নতুন ডেন্টাল সার্জনদের জন্য কিছু কথা

আমি ইদানিং কিছু কিছু নতুন পাশ করা কিংবা অধ্যায়নরত ডেন্টাল সার্জনদের মধ্যে একধরনের হতাশা দেখতে পাই। অনেক সময় সিনিয়র বড় ভাইদের অনেক কথাতেও দেখি পেশা নিয়ে হতাশার ছায়া। আসলেই কি আমাদের দন্ত চিকিতসা পেশার এতই দুর্গতি? আমার কিন্তু তা মনে হয়না। কারন, আমরা ডেন্টাল সার্জনরা সবাই শহরমুখী, এই কারনে বিভাগীয় শহর এবং জেলা পযায়ে অনেক বেশি ডেন্টাল সার্জন, অনেক অনেক চেম্বার। কিন্তু উপজেলা বা থানা লেভেলে গেলে দেখবেন কোয়াকরাই অধিকাংশ উপজেলা/থানাতে দাপটের সাথে চেম্বার চালায় যাচ্ছে, কোন বিডিএস এর চেম্বার সেখানে নাই। কিংবা থাকলেও উনি সপ্তাহে ১/২দিন আসেন। এখানে আমি নতুনদের জন্য কিছু উপকারী টিপস দেয়ার চেস্টা করব যা তারা টেক্সট বই এ হয়তবা পাবেনা।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটা এমন যে একজন ডেন্টাল সার্জন কে পাশ করার জন্য ক্লিনিকাল ও থিওরিটিকাল অনেক জ্ঞান দেয়া হয় কিন্তু চেম্বার চালানো, রোগীদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হবে, কিভাবে একজন রোগীকে সামলাতে হবে এসব সাধারনত শেখানো হয়না। কলেজের হাসপাতালের রোগী আর চেম্বারে আসা রোগীদের মধ্যে মানসিকতার অনেক পার্থক্য থাকে। ক্লিনিকে রোগীরা আসে একটু স্পেশাল কেয়ারের আশায়। নতুন পাশ করা ডেন্টাল সার্জনরা অনেক সময় বুঝে উঠতে পারে না কিভাবে প্রফেশনাল জীবন শুরু করবে, তাই পাশ করার পর না বুঝেই অনেকে অনেক রকমের পদক্ষেপ নেয়, যা অনেক ক্ষেত্রে মানষিক চাপ আরও বাড়ায় দেয়। আমি এখানে সেই কমন ভুলগুলো আলোকপাত করব:
ভুল নং ১ঃ পাশ করা মাত্র চেম্বার দেয়া : যেহেতু ডেন্টাল প্রফেশন এ চাকুরীর খুব অভাব এবং যেহেতু আমাদের স্যাররা চেম্বারে নামমাত্র সন্মানী দেন, তাই অন্য কোন পথ না পেয়ে পাশ করেই সাথে সাথে অনেকে চেম্বার দেন।

নতুনরা অনেক সময় শুরুতেই অনেক টাকা ইনভেস্ট করে চেম্বার দিয়ে কাঙ্ক্ষিত সাড়া না পেলে হতাশায় ভুগে
নতুনরা অনেক সময় শুরুতেই অনেক টাকা ইনভেস্ট করে চেম্বার দিয়ে কাঙ্ক্ষিত সাড়া না পেলে হতাশায় ভুগে
যারা পারিবারিকভাবে একটু সচ্ছল তারা অনেকে প্রচুর টাকা খরচ করে হাই-ফাই চেম্বার দেন। এক যুগ ডেন্টাল চেম্বার পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকে আমার অন্যতম উপলদ্ধি হল, আপনার চেম্বারে একটা রোগী ভাল হলে সে ভবিষ্যৎ এ একটা রোগী পাঠাবে আর একটা রোগীর খারাপ চিকিতসা হলে সে ১০জন রোগীকে ভাগাবে। দাত ফেলা,ফিলিং, রুট কেনেল এই তিন কাজ যেহেতু সবচেয়ে বেশি হয়, এই তিনকাজে সাধারন (Basic) দক্ষতা না থাকলে চেম্বার দেবার আগেই পিজিটি বা অন্য কোন অভিজ্ঞ ডাক্তারের অধীনে কাজ করে তা অর্জন করা উচিত। আমি মনে করি বিনা পারিশ্রমিকে হলেও অভিজ্ঞ একজন স্যার এর চেম্বারে কয়েক মাস কাজ শেখা উচিত। কিভাবে রোগীদের সাথে কথা বলতে হয়, ট্রিটমেন্ট প্লান থেকে শুরু করে টাকা কিভাবে আদায় করতে হয় এই সবই শেখা সম্ভব একজন অভিজ্ঞ স্যার এর সাথে কিছুদিন থাকলে।
ভুল নং ২ঃ প্রচারে অসংযমী হওয়া: অনেকে সাধারন ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান দিলে যেভাবে লিফলেট, ডিশ এ বিজ্ঞাপন, দেয়াল লিখন, পোস্টারিং, মাইকিং করা হয়, সেভাবেই ডেন্টাল ক্লিনিক এর বিজ্ঞাপন করে থাকেন। যেহেতু মানুষ এখন অনেক সচেতন তাই বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে নতুন ডাক্তারদের একটু বুদ্ধিমান হওয়া দরকার । আমি মনে করি ভাল সার্ভিস নিশ্চিত করলে একজন রোগী সেই ডাক্তারের সুনাম অনেকের কাছে করে এবং তার পরিচিতদের সেখানে পাঠায় (Referred) , এটাই সবচাইতে সুস্থ এবং শক্ত বিজ্ঞাপন।
একটি সাহসী ও ব্যতিক্রমী বিজ্ঞাপন
একটি সাহসী ও ব্যতিক্রমী বিজ্ঞাপন
তবে একদম প্রথম অবস্থায় নিজের অস্তিত্ব জানাবার জন্য  বিজ্ঞাপন করার প্রয়োজন হতে পারে। সেই ক্ষেত্রে শুধু নিজের আর ক্লিনিকের গুনগান না করে ডেন্টাল সচেতনতামুলক কিছু উপদেশ দিয়ে জনসচেতনতায় অমুক ক্লিনিক তমুক ডাঃ দেয়া যেতে পারে। এতে পজিটিভ মার্কেটিং হবে, মানুষ আপনার ক্লিনিক ও আপনাকেও চিনবে আবার লিফলেটটা রাস্তায় ফেলে দিবেনা, পরিবারের বাকিদের সচেতনতা বাড়ানোর জন্য সাথে নিয়ে যাবে। নতুনদের সুবিধাথে আমি আমার করা এমন একটি বিজ্ঞাপন এর নমুনা দিলাম। এটা একটা স্কুলের বার্ষিক যে Year Book সার্কুলার করে সেটায় দেয়ার উদ্দেশে বানানো। টারগেট গ্রুপ শিশু, শিশুদের বাবা-মা। এছাড়া পরিচিতি বাড়ানোর জন্য নতুনদের প্রচুর জনসংযোগ বাড়ানো দরকার। এটা প্রফেশনালি করার একটা বুদ্ধি হল – ডেন্টাল ক্যাম্প এর আয়োজন করা। এই আয়োজনটাও এমনভাবে করা উচিত যাতে কোনভাবেই নিজের প্রয়োজন বড় হয়ে না দেখায় বরং যেন সবাই এটাকে মানবসেবা হিসেবেই দেখে বা বুঝে। স্কুলে বা কর্পোরেট অফিসে, গার্মেন্টস বা অন্যান্য ফ্যাক্টরিতে কিংবা গ্রামে এই ধরনের আয়োজন আপনার পরিচিতি ব্যাপকভাবে বাড়ায় দিতে পারে। কিছু পেতে গেলে কিছু ছাড়তে হয়, গরীব মানুষদের সেবা দেয়ার মাধ্যমে যে মানসিক শান্তি পাবেন তা কিন্তু মহামুল্যবান।

ভুল নং
৩ঃ অনেক কম রেটে কাজ করা: অনেক নতুন ডাক্তার মনে করেন যে কম টাকায় সেবা দিলে রোগী বেশি আসবে। অনেকে আবার তুলনা করে আশেপাশের চেম্বারের চাইতে কম রেট রাখে। সবচাইতে বোকামী করে যারা একেক রোগীর কাছে একেক রকম রেট রাখে।প্রথমত কম টাকা রাখলেই রোগী বেশি আসবে এই ধারনা ভুল। আর প্রতিটা রোগী দেখার সময় এটা মনে রাখা উচিত যে- “এই রোগী হয়ত আরেক জন রোগীর কাছে শুনে আমার কাছে এসেছে।” নইলে দেখা যাবে যে পাঠাইছে তার কাছে একি চিকিতসায় আপনি কম/বেশি টাকা রেখেছিলেন! সব সময় মাথায় রাখা উচিত প্রাইভেট প্রাক্টিস একটা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। এখানে তিল তিলকরে সুনাম অজন করা লাগে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত চিকিতসা সাময়িকভাবে লাভবান করলেও দীর্ঘমেয়াদে দুর্নাম বয়ে আনে। সৎ ভাবে একটা নিধারিত রেটে কাজ করলে একটা সময় পরে এটার সুফল ঠিকই পাওয়া যায়। কত টাকা রেট করবেন? এটা নির্ভর করবে আপনার চেম্বারের লোকেশন, আপনার টারগেটেড জনগন, আশেপাশের চেম্বারের রেট, আপনার ইনভেস্ট এইসবের উপর। মনে রাখবেন একবার আপনার লেভেল নামিয়ে ফেললে উপরে তুলতে অনেক কষ্ট হবে। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে যে দুনিয়ার সবচাইতে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হল ডেন্টাল সার্জন। কারন অনেক সময় বসে বসে কাজ করা আর রোগ জীবানুর খুব কাছে থাকার কারনে ডেন্টাল সার্জন ও এসিস্টেন্টদের জীবন ঝুঁকিতে থাকে। যেকোন ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় বেতন/ মজুরি বেশি হয়ে থাকে। এখন তো অটোমেটিক চেয়ার, আধুনিক যন্ত্রপাতি আর সচেতনতা বাড়ায় বিপদ অনেক কমেছে। আপনি জানেন কি , ৮০’র দশকের অধিকাংশ ডেন্টাল সার্জন ব্যাক পেইন এর সমস্যাতে ভুগছেন? তবে সবকিছুর পরেও গরীব দুস্থদের জন্য মানবিকতার খাতিরে কম টাকা রাখা যেতে পারে, সেক্ষেত্রে রোগীকে এটা বলে দিতে ভুলবেন না যে আসল খরচ কত টাকা ছিল আর মানবিকতার খাতিরে কত ডিস্কাউন্ট দেয়া হল।

চলবে… (পরবর্তীতে দেওয়া হবে)

লিখেছেন ঃ ডাঃ আরিফুর রহমান
Asstt. Professor & Head Dental Unit Northeast medical college, Sylhet

Ishrat Jahan Mouri

Institution : University dental college Working as feature writer bdnews24.com Memeber at DOridro charity foundation

3 thoughts on “নতুন ডেন্টাল সার্জনদের জন্য কিছু কথা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Next Post

ঢাবির সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটে ডাক্তারদের জন্য মাস্টার্সের সুযোগ

Sat Nov 7 , 2015
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটে যুক্ত হল  এক বছর মেয়াদি ৪ টি মাস্টার্স প্রোগ্রাম। যার মধ্যে ২ টি হচ্ছে এমবিবিএস আর বিডিএস দের জন্য । এর অর্থ হচ্ছে এমবিবিএস এবং বি ডি এস পাশ করে সবাই এই ১ বছর মেয়াদি মাস্টার্স প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ  করতে পারবে। বিষয় দুইটি হচ্ছে ঃ 1. Clinical […]

সাম্প্রতিক পোষ্ট