গন্ধ এবং স্বাদ হ্রাস একটি গুরুত্বপূর্ণ কোভিড-১৯ উপসর্গ

প্ল্যাটফর্ম নিউজ, ৭ জুন ২০২০, রবিবার : 

বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জনসচেতনতা এবং কন্টাক্ট ট্রেসিং এর মাধ্যমে শ্বসণতন্ত্রের মারাত্মক রোগ করোনভাইরাস (সার্স-কোভ-২) এর ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধের  (যেমনঃ সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের শনাক্ত ও আলাদা) চেষ্টা করছে। এখনো অনেক দেশে প্রতিদিন নিয়মিত ভাবে বিপুল সংখ্যক জনগনের নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই এই জন গোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণ প্রতিরোধ এর ক্ষেত্রে  করোনা রোগের উপসর্গ শনাক্তকরণ  অতীব গুরুত্বপূর্ন।

কোভিড উপসর্গ গবেষণা অ্যাপের ১৮,৪০১ ব্যবহারকারী ; যাদের পরবর্তীতে পরীক্ষা করা হয়  (৭১০৪ জন পজিটিভ, ১১,২৯৭ জন নেগেটিভ), তাদের লক্ষণের ডাটা ব্যবহার করে আমরা  জেনেছি সর্বাধিক প্রতিষ্ঠিত উপসর্গ হল উচ্চ তাপমাত্রা, কাশি এর সাথে আরও যুক্ত হয়েছে গন্ধ এবং স্বাদের হ্রাস।

গন্ধ এবং স্বাদ হ্রাসের প্রবণতা পজিটিভ (৬৫.০৩%) রোগীদের মধ্যে নেগেটিভ (২১.৭১%) রোগীদের তুলনায়  তিনগুণ বেশি ।
তাই পরামর্শ দেওয়া হয় স্বাদ এবং গন্ধ হ্রাসের প্রবণতা দেখা দিলে ওই ব্যক্তি যাতে নিজে থেকেই যেন আলাদা হয়ে যান। ২০২০ সালের এপ্রিলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেক দেশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়া গন্ধ এবং স্বাদ হ্রাস হওয়াকে কোভিড-১৯ এর মূল উপসর্গ হিসাবে  যুক্ত করেছে, যেখানে যুক্তরাজ্য সরকার এটিকে ১৮ মে, ২০২০-এ তাদের উপসর্গ তালিকায় যুক্ত করেছে।

২০২০ সালের ২০ মে, কোভিড-১৯ উপসর্গ গবেষণা এ্যাপের মাধ্যমে ৩.২ মিলিয়নেরও বেশি যুক্তরাজ্যের ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৭৬,২৬০ জনের এখন পর্যন্ত কোভিড-১৯ পরীক্ষা করা হয়েছে এবং উপসর্গগুলো পাওয়া গিয়েছে। ১৩,৮৬৩ পজিটিভ কেসের মধ্যে ৭১.৫% মানুষের যাদের জ্বর বা কাশি রয়েছে, তাই কেবল এই দুটি  উপসর্গ আমলে এনে উপসর্গ ভিত্তিক সারভিল্যান্স করলে অর্থাৎ কেবলমাত্র জ্বর বা কাশি রয়েছে এমন ব্যক্তিদের স্ক্রিনিং করে অন্যদের থেকে আলাদা করলে প্রায় ৩০% পজিটিভ কেস বাদ পরে যেতে পারে।

আমাদের পূর্ববর্তী ফলাফলের রেশ ধরে বলা যায়, ৬৪% পজিটিভ রোগীদের মধ্যে গন্ধ এবং স্বাদের ২টিরই হ্রাস পাওয়া যায় এবং ১৫.৯% রোগী রয়েছে যাদের জ্বর বা কাশি কোনটাই ছিল না। যারা অল্প বয়স্ক এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী  বিশেষত যারা ঘুরে বেড়ায় এবং রোগটি ছড়াতে সক্ষম তাদের মধ্যেই গন্ধ এবং স্বাদ হ্রাস এর লক্ষণ গুলো দেখা যায়। এই ১৫.৯% যারা গতানুগতিক উপসর্গ ছাড়াই রোগ ছড়াতে পারে তাদের টার্গেট করে উপসর্গ ভিত্তিক সারভিল্যান্স এর ব্যবস্থা করলে করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া হ্রাস করার জন্য খুব প্রাসঙ্গিক একটা উদ্যোগ হতে পারে।

যারা কোভিড-১৯ পরীক্ষা করেছে, এমন ৭৬,২৬০ জন (১৩,৮৬৩ জন পজিটিভ, ৬২,৩৬৭ জন নেগেটিভ) কোভিড উপসর্গ গবেষণা এ্যাপ ব্যবহারকারীর উপসর্গ পর্যালোচনা করে আমরা তাদের মধ্যে জ্বর, কাশি, জ্বর বা কাশি, গন্ধ এবং স্বাদের হ্রাস লক্ষণ গুলোর  sensitivity, specificity, positive predictive value এবং negative predictive value পরিমাপ করেছি। আমরা জ্বর বা অবিরাম কাশির চেয়ে গন্ধ এবং স্বাদ নষ্ট হওয়ার লক্ষণ বেশি পেয়েছি যা আমাদের আগের অনুসন্ধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আমরা বলতেই পারি গন্ধ ও স্বাদের হ্রাস ভাইরাসটি থাকার বেশ সম্ভাবনাময় ভবিষ্যদ্বাণী। এছাড়া, আমরা দেখতে পেলাম যে অ্যানোসমিয়ার উপসর্গলির মধ্যবর্তী সময়কাল ছিল ৫ দিন, যেখানে জ্বরের মধ্যবর্তী সময়কাল ছিল মাত্র ২ দিন।

যেহেতু দেশগুলো ধীরে ধীরে লকডাউন তুলে নিচ্ছে সেহেতু সংক্রামিত ব্যক্তিদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বিশ্বাস করি যে, কোভিড -১৯ উপসর্গগুলির তালিকায় স্বাদ এবং গন্ধহীনতা একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ যা যুক্ত হওয়ার ফলে ১৬% কেস শনাক্ত করা যাচ্ছে যা আগে করা যেত না। স্বাদ এবং গন্ধহীনতা সাথে জ্বর আমাদের ৮৭.৫% কোভিড-১৯ শনাক্ত করতে সাহায্য করে যদিও প্রাথমিক পর্যায়ে এসব উপসর্গ অনেক কম থাকে। আমাদের প্রাপ্ত ফলাফল গুলো Public Health England  এ প্রকাশিত এই রোগের লক্ষণ তালিকাকে সমৃদ্ধ করতে তাত্ত্বিকভাবে সহায়তা করেছে । এ থেকে  WHO এবং অন্য দেশ গুলোও তাদের লক্ষণ তালিকায় এগুলো অন্তর্ভুক্ত করেছে।

সমস্ত পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণার মতোই আমাদের এই গবেষণারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিপুল সংখ্যক জনসংখ্যা পরীক্ষার আওতার বাইরে রয়েছে এবং যারা নিজেরা স্বপ্রণোদিত হয়ে পরীক্ষা করছে আমরা তাদের উপসর্গের উপর নির্ভর করছি।

স্বাদ ও গন্ধহীনতা যে কেউ নিজে নিজে শনাক্ত করতে পারে এবং এর মাধ্যমে দ্রুত উপসর্গ গুলো চিহ্নিত করা সম্ভব হবে ফলে নিশ্চিতকরণ পরীক্ষার (Confirmatory test) দ্বার উন্মুক্ত হতে পারে। যাইহোক,স্বাদ ও গন্ধহীনতা বয়স্কদের জন্য কমগুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ হিসেবে ধরা হয় এবং কেয়ার হোমে যারা কাজ করেন তারা অনেক সময় এই লক্ষণ ধরতে অতটা পারদর্শী নাও হতে পারে।

আমরা বিশ্বাস করি যে গন্ধ এবং স্বাদ হ্রাস একটি  কোভিড-১৯ উপসর্গ এবং এই উপসর্গগুলি চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া হলে সংক্রমণ হ্রাস হবে এবং অনেক জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে।

আমাদের তথ্য উপাত্ত অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী কিছু  কর্মস্থলের প্রবেশপথগুলিতে স্বল্প দামের তথাকথিত গন্ধের পার্থক্য স্ক্রিনিং পরীক্ষাগুলি তাপমাত্রা সেন্সরগুলির চেয়ে বেশি সংখ্যক কেস সনাক্ত করতে পেরেছে।

পরিশেষে বলতে চাই, যাদের এই রোগের  উপসর্গ থাকবে তাদের পৃথক করতে হবে কারণ অল্পস্বল্প উপসর্গ/লক্ষণ যুক্ত জনগোষ্ঠী নিজের অজান্তেই এই রোগ ছড়িয়ে ফেলতে পারে।

অনুবাদ
ডা. মো. রিজওয়ানুল করিম 

ডা. নাওমী নূর

মূল তথ্যসূত্র : The Lancet Journal 

Firdaus Alam

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Next Post

পেরিফেরি কথন - ১: রোগী, ইনভেস্টিগেশন আর আমি

Sun Jun 7 , 2020
রবিবার, ৭ জুন, ২০২০ ডা. মোবাশ্বের আহমেদ মেডিকেল অফিসার পীরগাছা উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স, রংপুর পেরিফেরিতে এসেছি ১০ দিন হলো। এসেই প্রথম রোগী দেখার পরই দেখি ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের লোকের মন খারাপ। কারন ইনভেস্টিগেশন দেই নাই। যে পল্লী চিকিৎসক নিয়ে এসেছেন, তারও মন খারাপ। কারন কামাই ভালো হয় নি! উল্লেখ্য রোগীর ইনভেস্টিগেশন […]

সাম্প্রতিক পোষ্ট