সার্জারির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (পর্ব-০৩)

আজ যার অবদানের কথা লিখবো, তার নাম প্রথমেই জানাবো না! দেখা যাক কতজন তার সম্পর্কে ধারণা করতে পারেন। জীবদ্দশায় একদমই স্বীকৃতি না পেলেও এখন তিনি সারাবিশ্বের জন্য এন্টিসেপটিক প্রসিডিউরের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র।
প্রধানত তিনি কাজ করেছেন প্রসূতি বিভাগে, আর এজন্যই তাঁকে “মায়েদের ত্রাণকর্তা” বা “saviour of mothers” বলে আখ্যায়িত করা হয়। এই হাঙ্গেরিয়ান ডাক্তারকে নিয়ে লেখালেখি হয়েছে বিস্তর, মুভিও বানানো হয়েছে অনেক! ১৯৩৮ সালে তাঁকে নিয়ে বানানো শর্টফিল্ম “That Mothers Might Live” অস্কারও জিতেছে।
বিশাল অবদানের পরেও পদে পদে অপমানিত হয়েছেন। ডিপ্রেশনে ভুগে অল্প বয়সে করুণ মৃত্যু হয়েছে তার।
কেউ কি ধরতে পেরেছেন, কাকে নিয়ে লিখছি?
তার জন্ম ১৮১৮ সালে হাঙ্গেরিতে (বলতে গেলে, তিনি ডাঃ জোসেফ লিস্টারের মোটামুটি সমসাময়িকই ছিলেন। তাঁর কাজও ছিল জীবাণুমুক্তকরণ নিয়ে)। তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কিন্তু মেডিসিন দিয়ে শুরু হয়নি! তিনি ১৮৩৭ সালে ইউনিভার্সিটি অফ ভিয়েনা-তে আইন নিয়ে পড়তে শুরু করেন। হঠাৎ পরের বছর বিষয় পাল্টে মেডিসিন নিয়ে নেন, এবং ইন্টারনাল মেডিসিনে ডক্টরেটও করে ফেলেন!
কিন্তু কোথাও চাকরি না পাওয়ার কারণে শেষমেষ ক্যারিয়ারের মোড় পাল্টে Obstetrics (ধাত্রীবিদ্যা)-এর দিকে চলে যান! (ডক্টরেট করার পরেও চাকরি পাননি শুনে অবাক লাগছে? সামনে আরও চমক অপেক্ষা করছে!)
লিখছি ডাঃ ইগনাজ ফিলিপ সেমেলওয়াইস (Ignaz Philip Semmelweis)-এর কথা।
তিনি ১৮৪৬ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা জেনারেল হাসপাতালের দুইটা অবস্টেট্রিকাল ক্লিনিকের প্রথমটিতে একজন প্রফেসরের সহকারী হিসাবে যোগ দেন। সেখানে ক্লিনিকাল কাজ এবং শিক্ষকতার পাশাপাশি তাকে হসপিটালের রেকর্ডও সামলাতে হতো। এই সময় ১৮৪১-৪৬ সাল পর্যন্ত রেকর্ড ঘেটে তিনি একটা ব্যাপার খেয়াল করলেন, ১ম ক্লিনিকের চেয়ে ২য় ক্লিনিকে মৃত্যুহার চোখে পড়ার মত কম। দুইটি ক্লিনিকে সব প্রক্রিয়া এবং যন্ত্রপাতি একরকম হওয়ার পরেও ১ম ক্লিনিকে রোগীর পিউপেরাল ফিভার (puerperal fever)-এ আক্রান্ত হওয়ার হার এবং মৃত্যুহার অনেক বেশি। ব্যাপারটা তাঁকে বেশ চিন্তায় ফেলে দিল।
IMG_20170805_115402
রোগীরা কোনমতেই ১ম ক্লিনিকে ভর্তি হতে চাইতো না, এমনকি অনেকে ১ম ক্লিনিকে ভর্তি হওয়ার ভয়ে রাস্তায়ও ডেলিভারি করিয়ে ফেলতো। ব্যাপারটা তখন এতই বেশি ঘটতো যে এর একটা নামও দেয়া হয়েছিল, “স্ট্রিট-বার্থ”। বিস্ময়কর ব্যাপার হল, ১ম ক্লিনিকের চেয়ে স্ট্রিট-বার্থে মৃত্যুহার কম ছিল! তিনি ভাবতে লাগলেন, কিছু একটা তো নিশ্চয়ই আছে যা ১ম ক্লিনিকের মৃত্যুহার স্ট্রিট-বার্থের চেয়েও বাড়িয়ে দিচ্ছে!
সেমেলওয়াইস দুইটি ক্লিনিকের বিভিন্ন মিল-অমিল থেকে একটা একটা করে বিভিন্ন ফ্যাক্টর বাদ দিতে থাকলেন। দেখা গেলো, সবচেয়ে বড় অমিল হলো ক্লিনিকের কর্মীরা। ১ম ক্লিনিকে কাজ করতো মেডিকেলের ছাত্ররা, ওদিকে ২য় ক্লিনিক চলতো দাই বা ধাত্রীদের (Midwives) মাধ্যমে।
১৮৪৭ সালে হঠাৎ একটা দুর্ঘটনার মাধ্যমে একটা বড় ব্যাপার তার সামনে চলে আসলো। তাঁর বন্ধু জ্যাকব এই বছর মৃত্যুবরণ করেন। ছাত্রের সাথে পোস্টমর্টেম এক্সামিনেশন করতে গিয়ে ছাত্রের স্কালপেলের আঁচড় তার গায়ে লাগে। কিছুদিন জ্বরে ভুগে জ্যাকব মারা গেলেন। আর তার পোস্টমর্টেম এক্সামিনেশন বা অটোপসিতে ঠিক একই লক্ষণগুলো ধরা পড়লো, যেগুলো পিউপেরাল ফিভারে ভুগে মারা যাওয়া মহিলাদের মধ্যে পাওয়া যায়!
সাথে সাথেই সেমেলওয়াইস “ক্যাডাভারিক পার্টিকেল” (Cadaveric particles) এবং পিউপেরাল ফিভারের মধ্যে সম্পর্ক দেখিয়ে একটা থিওরি প্রস্তাব করলেন। (লুই পাস্তুরের Germ Theory প্রকাশের ২০ বছর আগের কথা!)
১ম ক্লিনিকে অটোপসি করা হয়ে থাকে। ফলে ডেডবডি থেকে ক্যাডাভারিক পার্টিকেল তখন হাতে চলে আসতো (এখন আমরা জানি, সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই Streptococcus pyogenes)। এরপর ভালমত হাত না ধুয়েই  ডেলিভারি এবং রোগী দেখার কারণেই সেই পার্টিকেল রোগীর দেহে চলে যেত। ফলে পিউপেরাল ফিভার দেখা দিত।
অন্যদিকে, ২য় ক্লিনিকে কর্মরত ধাত্রীরা কখনো অটোপসি করতো না, ফলে ক্যাডাভারিক পার্টিকেলের সাথেও তাঁদের কোন সম্পর্ক থাকতো না। তাই সেখানে পিউপেরাল ফিভারে আক্রান্ত হওয়ার হারও কম।
সমাধান হিসাবে অটোপসি করার পর ক্যালসিয়াম হাইপোক্লোরাইট বা ক্লোরিনেটেড লাইম দিয়ে হাত ভালমত ধুয়ে এরপর রোগী দেখার কথা বলেন তিনি। এতে ক্যাডাভারের দুর্গন্ধ হাত থেকে দূর হওয়ার সাথে অন্যান্য পার্টিকেলও দূর হবে।
এই ব্যবস্থার ফলে মাত্র এক মাসের মধ্যেই ১ম ক্লিনিকে রোগীর মৃত্যুহারে বিশাল পরিবর্তন দেখা গেল। এমনকি পরপর দুইমাস কোন রোগী মারাই গেল না!
তিনি ও তাঁর ছাত্ররা সবার মঙ্গলের জন্য এই বিষয়টা জানিয়ে বিভিন্ন হসপিটালে চিঠি দিলেন। এখন ব্যাপারটা যতই সহজ মনে হোক, তখনকার দিনে ডাক্তারদের কাছে ব্যাপারটা নতুন ছিল। বিশ্বাস করা হতো যে প্রত্যেকের রোগ এবং তার কারণ আলাদা। “একটামাত্র কারণে অনেকের একই রোগ হতে পারে”- এই ব্যাপারটা তখন প্রচলিত ছিল না।
অনেক সার্জনের কাছেই হাত ধোয়ার পরামর্শ চরম অপমানজনক ঠেকলো। তাঁরা মনে করলেন রোগীর মৃত্যুর জন্য আসলে তাদেরই দায়ী করা হচ্ছে। ফলে তৎকালীন মেডিকেল কমিউনিটি সেটা সহজে মেনে তো নিলই না, বরং সেমেলওয়াইসকে প্রচুর অপদস্থ করলো।
এতকিছুর পরেও তিনি প্রথমে দমে যাননি। নিজের কাজকে আরও এগিয়ে নিতে থাকলেন। পরের বছর হাত ধোয়ার সাথে সাথে যন্ত্রপাতি ধুয়ে নেওয়ার রেওয়াজও চালু করলেন। কিছুটা লাজুক ছিলেন বলেই তাঁর কাজ সম্পর্কে তিনি নিজে লিখতেন না। তাঁর ছাত্ররা “ল্যানসেট”সহ বিভিন্ন মেডিকেল জার্নালে এসম্পর্কে লিখতে থাকে। ফলে সারাবিশ্বে তাঁর থিওরি ছড়িয়ে গেল।
তার পদ্ধতি অনুসরণ করে হসপিটালে মৃত্যুহার শতকরা ০.৮৫ ভাগে নেমে আসলেও কোন বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যা না থাকার কারণে এই থিওরি একদমই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। (কিন্তু সামনাসামনি বিরোধিতা করলেও অনেকেই তাঁর থিওরি কাজে লাগিয়ে রোগী বাঁচাতে শুরু করেন। এমনকি তাঁর প্রত্যক্ষ প্রতিপক্ষ পর্যন্ত!)
ওদিকে ১৮৪৮ সাল থেকে অস্ট্রিয়া আর হাঙ্গেরির মধ্যে রাজনৈতিক ঝামেলা শুরু হলো। একজন হাঙ্গেরিয়ান হওয়ার ফলে অস্ট্রিয়ার এই হাসপাতালে তাঁর পূর্বের চাকরি তো গেলই, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে চাকরি না দিয়ে অপদস্থ করা হলো। সবার তোপের মুখে পড়ে শেষে তিনি ভিয়েনা ছেড়ে বুডাপেস্টে চলে আসলেন!
এই যুদ্ধ-বিদ্রোহের মাঝে হাঙ্গেরির অবস্থা ভাল ছিল না। ১৮৫১ সালে তিনি একটা হাসপাতালে অনারারি চাকরি নিলেন অবস্টেট্রিক্স বিভাগের প্রধান হিসাবে। ৬ বছরে তিনি সেখানেও মৃত্যুহার কমিয়ে ১%-এরও নিচে নামিয়ে আনলেন। অবশেষে ১৮৫৮ ও ১৮৬০ সালে সেমেলওয়াইসের দুইটি প্রবন্ধ এবং ১৮৬১ সালে তাঁর বই “The Etiology, Concept and Prophylaxis of Childbed Fever” প্রকাশিত হলো।
কিন্তু তবুও নিজের দেশেও তাঁর পদ্ধতির বিরোধিতা করা হলো। হাঙ্গেরিসহ ইউরোপিয়ান ডাক্তাররা ক্ষিপ্ত হয়ে পেটের পীড়াকেই পিউপেরাল ফিভারের কারণ বলে প্রচার করতে লাগলেন।
এসব দেখে সেমেলওয়াইস প্রায়ই ডিপ্রেসড থাকতেন। ফলস্বরূপ, উত্তেজিত হয়ে ইউরোপের বড় বড় অবস্টেট্রিসিয়ানদের দায়িত্বজ্ঞানহীন, মূর্খ এবং খুনী আখ্যায়িত করে প্রকাশ্যে রাগান্বিত চিঠি পাঠাতে লাগলেন। কথা বলতে গেলে তিনি সব আলাপ পিউপেরাল ফিভারের দিকে নিয়ে যেতেন। ধীরে ধীরে তাঁর মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকলো।
১৮৬৫ সালে চরম পর্যায়ে চলে গেলে তাঁকে মানসিক হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু সম্ভবত পালানোর চেষ্টা করায় গার্ডরা তাঁকে সেখানে পিটিয়ে আহত করে। ১৪দিন পরে সেখানেই মাত্র ৪৭ বছর বয়সে Pyemia বা Blood poisoning (এক ধরনের septicemia)-তে তাঁর মৃত্যু হয়। তবে মৃত্যুতেও তার অপমান কোথাও থেমে থাকেনি!
কিন্তু তার মৃত্যুর কয়েক বছর পর লুই পাস্তুরের Germ Theory প্রকাশ পাওয়ার সাথে সাথে সেমেলওয়াইসের থিওরি অস্বীকার করার আর কোন উপায় ছিল না। যাকে মানসিক হাসপাতালের বিছানায় প্রচণ্ড কষ্ট নিয়ে মরতে হয়েছিল, আজ তাঁর নামে বিশ্বে রয়েছে অসংখ্য হসপিটাল, ইউনিভার্সিটি, এমনকি যাদুঘর।
মানুষ প্রায়ই পুরাতন বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চায় এবং বেশি প্রাধান্য দেয়। নতুন কিছু মানতে চায় না।মানবপ্রকৃতির বিশেষ এই দিকটার কিন্তু একটা নাম আছে! একে বলা হয় “সেমেলওয়াইস রিফ্লেক্স” (Semmelweis reflex)…. কীসের প্রেক্ষিতে এই নামকরণ, সে ব্যাপারে নিশ্চয় এখন আর কারো কোন সন্দেহ নেই!
আদিবা তাসনিম
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ
সেশনঃ ২০১২-১৩

যোবায়ের মোমিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Next Post

কিশোরগঞ্জ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের উপর হামলা

Fri Aug 18 , 2017
তথ্যপ্রদানেঃ মীর শওকত নেওয়াজ নিরব কিশোরগন্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম লেডিকেল কলেজ হাসপাতেলের মহিলা ইন্টার্ণ চিকিৎসেক উপর হামলা করেছে রোগীর লোকজন। উক্ত মেডিকেল কলেজের “হাসপাতালের” কাজ এখনো সম্পন্ন না হওয়ায় বর্তমানে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালে ১ম ব্যাচ SN-1 খুবই কষ্ট করে ফুলটাইম ডিউটি পালন করছে। আজ বিকালে CCU […]

সাম্প্রতিক পোষ্ট