উপজেলা পর্যায়ে ‘মারামারির রোগী’- সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ডাক্তারদের জন্য পরামর্শ

লেখকঃ ডাঃ অনির্বাণ সরকার

সীমিত জ্ঞানের ওপর ভর করে আগের তিনটি পর্বের লেখায় assault বা ‘মারামারির রোগী’ দের ক্ষেত্রে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তাররা কি করবেন, কিভাবে করবেন- আলোচনা করেছি। ধাপে ধাপে বলেছি সরকারী সেলফোন ব্যবহারের নিয়ম, ইমার্জেন্সিতে assault-এর রোগী ডিল করার নিয়ম, assault খাতায় লেখার নিয়ম। এছাড়া এ ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রে নানাধরনের রাজনৈতিক/ সামাজিক অন্যায় আবদার কিভাবে মোকাবেলা করবেন- সে সম্পর্কে কয়েকটি টিপস দিয়েছি। Assault খাতার গোপনীয়তার ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি আপনাদের। Injury certificate কিভাবে লিখবেন বলতে চেষ্টা করেছি। আজ শেষ পর্বে বলবো উপজেলার ডাক্তার এবং আদালতের সম্পর্কের রূপটি।

Injury certificate দিয়ে দেয়া মানেই কিন্তু ঐ ব্যাপারে আপনার হাত ধুয়ে ফেলা নয়। একটি জটিল কেস আপনাকে আমৃত্যু তাড়া করে বেড়াতে পারে, আদালতের চৌহদ্দিতে কেটে যেতে পারে আপনার জীবন। তাই আদালত বিষয়ে সাবধান।
আপনার উপজেলার ম্যাজিস্ট্রেট আদালত (সব উপজেলায় নেই) আপনাকে ডাকতে পারে, ডাকতে পারে জেলা আদালত। কেন ডাকে তারা? ডাকতে পারে দুটি কারণেঃ
১) এক্সপার্ট উইটনেস হিসেবে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য, অথবা
২) বাদী পক্ষের নারাজি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে।
নারাজি আবেদন কি? বাদীপক্ষ, মানে আঘাতপ্রাপ্ত রোগীর পক্ষ আপনার দেয়া Injury certificate-এ সন্তুষ্ট নয়। এজন্য তারা ‘আমরা এ সার্টিফিকেটের ভাষ্যে রাজি নই’ এইভাবে আদালত বরাবর একটি আবেদন করে। এটিই নারাজি আবেদন। আসলে তারা সরাসরি নয়, বাদীপক্ষের নিয়োজিত উকিলই কাজটি করেন।

এক্সপার্ট উইটনেস হিসেবে আদালতে ডাকলে অত ঝামেলার কিছু নেই, যাবেন- লেখার ব্যাখ্যা দিয়ে চলে আসবেন। নারাজি আবেদনের পর আদালত ডাকলে কিঞ্চিত্‍ ঝামেলা আছে। যাইহোক, আদালতে কখন যাবেন, কি করবেন পয়েন্ট আকারে বলছি-

১) আদালত আপনাকে দুইভাবে ডাকতে পারে। আদালতের পেশকার ফোনে জানাতে পারেন আপনাকে অনানুষ্ঠানিকভাবে (যদিও এটা নিয়ম নয়) কিংবা আপনার নামে সমন জারী হতে পারে। দুই ক্ষেত্রেই ব্যাপারটি গুরুত্বের সাথে নিন।

২) আদালতের পেশকারের ফোন নম্বর অবশ্যই কাছে রাখবেন। তার কাছ থেকে জানার চেষ্টা করুন কোন্ কেসের ব্যাপারে ডাকা হয়েছে আপনাকে। জেনে নিন আদালতে উপস্থিত হবার তারিখ ও সময়।

৩) জানার পর ইমার্জেন্সির assault খাতা খুলে সংশ্লিষ্ট এন্ট্রিতে যা যা লিখেছেন সব একটা কাগজে লিখে নিন। অফিস থেকে injury certificate, যেটা দিয়েছেন, তার কপি বের করে সেটিও ঐ কাগজে লিখে নিন। কাগজটি বাড়িতে এনে পড়ুন, মনে রাখুন।

৪) নির্দিষ্ট তারিখে সময়ের অন্তত আধ ঘন্টা আগে আদালতে পৌঁছান, পেশকারের সাথে দেখা করে আবারো কোনো প্রশ্ন থাকলে জেনে নিন।

৫) ডাক পড়লে এজলাসে যান, কাঠগড়ায় দাঁড়ান। একজন এসে আপনাকে শপথবাক্য পাঠ করিয়ে যাবে।

৬) বাদীপক্ষ বা বিবাদীপক্ষের উকিলের জেরার জবাব ঠাণ্ডা মাথায় দিন, প্রয়োজনে নিজের লেখার স্বপক্ষে যুক্তি দাঁড় করান।

৭) জজ/ ম্যাজিস্ট্রেটের ক্রস এক্সামিনেশনের জবাব বিনীতভাবে দিন।

৮) জেরা শেষ হলে স্টেটমেন্ট-এর কাগজে স্বাক্ষর করে আদালতের অনুমতি পাবার পর এজলাসকক্ষ ত্যাগ করুন।

* যা করবেন এবং যা করবেন না:

১) কাঠগড়ায় উদ্ধত ভাব দেখাবেন না বা অতিরিক্ত বিনয়ী ভাব দেখাবেন না। স্বাভাবিক থাকুন।

২) আপনার বিরুদ্ধে উকিল বা জজ কোনো অভিযোগ করলে (যেমন উকিল বলে বসতে পারে- এ সার্টিফিকেট আপনি টাকা খেয়ে লিখেছেন) মনে মনে আপনি রেগে গেলেও নিরীহ মুখ করে বলবেন- “এ অভিযোগ সত্য নয়”।
কখনোই- “এইসব কি বলেন?”, “আমি মিথ্যা কথা লিখিনা”, “আমি টাকা খাইনা”,”আপনি কিভাবে জানলেন?”- জাতীয় বাক্য ব্যবহার করবেন না।

৩) জখমীকে সনাক্ত করতে বললে চেনার ভান করবেন না। বলবেন- “স্মরণ নেই”। কারণ এমন ধারণা আদালতে হতে পারে- এই ব্যক্তিকে আপনি চেনেন, হয়তো এর কাছ থেকে টাকা খেয়েছেন কিংবা শত্রুতা করেছেন সার্টিফিকেটে।

* সবশেষে নিজের একটি অভিজ্ঞতাঃ
সবে তখন সরকারী চাকরিতে জয়েন করেছি। Injury certificate-ও কয়েকটা দিয়েছি। মাস দুয়েকের মাথায় আদালত থেকে ডাক এলো একটা কেসের ব্যাপারে। বাদীপক্ষ নারাজি আবেদন করেছেন- এর পরিপ্রেক্ষিতে। ভয়ে ভয়ে আদালতে গেলাম। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে শপথবাক্য পাঠ শেষ হওয়ামাত্রই জজসাহেব বলে বসলেন- “মিথ্যা কথা লিখেছেন কেন?” বিনীতভাবে জানতে চাইলাম- “কোনটি মিথ্যা লিখেছি?” তখন তিনি আঘাতপ্রাপ্ত রোগীকে শার্ট খুলতে বললেন। রোগী শার্ট খুলে দাঁড়ালো। জজ বললেন-“আপনি bruise-এর কথা লিখেছেন। এর তো বুকে bruise নাই।” … ভাগ্যিস তখন bruise-এর রং পরিবর্তনের দিনের ব্যাপ্তিগুলো মনে পড়েছিলো। সেটি বলে বললাম-“আঘাত পাবার পর প্রায় দুমাস হয়ে গেছে। এজন্য তা মিলিয়ে গেছে।” জজ মেনে নিলেন। হয়তো আমাকে বাজিয়ে দেখতেই “এটাকে গুরুতর জখম বলেন নাই কেন?”-এই প্রশ্ন করলেন। আমি ধীরে ধীরে Grievous hurt-এর আটটা পয়েন্ট বলে বললাম-“এ কম্পোনেন্টগুলোর অধীনে পড়ে না বলেই এটা গুরুতর জখম নয়”। জজ এটাও মেনে নিলেন। তারপর উকিলদের গতানুগতিক প্রশ্ন আর আমার উত্তর… গর্ব করছি না, নানা ধরনের wound সম্পর্কে জানা থাকটাই সেদিন আমাকে আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দিতে সাহায্য করেছিলো।

* পরিশিষ্ট-
আপনারা যারা সদ্য সরকারী চাকরিতে ঢুকেছেন, তারা সবই জানেন- এমনটাই সবাই ধরে নেবে। ঘটনা তো তা নয়। আপনারা বেশিরভাগই assault-এর রোগী ডিল করেননি, injury certificate লেখেননি, জীবনেও আদালতে যাননি। অথচ উপজেলা হাসপাতালে গিয়েই আপনাকে এ কাজগুলো শুরু করতে হবে। হবেই- এতে কোনো সন্দেহ রাখবেন না। চার পর্বের লেখায় চেষ্টা করেছি এ সম্পর্কে আপনাদের কিছুটা ধারণা দিতে। তারপরও অনেক সূক্ষ্ম বিষয় বাকি রয়ে গেলো। আপনারা এ বিষয়ে কেউ কোনো পরামর্শ চাইলে আমাকে ইনবক্সে মেসেজ দিতে পারেন, চেষ্টা করবো আপনাদের উত্তর দিতে। কোনো রোগীর কোনো আঘাতের বর্ণনা লেখার ক্ষেত্রে সমস্যা হলেও জানাতে পারেন। চেষ্টা করবো সমাধানের।
শেষ কথা-
সত্‍ ও নির্ভীক থেকে সরকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করুন। আপনাদের সাফল্য কামনা করছি।

ডক্টরস ডেস্ক

7 thoughts on “উপজেলা পর্যায়ে ‘মারামারির রোগী’- সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ডাক্তারদের জন্য পরামর্শ

  1. Jibone apni ami mistake koresi doctor hoe bcs kore.apni ami laddu chakhe dekha public.jo vi khaiega o vi postaega,na khaega o vi postaega

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Next Post

Cardiologists in Bangladesh

Tue Aug 19 , 2014
Doctor’s Name: Professor Dr. Abdullah-Al-Safi Majumder Qualification : MBBS, D. Card, MD(Card), FACC, FSGC, FRCP Research Fellow, NCVC, (Japan) WHO Fellow in Cardiology, USA Designation : Professor of Cardiology Expertise : Cardiology Organization: National Institute of Cardiovascular Diseases, (NICVD) Chamber: Popular Diagnostic Centre Ltd – Dhanmondi Branch Visiting Hours: Location: […]

সাম্প্রতিক পোষ্ট