চোখের জলের রং ভিন্ন হয় না

১০ এপ্রিল, ২০২০:
ডা. সুমন হুসাইন

মালেকা, বয়স ৫৫, ময়মনসিংহ।
উনার সাথে আমার পরিচয় হয় গত মাসের ৩০ তারিখে।

দুপুরে ডিউটি শেষে সিএ (ক্লিনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট) আপু বললেন, সুমন, মালেকা নামে একটা প্যাশেন্ট আছে Eclampsia ওয়ার্ডে, তুমি রাতে এসে একটু উনাকে ফলো আপ দিয়ে যেও। কিছু টেস্ট করতে দিয়েছি, কিছু জিনিস বাইরে থেকে আনতে বলছি, আর রক্ত ম্যানেজ করতে বলছি- তুমি রাতে এসে দেখবা, সবকিছু করছে কি না। তারপর আমাকে রিপোর্ট করবা।

রাতে ওয়ার্ডে গেলাম, তখনই আপু ফোন দিলেন, গেছো তুমি? বললাম, জ্বি আপু আসছি, আপনাকে জানাচ্ছি। আপু বললেন, তাড়াতাড়ি জানাও। ওয়ার্ডে গিয়ে অনেকক্ষণ চিল্লাইলাম, মালেকা কে? মালেকা কে?
কোনো উত্তর নেই। বাইরে এসে চিল্লাইলাম, মালেকার লোক কে? কোনো উত্তর নেই।

সবগুলো টিকেট চেক করে অবশেষে মালেকাকে পেলাম। প্রায় অচেতন রোগী, কঙ্কালসার। পেটের চামড়া, পিঠের চামড়া আলাদা করা যায় না।

ফলো আপ দিচ্ছি। বিপি, পালস, ইউরিন আউটপুট, ড্রেন টিউব কালেকশন..

ফলো আপ দেওয়ার সময়ই মালেকা হড়হড় করে গায়ের উপর বমি করে দিলেন। দুর্গন্ধময় বমি। কেনো জানি রাগ হলো না। পাশে রাখা একটা গামছা দিয়ে উনার মুখ মুছে দিলাম।

নার্স ছিলো পাশেই। দূর থেকেই আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “ডক্টর, আপনি কি নতুন জয়েন করেছেন?”
উনার প্রশ্নের মানে আমি বুঝলাম। মাস্কের উপর উনার যতটুকু চোখ খোলা ছিলো, ওতটুকুতেই বুঝলাম, উনি হাসছেন!

বললাম, জ্বি নার্স, নতুনই। নার্স বললেন, আচ্ছা।

খানিকক্ষণ পর এক বাচ্চা মেয়ে আসলো। বয়স ১৮ থেকে ২০ হবে। জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি মালেকার লোক? ইনি কে হয় তোমার? বললো, দাদী।
জিজ্ঞেস করলাম, যে টেস্টগুলো করাতে দিছিলাম, করছো?
উত্তর, না।
রক্ত জোগাড় হইছে?
উত্তর, না।
কিছু জিনিস বাইরে থেকে আনতে দিছিলাম, আনছো?
উত্তর, যথারীতিই না।

আপুকে ফোন দিলাম, আপু কিছুই হয়নি।

আপু রেগে বললেন, কি বলো! সকালে বলে আসছি, এখনো কিছু ম্যানেজ করে নাই? কাল ওই রোগীর OT, খুব জরুরি! তুমি রোগীর লোকরে বলো যেভাবেই হোক, আধা ঘন্টার মধ্যে সব ম্যানেজ করতে। না হলে বলো, হাসপাতাল থেকে ছুটি দিয়ে দিবো এখনই! আর তুমি রোগীর লোকের নাম্বার দাও, আমি দেখতেছি!

আপুকে বললাম, আপু, আমি দেখতেছি ব্যপারটা। আপনাকে জানাচ্ছি।

গিয়ে রোগীর নাতনিকে বললাম, তোমরা কি ম্যানেজ করতে পারবা এগুলা? নাকি ছুটি দিয়ে দিবো?
পিচ্চি মেয়ে, আমি ঝাড়ি মারি, আর ওয় হাসে।
ধমক লাগালাম, এই মেয়ে চুপ করো! হাসার মতো কী বলছি?
তোমার দাদীর কয় ছেলে মেয়ে ?
– চার ছেলে, তিন মেয়ে।
– তাদের মোট ছেলে মেয়ে কজন?
অনেকক্ষণ গুণে গুণে বললো, ২৫ জন। ভাবে বুঝলাম, আরও বেশি বৈকি, কম না!
– তারা কোথায়?
– বাড়িতে।
– আর কেউ আসে নাই ক্যান?
– জানি না।
– তুমি আসছো ক্যান?
– এমনি।

কেমন লাগে? বললাম, তোমার বাপকে ফোন দাও। ফোন করলো, খানিকক্ষণ বুঝালাম, বুঝলো না। তারপর ঝাড়লাম, কথা বলে না।
তারপর আবার বুঝালাম। শেষে জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা কি কেউ আসবেন?
বলে, না।
আপনার মাকে কি ছুটি দিয়ে দিবো?
বলে, দেন! দিলে আর কি করবাম?
– অপারেশন না করলে তো মরে যাবে আপনার মা!
– মরলে আর কিতা করবাম! আল্লার মাল আল্লায় নিবো!

বলেই দুম করে ফোন কেটে দিলো!
এর মধ্যেই আবার আপুর ফোন! কি খবর সুমন? কি হলো? হলো কিছু?
আপুকে সব বললাম ।
আপু বলেন, কিছু বলার নাই!

রোগীর কাছে আসলাম। মেয়েটাকে জিগ্যেস করলাম, টাকা পয়সা আছে কিছু তোমার কাছে?
যথারীতি মুখস্থ উত্তর, না।

বললাম, এসো আমার সাথে।
ওয়ান স্টপে গেলাম ।
গিয়ে ওয়ানস্টপের ইনচার্জকে বললাম, রোগী আমার দাদী। এই টেস্টগুলা ফ্রি করতে হবে। ফ্রি করেন।
উনি আগে থেকেই চিনেন আমাকে। বললেন, ঠিক আছে স্যার। তবে, টেস্ট টিউব আর সিরিঞ্জ দিয়ে দিচ্ছি, ব্লাড টা ড্র করে একটু দিয়ে যাবেন কাইন্ডলি।
এখানে অনেক চাপ, তাই কাউকে পাঠাতে পারছি না। কিছু মনে করবেন না।

বাইরে থেকে Osmosol, prolene 1-0 cutting Body আরো বেশ কিছু জিনিস কিনে আনলাম।

আপুর আবার ফোন!
– সুমন, কি করা যায় বলো তো?
– আপুকে বললাম, আপু ব্লাড ছাড়া সব ম্যানেজড।
– কিভাবে?
আপুকে বললাম সব। ফোনের এপাশ থেকে টের পেলাম, আপুর একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস।
বললেন ঠিক আছে, তুমি বাকি রোগীগুলোর ফলো আপ দিয়ে জানাও, কোনো রোগীর অবস্থা খারাপ আছে কি না। বেশি খারাপ হলে আমি আসবো।

মালেকার অপারেশন হয়েছে তার পরের দিন সকালে।
তারপর প্রতিদিন সকাল আর রাতে ফলো আপ দিতে যাই। অনেক রোগী। সবার কাছে যাওয়া হয় না। তাও মালেকার কাছে যাই। গিয়েই জিগ্যেস করি- কি খবর আপনার?
পেটের অপারেশনের সেলাইয়ের জায়গাটা দেখিয়ে বলে, এইহানডায় দুক্ক!

আমি বুকের দিকে দেখিয়ে বলি, এইহানে দুক্ক নাই?

প্রথমে বুঝে নাই মালেকা।

বললাম, এত্তগুলা ছাওয়াল মিয়া জন্ম দিছেন, জন্ম দিতে কষ্ট হয় নাই অনেক?
মালেকা মাথা নাড়ে।
বললাম, ভুল কইরা কষ্ট করছেন। হুদাই কষ্ট কইরা জন্ম দিছেন!

মালেকার দু’চোখের দু’পাশ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে।
খারাপ লাগলো, উনাকে শুধু শুধুই কষ্ট দিলাম।
কম কষ্টে চোখ দিয়ে পানি আসে না কারো। বেচারী!
চোখের পানি মুছে দিইনি। মনে হলো, না কাঁদুক!
এ কান্না উনার সৃষ্টিকর্তা দেখুক, দরকার আছে!

মুখের একপাশ দিয়ে লালা গড়িয়ে পড়ছিলো। কাপড় দিয়ে মুছে দিলাম।

ছবিঃ ইন্টারনেট

আমাকে হসপিটাল থেকে PPE (জীবাণু প্রতিরোধী সুরক্ষা পোশাক) দ্যায় নাই, রেইনকোট পরে একটানা ১২ ঘন্টা গরমের মধ্যে হাঁসফাঁস করেছেন কখনো? আমরা করছি। জাহান্নামের মতো গরম!

হেক্সিসল খুঁজে পাই না, মাঝে মাঝে হ্যান্ড গ্লাভসও খুঁজে পাই না। নিজের টাকা দিয়ে কেনার ওতটুকু সামর্থ্যও এখন আপাতত নাই। ডক্টরস ক্লাবে বাকিতে আলু ভর্তা আর ডিম দিয়ে ভাত খাই দুই বেলা করে, কখনো এক বেলা। এতেই পঞ্চাশ টাকার উপরে বিল উঠে যায়, এর উপরে উঠলে কেমন জানি লাগে! অনেক বাকি হয়ে গেছে। শোধ করমু কেমনে! যাহোক, ওগুলো নিয়ে অভিযোগ করছি না।

কিন্তু, কেনো করছি আমরা এসব বলুন তো! বিশ্বাস করুন, আপনাদের বাহবা পাওয়ার জন্য না। আমাদের ডাক্তারদের জীবনটাই এমন, মেনে নিয়েছি! তবে একটা আফসোস আমাদের প্রফেশনের প্রায় প্রতিটা মানুষকেই কুরে কুরে খায়, তা হলো – আপনার মাকে আমার মা মনে করে সেবা দিই আমরা। গালি কেনো দেবেন?
ভুল ত্রুটি, কিছু অব্যবস্থাপনার ঊর্ধ্বে কোনো মানুষ আছে? কিন্তু, আমাদেরটা কেনো মানতে পারেন না? কেনো পান থেকে একটু চুন খসলেই, এতটা পাগল হয়ে যান গালি দিতে?

যাহোক, মালেকাকে বললাম, থাকেন, যাই। আরো রোগী আছে অনেক!

মালেকা আমার হাত চেপে ধরে। আমি আস্তে আস্তে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে অন্য রোগীর ফলো আপ দিতে থাকি। মালেকার কান্না মুখ ভুলে যেতে থাকি..

মালেকা এখন ভালো আছে। খুব তাড়াতাড়িই ছুটি হবে মালেকার।

গতমাসের অর্থাৎ, মার্চের ৩ তারিখ থেকে মালেকা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি। এই সময় তার ছেলেমেয়ে কেউ আসেনি তার মাকে দেখতে।
এই ডাক্তাররাই তাকে দেখে রেখেছে, কখনো নিজের মায়ের মতো, কখনো ডাক্তার হয়ে, ঠিক আপনজনের মতো। নার্সরা তাকে সেবা দিয়েছে পরম মমতায়, যেখানে তার সন্তানরা কিংবা আত্নীয় অতটুকু প্রয়োজন মনে করেনি। কি বললাম, আশা করি বুঝতে পারেন নি। কিন্তু খুব করে চাই, বুঝতে পারুন একদিন।

যাহোক, ভাবছি ছুটি দেওয়ার সময় মালেকাকে বলবো, আপনার একেবারেই ছুটি হয়ে যাওয়া উচিত ছিলো, মালেকা! আর এতগুলো ছেলে মেয়ে হুদাই জন্ম দিছেন কষ্ট কইরা! এমন জীবন বাঁচার চাইতে আপনার মরে যাওয়া বেশি ভালো ছিলো, হুদাই বাঁচতেছেন!

পুনশ্চ :

এটা গল্প ছিলো না, গল্প লিখি নি। আর, এ রকম হাজার হাজার ঘটনা বাংলাদেশের প্রতিটা হাসপাতালে জন্ম হয় প্রতিদিন। যারা জন্ম দেন, তারা হচ্ছেন আপনার কাছে সকাল বিকাল গালি খাওয়া, কসাই বলে খেতাব পাওয়া ডাক্তাররা। আপনার মা, আপনার বাবা, আপনার স্বজন বাঁচুক না হয় মরুক- এটা নিয়ে আপনাদের মাথাব্যথা নাও থাকতে পারে, একজন ডাক্তারের আপনাদের সবাইকে নিয়ে অনেক মাথা ব্যথা।

প্রতিটা ডাক্তার সবসময় চান, তার রোগী বাঁচুক, একটা জীবন আবার নতুন করে হাসুক। প্রতিটা ডাক্তারই মানুষ, এক একটা মৃত্যু তাদেরকেও ছুঁয়ে যায়। আমরা হয়তো বুঝতে দিই না, কারণ এর পরেই আমাদের আরেকটা যুদ্ধের শুরু হয়- আরেকটা মৃতপ্রায় জীবনকে বাঁচানোর যুদ্ধ!

জানি না আপনারা বুঝেন কি না, কিংবা কোনোদিন বুঝবেন কি না!

ডাক্তারদের করোনা ধরে না, ডাক্তারদের ক্লান্তি ধরে না, ডাক্তারদের মা বাবা নেই, সন্তান নেই, আত্নীয়-স্বজন নেই, ডাক্তারদের আবেগ নেই, ডাক্তারদের জীবন ঠিক জীবনের মধ্যে পড়ে না!

কিন্তু খুব করে চাই, আপনারা একদিন না একদিন বুঝুন।
আরও বেশি করে চাই- আপনারা ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, নিরাপদ থাকুন।
কষ্টগুলো, দুঃখগুলো আপনাদের না ছুঁক, এগুলো আমাদেরই থাকুক!

Platform

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Next Post

কোভিড-১৯ঃ গাইবান্ধা জেলা লকডাউন ঘোষণা

Fri Apr 10 , 2020
শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২০ :  করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ও বিস্তার প্রতিরোধে গাইবান্ধা জেলা লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণ ঝুঁকি মোকাবেলায় আজ শুক্রবার, দুপুরে অনুষ্ঠিত এক সভায় “করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংক্রান্ত জেলা কমিটি, গাইবান্ধা” এর সিদ্ধান্ত এবং সিভিল সার্জন, গাইবান্ধার সুপারিশক্রমে “সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) […]

সাম্প্রতিক পোষ্ট