এডিস, ডেঙ্গু ও অন্যান্য ভাইরাল জ্বর

1

ভেক্টর কাকে বলে?
ভেক্টর হচ্ছে মশা মাছি ইত্যাদি যা কোনো প্যারাসাইট কিংবা ভাইরাস কে এক host থেকে অন্য Host এ ট্রাসমিট করে। যেমন এডিস মশা একটি ভেক্টর। এইটা বিভিন্ন ভাইরাস কে ক্যারি করে, আবার যে ভাইরাস টা এডিস মশা দ্বারা পরিবাহিত হবে, তা অন্য মশা দ্বারা পরিবাহিত হতে পারেনা।
আরো সহজ করে বললে,
ধরুন ডেঙ্গু ভাইরাসটা পরিবেশে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় ছিলো, গত কয়েক শতাব্দি পূর্বে Ecosystem থেকে এটি Natural transmisson এর মাধ্যমে এডিস মশাতে চলে আসে। এডিস মশার জিনসমূহ এই ভাইরাসের উপযোগী হবার কারণে এই ভাইরাস কেবল এডিস মশার মধ্যেই বংশ বৃদ্ধি করতে পারে।
তারপর যখন এই এডিস মশা মানুষকে কামড় দেয়, তখন ডেঙ্গু ভাইরাস এডিস মশা থেকে মানুষের মধ্যে চলে আসে এবং মানুষের মধ্যে বংশ বৃদ্ধি করে। বর্তমান গবেষণা পর্যন্ত ডেঙ্গু ভাইরাসের লাইফ সাইকেল মানুষ আর এডিস মশাতে সীমাবদ্ধ।

এডিস মশা
এডিস মশার উৎপাত কোথায় বেশি?
এডিস মশা মোটামুটি একটি অভিজাত প্রজাতির মশা, বড় বিল্ডিং দালান কোঠাতে এদের বসবাস। এরা ফ্রেশ পানিতে ডিম পাড়ে আর বংশবৃদ্ধি করে।

এডিস মশা কখন বেশি কামড়ায়?
এই মশা সকাল সন্ধায় বেশি কামড়ায়, হাতে আর পায়ে বেশি কামড়ায়, কারণ এরা সকালে বেলায় এবং সন্ধাবেলায় Active থাকে। দিনের বেলায় যে কোনো সময় কামড়াতে পারে, তবে রাতে সাধারণত
কামড়ায়না।

ডেঙ্গু দ্বারা আক্রান্ত মানুষকে অন্য কোনো প্রজাতির মশা কামড় দিলে ডেঙ্গু ভাইরাস কি সেই মশার দেহে যাবে?
অর্থাৎ, একটি ডেঙ্গু জ্বরের রোগীকে এডিস বাদে অন্য কোনো মশা, যেমন এনোফিলেস মশা কামড় দিলে এই ডেঙ্গু ভাইরাস এনোফিলেস মশার ভিতরে যাবে কিনা। উত্তর হলো, হ্যাঁ যাবে। ব্লাড মিলের মাধ্যমে এই ভাইরাস এনোফিলেস মশার মধ্যেও ট্রাসমিশন হবে, তবে এইটা এনোফিলেস মশার মধ্যে বংশ বৃদ্ধি করতে পারবেনা। কারণ এর বংশ বৃদ্ধি করার জন্য উপযোগী জিন কেবল মানুষ আর এডিস মশার মধ্যে রয়েছে। তাই কোনো ডেঙ্গু ইনফেক্টেড এনোফিলেস মশা যদি কাউকে কামড় দেয়, তবে ইনফেক্শন ছড়াবেনা।

ডেঙ্গু ভাইরাসের সুপ্তিকাল কত?
একটি ইনফেক্টেড মশা যদি কাউকে কেবল এক কামড় দেয়, তখন মশার স্যালাইভাতে অবস্থিত ডেঙ্গু ভাইরাস মশা থেকে মানুষের শরীরে চলে আসবে এবং কামড় দেওয়ার ৩-১৪ দিনের মধ্যে জ্বর আসবে।
কেউ মশার কামড় খাওয়ার ১৪ দিন পর যদি জ্বর আসে, তাহলে বুঝবে যে, জ্বর ডেঙ্গুর কারণে নয়, অন্য কারণে এসে থাকতে পারে।। কারণ Dengue Virus এর incubation period ৩-১৪ দিন, বেশির ভাগ পেশেন্টে মশার কামড়ের ৫-৬ দিনের মধ্যে জ্বর দেখা যায়।

ডেঙ্গু জ্বরের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য:

প্রথম ৩-৪ দিন (ক্লাসিকাল ডেঙ্গু):
১. জ্বরের সাথে সারা শরীর ব্যথা
২. চোখের পিছনে খুব ব্যথা (Retro orbital
headache)
৩. পেটে ব্যথা
৪. শরীর চুলকানি ও Rash
৫. সর্দি কাশি তেমন একটা থাকেনা
৬. জয়েন্ট পেইন এবং মাংশপেশিতে ব্যথা
৭. পেটে ও বুকে পানি জমা
৮. তীব্র মাত্রার continuous জ্বর
৯. কাঁপুনি থাকবেনা

প্রথম ৩-৪ দিন পর ৮০-৯০% রোগী রিকভারি স্টেজে চলে যায়, ধীরে ধীরে সুস্থ হতে থাকে, সুস্থ হবার আগে শরীরে Rash দেখা দিতে পারে।

আর ১০-২০ % রোগীর ক্ষেত্রে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার গড়ে উঠবে। তখন জ্বর শুরু হওয়ার ৪-৫ দিন পর এ ধরনের উপসর্গ দেখা যায়:
১। বমির সাথে রক্ত
২। ডায়েরিয়া, সাথে রক্ত
৩। নাক দিয়ে রক্ত
৪। দাতের মাড়ি থেকে রক্ত
৫। Subcutaneous hematoma ইত্যাদি
এ অবস্থায় রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

হেমোরেজিক স্টেজের পর অবস্থা আরো খারাপ হয়ে রোগী শকে চলে যেতে পারে। তখন একে
ডেঙ্গু শক সিনড্রোম বলে। এসময় মারাত্মক নিম্ন রক্তচাপ হতে পারে এবং রোগী মারাও যেতে পারে।

ডেঙ্গু জ্বর কে কিভাবে অন্যান্য ভাইরাস জ্বর থেকে আলাদা করা যায়?
১। ইনফ্লুয়েঞ্জা কিংবা Rhino Virus দিয়ে জ্বর হলে সাথে সর্দিকাশি থাকবে। কারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপের ভাইরাস গুলি প্রধানত শ্বাসনালীকে আক্রান্ত করে। তাই সর্দিকাশি খুবই সাধারণ উপসর্গ। আর ডেঙ্গু তে সর্দিকাশি থাকেনা।
২। ইনফ্লুয়েঞ্জাতে Generalized headache থাকবে। আর ডেঙ্গুতে Retro orbital
headache তথা চোখের পিছনে ব্যথা থাকবে।
৩। Influenja বা অন্য ভাইরাসের ক্ষেত্রে রক্ত সহকারে বমি কিংবা পায়খানা খুবই কম দেখা যায়। আর ডেঙ্গুতে এইটা খুব সাধারণ।
৪। অন্যান্য ভাইরাল জ্বরে মাংসপেশি ও হাড়ে ব্যথা কম থাকে, ডেঙ্গু তে বেশি থাকে।
৫। ভাইরাল হেপাটাইটিস এর কারণেও জ্বর হতে পারে, তবে সেইক্ষেত্রে জন্ডিস দেখা দিবে।
৬। টাইফয়েডের ক্ষেত্রে দূষিত পানি কিংবা বাহিরের খাবার, পানি পান ইথ্যাদির ইতিহাস থাকবে,
আর জ্বর শুরু হবার আগে ডায়েরিয়া হয়ে থাকে,
প্রথম সপ্তাহে ব্লাড কালচার করলে সালমোনেলা টাইফি পজিটিভ আসবে।

রোগ নির্ণয়:
ডেঙ্গু প্রধানত ক্লিনিকালি নির্ণয় করা হয়ে থাকে, আর নিশ্চিত হবার জন্য CBC করে Platelet count দেখা যেতে পারে।
Platelet Count কমে যাবে কিংবা Lower Marginal limit এ চলে আসবে। অর্থাৎ, Thrombocytopenia দেখা যাবে। আর ডেঙ্গু দ্বারা লিভারও আক্রান্ত হতে পারে, তখন Serum ALT, AST অনেক বেড়ে যাবে।
আর ডেঙ্গুতে জ্বর শুর হবার প্রথম ৪ দিনের মধ্যে NS1 Antigen দেখা যেতে পারে। প্রথম ৪ দিনের মধ্যে NS1 positive আসবে। ৪ দিন পর NS1 করা, না করা একই কথা। কারণ ৪ দিন পর NS1 নেগেটিভ আসে।

চিকিৎসা:
১। ক্লাসিকাল ডেঙ্গুতে কেবল প্যারাসিট্যামল ব্যতীত আর কোনো ব্যথানাশক ঔষধ দেয়া যায় না।
ডেঙ্গু জ্বর শুরু হবে অনেক ব্যথা সহকারে। ব্যথা অসহনীয় হবে, তবে কোনো ভাবেই NSAID কিংবা ব্যথানাশক ঔষধ ব্যবহার করা যাবে না। কারণ এতে রক্তপাতের আশঙ্কা বেড়ে যাবে এবং রোগী খুব তাড়াতাড়ি হেমোরেজিক স্টেজে চলে যাবে।
২। চুলকানি থাকলে এন্টি হিস্টামিন
৩। I/V ফ্লুইড সাপোর্ট

ডা. ইসমাইল আযহারি
DCMC/2013-14

প্ল্যাটফর্ম ফিচার:
সামিউন ফাতীহা
শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ, গাজীপুর

Platform

One thought on “এডিস, ডেঙ্গু ও অন্যান্য ভাইরাল জ্বর

  1. FYI, He’s not doctor yet. He is my batchmate and final year medical student.

    Mohaimenul Auntor
    DCMC (2013-14)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Next Post

হ্যাপি কেমিক্যাল - সেরোটোনিন

Wed May 29 , 2019
সেরোটোনিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি নিউরোট্রান্সমিটার, যা স্বাভাবিক পরিমাণে থাকলে মানসিক সুখানুভূতি একটি ভারসাম্য অবস্থায় থাকে। আর তাই একে হ্যাপি কেমিকেল বলা হয়। সেরোটোনিন উৎপাদন আমরা যে প্রোটিন খাই, তাতে আটটি এসেনশিয়াল এমাইনো এসিড রয়েছে, যার একটি হলো ট্রিপ্টোফ্যান। ডিম, মাংস, মাছ, ডাল ইত্যাদিতে Trytophan পাওয়া যায়। প্রোটিন খাবার গুলি অন্ত্রে […]

সাম্প্রতিক পোষ্ট