• ভাবনা

November 23, 2014 10:41 pm

প্রকাশকঃ

images (1)
স্যার, এই লেখা আপনাদের কারো কাছেই পৌঁছাবেনা জানি । পৌঁছালেও পড়বেন না হয়তো। আপনাদের অনেক ব্যাস্ততা।
স্যার, দিপংকর আত্মহত্যা করেছে।
কারণ? তাকে আর তাঁর বাবাকে কমিউনিটি মেডিসিন ডিপার্টমেন্টে ডেকে নিয়ে অপমান করা হয়েছে টানা এক ঘন্টা।
জানি, স্যার। যে কেউ ভাববে, এ আর এমন কী! এজন্য আত্মহত্যা করার কী হয়েছে? এমন ঘটনা তো প্রতিদিন অনেকের সাথেই ঘটে।
না স্যার। দিপংকর এই একদিনে বা এক ঘন্টায় সৃষ্টি হয়নি। তাঁকে প্রতিদিন হত্যা করা হয়েছে। একটু একটু করে। কমিউনিটি মেডিসিনে হয়তো তাঁকে হত্যা করা হয়েছে শেষবারের মতো। স্যার, প্রথম বর্ষের অরিয়েন্টেশনের দিন দিপংকর ফেসবুকে কী লিখেছিলো জানেন? লিখেছিলো –
Enjoying the best moment of my life..
(MBBS Orientation)
a moment with many doctors and future doctors….
দিপংকর তখনও জানতো না, কী অসহ্য একটা ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে তাঁর সামনে!
স্যার, আপনারা আপনাদের রুমে বসে আমাদেরকে নিয়ে অনেক ভাবেন, জানি। সেখানে আপনাদের কাছে খবর পৌঁছায়, এবছর কতজন পাশ করলো। কতজনের এফসিপিএস হলো, এমডি হলো, এমএস হলো। কিন্তু স্যার আপনাদের কাছে ফেল করা ছেলেটির খবর পৌঁছায় না। আপনারা জানতে পারেন না, ক্লাসে, টিউটোরিয়ালে কী ব্যবহার করা হচ্ছে সেই ছেলেটার সাথে। কেউই জানতে পারেনা সে খবর। যে লেকচারার, প্রফেসর ফেল করা ছেলেটার সর্বশেষ আত্মবিশ্বাসটুকুও ধ্বংস করে দেন, তিনিও বুঝতে পারেন না কিছু।স্যার, আপনারা কি কখনো খোঁজ নিয়ে দেখেছেন আপনাদের কলেজে ‘নিয়ম’ আর ‘শৃংখলা’র নামে কী অত্যাচার চালানো হয় ছাত্রদের উপর?
সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর মাস -মাত্র এক মাস পড়িয়ে নভেম্বর মাসে থার্ড ইয়ারের প্রথম টার্ম নেয়া হয় স্যার। অন্য মেডিকেল কলেজে যেখানে ফাস্ট টার্ম হয়েছে এপ্রিল মাসে! সেখানে আমরা দিয়েছি নভেম্বরে! কখনো ভেবেছেন, এই ৫ মাসের পড়া একটা ছেলে একমাসে কীভাবে পড়ে? কতোটা জগাখিচুড়ি জ্ঞান নিয়ে পরীক্ষায় বসতে হয় তাকে! শর্তও দিয়ে দেন সাথে – একমাসে আইটেম ক্লিয়ার না করতে পারলে পরীক্ষা দিতে দিবেন না। এক মাসের পড়া নিয়ে পরীক্ষায় বসলে তার জ্ঞান কী হবে সেটা তো জানা কথা স্যার। অথচ এই জ্ঞান নিয়েই কিছু এসিস্টেন্ট/এসোসিয়েট প্রফেসররা টিটকারী মারেন ভাইবার টেবিলে। ফোন দিয়ে কথা বলেন গার্জিয়ানদের সাথে। মনোবল ধ্বংস হয়ে যায় তখনই। এসবের মধ্যেও ‘ভালো ছাত্র’রা উতরে যায়। বাকিরা পড়ে থাকে তলানী হিসেবে।স্যার, এই তলানীদের সাথে কী করা হয় জানেন? আপনারা দাবী করেন এদেরকে ‘স্পেশাল কেয়ার’ নেয়া হয়। না স্যার। বাস্তবতা ভিন্ন। স্পেশাল কেয়ার এক বিষয়, আর টিটকারী মারা আরেক বিষয়। এখানে টিটকারী মারা হয় তলানীদের সাথে। স্যার, শিক্ষকের শাসন পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার। শিক্ষকরা পিতার মতো। কোনো শিক্ষক যদি আমাকে সত্যিই শাসন করেন, আমার ভালো লাগবে। শাসন করতে গিয়ে পিঠে চাবুক দিয়ে মারলেও মনে হবে শিক্ষকই তো! তিনি না মারলে কে মারবেন?কিন্তু স্যার, শিক্ষকদের টিটকারী সহ্য হয়না। ক্লাসে ১০০ জনের সামনে দাঁড় করিয়ে যখন যাচ্ছেতাইভাবে অপমান করা হয় কষ্ট হয়, স্যার। প্রচণ্ড কষ্ট হয়।শেষ বিন্দু আত্মবিশ্বাসও শেষ হয়ে তখন।
আমার বাবা কখনো আমাকে অপমান করেন না। বকাঝকা করেন। মারেন। আর এখানে…?
বাবা আর শিক্ষকের পার্থক্য অনেকটাই বুঝে গেছি স্যার এই কয়েক বছরে।
একজন দুর্বল ছাত্রকে যদি টেনে তুলতে না পারেন তাহলে থাক না যেরকম ছিলো সেরকম। কিন্তু তাকে কেন আরো বেশি দুর্বল করে দেয়া হয়? তাকে কেন ঠেলে আরো গহীনে ফেলে দেয়া হয়।
এই অধিকার কারো কি আছে?স্যার, আপনারা কি জানেন কিছু শিক্ষক ভাইবা বোর্ডে প্রশ্ন করেন না, তাদের ভাষায় তারা ‘বোলিং’ করেন! সে ‘দুর্বল’ ছাত্র ভাইবা রুমে ঢুকা মাত্র স্যাররা নড়েচড়ে বসেন। তাদের মুখে আনন্দের হাসি খেলে যায়। এবং ভাইবার পুরোটা সময় তারা ঐ ছাত্রের কাছ থেকে ‘মজা লুটেন’। একজনের প্রশ্ন করা শেষ হলে অন্যজনকে বলেন, ‘আমার বোলিং শেষ। এখন আপনি বোলিং করেন।’
স্যার, অনেক লেকচারারই তাদের ডিপার্টমেন্টে নতুন সব নিয়ম চালু করে ফেলেছেন জানেন?
একটা উদাহারণ দেই, আজকের আইটেম ক্লিয়ার না হলে আগের আইটেমের মার্ক্সও মাইনাস করে দেয়া হয়!স্যার, আইটেম দিয়ে এসে ক্লাসের পেছনে বন্ধুর সাথে কথা বলার ‘মহা অপরাধে’ ছাত্রকে ক্লাসে সবার সামনে ডেস্কের উপর কান ধরিয়ে দাড় করিয়ে দেয়া হয়, এটা জানেন?অসংখ্য ছাত্র আছে স্যার, যারা দীর্ঘদিন অনিয়মিত থাকার পর আবার পড়ালেখায় মনোযোগী হবার চেষ্টা করছে। কিন্তু ডিপার্টমেন্টে আইটেমের জন্য যেতে পারছে না আতংকে। তারা জানে, লাইফ হেল বানিয়ে ফেলা হবে তাদের।
সব সহ্য হয় স্যার, কিন্তু সহ্য হয়না শুধু নিয়মের বৈষম্য। একই ‘পাপ’ করে দেখা যায় কাছের বন্ধু প্রফে এলাউ হয়ে গেছে আমি হইনি। আমার জন্য থাকে কেবল বঞ্চনা আর অপমান। কারণ? তার ভালো ‘লিংক’ আছে, আমার নেই। কেবল লিংক না থাকার অপরাধে আমার জীবন থেকে ৬ মাস… এক বছর হারিয়ে যায়!
স্যার, আমার জানতাম, মেডিকেল অনেক কঠিন। এখানে সংগ্রাম করেই টিকে থাকতে হয়। কিন্তু তাই বলে এতোটা?আমাদের বন্ধুরাও তো মেডিকেলে পড়ে। তাদের কাছে তাদের মেডিকেলের গল্প শুনি। নিজের সাথে তুলনা করি। তখন নিজেকে কারাদনণ্ডপ্রাপ্ত আসামীর মতো মনে হয় যাকে নির্বাসনে দেয়া হয়েছে দূরের কোনো নির্জন দ্বীপে।মাঝে মাঝে মনে হয় সব ছেড়ে দেই। কিন্তু পারিনা স্যার। বাবা-মা, সমাজ, ভবিষ্যত সবকিছুর ভয়ে আবার ফিরতে হয় লেকচার গ্যালারিতে যেখানে কিছু টিচার আমার জন্য অপেক্ষা করছেন আমাকে নিয়ে টিটকারী মারার জন্য।
স্যার, অনেকের মতোই হয়তো আপনারাও ভাবেন, আমরা সবাই প্রচুর টাকা পয়সাওয়ালা বাবা মার ছেলে। ৮/১০ লাখ টাকা কোনো ব্যাপারই না আমাদের জন্য।না স্যার। ভুল। আমাদের ৯০ ভাগ ছাত্রছাত্রী এসেছে খুব মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে। বাবা সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে হয়তো ছেলের জন্য এক টুকরো স্বপ্ন কিনেছেন। কিন্তু কী পরিহাস স্যার। সেই স্বপ্ন এক ডিপার্টমেন্ট থেকে অন্য ডিপার্টমেন্টের বারান্দায় গড়াগড়ি খায়। বাবা মাকেও বলা যায়না, স্যার। লেকচারার শাস্থি দিয়েছেন ডেস্কে সবার সামনে কান ধরে দাড় করিয়ে রেখে – এটা বলাতেও অপমান। কাছের বন্ধুদেরকেও বলা যায়না। ঘরের দরজা বন্ধ করে কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করে আবার পরের দিনের আইটেমের পড়ায় মনোযোগ দিতে হয়। পরের দিন কী হবে, সেই আতংকে।
অসংখ্য উদাহারণ আছে স্যার। অসংখ্য। মাত্র একদিনের গল্প লিখতে গেলেও হয়তো অনেক লম্বা হয়ে যাবে। তাই লিখলাম না।স্যার, যেকোনো প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের তার প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনেক ভালোবাসা থাকে। কিন্তু আমাদের প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগ ছাত্ররা কী ভাবে জানেন? তারা ভাবে, ‘কোনোরকমে পাশ করে এখান থেকে বের হতে চাই।’কেন স্যার? একটু কি ভেবে দেখেছেন কখনো?
স্যার, খুব বেশি কিছু তো লাগেনা একটা ছেলে বা মেয়েকে খুশি করতে। আপনারাও কোনো সন্তানের বাবা অথবা মা। সব জানেন।
প্রফের টেবিলে ‘লিড’ দেয়াটাই একমাত্র সাহায্য না স্যার। প্রফের টেবিলের বাইরেও পৃথিবী আছে। আমরা সকাল ৭টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত থাকি আপনাদের আশেপাশে। যারা হোস্টেলে থাকি আমাদের বাবা মার সাথে দেখা হয়না মাসের পর মাস।আমাদের বাবা মা আমাদেরকে আপনাদের হাতেই তুলে দিয়েছেন। সেই আপনাদের কাছ থেকে ‘প্রফের টেবিলের লিড’এর বাইরে একটু ভালোবাসা কি আমরা পেতে পারিনা?
আমরা খারাপ ছাত্র। আপনাদের ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্যতা কিংবা সৌভাগ্য কোনোটাই হয়তো আমাদের নেই। দুঃখ নেই এতে, কিন্তু ভালোবাসার বদলে অপমান আর কষ্ট কেন দেয়া হয় স্যার? যত ইচ্ছা শাসন করুন। মারতে মারতে পিঠ লাল করে ফেলুন। কিন্তু টিটকারি কেন? বাবা মাকে জড়ানো কেন?
স্যার, আপনারা শতকোটি টাকা ব্যয় করে দেশের সেরা ক্যানসার হাসপাতাল বানাচ্ছেন। এখানে চিকিৎসা নিয়ে শত শত রোগী ভালো হবে। স্যার, কলেজ বিল্ডিং-এর দেয়ালে একটু কান পাতবেন। ক্লাসের পেছনের বেঞ্চের ছাত্রদের কাছে ঘেষবেন একটু। ক্যানসারের চেয়েও ভয়াবহ ব্যাধিতে এরা শেষ হয়ে যাচ্ছে, স্যার। এরা মুখ হাসি হাসি করে রাখে। কিন্তু এদের ভেতরে কী হচ্ছে এরাই জানে শুধু। কাউকে বলেনা। বললো শুধু দিপংকর। কিন্তু যখন বললো তখন দেরী হয়ে গেছে অনেক।
অনেক কথা লিখে ফেললাম, স্যার। অনেক বেয়াদবী হয়েছে জানি। ক্ষমা করে দিবেন যদি সম্ভব হয়।
ইতি-
দিপংকরদের একজন।
হ্যাঁ সেই দিপংকরদের মাঝে একজন আমিও ছিলাম । তাই দিপংকরদের লেখা প্রকাশ করছি এখানে । কী অসহ্য জ্বালা কী অসহায়ত্ব মেডিকেল স্টুডেন্ট ছাড়া কেউ জানে না কী ঘটে এখানে ।
ওহ যারা দিপংকরকে চেনেন না , তাঁদের বলছি , দিপংকর এ অসহ্য যন্ত্রণা থেকে ছুটি নিয়েছে…দিপংকর তোর কাছে যেন আর এভাবে কাউকে যেতে না হয়…

শেয়ার করুনঃ Facebook Google LinkedIn Print Email
পোষ্টট্যাগঃ

পাঠকদের মন্তব্যঃ ( 1)

  1. Khan romman says:

    Medical student der jonno chorom koster basthob ekta likha.jay liksay takay eto shundor kore present korar jonno donnobad.bt er uchit jobab ditay hole medical student der e ek hotay hobe.mone raktay hobe eta sudu ek medical er ek student er kostay piritho attohononer gotona noy,ae rokom shoto shoto student shoto medical a protidin attohononer try korsay,keu hoytho shahosh ta passay na ae jibon tekay puru puri mukitu paoar ja diponkar kore felaysay.tai er jonno shob medical student der e ek hotay hobe,voy kay dure shoriey shamnay ashtay hobe,shobar protibad kortay hobe,jotokkan na student ra ek na hobe totodin aerokom diponkor ra pritibay tekay paliey giey bachar try korbe,tai ar jeno kunu diponker kay haratay na hoy,shae jonno ekoni ek hotay hobe.ar shommanito sir der bolbo apnara mone hoy bulay jan ekdin apnara o student silen.Akash tekay pore suddenly doctor hoay jan nai…




Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Advertisement
Advertisement
.