাউকে বাঁচাতে চেষ্টা করছি। ব্যাপারটি তা নয়। আসুন তার আগে দেখে নেই যে দেশে একবার চিকিৎসকের গায়ে হাত তোলা হয় সেদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিণতি কি হতে পারে?

তুরস্কে স্বাস্থ্য নীতি পরিবর্তনের পর চিকিৎসকের উপর হামলার ঘটনা বাড়তে থাকে। নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের বিশেষজ্ঞগণ টার্গেটেড হন, দু’জন থোরাসিক সার্জন অপারেশন থিয়েটারের বাইরে পর পর খুন হলে পরবর্তীতে সার্জারী সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চিকিৎসকদের আগ্রহ কমতে থাকে।

ব্যর্থ রাষ্ট্র পাকিস্তানে ২০১৪ সালেই খুন হন অন্তত ১৪ জন চিকিৎসক, অসংখ্য চিকিৎসক কিডন্যাপড হন। মুক্তিপণের বিনিময়ে কেউ কেউ ফিরে আসলেও অধিকাংশই গুম। পাকিস্তানে কয়েক বছরে ৯ হাজার চিকিৎসক বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। পাকিস্তান মেডিকেল এ্যাসোসিয়েশন থেকে জানানো হয় এরকম চলতে থাকলে বিদেশ থেকে চিকিৎসক আমদানী করতে হবে। হ্যাঁ সহিংসতার জন্য ব্রাজিলের বিভিন্ন প্রান্তে চিকিৎসক যেতে রাজী না হওয়ায় কয়েক বছর আগে কিউবা থেকে চিকিৎসক আমদানী করতে হয়। বাংলাদেশে অবশ্য আইন করে বিদেশী চিকিৎসক আনার ব্যবস্থা হচ্ছে।

উন্নত দেশগুলোর মাঝে চীনেই চিকিৎসকদের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। চীনে সকল রকম চিকিৎসক ও চিকিৎসা সরকারী। সেখানে রোগী মারা গেলে বা সুস্থ না হলে রোগীর লোক এক ধরনের গুণ্ডা দল ভাড়া করে। এদের কাজ হচ্ছে হাসপাতালের উপর হামলা করা, চিকিৎসককে পেটানো। যত বেশী তারা চিকিৎসক পেটাবে, যত বেশী হাসপাতালে গণ্ডগোল করবে তত বেশি জরিমানা আদায় করা যাবে। জরিমানার ভাগ পাবে রোগী এবং গুণ্ডা দল। চীনে এরা এতই তাণ্ডব চালিয়েছে ডিকশনারীতে নতুন একটা শব্দ যোগ করা হয়েছে, “ইয়েনাও” ইংরেজি প্রতিশব্দ মেডিকেল মব। চীনে ২০১৪ সালে চিকিৎসক ও হাসপাতালের উপর হামলার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যু দণ্ড ঘোষণা করা হয় এবং ২০১৪ সালেই দু’জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

হ্যাঁ ভাই, ডেমোক্রেসি না মবোক্র্যাসির যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। হাসপাতালে সিট নাই ডাক্তার পিটাও, টয়লেট অপরিষ্কার কেন ডাক্তার পিটাও, ওষুধের এত দাম কেন ডাক্তার পিটাও, এতগুলা টেস্ট কেন ডাক্তার পিটাও, হাসপাতালের বিল বাকি ডাক্তার পিটাও, রোগ ভালো হয় না কেন ডাক্তার পিটাও, অমর মানুষ রোগে মরলো কেন ডাক্তার পিটাও, পিটাও…পিটাও…পিটাও।

নরম হাতে পেট চেপে রোগীর অসুখ ধরতে শিখেছি, আরো নরম হাতে আপনার সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর পিঠে স্পর্শ করে তাকে প্রথম শ্বাস নিতে সাহায্য করেছি, আপনার বিছানায় পড়া মায়ের পিঠ থেকে যখন মাংস পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল পরম মমতায় ড্রেসিং করে সে ক্ষত সাড়িয়ে তুলেছি, আপনার ১৯-২০ বছরের বোনটির যখন অকাল মৃত্যু হয়, তাঁর স্থির হয়ে যাওয়া চোখে আলো ফেলে যখন বুঝতে পেরেছি সে নেই, আমার বুক ভেঙ্গেও কান্না এসেছিল, কত দিন সেই চোখের পানি লুকিয়ে ডেথ সার্টিফিকেট লিখেছি সে খবর আপনি জানেন না। আমিও মানুষ, আমারো ক্লান্তি, তৃষ্ণা, ঘৃণা, ভয় লাগে।

হ্যাঁ চিকিৎসকেরা রক্ত মাংসের মানুষ। মানুষের যখন অস্তিত্বের সংকট হয় তখন সে তাঁর যা কিছু আছে তাই নিয়েই রুখে দাঁড়াতে চেষ্টা করে। একজন চিকিৎসকের সারাজীবন পড়াশোনাই করেছে, আপনি যখন তাঁকে মারতে আসবেন আর ঠেকানোর ক্ষমতা তার নেই। কিন্তু তাঁর জ্ঞান দিয়েই যখন আঁচ করতে পারে তাঁর চিকিৎসায় ভুল ধরে তাঁকে আঘাত করা হবে, তখন সে নিজেকে বাঁচাতে আপনাকে তাঁর চেয়ে সেরা চিকিৎসক অথবা সেরা হাসপাতালের পাঠানোর ব্যবস্থা করবে। পৃথিবীর সকল অসুখ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কিংবা টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতাল ভারতে গিয়ে পৌঁছানোর মত সময় আপনাকে দেবে না।

 

হ্যাঁ আপনার জন্যে নয়,
এ লেখা আমি আমার জন্য লিখছি।
আমি বাঁচতে চাই,
বাংলাদেশের যে কোন হাসপাতালে চিকিৎসকের সর্বোচ্চ চেষ্টা যেন আমার জন্যে করা হয় সেটা চাই।
কিন্তু চিকিৎসককে এভাবে নির্বিচারে মারা হলে,
সৃষ্টিকর্তা এমন দিন যেন আপনাকে না দেয়,
আপনার বুকে ব্যথা হলো,
প্রতি মিনিটে আপনার হৃদপিণ্ডের অংশ মরে পচে যাচ্ছে,
আপনার বাসার পাশের হাসপাতাল মারের ভয়ে, চিকিৎসককে পেটানোর বিচারহীনতার হতাশায় আপনার জন্য জরুরী দু’টাকার ওষুধ আপনাকে দেবার সাহস করলো না।
আপনি গাড়িতে ঢাকা মেডিকেলের পথে,
এয়ার এ্যাম্বুলেন্সে ভেলর যাচ্ছেন,
ব্যাংকে কোটি টাকা,
যেহেতু আপনার চিকিৎসকে কে আপনি আশ্বস্ত করতে পারেন নি,
সৃষ্টিকর্তার পর একমাত্র যে চিকিৎসক আপনাকে বাঁচাতে পারত,
হ্যাঁ, শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত চিকিৎসকের চোখে ভরসা দেখতে চাই।
আপনি চান কি?

 

আগামী কাল ৬/৬/১৭, বাংলাদেশ মেডিকেল এ্যাসোসিয়েশন দেশ ব্যাপী চিকিৎসক নির্যাতনের বিরুদ্ধে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করেছে বেলা ১২টার সময়।
সেখানে আসুন,
চিকিৎসকদের আশ্বস্ত করুন ।
ভিডিও লিংক ঃ https://www.facebook.com/mohib.nirob/videos/pcb.10211917632992451/10211917619832122/?type=3&theater

https://www.facebook.com/mohib.nirob/videos/pcb.10211917632992451/10211917621832172/?type=3&theater

লেখক ঃ ডাঃ মোহিব নীরব

শেয়ার করুনঃ Facebook Google LinkedIn Print Email
পোষ্টট্যাগঃ চিকিৎসক নিরাপত্তা,

পাঠকদের মন্তব্যঃ ( 0)




Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Advertisement
Advertisement
.