• sticky

August 25, 2015 9:12 pm

প্রকাশকঃ

ডাঃ সৌমিত্র চক্রবর্তী,
রেসিডেন্ট (প্যাথলজি) বিএসএমএমইউ, সহকারী সার্জন ডিজিএইচএস।

আজ লিখছি চিকিৎসাশাস্ত্রের এমন একটি শাখা নিয়ে যেটা আমজনতার কাছে পরিচিততো নয়ই,এমনকি অনেক চিকিৎসকের কাছেও যেটি অস্পষ্ট।অথচ শাখাটি যে খুব নতুন,তা নয়।প্রয়োগও যথেষ্ট।জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নে শাখাটির গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়।চিকিৎসাশাস্ত্রের এই শাখাটির নাম হিস্টোপ্যাথলজি।

হিস্টোপ্যাথলজির আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় ‘কোষকলার (tissue) বিকারবিদ্যা’।অর্থাৎ বিভিন্ন অসুখে যে লক্ষণগুলো দেখা দেয় কিংবা শারীরবৃত্তীয় যে পরিবর্তনগুলো ঘটে তার সাথে কোষকলার পরিবর্তনের সম্পর্ক স্থাপন করাই এর কাজ।কালের পরিক্রমায় এটা আর হিস্টোপ্যাথলজির একমাত্র কাজ নয়,সে ব্যাপারে পরে আসছি। আগে একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করি।ধরা যাক, রোগীর লসিকা গ্রন্থি (lymph node) ফুলে গেছে।সেই সাথে তার আছে জ্বর, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে। সাথে কিছুটা কাশি আছে। এটুকু তথ্য পেলে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনো চিকিৎসক সবার আগে যক্ষার কথা ভাববেন।কিন্তু আসলেই যক্ষা কিনা তা নিশ্চিত হতে হলে বেশ কিছু পরীক্ষা করা প্রয়োজন। রক্তের রুটিন পরীক্ষা এবং বুকের এক্সরে থেকে কিছুটা হদিস মিলবে,এমটি টেস্টও খানিকটা সাক্ষ্য দিতে পারে, কাশির সাথে যদি কফ(sputum) বের হয় তখন সেখানে যক্ষার জীবাণু খুঁজে দেখা যেতে পারে।তবে ওই লসিকা গ্রন্থি কেন ফুলেছে তা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে গেলে হিস্টোপ্যাথলজির বিকল্প নেই।সেক্ষেত্রে রোগীর বর্তমান চিকিৎসক রোগীর ওই ফুলে ওঠা লসিকা গ্রন্থি কেটে পাঠাবেন আরেকজন চিকিৎসকের কাছে।সেই চিকিৎসক হলেন হিস্টোপ্যাথলজিস্ট।তিনি তখন সেই লসিকা গ্রন্থিটি অণুবীক্ষণের নিচে পরীক্ষা করে বলবেন, ঘটনা আসলে কী।যক্ষা তো নাও হতে পারে,যদি লিম্ফোমা (এক ধরণের ক্যান্সার)হয়? তখন তো পুরো ব্যাপারটাই পাল্টে যাবে!যক্ষার চিকিৎসা তৎক্ষণাৎ বাতিল করে লিম্ফোমার চিকিৎসা শুরু করতে হবে।

এখানে যে উদাহরণটি দেওয়া হলো, তা আসলে বেশ খানিকটা সরলীকৃত। সহজে বোঝার স্বার্থে এই উদাহরণটি দেওয়া হয়েছে। বাস্তবতা আরেকটু জটিল। এখন আমরা এর কোথায় কোথায় ইচ্ছে করে সরল করেছি তা দেখবো, তাহলেই বোঝা যাবে হিস্টোপ্যাথলজি আসলে কীভাবে কাজ করে।
সত্যি কথা বলতে, যক্ষার লক্ষণ যদি একদম প্রকট হয় এবং যক্ষার জীবাণু যদি কফের মধ্যে পাওয়া যায়,তাহলে হিস্টোপ্যাথলজিস্টের কাছে আসার প্রয়োজন পড়েনা।কিন্তু অনেক সময়ই যক্ষার লক্ষণগুলো এতো স্পষ্ট থাকে না কিংবা জীবাণুও সহজে ধরা পড়ে না।বাস্তবে খুব কম রোগই আছে যেগুলো একদম বইয়ের পাতার মতো করে রোগীর দেহে প্রকাশিত হয়।কেননা মেডিসিন বা সার্জারি বা গাইনির বইতে রোগের যে বর্ণনা থাকে তা হলো ‘আদর্শ’ রোগের বর্ণনা।অর্থাৎ ওই রোগের কয়েকশ বা হাজার রোগীর লক্ষণ একত্রিত করে সার্বিকভাবে রোগটি কেমন,তার বর্ণনা।কোনো একজন রোগীর বেলায় ওই বর্ণনা অক্ষরে অক্ষরে মিলবে তা আশা করা উচিত নয়।তখন রোগীকে দেখে চিকিৎসক কয়েকটি সম্ভাবনার কথা ভাবেন:এই দুটো/তিনটে/পাঁচটা ইত্যাদি সংখ্যক রোগের মধ্যে হয়তো তার কোনো একটি রোগ হয়েছে।কিন্তু ঠিক কী রোগ তার হয়েছে তা জানার জন্য ল্যাবরেটরি পরীক্ষার সাহায্য নিতে হয়।অনেক সময় সাধারণ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই রোগটি বোঝা যায়। হয়তো পরীক্ষাটি নিজে শতভাগ নিশ্চয়তার সাথে রোগ নির্ণয় করতে পারে না কিন্তু রোগলক্ষণের সাথে মিলিয়ে পরীক্ষার ফল যতটা নিশ্চয়তা দেয় তা যথেষ্টই বটে।যেমন:এমটি টেস্ট যদিও খুব বিশ্বাসযোগ্য কোনো পরীক্ষা নয় কিন্তু যক্ষার অন্যান্য লক্ষণগুলো বেশ স্পষ্টভাবে রোগীর শরীরে প্রকাশিত হলে ওই টেস্টের উপর ভিত্তি করেই চিকিৎসা শুরু করা যেতে পারে। তখনও হিস্টোপ্যাথলজিস্টের ডাক পড়বে না হয়তো।কিন্তু অনেক সময়ই এমন হয়, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও রোগের কোনো কুল-কিনারা করতে পারছেন না, সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষায়ও এমন কিছু পাচ্ছেন না,যা তাকে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের সাথে চিকিৎসা শুরু করতে সহায়তা করতে পারে।এটা কিন্তু ওই বিশেষজ্ঞের অদক্ষতা নয়,বরং প্রকৃতি যে কত বিচিত্র হতে পারে,তার প্রমাণ।এরকম ক্ষেত্রে যদি কোনো কোষকলা পরীক্ষা করে রোগের সুরাহা করার কোনো সম্ভাবনা থাকে তখনই ডাক পড়ে হিস্টোপ্যাথলজিস্টের।তাই হিস্টোপ্যাথলজিস্টকে বলা হয় ‘কনসালট্যান্ট অব দ্যা কনসালট্যান্টস’।চিকিৎসাশাস্ত্রের অন্যান্য শাখার বিশেষজ্ঞের ক্লায়েন্ট হলো রোগী, কেননা রোগীরা সরাসরি ওই বিশেষজ্ঞের চেম্বারে যায়।কিন্তু একজন হিস্টোপ্যাথলজি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ক্লায়েন্ট হলেন চিকিৎসাশাস্ত্রের অন্যান্য শাখার বিশেষজ্ঞরা, কেননা তাঁরা যখন বিশেষজ্ঞ মতামত চান তখনই কেবল রোগী বা রোগীর কোষকলার নমুনা হিস্টোপ্যাথলজিস্টের কাছে যায়।এজন্য হিস্টোপ্যাথলজিস্টকে মেডিসিন-সার্জারি-গাইনির প্রায় সমস্ত রোগ সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখতে হয়, কারণ তাকে মূলত জবাবদিহি করতে হয় একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে,যার কাছ থেকে রোগী বা তার কোষকলা তার কাছে পরীক্ষার জন্য এসেছে।তাই হিস্টোপ্যাথলজিস্টের কাছে পাঠানোর সময় রোগীর যাবতীয় ইতিহাস, আগের পরীক্ষার রিপোর্টসমূহ এবং চিকিৎসার বিবরণ অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। কেননা একজন হিস্টোপ্যাথলজিস্ট সেখান থেকে রোগীর রোগনির্ণয় শুরু করেন,যেখানে অন্যরা থেমে গিয়েছেন।তাই আগের সমস্ত ঘটনা জানাটা সঠিক রোগনির্ণয়ের পূর্বশর্ত।ব্যাপারটা এমন নয় যে,আগের রিপোর্ট বা ইতিহাস জানা থাকলে হিস্টোপ্যাথলজিস্ট biased হয়ে যাবেন।বরং তা না জানা থাকলে রোগীর ভোগান্তি বাড়বে বৈ কমবে না। চিকিৎসকের চেম্বারে আস্ত রোগীটা যায়, কিন্তু হিস্টোপ্যাথলজিস্টের কাছে আসে স্রেফ তার দেহের টুকরো!এমনকি অনেক চিকিৎসকের ধারণা, অণুবীক্ষণের নিচে দেখলে সব রোগ ফিলিপস বাতির মতো ফকফকা হয়ে যায়।কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।হিস্টোপ্যাথলজির মানসম্পন্ন পাঠ্যবইগুলোতে বলা হয়েছে, রোগীর রোগের এবং চিকিৎসার পূর্ণ বিবরণ না পাওয়া গেলে একজন হিস্টোপ্যাথলজিস্টের অধিকার আছে রিপোর্ট স্থগিত রাখার,এমনকি চাইলে তিনি রোগীর টিস্যু-নমুনা গ্রহণ করতেও অস্বীকৃতি জানাতে পারেন।

বাংলাদেশে হিস্টোপ্যাথলজিস্টদের যেসব দায়িত্ব পালন করতে হয়,তা মোটামুটিভাবে পরীক্ষাগার এবং শ্রেণীকক্ষে সীমাবদ্ধ।তবে বহির্বিশ্বে চিত্রটি এমন নয়।সেখানে শুধু রোগনির্ণয় এবং পাঠদান কিংবা গবেষণা মাত্র নয়,হিস্টোপ্যাথলজিস্টের দায়িত্ব পুলিশি তদন্তে মেডিকেল এক্সপার্ট হিসেবে ময়নাতদন্ত করা ও মতামত দেওয়া(medicolegal autopsy) থেকে শুরু করে হাসপাতালে রোগী মারা গেলে তার মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানপূর্বক (medical autopsy) চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না-তার সুলুক সন্ধান করা পর্যন্ত বিস্তৃত।হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবাদাতাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে যে ক্লিনিক্যাল অডিট হয়,সেখানে হিস্টোপ্যাথলজিস্ট বিশেষজ্ঞ মতামত দেন।মোটকথা, হিস্টোপ্যাথলজিস্টের দায়িত্ব শুধু রোগনির্ণয়কারী (diagnostitian) থেকে বিস্তৃত হয়ে চিকিৎসাসেবার মান নিয়ন্ত্রকের (quality controller) পর্যায়ে চলে যায়।অবশ্য যদি শুধু রোগ নির্ণয়ের কথা ধরা যায়, সেদিক থেকেও হিস্টোপ্যাথলজিস্টদের কাছে চিকিৎসকদের প্রত্যাশাও বাড়ছে।উন্নত বিশ্বে একজন কনসালট্যান্ট যখন তার কোনো রোগীর ব্যাপারে হিস্টোপ্যাথলজিস্টের পরামর্শ নিচ্ছেন,তখন আর শুধু রোগের নাম (diagnosis) জেনে সন্তুষ্ট হচ্ছেন না, সেই রোগের সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ শ্রেণিবিভাগ(classification) থেকে শুরু করে রোগটির সম্ভাব্য পরিণতি (prognostication) প্রতিটি রোগীর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত চিকিৎসা-পরিকল্পনার (individualized/targeted therapy)কথা আশা করছেন হিস্টোপ্যাথলজিস্টের রিপোর্টে।অর্থাৎ হিস্টোপ্যাথলজি আর কেবল paraclinical বিষয় নয়,বরং clinical বিষয় হয়ে উঠেছে।কেননা, কোন চিকিৎসা কোন রোগীর জন্য সবচেয়ে ভালো হবে, সেটাও বলে দিতে হচ্ছে হিস্টোপ্যাথলজিস্টকেই। হিস্টোপ্যাথলজিস্টের দায়িত্বের এতো বিস্তৃতি ঘটার কারণে এখন উন্নত বিশ্বে এই শাখাটির অনেক উপশাখা (subspeciality) সৃষ্টি হয়েছে।যেমন: dermatopathology, neuropathology, forensic pathology ইত্যাদি।অতো দূরে যাই কেন, আমাদের দেশেও মাত্র কয়েক দশক আগে hematology (রক্তরোগবিদ্যা) হিস্টোপ্যাথলজির allied subject ছিল,এখন রীতিমতো পৃথক একটি ক্লিনিক্যাল বিষয়।

হিস্টোপ্যাথলজিস্ট হতে চান? খুব ভালো কথা। কারণ এই পেশাটি যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং হওয়া সত্ত্বেও পরিবারের সাথে সময় কাটানো,গবেষণা বা অন্যান্য কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের জন্য যথেষ্ট সময় পাওয়া যায়,যেটা চিকিৎসাশাস্ত্রের অন্য অনেক শাখায় খুব মুশকিল।বাংলাদেশে দুটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করা যায়: MD এবং FCPS।হিস্টোপ্যাথলজিস্ট হতে চাইলে এর অন্তত একটি অর্জন করাই যথেষ্ট।বর্তমানে MD ডিগ্রিটি বাংলাদেশে দিয়ে থাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।যদিও এটি হিস্টোপ্যাথলজির উপরে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি,তবু ঐতিহাসিক কারণে এর নাম এখনো MD in Pathology;যদিও হওয়া উচিত ছিল MD in Histopathology। এই MD in Pathology রেসিডেন্সি কোর্সের মেয়াদ চার বছর,এতে যদিও মূলত হিস্টোপ্যাথলজিস্ট বানানোর প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে, তবু নন-মেজর বিষয় হিসেবে ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজি, ভাইরোলজি, ইমিউনোলজি, বায়োকেমিস্ট্রি,হেমাটোলজি,ট্রান্সফিউশন মেডিসিন প্রভৃতি অন্তর্ভুক্ত।আর এবিষয়ে BCPS কর্তৃক প্রদত্ত FCPS ডিগ্রিটি অবশ্য FCPS in Histopathology হিসেবে পরিচিত এবং এর পাঠ্যক্রম রেসিডেন্সি কোর্সের অনুরূপ।হিস্টোপ্যাথলজিতে বাংলাদেশে প্রাপ্ত ডিগ্রিগুলো ভারত, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান, মালয়শিয়া, সিঙ্গাপুর এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কমবেশি স্বীকৃত এবং সেসব দেশে হিস্টোপ্যাথলজিস্টের চাহিদাও কম নয়।তবে পৃথিবীর সব দেশে সমানভাবে স্বীকৃত ডিগ্রিগুলোর একটি হলো FRCPath, যেটি বিলেতের Royal College of Pathologist দিয়ে থাকে। এই পরীক্ষায় পাসের হার প্রায় আশি শতাংশ!তবে আফসোসের বিষয় হলো, FRCPath পরীক্ষার কোনো অংশ বাংলাদেশ থেকে দেওয়া যায় না।কেউ চাইলে খোদ হিস্টোপ্যাথলজিতে FRCPath না করে সরাসরি এর কোনো শাখায় (পূর্বে উল্লিখিত)ডিগ্রিটি নিতে পারেন। বলে রাখা ভালো, বহির্বিশ্বে চিকিৎসাশাস্ত্রের হিস্টোপ্যাথলজি শাখাটি Surgical Pathology, Anatomic Pathology ইত্যাদি নানা নামে পরিচিত।তাই অন্তর্জালে খোঁজ-খবর করার সময় এই নামগুলো দেখে বিভ্রান্ত হবেন না।

প্ল্যাটফর্ম পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত। প্ল্যাটফর্ম পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যায় একটি অপ্রচলিত বিষয় সম্পর্কে লেখা প্রকাশিত হয়। পঞ্চম সংখ্যা আসছে আগামী অক্টোবরে।

শেয়ার করুনঃ Facebook Google LinkedIn Print Email
পোষ্টট্যাগঃ ক্যারিয়ার,

পাঠকদের মন্তব্যঃ ( 3)

  1. Sarjana says:

    What is the syllabus of MD in pathology/fcps in histopath?anatomy or physiology needed?plz can anyone give me any idea?

  2. sozol mozahid says:

    healthnewsbd.com/tips/2644

  3. Ae subject a ki porobortite bire jeye job porashunar kono scope ache??




Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Advertisement
Advertisement
.