মূল অংশে যান
সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের সঙ্গে থাকুন
সাবস্ক্রাইব করুন
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬১২ কার্তিক ১৪৩৩ · ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
প্রতিবেদন

“প্যারাসিটামল আবিষ্কারের যত কথা”

প্ল্যাটফর্ম কনট্রিবিউটরপ্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০১৭, ৫:২৭ · ৫ মিনিটে পড়ুন
“প্যারাসিটামল আবিষ্কারের যত কথা”
লেখার আকার

চায়ের দোকানে বসে দশ পনেরজন লোক আড্ডা দিচ্ছে, সেই দোকানের একজন কাস্টমার কিংবা কোন অফিসে কাজের ফাকে একজন কর্মকর্তা হঠাৎ বলে উঠল শরীরটা ম্যাজ ম্যাজ করছে, মনে হয় কিছুক্ষণের মধ্যে জ্বর আসবে। তখনই গোপাল ভারের গল্পের মত রোগী থেকে ডাক্তারই বেশি দেখা যাবে। চায়ের দোকানে বসা অধিকাংশ কাস্টমার এমনকি চায়ের দোকানদার, অফিসের পিয়ন থেকে শুরু করে সবাই এক সাথে বলে উঠবে একটা নাপা (বানিজ্যিক নাম) খেয়ে নেন। এই নাপাই হচ্ছে প্যারাসিটামল। এটাই মনে হয় একমাত্র ঔষুধ যেটা ডাক্তারের থেকে আম জনতাই বেশি প্রেসক্রাইভ করে। কিন্তু আমরা কয় জনই বা জানি এই প্যারাসিটামল কিভাবে এসেছে। চলুন একটু জেনে নেওয়া যাক।

প্রাচীন এবং মধ্যযুগে জ্বর এবং ব্যথা সারানোর জন্য সাদা উইলো এবং সিনকোনা গাছের বাকল ব্যবহৃত হত। সাদা উইলো গাছ স্যালিক্স এলবা নামে পরিচিত, সে গাছের বাকলে salicin নামক রাসায়নিক পর্দাথ আছে যেটা রাসায়নিক ভাবে acetylsalicylic acid অর্থাৎ aspirin এর মত।সিনকোনা উদ্ভিদ যা সাধারণভাবে কুইনা নামেই পরিচিত। এই কুইনা উদ্ভিদ থেকেই ম্যালেরিয়ার ঔষুধ Quinine তৈরি করা হয়েছে। এটা ও জ্বর কমানোর জন্য ব্যবহৃত হত।
১৮৮০ সালের দিকে সিনকোনা গাছটি যখন প্রায় দুর্লভ হয়ে পড়ে তখন বিজ্ঞানীরা তার বিকল্প হিসেবে অন্য কিছু খুজতে থাকেন। ফলশ্রুতিতে ১৮৮৬ সালে acetanilide এবং ১৮৮৭ সালে phenacetin নামে দুটি বিকল্প রাসায়নিক যৌগ পেয়ে যান উনারা। aspirin এর পাশাপাশি এ দুটো যৌগ ব্যথা এবং জ্বরে ব্যবহৃত হত।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, এসব ব্যথার ঔষুধ আবিষ্কারের আগেই ১৮৭৩ সালে প্যারাসিটামল আবিষ্কার হয়ে যায়। আমেরিকান বিজ্ঞানী হরমোন নোর্থরোপ মোরসে p-nitrophenol এবং tin in glacial acetic acid এর মধ্যে বিজারণ বিক্রিয়া ঘটিয়ে অ্যাসিটামিনোফেন অর্থাৎ প্যারাসিটামল তৈরি করে ফেলেন। এটা যে ঔষুধ হিসেবে কাজ করবে সেটা তিনি বুঝতেই পারেননি। দুংখের ব্যাপার হল জীবিত অবস্থায় তিনি সেটিকে আর ঔষুধ হিসেবে দেখে যেতে পারেননি।
তার দুই দশক পড়ে অর্থাৎ১৮৯৩ সালে আরেকটি মজার কাহিনী ঘটে। এটা ঘটেছিল University of Strassburg এ। এ ইউনিভার্সিটির ইন্টারনাল মেডিসিনের প্রফেসর এডলফ কুসমল ( Kussmaul breathing, Kussmaul’s sign,Kussmaul disease তিনিই ব্যাখ্যা করেন) তার দুই ছাত্র আরনোল্ড কাহন এবং পল হেপ কে ন্যাপথালিনের বোতল দিয়েছিলেন কিছু রোগীর অন্ত্রের কৃমি চিকিৎসা করার জন্য। কিন্তু উনারা দেখলেন যে কৃমি না মরে সে সব রোগীদের জ্বর কমে গেছে। তখন ন্যাপথালিনের বোতলটি ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হল। দেখা গেল সেই বোতলে যে রাসায়নিক যৌগটি ছিল সেটি হল acetanilide। সাথে সাথে ঐ রোগীদের প্রশ্রাব পরীক্ষা করেন উনারা। পরীক্ষায় প্রশ্রাবের মধ্যে সাদা, ক্রিস্টাল এবং খুব তিক্ত স্বাদ বিশিষ্ট একটি রাসায়নিক পর্দাথ পাওয়া গেল এবং সেটি ছিল প্যারাসিটামল। যে সব রোগীদের phenacetin দেওয়া হত তাদের প্রশ্রাবে ও একই পাওয়া পর্দাথ পাওয়া গেল। ১৮৯৯ সালের দিকে acetanilide এর বিপাক ক্রিয়ার ফলে উপজাত হিসেবে মানব দেহে প্যারাসিটামল পাওয়া গেল। কিন্তু সে সময়ে ও এর গুরুত্ত বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেননি।

মাঝখানে অনেক গুলো বছর কেটে গেল। প্যারাসিটামল নিয়ে আর তেমন কোন গবেষণা হয়নি।
১৯৪০ সালের দিকে aspirin ছাড়া অন্য গ্রুপের ব্যথার ঔষুধ ব্যবহারকারী রোগীদের রক্তে methemoglobinemia ( রক্তের অক্সিজেন বহন ক্ষমতা কমে যাওয়া) নামক মারাত্মক রোগ অহরহ পাওয়া যেতে লাগল। সে জন্য ১৯৪৬ সালে ” The Institute for the Study of Analgesic and Sedative Drugs” নামক সংস্থাটি ব্যথার জন্য ব্যবহৃত ঔষুধ ( analgesic) মানবদেহে কি কি সমস্যা করে সে গুলো নিয়ে গবেষণা করার জন্য ” New York City Department of Health কে একটি প্রজেক্ট দেয়। সে প্রজেক্টের প্রধান ছিলেন বিখ্যাত মার্কিন রসায়নবিদ বার্নাড ব্রোডি, তার অধীনে ছিলেন আরেক বিখ্যাত মার্কিন রসায়নবিদ জুলিয়াস অ্যাক্সেলরড। তারা নিউইয়র্ক এর গোল্ড ওয়াটার মেমোরিয়াল হাসপাতালে তাদের প্রজেক্ট শুরু করেন।
১৯৪৮ সালে উনারা দুজনই দেখতে পেলেন, ব্যথার জন্য ব্যবহৃত acetanilide এবং phenacetin নামক ড্রাগের সাথে methemoglobinemia নামক রক্তের সেই সমস্যার একটা যোগ সূত্র আছে এবং এদের পুরো উপাদানটি ব্যথার জন্য কাজ করে না।
বরংতাদের বিপাক ক্রিয়ার ফলে যে উপজাত তৈরি হয় অর্থাৎ প্যারাসিটামল সেটা শুধু ব্যথার জন্য কাজ করে। উনারা তখন রোগীদের উপর গবেষণা শুরু করেন এবং দেখলেন যে শুধু প্যারাসিটামল ব্যবহারকারী রোগীদের রক্তে methemoglobinemia নামক সেই রোগটি আর হচ্ছে না।

১৯৫০ সালে আমেরিকায় প্রথম Triagesic নামে প্যারাসিটামল, এসপিরিন এবং ক্যাফেইনের কম্বিনেশন বাজারে ছাড়া হয়। কিন্তু দেখা গেল, এ ঔষুধের জন্য
agranulocytoses ( হঠাৎ রক্তে শ্বেত রক্তকণিকা কমে যাওয়া) নামক অসুখটি হয়। বাধ্য হয়ে কতৃপক্ষ তখন বাজার থেকে এটি সরিয়ে ফেলেন।
১৯৫৫ সালে আমেরিকাতে সর্বপ্রথম Tylenol নামে প্যারাসিটামল বানিজ্যিক ভাবে বাজারে ছাড়া হয়।
১৯৫৬ সালে Panadol নামে ইংল্যান্ডের বাজারে আসে।বাজারে যখন আসে তখন প্যারাসিটেমলের স্লোগান ছিল ‘ “gentle to the stomach,” যেহেতু aspirin কে বলা হত ” irritant to stomach”.
কাজেই তখন প্যারাসিটামল বেশি ব্যবহার হওয়া শুরু হল।
১৯৫৮ সালের জুন মাসে Panadol Elixir নামে বাচ্চাদের জন্য ফর্মুলা করে বাজারে ছাড়া হয়।
১৯৬৩ সালে এটাকে British Pharmacopoeia তে যোগ করা হয়।
সেই থেকে আজ ও পর্যন্ত ব্যথা এবং জ্বরের ঔষুধ হিসেবে সবার আগে প্যারাসিটামলই ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
References:
1. Wikipedia
2. www. bimsifram.fr
3. www.herbal-supplement-resource.com
4. www.world medicinehistory.com
5. www. ch.ic.ac.uk

…………….
লিখেছেনঃ
মো: মহিউদ্দিন
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ
২০১১-১২

খবরটি শেয়ার করুন

সম্পর্কিত খবর

চিকিৎসক সংকটে ব্যাহত হচ্ছে ভোলার স্বাস্থ্য সেবা ; চিকিৎসক পদ শূন্য ১৩৪টি!

শনিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৫ ভোলা জেলায় চিকিৎসক পদ শূন্য ১৩৪ টি শুধুমাত্র ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে পদ শূণ্য ৩৭ টি আউটডোর - ইনডোরে দৈনিক গড়ে ১২০০ রোগীর চিকিৎসা দেন ২৪ জন চিকিৎসক চিকিৎসক-নার্স, কর্মকর্তা–কর্মচারীসহ জনবল সংকটে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে ভোলার…

১৯ এপ্রিল ২০২৫বিস্তারিত পড়ুন

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতারণাকে ‘ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু’ নামে গণমাধ্যমে অপপ্রচার

সোমবার, ১৭ মার্চ, ২০২৫ কুমিল্লায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতারণার ঘটনাকে 'ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু' নামে বিভিন্ন গণমাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। কিন্তু রোগীর স্বজনদের অভিযোগ ভুল চিকিৎসার বিষয়ে নয় বরং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতারণার বিরুদ্ধে। রোগীর স্বজনদের সাথে কথা বলেও মিলেছে এর সত্যতা।…

১৭ মার্চ ২০২৫বিস্তারিত পড়ুন

সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের নিয়োগ বাতিলের প্রতিবাদ পূর্বের নিয়োগপ্রাপ্তদের

রবিবার, ১৬ মার্চ, ২০২৫ বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (পূর্বের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের ৩-২০ গ্রেডের ৭৫৪টি পদের নিয়োগ বাতিলের প্রতিবাদ জানিয়েছেন পূর্বের নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও নার্সরা। একইসঙ্গে পুনরায় অধিকতর তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা। রবিবার (১৬ মার্চ) বেলা…

১৬ মার্চ ২০২৫বিস্তারিত পড়ুন

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। * চিহ্নিত ঘর পূরণ করা জরুরি।

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

🔔 নোটিফিকেশন
নতুন খবর ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট পেতে নোটিফিকেশন চালু করুন।
নোটিফিকেশন বর্তমানে বন্ধ।