ইন্টার্ন কমপ্লিটের পর আমরা সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ি একটি পোষ্ট গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি, বিসিএস বা ক্ষ্যাপ মারার জন্য। ক্ষ্যাপ মারা বা বিসিএসের তুলনায় অনেক নিরাপদ এবং সম্মানজনক চাকরি হিসেবে বেছে নিতে পারেন আর্মি মেডিকেল কোরকে। ছোট থেকেই অনেকের স্বপ্ন থাকে আর্মি অফিসার হবার। পরিবারের চাপে বা বিভিন্ন পরিস্থিতি বা আর্মির আইএসএসবির কঠিন পরীক্ষার অনেকের সেই স্বপ্ন পূরন হয়না। তাই ডাক্তার হবার পর সেই স্বপ্ন পূরন করতে পারেন আর্মি মেডিকেল কোরে যোগদানের মাধ্যমে।
আর্মি মেডিকেল কোরে তিনভাবে যোগদান করা যায়। আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজে ক্যাডেট হিসেবে ভর্তি হওয়া, স্বল্প মেয়াদি কমিশনের মাধ্যমে ক্যাপ্টেন হিসেবে যোগদান, পোষ্ট গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে সরাসরি মেজর হিসেবে যোগদান।
বছরে দুই হতে তিন বার পত্রিকায় এবং ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আর্মি মেডিকেল কোরের সার্কুলেশন পাওয়া যাবে। ওয়েবসাইটের ঠিকানা http://www.joinbangladesharmy.mil.bd
পরীক্ষা চারটি ধাপে হয়ে থাকেঃ
১) লিখিতঃ
একশো নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় মেডিকেল বিষয়, সাধারণ জ্ঞান, সাম্পতিক বিশ্ব, বাংলাদেশের ইতিহাস হতে প্রশ্ন করা হয়। ৩০টি সত্যমিথ্যা এবং ৮টি রচনামূলক প্রশ্নের উত্তর দেওয়া লাগে। লিখিত পরীক্ষা খুবই সহজ হয়ে থাকে। নম্বরের ভিত্তিতে এবং কতজনকে সেইবছর কোর্সে নেওয়া হবে সেই ভিত্তিতে লিখিত পরীক্ষা হতে ভাইভার জন্য ডাকা হয়।
আমার সময়ে আসা কয়েকটি প্রশ্ন দেই তাহলে কিছুটা ধারনা পাওয়া যাবে।
ক) টাইপ অফ রেজিস্ট্যান্স অফ টিবি
খ) বাংলাদেশে ম্যাটারনাল ডেথের কারন
গ) শর্ট নোট APGAR, সোয়াইন ফ্লু
ঘ) ক্রনিক লিভার ডিজিজের ইটিওলজি ও ক্লিনিক্যাল ফিচার
ঙ) ডায়গনস্টিক ক্রায়টেরিয়া- ARF & CRF
চ) কম্পিকেশন অফ একুইট হেপাটাইটিস
ছ) প্লুরাল ইফুউশনের কারন
সাধারন জ্ঞানের মধ্যে বাংলাদেশ বিষয়াবলী, সংস্থার নাম, মুক্তিযুদ্ধ, স্থপতি, দিবস ইত্যাদি।
২) প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষাঃ
১। উচ্চতা, ওজন, বুকের মাপ(২ ইঞ্চি সম্প্রসারন সহ), দৃষ্টি শক্তি, কালার ব্লাইন্ডনেস, হার্নিয়া বা হাইড্রোসিল, পাইলস, ফ্ল্যাট ফুট, নক নি, স্কিন ডিজিস, শ্রবণ ক্ষমতা বা কানের পর্দা, রক্তচাপ, পালস রেট, সাধারণত এই কয়েকটি পরীক্ষা করা হয়ে থাকে।
২। জ্বি, সত্যই শুনেছেন। আপনার প্রাইভেট পার্ট এক্সাম করা হবে। হার্নিয়া বা হাইড্রোসিল এবং পাইলসের পরীক্ষার জন্য এটি ছাড়া উপায় নাই। সুতরাং সেই অনুযায়ী ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে যাবেন।
৩। কানের ময়লা অবশ্যই পরিষ্কার করে যাবেন। ময়লার কারনে কানের পর্দা দেখা না গেলে আপনাকে ফেরত পাঠাবে পরিষ্কার করে আবার এক্সাম দেবার জন্য। পরীক্ষার্থির সংখ্যা অনেক বেশি। একজনের পেছনে এত সময় নাও দিতে পারে।
৪। পরীক্ষার আগেই কিছু ওজন কমাবার চেষ্টা করে দেখুন। অফিসিয়ালি ৫ পাউন্ড অবধি কনসিডার করে থাকে।
৫। পরীক্ষার দিন কারো কারো রক্তচাপ বেশি থাকে। এক্সামের টেনশনের কারনে হতে পারে। এটির কারণে বাদ পড়তে পারেন। রক্তচাপ কম রাখার জন্য কি করা লাগবে বা ওষুধ খাওয়া লাগবে অভিজ্ঞদের পরামর্শ নিন।
৬। মেডিকেল কোরে দৃষ্টি শক্তির জন্য খুব একটা ঝামেলা করেনা। তবে -২.৫ এর বেশি গ্লাস হলে ল্যাসিক করাতে বলবে ফাইনাল সিলেকশনের আগে।
৭। আপনার যদি নক নি থাকে, তবে হাইড করার চেষ্টা করে লাভ নেই। যতই পা বাঁকিয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করুন না কেন। ধরা পড়ে যাবেন। খামোখা ইম্প্রেশন খারাপের কি দরকার।
৩।মৌখিক পরীক্ষাঃ
১। যথাসম্ভব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিপাটি হয়ে যাবার চেষ্টা করুন। চুল বড় হলেও সমস্যা নাই তবে আউলা চুলে না যেয়ে একটু চিরুনি লাগান।
২। এখন যেহেতু গরমকাল, পোষাক হিসেবে শার্ট প্যান্ট কালো শু পড়ে যেতে পারেন। টাই পড়লে ভাল। না পড়লেও সিলেক্ট হবেন না এমন কোন কথা নাই। তবে জিন্স টি শার্ট ছাপড়া শার্ট না পড়া উত্তম।
৩। অতিরিক্ত স্মার্টনেস শো করার প্রয়োজন নাই। কোন প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকলে বানিয়ে উত্তর দেবার চেষ্টা করবেন না। যারা আপনার এক্সাম নিবে সবাই বিশাল অভিজ্ঞ স্যার। সুতরাং সরাসরি “স্যরি স্যার , অ্যাই ক্যান্ট রিকালেক্ট” এইভাবে জানিনা বলে দিবেন। উত্তর না জানা বা না পারা মাইনাস পয়েন্ট না।
৪। মৌখিক পরীক্ষায় ইংরেজিতে উত্তর দেবার চেষ্টা করবেন।
৫। আপনার নিজের সম্পর্কে বলতে বলা হতে পারে। কি কি বলবেন আগেই গুছিয়ে নিন।
৬। কোন সাব্জেক্টে পড়তে চান, এটি জানতে চেয়ে সেই সাবজেক্ট থেকে প্রশ্ন করা হবে। সুতরাং নিজের পছন্দের সাবজেক্ট সম্পর্কে জানুন।
৭। সাম্প্রতিক বিশ্বে বা দেশে ঘটে যাওয়া বিষয় সম্পর্কে জানতে চাওয়া হতে পারে। পত্রিকা বা নিউজের দিকে খেয়াল দিন। তবে কোন দলীয় বা আদর্শিক মতামত দেবার চেষ্টা করবেন না।
৮। সালাম দিয়ে ঢুকবেন ভাইভা বোর্ডে। হুট করে যেয়ে বসে যাবেন না, বসতে বললে বসবেন, চলে যেতে বললে সালাম দিয়ে বের হয়ে আসবেন। পা নাচাবেন না, আঙ্গুল ফুটাবেন না।
৯। স্পষ্ট এবং কিছুটা জোরে কথা বলবেন। আপনার কথা যেন রুমের কারো শুনতে সমস্যা না হয়।
৪) আইএসএসবিঃ
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসার পদে কমিশনের যোগ্যতা নিরুপনের অন্যতম ধাপ হলো আইএসএসবি। এইখানে একজন পরীক্ষার্থীর শারীরিক এবং মানসিক সক্ষমতার পরীক্ষা নেওয়া হয়। এই যোগ্যতা আলাদা ভাবে কোচিং করে বা কসরত করে আয়ত্বে আনা বেশ দুরূহ। এর চে সবচেয়ে সোজা পদ্ধতি হলো নিজস্বতা প্রকাশ। কোচিং করা বা অন্যান্য প্রস্তুতি আপনাকে এগিয়ে দিতে কিছুটা সহায়তা হয়ত করতে পারে তবে সবচেয়ে উত্তম উপায়, “নিজের আত্নবিশ্বাস কাজে লাগানো।“
আজকে আইএসএসবির কিছু পরীক্ষা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেবার চেষ্টা করছি। এটি নিছকই আমার অভিজ্ঞতা থেকে লেখা। বর্তমানে আইএসএসবির পরীক্ষায় বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। আমি জতটুকু সম্ভব এখানে জানানোর চেষ্টা করছি। কোন ভুল থাকলে, নতুন তথ্য থাকলে কমেন্টে শেয়ারের অনুরোধ করছি। পরে পোস্টে এড করা হবে।
পরীক্ষা পূর্ব প্রস্তুতিঃ
১) দৌড়ঝাপের অভ্যাস না থাকলে একটু দৌড়ঝাপ করুন। লং জাম্প, পুশ আপ, বিম এগুলো চেষ্টা করে দেখুন।
২) ফুলস্লিভ শার্ট( চাখরাপাখড়া না), টাই, প্যান্ট, সু, শাদা হাফপ্যান্ট, সাদা টি শার্ট, ভেস্ট, সাদা মোজা, কেডস, তিনরাত থাকার প্রস্তুতি নিয়ে রাখুন।
৩) মোবাইল আইএসএসবির গেটে রেখে দিবে। সুতরাং না নেওয়াই উচিত।
৪) স্বাভাবিক ছাটের চুল থাকলেই হবে। আর্মি ছাট দিয়ে যেতে হবে এমন কথা নেই। অবশ্যই ক্লিন শেভ করবেন।
৫) প্রথমদিন ইন টাইম যাওয়ার চেষ্টা করবেন।
আইএসএসবি অবস্থানকালীন করণীয় এবং পরিত্যাজ্যঃ
১) আইএসএসবির গেটে ঢোকার পর হতেই আপনার এক্সাম শুরু হয়ে যাবে। সুতরাং নিজের ব্যবহার, কথাবার্তা, আচরণ হিসেব করে করুন। আইএসএসবির অফিসার, সাইকোলজিস্ট, স্টাফ থেকে শুরু করে ডাইনিং এর মেসবয় সবাই আপনার আচরন নোট করবেন।
২) সময়ানুবর্তিতা। যে সময়ে ফলইন দেওয়া হবে অবশ্যই তার আগেই প্রস্তুত হয়ে জায়গামত উপস্থিত হবেন। স্টাফের কথামত চলবেন। ইচ্ছে হলো করে ফেললাম এই কয়েকদিনের জন্য পরিহার করুন।
৩) লাইটস অফের টাইমে অবশ্যই রুমের লাইট অফ করে শুয়ে পড়বেন। ডাইনিং এ অযথা উচ্চস্বরে গল্প বা কোন স্টাফের সাথে কড়া ভাষায় কথা বলবেন না। আপনার জন্য যথেষ্ট খাওয়া সাপ্লাই থাকবে। হুড়োহুড়ির কারন নাই।
৪) কোন এক্সামে নকল, বা কথা বলাবলির চেষ্টা করবেন না। সোজা বাসায় পাঠায়ে দেওয়া হবে।
৫) আইএসএসবির প্রতিটি এক্সামের আগে বিস্তারিত ব্রিফিং দিয়ে দেওয়া হয়। কিভাবে উত্তর লেখা লাগবে, কি করা লাগবে সব বলে দেয়া হয়। প্রতিটি ব্রিফিং ভালমত শুনে নিতে হবে।
প্রথম দিনঃ ব্যাগ সহ রিপোর্টিং এর পর মেসে নেওয়া হবে। চেস্ট নম্বর দেওয়া হবে। লাল নীল হলুদ বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করা হবে। রুম এ ব্যাগ রেখে সকালের ব্রেকফাস্ট খাওয়ানো হবে। আইএসএসবির পক্ষ থেকে ওয়েলকাম এড্রেস দেওয়ার পর আইকিউ এক্সাম শুরু হবে।
আইকিউ এক্সামঃ স্ক্রিন্ড আউটের প্রথম ধাপ হলো আইকিউ এক্সাম। ওএমআর উত্তরপত্রে এটি হয়ে থাকে। ১০০টি আইকিউ প্রশ্ন ত্রিশ মিনিটে এবং ৩৮টি ম্যাট্রিক্স ২২ মিনিটে সমাধান করা লাগে। আইকিউ প্রশ্নের কিছু নমুনা ডিফেন্স গাইডে পাওয়া যাবে। কয়েকটি নমুনা দেই-
ক। Complete the series: 71, 65, 61, 55, 45,?,?
খ। Air is to Bird as Sea is to-Fish/Ship/Boat/Snake.
গ। Rearrange the jumble word: INWE (Name of a Drink)
ঘ। Moscow/London/New York/Paris/Dhaka. (Find the Odd)
ম্যাট্রিক্স হলো নন ভার্বাল এক্সাম। একই রকম প্যাটার্ন বা সিকোয়েন্সের সাথে মিলিয়ে উত্তর থেকে সঠিক প্যাটার্নটি খুজে বের করা। যেমন কয়েকটা একই টাইপের স্কয়ার দেয়া থাকতে পারে। উত্তরে আয়তকার, কোণ, স্কয়ারের মধ্য থেকে একই প্যাটার্নের স্কয়ার খুঁজে বের করতে হবে।
টিপসঃ আইকিউ টেস্টে সময় খুব কম পাওয়া যায়। খুব দ্রুত উত্তর করতে হবে। কোনটাতে আটকে গেলে বসে না থেকে পরেরটা আন্সার করে যেতে হবে। উত্তরের সিকোয়েন্স যেন আবার ভুল না হয়ে যায় খেয়াল রাখা লাগবে।
পিপিডিটিঃ পিকচার পারসেপশন এন্ড ডেস্ক্রিপশন টেস্ট।
আইকিউ টেস্টের স্ক্রিন্ড আউটদের বাদ দিয়ে একই পরীক্ষা হলের প্রজেক্টরে অস্পষ্ট একটি ছবি দেখানো হবে। ছবি দেখে ছবির বর্ণনা দেওয়া লাগবে, ছবিতে কতজন আছে, তাদের জেন্ডার কি, এবং তারা কি করছেন। এরপর সামঞ্জস্যপূর্ন একটি গল্প তৈরি করতে হবে। মোট সময় ৪ মিনিট।(কম বা বেশি হতে পারে) গল্প অবশ্যই পজেটিভ এবং মোরাল ও যুক্তিযুক্ত হওয়া লাগবে।
লেখা শেষ হলে সবাইকে গ্রুপ অনুযায়ী গ্রাউন্ডে নেয়া হবে। সাইকোলোজিস্ট, জিটিওর উপস্থিতিতে হবে গ্রুপ ডিস্কাশন। সবাই একবার করে নিজের স্টোরি বলবেন এবং নিজের স্টোরির পক্ষে যুক্তি দেখাবেন। এরপর ওপেন ডিস্কাশন। একজন আরেকজনের যুক্তি খন্ডানোর চেষ্টা চালাবেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে একজন আরেকজনকে নেগেটিভলি আক্রমন করবেন না। অন্যের যুক্তি উড়ায়ে দেবার চেষ্টা করবেন না। যাই পারুন মুখ খুলবেন। ডিস্কাশনের সময় অফিসারের দিকে তাকাবেন না। ইংরেজিতে কথা বলবেন। অফিসার একসময় একটি ডিসিশনে আসতে বলবে তখন সবাই মিলে একজনের গল্পকে সাপোর্ট দিবেন। যদি পুরো গ্রুপ একমত না হতে পারেন হতে পারে পুরো গ্রুপ আউট হয়ে যাবেন। সুতরাং এখানে সাপোর্টিভ রোল দেখাতে হবে।
পিপিডিটি শেষে রেজাল্ট দিবে। সেকেন্ড স্ক্রিন্ড আউট শেষে বাকি সবাইকে লাঞ্চে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। পরবর্তী তিনদিনের এক্সাম এবার শুরু।
সাইকোলজিক্যাল এন্ড পার্সোনালিটি টেস্টঃ
বিকেল থেকে রাত অবধি এই টেস্ট চলবে। পুরোটাই লেখালেখি। তবে এর মধ্যে সতর্কতা আবশ্যক।
ক। ওয়ার্ড এসোশিয়েশন টেস্টঃ প্রজেক্টরে একটির পর একটি শব্দ যেতে থাকবে আর সেই শব্দ দিয়ে আপনি একটি বাক্য তৈরি করবেন। প্রতিটির জন্য দশ সেকেন্ড। ৮০ টি ইংরেজি শব্দ দেওয়া থাকবে। বাক্য তৈরির সময় পজেটিভ চিন্তা প্রকাশ করবেন অবশ্যই। নির্দেশনা মূলক কথা লিখবেন না। যেমন You should not lie না লিখে lying is a sin লেখা উত্তম।
খ। গল্প লেখাঃ বাংলা ও ইংরেজিতে দুটি গল্প লেখা লাগবে। প্রজেক্টরে ছবি দেখানো হবে। সেটি সম্পর্কে পজেটিভলি গল্প তৈরি করবেন।
গ। নিজের ভাল ও খারাপ গুণ সম্পর্কে লিখতে হবে। নিজের জীবনের সুখের এবং কষ্টের স্মৃতি লিখতে হবে।
ঘ। বিস্তারিত দুটি বায়োডাটা পূরণ করতে হবে। চাচা, মামা, খালু, দাদা নানা সবার সম্পর্কে জানতে চাওয়া হবে। কে কি করে, কোথায় চাকরি করে, দাদা নানার নানী দাদীর বয়স পূর্ন নাম ঠিকানা সব কিছু জেনে যাবেন।
টিপসঃ আপাতদৃষ্টিতে এই এক্সাম সোজা লাগলেও এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে আপনার প্রদত্ত তথ্যগুলোকে বারবার যাচাই করা হয়। আপনি সত্য বলছেন না মিথ্যে বলছে ধরা যায়। ডিপি ভাইভাতেও আপনার এই খাতাগুলো পরীক্ষকের সামনে থাকে। উনি নানা প্রশ্নের মাধ্যমে আপনার লেখা তথ্যগুলো ক্রস চেক করবেন।
দ্বিতীয় দিনঃ
ক। গ্রুপ ডিসকাশন। বাংলা এবং ইংরেজি দুটি টপিক্স দেওয়া হবে। গ্রুপের সবাই মিলে আলোচনা করা লাগবে। চুপ করে বসে থাকবেন না। সবার সাথে আলোচনা করুন। স্পষ্ট উচ্চারনে কথা বলবেন যেন অফিসার শুনতে পায় ঠিকমত।
খ। এক্সটেম্পোর স্পিচঃ লটারিতে একটি বিষয় দেওয়া হবে। মিনিট পাঁচেক ভাববার সময় পাবেন। এরপর সেই বিষয়ের উপর বক্তৃতা দিবেন।
গ। প্রগ্রেসিভ গ্রুপ টাস্ক। গ্রুপের সবাই মিলে কয়েকটি বাধা অতিক্রম করবেন। এটি শুরুর আগেই বিস্তারিত ব্রিফিং দেওয়া হবে। দড়ি, ড্রাম, লগ ইত্যাদির সাহায্যে বাধা অতিক্রম করবেন। সময় সীমিত। চেষ্টা করবেন এই টাস্কের সময় নিজের প্ল্যান সবাইকে জানাতে। একটিভলি টাস্কে সবাইকে হেল্প করবেন। গ্রুপের কর্তৃত্ব নিজে নেবার চেষ্টা করবেন তবে ঝগড়া করে নয়। নিজে সুন্দরভাবে সমস্যার সমাধান দিয়ে।
ঘ। হাফ গ্রুপ টাস্ক। প্রগ্রেসিভের মতই। এখানে পুরো গ্রুপকে অর্ধেক বানিয়ে বাধা অতিক্রম করতে দেওয়া হবে।
ঙ। ফিজিক্যাল এবিলিটি টেস্টঃ প্রত্যেক প্রার্থিকে সাতটি আইটেমে অংশ নিতে হবে। ফিমেল প্রার্থিদের টেস্ট কিছুটা আলাদা। এই এক্সামের জন্য আইএসএসবি কর্তৃক আপ্লোডকৃত ভিডিও-
পুরুষ পরীক্ষার্থী- https://www.youtube.com/watch?v=2B1…
মহিলা পরীক্ষার্থী- https://www.youtube.com/watch?v=TAjTrqIixv0
চ। ডেপুটি প্রেসিডেন্ট ভাইভাঃ আলাদা আলাদা ভাবে সবার এই ভাইভা হয়ে থাকে। নির্দিষ্ট কোন সময় নাই। যতক্ষণ প্রয়োজন আপনাকে জাজ করতে ততক্ষন যাবত ভাইভা হবে। আপনার ফ্যামিলি, পড়াশোনা, ইচ্ছা অনিচ্ছ্ স্বপ্ন, পার্সোনাল জীবন, প্রেম,সেক্স সবকিছুই আসতে পারে এই ভাইভায়। পার্সোনালিটি টেস্টে লিখে আসা তথ্যগুল ঘুরিয়ে পেচিয়ে জানতে চাওয়া হবে। রাজনীতি, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দিতে বলবে। কোন পক্ষপাতদুষ্ট মন্তব্য করবেন না। সর্বদা সত্য কথা বলার চেষ্টা করবেন। ইতস্তত করবেন না। রুমে কি কি আছে, কে কে আছে দেখার চেষ্টা করবেন না। অফিসারের চোখে চোখ রেখে কথা বলবেন। মাথা নিচু করে বসবেন না। পা ঝাকাবেন না। হাত নেড়ে কথা বলবেন না। রেগে যাবেন না। উলটো প্রশ্ন করবেন না। একেবারে পরিচিত মানুষের মত কথা বলুন।
তৃতীয় দিনঃ
ক। প্ল্যানিং এক্সারসাইজ। একটি ম্যাপ ও সমস্যা দেওয়া থাকবে। সমস্যায় আপনাকে ম্যানপাওয়ায় ,ইকুইপমেন্ট, সময়, রিসোর্স উল্লেখ করে দিবে। সেই অনুযায়ী সমস্যার সমাধান করবেন। প্রথমে রিটেন এক্সাম হবে। পরে গ্রাউন্ডে গ্রুপে বড় ম্যাপে সেই বিষয়ক আলোচনা হবে। রিটেনে একেকজন একেক সমাধান লিখলেও গ্রুপ ডিস্কাশনে একেকজন একেক সমাধান না দিয়ে সবাই মিলে একটি সমাধান নির্বাচন করুন। একজন বা দুইজনকে সেই সমাধান পরীক্ষকের সামনে উপস্থাপনের দায়িত্ব দিন।
খ। কমান্ড টাস্কঃ আপনাকে কমান্ডার বানিয়ে আপনার আন্ডারে অন্য কয়েকজন পরীক্ষার্থীকে দেওয়া হবে। আপনার নির্দেশনায় সবাই মিলে একটি বাধা অতিক্রম করবেন। সময় সীমিত থাকবে। লক্ষ্য রাখবেন আপনার আন্ডারকমান্ড যেন আপনার নির্দেশ শোনেন। আগেই গ্রুপের সবার সাথে ভাল সম্পর্ক রাখবেন। আপনি কাদের সিলেক্ট করবেন তাদের আগেই জানিয়ে রাখবেন। ধরুন গ্রুপে এগারোজন আছেন। সবাই একবার করে কমান্ডার হবে। সে অন্যদের মধ্য থেকে তিনজনকে সিলেক্ট করবে আন্ডারকমান্ড হিসেবে। আপনাকে যদি কেউই আন্ডারকমান্ড হিসেবে ডাক না দেয় তবে তা আপনার ডিসক্রেডিট। সুতরাং গ্রুপের সবাই যেন সমান ডাক পায় সে ব্যবস্থা আগেই করে নিবেন। কমান্ডার হিসেবে বাধা অতিক্রমের সময় নিজে আগে বা শেষে পার হবেন না। মাঝামাঝি সময়ে পার হবেন।
গ। মিউচুয়াল এসেসমেন্টঃ আপনাকে আপনার গ্রুপ সম্পর্কে মিউচুয়াল এসেসমেন্ট করতে দিবে। কাকে আপনি কত পজিশনে রাখতে চান সেটি সিরিয়াললি লিখবেন। এইখানেও একটু নজর রাখবেন যেন আপনি কারো না কারো লিস্টে যেন এক নম্বরে থাকেন নিজের লিস্ট বাদে। এই এক্সামে আপনার এসেসমেন্ট করার সক্ষমতা দেখা হবে।
ঘ। ভাইভাঃ আগের দিনের যাদের ভাইভা বাকি ছিলো তাদের ভাইভা শেষ করা হবে।
ঙ। মুভিঃ রাত্রে একটি ইংরেজি মুভি দেখানো হয়। অনেকেই মুভি দেখার সময় ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু মুভি দেখা শেষ রাত্রে এক্সাম হলে নিয়ে যেয়ে মুভির সারমর্ম, গল্প সম্পর্কে লিখতে বলা হয়। সুতরাং মুভি দেখবেন মনোযোগ দিয়ে।
আপনার এক্সাম তৃতীয়দিনেই শেষ। চতুর্থদিন কোন এক্সাম হয়না। সকাল থেকে সিলেকশন বোর্ড বসে। তিনদিনের পারফর্মেন্স আলোচনা হয়। কারো সম্পর্কে অনিশ্চয়তা থাকলে তার পুনরায় ভাইভা হতে পারে। সব চূড়ান্ত হলে রেজাল্ট দিয়ে দেওয়া হয় গ্রিন বা রেড কার্ড।
আইএসএসবির ডেপুটি প্রেসিডেন্ট ভাইবা সম্পর্কে বিশেষ সতর্কবার্তা দেওয়া প্রয়োজন। এখানে আপনাকে নানাভাবে প্রশ্ন করে উত্তেজিত করা হবে। খুব পার্সোনাল প্রশ্ন করা হয়ে থাকে। যেমন গার্লফ্রেন্ড বা বয়ফ্রেন্ড সম্পর্কে, শারীরিক মিলন হয়েছে কিনা এধরনের নানা প্রশ্ন করে আপনাকে রাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। রেগে গিয়ে উল্টোপাল্ট কিছু বললেই ধরা খেয়ে যাবেন। এটিকে এক ধরনের মাইন্ড গেম হিসেবে নেয়ার চেষ্টা করুন। পার হয়ে যাবেন।
আইএসএসবির সব পরীক্ষায় সর্বদা চটপটে ভাব দেখাতে হবে। গ্রুপ টাস্কে নিজের কমান্ড এবং ডিসিশন দেবার দক্ষতা দেখাতে হবে। সবসময় একজন সাইকোলজিস্ট আপনার দিকে লক্ষ্য রাখবে আপনার মানসিক ক্ষমতা দেখার জন্য। জিটিও থাকবে শারীরিক ক্ষমতা দেখার জন্য। আর আইএসএসবির প্রত্যেক কর্মচারির কাছেই নজরদারির নির্দেশ দেওয়া থাকে। ডাইনিং এর বয়রাও আপনার চেস্ট নাম্বার লিখে রিপোর্ট দিয়ে দিতে পারে, তাই চারদিন থাকাকালে কোন রকম উগ্রতা বা অশালীন আচরন করা যাবেনা।
৫।চূড়ান্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষাঃ সিএমএইচে চুড়ান্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়ে থাকে। এখন এর কিছু অংশ আইএসএসবিতে নেওয়া হয়। এক্সরে, ব্লাড, ইউরিন থেকে সব চোখ কান সবকিছুরই পরীক্ষা করা হয়। চুড়ান্তভাবে নির্বাচিতদের আর্মি হেডকোয়াটারে ডাকা হয় জয়নিং লেটার এবং বিএমএতে যোগদানের তারিখ জানানোর জন্য।
প্রশিক্ষণঃ ডাইরেক্ট শর্ট সার্ভিস কমিশনে তিনিটি ধাপে প্রশিক্ষন দেওয়া হয়ে থাকে। ১১ সপ্তাহ বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে ব্যাসিক মিলিটারি ট্রেনিং, ৬ সপ্তাহ আর্মি মেডিকেল কোর সেন্টার এন্ড স্কুলে অফিসার্স ব্যাসিক কোর্স, ৪ সপ্তাহ ঢাকার এএফএমআইতে মেডিকেল অফিসার্স ব্যাসিক কোর্স। প্রশিক্ষনের রেজাল্ট এবং চাহিদার ও পছন্দের সাপেক্ষে পোষ্ট গ্রাজুয়েশনের সাবজেক্ট দেওয়া হয়। যারা পার্ট ওয়ান করে ঢুকবেন তাদের সেই সাবজেক্ট দেওয়া হয়ে থাকে।
সফল প্রশিক্ষন শেষে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট, সিএমএইচ, ফিল্ড এম্বুলেন্স, নেভি, এয়ারফোর্স, বিজিবি, কোস্ট গার্ড বা র্যাবে পোস্টিং দেওয়া হয়ে থাকে।
আইএসএসবির আরো বিস্তারিত তথ্যের জন্য ঘুরে দেখতে পারেন http://www.issb-bd.org বাংলাদেশ সেনাবাহীনিতে যোগদান করে একইসাথে মানুষ এবং দেশের সেবা করার সুযোগ নিন।
FAQ- আর্মি মেডিকেল কোর
১। আপনি কেন আর্মিতে জয়েন করলেন?
উত্তরঃ এই প্রশ্ন সবাই করে। আমার কাছে একটি স্বপ্ন ও দুইটি সুবিধা একসাথে ধরা দিয়েছে আর্মিতে তাই এখানে জয়েন করা। একটি সামরিক উর্দি পড়ার স্বপ্ন। আর সুবিধা হলো সরকারি চাকুরি এবং একইসাথে সামরিক অফিসার ও ডাক্তার এই দুই প্রফেশনে থাকতে পারা। একসাথে দুটি পরিচয় নিয়ে জীবন পার করার সুবিধা আর কোথাও আছে বলে মনে হয়না।
২। কিভাবে জয়েন করবো?
উত্তরঃ আর্মির ওয়েবসাইটে https://joinbangladesharmy.army.mil.bd নিয়মিত চোখ রাখুন। পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখুন। প্ল্যাটফর্মের সহায়ক পোস্ট দেখুন। উত্তর পেয়ে যাবেন।
৩। বেতন কত?
উত্তরঃ ক্যাপ্টেনের বেতন নতুন জাতীয় বেতন স্কেলের সপ্তম গ্রেডে। এর সাথে আনুষাঙ্গিক ভাতা, রেশন, এলাউন্স, বিবাহিত হলে যদি সরকারি বাসায় না থাকেন তবে বাসা ভাড়া ইত্যাদি রয়েছে।
৪। মিশন আছে ?
উত্তরঃ জ্বি মিশন আছে। আর্মি, নেভি বা এয়ারফোর্সের মিশনে মেডিকেল অফিসার হিসেবে যাবেন। ক্যাপ্টেন বা মেজর যে র্যাংকে মিশনে যাবেন সেই র্যাংক অনুযায়ী ইউএন এর বেতন পাবেন।
৫। পোস্টিং কোথায় হবে?
উত্তরঃ বাংলাদেশের যে কোন খানেই পোস্টিং হবে। যে কোন জায়গায় চাকুরির মানসিকতা নিয়ে ঢুকতে হবে। তবে এক্ষেত্রে আপনার থাকা বা খাওয়া নিয়ে চিন্তা করতে হবেনা অন্য সরকারি চাকুরির মত। আপনার থাকা খাওয়া নিশ্চিত করেই আর্মি আপনার পোস্টিং দিবে। স্বামী স্ত্রী দুইজনেই আর্মি অফিসার হলে একসাথে বা কাছাকাছি পোস্টিং দিতে আর্মি চেষ্টা করে।
৬। পোস্টগ্রাজুয়েশনের সুবিধা কি?
ঊত্তরঃ আর্মির চাহিদা, আপনার কোর্সের রেজাল্ট, আপনার আগ্রহ এই তিন পয়েন্ট অনুযায়ী সাবজেক্ট পাবেন। সেই সাব্জেক্টে আপনাকে এফসিপিএস পার্ট ১ করা লাগবে। পার্ট ১ হোক বা না হোক সিনিয়রিটি অনুযায়ী আপনাকে ২ বছরের গ্রেডিং কোর্স (পোস্ট গ্রাজুয়েশন ট্রেনিং) এ ডাকা হবে। এরপর পার্ট ১ হলে বাকি ট্রেনিং শেষ করে পার্ট ২ আপনাকে অন্যদের মতই পাশ করতে হবে। আলাদা কিছু না। যদি পার্ট ১ করে ঢুকেন তবে সেই সাবজেক্ট আপনাকে দেওয়া হবে। এফসিপিএস এর আগে এমডি বা এম এস করার সুযোগ নাই।
৭। কষ্ট নাকি অনেক বেশি? অনেক খাটায়?
উত্তরঃ দুনিয়ার কোন কিছুই সহজে আসেনা। সব কিছুতেই কষ্ট। নদীর এপার থেকে অইপার ভালই লাগে। কষ্ট থাকবেই। আর্মিতে ডিসিপ্লিন বেশি। ডিসিপ্লিন ছাড়া সামরিক বাহিনী চালানো সম্ভব না। তাই সেইখানে অফিসার হিসেবে কাজ করতে হলে আপনাকেও তার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। এটুকু মেনে নিতে পারলেই সব সম্ভব।
৮। সুবিধার কথাতো বললেন, অসুবিধার কথা বলেন?
উত্তরঃ অসুবিধা কোন চাকুরিতে নাই বলেন? আমি একটু ঘুরিয়ে উত্তর দেই। আমি ইন্টার্ন শেষ করেই ছয় মাস পর থেকে জাতীয় বেতন স্কেলের সপ্তম গ্রেডে বেতন পাই, সাথে ভাতা পাই, কমমূল্যে রেশন পাই, পরিবারের জন্য চিকিতসা ফ্রি পাই, বাবা মায়ের জন্য স্বল্পমূল্যে চিকিতসা পাই, বাসা পাই, ছেলেমেয়েদের পড়ানোর জন্য স্কুল,কলে্ মেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ পাই, নিরাপদ জায়গায় নিজ পরিবারকে নিয়ে থাকার সুবিধা পাই, সামরিক বাহিনীর সদস্য হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেবার সুযোগ পাই, একই সাথে ডাক্তার এবং সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে দেশ ও মানুষের সেবার সুযোগ পাই। এত কিছুর দিকে তাকালে অসুবিধাগুলোকে মানিয়ে নিতে খুব একটা কষ্ট হয়না। অসুবিধা মানাতে না পারলে কোন চাকুরিই করা সম্ভব না।
তথ্যগুলো দিয়ে সাহায্য করেছেন ঃ ডাঃ ইমান নূর, বাংলাদেশ আর্মি ।
MCQ te ki negative marking thake?