প্ল্যাব নিয়ে যত কথা: পর্ব ৪

লিখেছেন: ডা. সামিয়া ফারহিন

৩১ মার্চ, ২০২০

আমি যখন এ লেখাটি লিখছি তখন বাকিংহাম প্যালেস সরগরম। রয়্যাল প্রিন্স করোনায় আক্রান্ত। ব্রিটিশ রাজপরিবার যে শান- শওকত আর সিকিউরিটি মেনে চলে, তা চোখে আংগুল দিয়ে বিশ্বকে দেখিয়ে দিচ্ছে, এরাও অসহায়।
আমাদের অহংকার, নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবার প্রবণতা একমুহূর্তে ধূলিস্যাৎ হয়ে যায়, যখনই আমরা মৃত্যুকে কাছে দেখি। তিনিই আল্লাহ, যিনি এক প্রচন্ড ধাক্কা দিয়ে আমাদের মনে করিয়ে দেন, আমি এক এবং অদ্বিতীয়, তোমরা কিছুই নও।

আমরা স্বপ্ন দেখি, স্বপ্ন বানাই, নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে অপরের সাথে অন্যায় করি, অপরের কথা মনে রাখি না। আমরা বিভেদ করি নিজের মত করে। কেউ আমার কথা শুনছে না, সে দুনিয়ার খারাপ, বেঈমান!! হতে পারে তার কথায় যুক্তি ছিল, কে মানতে যায় সেসব।
আমরা বিভেদ করি, সরকারী মেডিকেল, উফ! সব ব্রিলিয়ান্ট! বেসরকারী!! ধূর! এইগুলা স্টুডেন্ট হলো! সব গাধা।
আমরা বিভেদ করি ডিগ্রীতে। ওর ২-৩ টা ডিগ্রি আছে, তার ফ্যান ফলোয়ার বেশি। ওর ডিগ্রি নাই, পরিবারও দাম দেয় না একদিন।
নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবার এই অসুস্থতা শুধু আমাদের দেশে নয়, পুরো বিশ্বেই আছে। বাংলাদেশ এখনো তৃতীয় বিশ্বের তকমা থেকে, শুধুমাত্র বিশ্বের একটি দেশ, এই পরিচিতি পায়নি। সাদা চামড়ার মানুষ বাদামী অথবা কালো চামড়ায় নাক সিটকায়। মনে মনে ভাবে তোমাদের তো দয়া করে থাকতে দিয়েছি। এদেরজন্যই দেশে দেশে বর্ণবাদ এর বিরুদ্ধে আইন পাশ করতে হয়, খেলার মাঠে ফুটবলাররা বর্ণবাদের বিরুদ্ধে পোস্টার নিয়ে দাঁড়ান। তা-ও কি বিলুপ্ত করা গিয়েছে, মানুষে মানুষের এই বিভেদ!!

মানুষে মানুষের এই বিভেদ যাবার নয় কেয়ামত পর্যন্ত। সুতরাং পছন্দ আপনার, যে কয়দিন বাঁচবেন সে কয়দিন কাদায় ডুবে থেকে অপরকে ছোট করে দেখতে দেখতে বাঁচবেন, নাকি মানুষকে সম্মান দিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচবেন।
নিজেকে অসাধারণ সবাই ভাবে, কিন্তু একমাত্র অসাধারণ সে-ই হতে পারে, যে নিজেকে সাধারণ ভাবতে এবং বিশ্বাস করতে পারে।

আজকে প্ল্যাব ২ নিয়ে লেখার কথা ছিল। এটাই ফাইনাল পার্ট প্ল্যাবের। আগেই বলেছি, এটা সবচেয়ে আনপ্রেডিক্টেবল পার্ট। আরেকটা কথা যোগ করতে চাই। এখানেই আপনার বিশাল অংকের খরচ করতে হয়।

প্রথমেই খরচ

প্ল্যাব ১ এর মত প্ল্যাব ২ এর টাকাও আগে থেকে একাউন্ট এ জমা রাখবেন। কারন আপনি সীট বুকিং না দেয়া পর্যন্ত ভিসা প্রসেসিং এ এগোতে পারবেন না। আমার সময়ে এক্সাম ফিস ছিল ৮৪০ জিবিপি, প্রায় ৯০,০০০+ বাংলাদেশী টাকা।
এরপরে ভিসা, প্লেন টিকেট, থাকা, খাওয়া সব মিলিয়ে তিন থেকে চার লাখের মত খরচ হয়। এইনিয়ে roadtouk.com ওয়েবসাইট দেখবেন।

শাহরিয়ার ভাই Plab for Bangladeshi doctors group এ খরচ নিয়ে একটা পোস্ট দিয়েছেন, সবাই কিভাবে টাকা জোগাড় করেছে সেখানে লিখছেন। প্লিজ পড়েন, মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে হতে পারে আপনিও আইডিয়া পাবেন, কিভাবে টাকা জমানো যায়।

কেউ স্বীকার করুক আর না করুক, বাংলাদেশের জুনিয়র ডাক্তাররা যে কি নিদারুণ অর্থ সংকটে কাটায়, একটাবার যদি নীতি নির্ধারকরা জানতেন! বেতনের টাকা আসা যাওয়ার ভাড়া দিতেই শেষ সবার, বই পত্র কিনে পরীক্ষার ফিস দিবে কি! বাংলাদেশে আশি ভাগ ডাক্তার এমন পরিবার থেকে আসে, যেখানে চাইলেই লাখ দুয়েক টাকা কয়েক মাসেও জোগাড় করা যায় না। আর যারা বেসরকারি মেডিকেল থেকে আসে, তাদের অবস্থা আরো করুণ। মা বাবা পুরো ব্যাংক ব্যালেন্স অলরেডি মেডিকেলে পড়াতে শেষ করে ফেলেছেন, পোস্ট গ্রাজুয়েশন এর টাকা তাদের কাছে চাওয়া যে কত বিব্রতকর!

এখন আপনি কিভাবে টাকা সেইভ করবেন? মাসের প্রথমে একটা লিস্ট করবেন, যে খরচ না করলেই নয়, সেটা লিখবেন। বেতনের বাকি টাকা ব্যাংক থেকে উঠাবেন না, যা হয় হোক। আমার আশেপাশে আমি দেখেছি, মানুষ সবচেয়ে বেশি খরচ করে শপিং, বাইরে খাওয়া দাওয়া আর সিগারেট কিনে। মন চাইলেই অনলাইন ফুড অর্ডার। এগুলো বাদ দিয়ে দেখেন, আপনার কত সেইভ হয়। কার্ড ব্যবহার করবেন, ক্যাশ টাকা কাছে রাখবেন না। ক্যাশ টাকা কিভাবে যে খরচ হয়ে যাবে, আপনি বুঝতেও পারবেন না।

ছেলে ডাক্তারদের একটা সুবিধা হল, পেরিফেরিতে খ্যাপে চলে যেতে পারে। এক – দুইমাসের জন্যে চলে যান, যা টাকা পাবেন পুরোটা একাউন্টে রেখে দিবেন।
এইভাবে একটানা ৬ মাস স্ট্রিক্ট রুটিন ফলো করেন।

এবার এক্সাম বুকিং

ভিসা, টাকার জোগাড়, থাকা খাওয়ার বন্দোবস্ত সব মিলিয়ে আপনার হাতে যদি টাকা থাকে, তাহলে প্ল্যাব ১ পাশ করার সাথে সাথেই ৩-৪ মাসের মধ্যে প্ল্যাব ২ এর সীট বুকিং দিবেন। প্ল্যাব ২ এর সীট পাওয়াও খুব কম্পিটিটিভ। পোর্টাল ওপেন করলেই দেখবেন, ৩/৪ মাস পরের সীট পাচ্ছেন। সুতরাং এক্সাম ফিস আগেই জোগাড় করে রাখতে পারলে ভাল।

যদি দেখেন, এক্সাম ফিসের টাকা আছে কিন্তু এর বেশি নাই, তাহলে ৬/৭ মাস পরের এক্সাম ডেট বুকিং দিবেন।ইন দ্য মিনটাইম, বাকি টাকার আর ভিসার কাগজ জোগাড় করবেন।

এবার ভিসা

gov.uk visa website এ যাবেন৷ একটা একাউন্ট করবেন। কাগজপত্র জোগাড় থাকলে, একটা ইমিডিয়েট ইন্টারভিউয়ের তারিখ নিবেন৷ না থাকলে, আপনার সুবিধাজনক সময়ের নিবেন।
এবার কাগজ জোগাড় করেন। পেপারসের বিস্তারিত roadtouk ওয়েবসাইট এ আছে। আমি শুধু কিছু টিপস দিচ্ছি।
১। আপনার যে ডকুমেন্টস গুলো বাংলায়, যেমন ন্যাশনাল আইডি, সেটা ইংলিশে ট্রান্সলেট করুন। নিজেই করেন, অন্যকে দিলে বানান ভুল করবে। আমি Microsoft word এ করেছি।
২। আপনার এপ্লিকেশন থেকে শুরু করে সব কাগজ পত্র আপনি নিজেই Microsoft word এ টাইপ করে প্রিন্ট করুন। এজেন্সির সাহায্য লাগে না।
৩। নোটারি করাতে হলে গুগুল সার্চ দিন, notaty office near me, রেজাল্ট চলে আসবে। আমি গুলশান ২ ডিসিসি মার্কেটের দোতলা থেকে করিয়েছিলাম। প্রত্যেকটা নোটারি ৩০ -৫০ টাকা করে নিবে।

স্পন্সর কে হবেন?

যে কেউ হতে পারেন, আপনার যে কোন আত্মীয় যিনি ইউকে আছেন, অথবা আপনার বন্ধু, মেডিকেলের সিনিয়র। দেশে আপনার বাবা মা, আত্মীয়। উনারা Sponsor’s letter এ লিখবেন, আপনি অনেক ব্রিলিয়ান্ট, প্রতিভাবান এবং সম্ভাবনাময় ডাক্তার। আপনার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্যে উনারা আপনাকে ছোট একটু হেল্প করতে চান, যাতে আপনি আরো মানুষের উপকার করতে পারেন।

আপনার স্পনসর আপনি হলে, কি করবেন?

চেষ্টা করবেন শেষ ৬ মাস আপনার একাউন্ট এ একটা ব্যালেন্সড টাকা রাখতে। হুট করে অনেক টাকা ডিপোজিট করবেন না, আবার সব টাকা তুলেও ফেলবেন না। আপনার যতটুকু না হলেই নয়, ততটুকু টাকা তুলবেন। সেটা যাতে consistent থাকে সেদিকে খেয়াল রাখবেন।

কোন একাডেমিতে এডমিশন নিবেন?

যেটায় খুশি। সব এক। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম Swamy তে যাওয়ার, কারন আমার এক্সাম সেন্টার ম্যানচেস্টারে। আমার জন্যে আরেক সিটি থেকে ট্রাভেল করে, ম্যানচেস্টার এসে পরীক্ষা দেয়া হ্যাজার্ড মনে হয়েছে৷ আর Swamy তে এডভান্স পেমেন্ট দিতে হয় না, লাইভ কোর্সের জন্যে। They are old in this business. ভিসার জন্যে আমার, একাডেমি থেকে কিছু পেপার নেয়া দরকার ছিল। They responded me very quickly always without asking second question.
তবে আশার কথা হল, Swamy, Samson, Aspire সবার সেন্টার এখন ম্যানচেস্টার এ আছে।

অনলাইন কোর্স করবেন কি না?

অবশ্যই করতে পারেন। থাকা খাওয়ার খরচ বাঁচাতে অনলাইন কোর্স করে পরীক্ষার ১ মাস অথবা ২ সপ্তাহ আগে গিয়ে লাইভ প্রাকটিস করতে পারেন। আমি বহু বহু ভীনদেশী ডাক্তারদের দেখেছি, এভাবে আসতে এবং পাশ করতে। বিশেষ করে যাদের ছোট বাচ্চা আছে অথবা চাকরি থেকে ছুটি পাচ্ছে না, তারা। অনলাইন কোর্স করে WhatsApp, Telegram এ স্টাডি গ্রুপ গুলোতে জয়েন করবেন। স্টাডি পার্টনারদের সাথে দুই থেকে তিনবার ফুল প্রাকটিস করবেন অনলাইনে।
মেয়ে ডাক্তাররা ইনকনভেনিয়েন্ট মনে করলে মেয়ে স্টাডি পার্টনার চেয়ে রিকোয়েস্ট করতে পারেন। আমি নিজেও তা-ই করেছি & I met with some talented female doctors.

কোর্সের পরে কতদিন প্রাকটিস করবেন?

তিন থেকে চার মাস। এটা এজন্যে নয় যে আপনি বাজে স্টুডেন্ট, এটা এজন্যে কারন UK system সম্পূর্ণ আলাদা। প্ল্যাব ২ এক্সাম প্যাটার্ন বুঝতে বুঝতেই চলে যায় এক মাস। এরপরে প্রতিদিন ১৪ ঘন্টা করে প্রাকটিস করেও দেখবেন, গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। তবে অনেক ডাক্তার কোর্সের পরে দুই সপ্তাহ মাত্র প্র‍্যাকটিস করে পরীক্ষা দেয় এবং পাশ করেন। এদের সংখ্যা অগণিত। সুতরাং এগেইন চয়েজ ইজ ইউরস। আপনি নিজেই আপনার ক্যাপাবিলিটি সম্পর্কে ভাল জানবেন।

কোথায় থাকবেন?

অনেকে আত্মীয়ের বাসায় থাকেন। তাতে থাকা খাওয়ার খরচ বাঁচে। তবে যদি টাকা পয়সার অসুবিধা না থাকে, তাহলে হোস্টেলে থাকেন। যেখানে অন্য প্লাব পরীক্ষার্থী ডাক্তাররা আছেন। অন্যেরটা দেখে দেখে পড়ালেখা হয়। নাহলে দেখবেন, দেশের কথা, পরিবারের কথা মনে করতে করতেই সময় চলে যাবে।
Spareroom.uk, booking.com, airbnb, travellodge এগুলোতে আপনার সামর্থ্যের মধ্যে রুম পাবেন। অনেকে একাডেমির নিজস্ব হোস্টেলে থাকে। কারন ওদের মেইল ফিমেইল হোস্টেল আলাদা। একাডেমির সাথে যোগাযোগ করতে পারেন এব্যাপারে।

থাকা হলো, খাওয়ার কি ব্যবস্থা?

আপনি যেখানে থাকবেন, সেখানে শিওর হয়ে নিবেন রান্না করার ব্যবস্থা আছে কি না। যদি থাকে তাহলে সব কিচেনে ইউটেনসিলস থাকবেই এমনকি ইস্ত্রি সহ।এগুলা আপনার কিনতে হবে না। শুধু দেশ থেকে ছোট একটা রাইস কুকার নিয়ে যেতে পারেন। নিজের রান্না নিজে করে খাওয়া দাওয়া করতে পারেন, খরচ কম হবে। আর খাদ্য সামগ্রী, টয়লেট্রিজ এগুলো খুব কমদামে এখানে পাওয়া যায়। অযথা দেশ থেকে ব্যাগ ভর্তি করে আনবেন না। রান্না না করতে পারলেও অসুবিধা নাই৷ There are plenty of halal shops.

আজকে এইটুকুই থাকুক। আগামী পর্বে শুধুমাত্র পড়ালেখা নিয়ে লিখব। কি পড়বেন, কিভাবে পড়বেন।

আরো জানতে চাইলে Plab for Bangladeshi doctors group দেখতে পারেন। আর আপনারা কি roadtouk.com website দেখেছেন?? বাংলাদেশী ডাক্তারদের জন্যে এরচেয়ে ভাল কোন ইনফরমেশন ওয়েবসাইট নাই।

লিখেছেন,

ডা. সামিয়া ফারহিন
তায়রুন্নেসা মেমোরিয়াল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
সেশন: ২০১০-২০১১

Publisher

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Next Post

করোনা সংক্রান্ত জটিলতায় বিখ্যাত নিউরোসার্জনের মৃত্যু

Tue Mar 31 , 2020
৩১ মার্চ ২০২০: নিউইয়র্কের বিখ্যাত নিউরোসার্জন ডা. জেমস টি গুডরিচ কোভিড-১৯ রোগ সংক্রান্ত জটিলতায় মৃত্যুবরণ করেছেন৷ তিনি যমজ শিশু জ্যাডন ও অ্যানিয়াস ম্যাকডোনাল্ডের জোড়া মাথাকে আলাদা করার অস্ত্রপচারে নেতৃত্ব দান করেন৷ ডা. গুডরিচ জটিল নিউরোলজিক্যাল সমস্যায় ভুগতে থাকা শিশুদের সাহায্য করার ব্যাপারে ছিলেন অন্যতম পথিকৃৎ৷ তিনি জোড়া মাথার শিশুদের অস্ত্রোপচার […]

সাম্প্রতিক পোষ্ট