আরব দেশে চিকিৎসা সমাচার !!

ভিনদেশে ডাক্তারী ————————-

বছর খানেক গত হল আরব দেশে আছি। শিশু চিকিৎসক হিসেবে এখানকার এক হাসপাতালে কর্মরত। পৃথিবীর সব বাচ্চারা আসলে একইরকম। নিষ্পাপ ফুলের মত। পৃথিবীর সব বাচ্চারাই কেমনজানি কিউট।। এখানে আউটডোরে রুগী দেখা শেষে বাচ্চার বাবা মার কাছে দুটো কমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।

অবশ্য রুগী দেখা শেষ হবার আগেই উনারা প্রশ্ন করা শুরু করেন। উনাদের ধৈর্য্য খুবই কম। যত বেশি বয়স তত কম ধৈর্য্য। এখানে বয়স বাড়ার সাথে সাথে আনুপাতিক হারে ধৈর্য্য কমতে থাকে। ভেতরে কোন রুগী থাকলে দরজার ওপাশে পরবর্তী সিরিয়ালে যিনি আছেন উনি মিনিট খানেক পরপর দরজা ফাঁক করে উঁকি মারতে থাকেন। এই দৃশ্যটি দেখতে আবার আমার খুব ভালোলাগে।

আমি যেদিন এদেশ ছেড়ে চলে যাব সেদিন নিশ্চয় এই দৃশ্যটি ভীষণ মিস করব..!! বাচ্চা দেখার সময় বাবা মার প্রথম প্রশ্ন, শুনো মুশকিলা দকতর?? বাংলা তর্জমা করলে ঠিক এমনটি শুনাবে, ডাক্তার সাহেব বাচ্চার সমস্যা কি?? যৌক্তিক প্রশ্ন। সমস্যাটা কি এটা জানতে চাওয়াটাই তো স্বাভাবিক। আরবি ভাষা এখনো পুরোপুরি দখল না থাকায় মাঝেমাঝে আরবি ইংরেজি এবং হাত ইশারা মিশিয়ে ককটেল ফর্মে উত্তর দিতে হয়। আরবি ভাষা জ্ঞানের অভাব থাকার কারনে স্ফীত এক হাসি সর্বদা মুখে ঝুলিয়ে রাখতে হয়। আসলে পৃথিবীর কোন মানুষই হাস্যজ্জ্বল কোন মানুষের উপর রাগ করতে পারে না। শুধু আমার দেশের কিছু নেতা এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম…!!

আর হাসিতো কিছুটা হলেও সংক্রামক। আমার স্ফীত হাসি দেখে প্রচণ্ড জ্বরে কষ্ট পাওয়া কিউট বাচ্চাটাও হাসি হাসি মুখ করে অপলক চেয়ে থাকে। এছাড়া আপনি ভাল কিংবা সুখে থাকলে ঢোল পিটিয়ে লোকে লোকে বলার কোন দরকার নেই। শুধু একটু মুচকি হাসি দিলেই মানুষ বুঝবে যে আপনি সুখে আছেন। আর বিগলিত হাসি দিলে বুঝে নিবে যে আপনি চরম সুখে আছেন..!! মেয়েরা আবার ছেলেদের চেয়ে বেশি হাসে। সম্ভবত এই কারনে মেয়েরা পৃথিবীতে বেশিদিন বাঁচে। মেয়েরা সবচেয়ে বেশি হাসে যখন একসাথে ছাদে উঠে। এবং বেশিরভাগ হাসির বিষয়বস্তু খুবই হালকা হয়।

আরব দেশের মানুষেরাও প্রচুর হাসিঠাট্টা পছন্দ করে। তবে তারা বেশিরভাগ সময় না বুঝেশুঝে হাসে। না বুঝেশুনে হাসাটাও ভাল। যারা আবার বুঝেশুনে হাসে তাদের বেশি বুঝতে গিয়ে আর কখনও হাসা হয় না। তবে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম হাসি হল মায়ের মুখের হাসি।।

আমাদের মত এখানেও আরবি ভাষাতে আঞ্চলিকতা আছে। আমরা যে আরবি শেখার চেষ্টা করি সেটা শুদ্ধ ভাষার আরবি। উনাদের মধ্যে কেউকেউ যখন আঞ্চলিক ভাষায় আরবি বলা শুরু করেন তখন মাথামুণ্ড কিছুই বুঝা যায় না। ওইসময় বডি ল্যাংগুয়েজ কিংবা সাইন ল্যাংগুয়েজ ব্যবহার করতে হয়। আমরা যেমন কক্সবাজার, চিটাগাং কিংবা নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষা ঠিকমত বুঝতে পারিনা। আঞ্চলিক আরবি ঠিক তেমনই।

এখানে আসার আগে বছর দেড়েক কক্সবাজারে থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। বিকেলে বসতাম ফুয়াদ আল খতীব হাসপাতালে। নিজের দেশে বসে কিছু কিছু বাবা মায়ের ভাষা সত্যিই বুঝতে পারতাম না। নিজেকে তখন অসহায় লাগত। প্রায়শই আমার এসিসট্যান্টের সহযোগিতা নিতে হত।

যাহোক বাচ্চা দেখার পর সমস্যাটি কি এটা ভাঙা ভাঙা আরবিতে বিস্তারিতভাবে বাবা মাকে বলতে হয়। সমস্যা না বলে সরাসরি ডায়াগনোসিস বললে আপনাকে অতিরিক্ত আর একটা বোনাস প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। সেটা হলো – শুন হাদা?? মানে এটা আবার কি? যেমন আপনি যদি বলেন, মুমকিন ফাইরাছ হারারা (সম্ভবত ভাইরাস জ্বর) সাথে সাথে প্রশ্ন করবে, শুন হাদা (এটা কি)?? এরপর ভাইরাস জ্বর নিয়ে আপনাকে ছোটখাটো আর একটা লেকচার দিতে হবে।

এরমাঝে পরবর্তী সিরিয়ালে থাকা বাবা মা মিনিট খানেক পরপর দরজা খুলে উঁকি দিতে থাকবেন। আহা! সে এক অপরূপ দৃশ্য ..!!

যাহোক ইনিয়ে বিনিয়ে বুঝানোর পর আপনাকে বহুল প্রচলিত শেষ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। সেটা হলো – লেশ হাদা ?? মানে,, কেন এই সমস্যা হলো?? অথবা জিজ্ঞেস করবে, কেফ হাদা ইজি মুশকিলা?.. মানে কিভাবে এই সমস্যা হলো?? তারপর ভাইবা পরীক্ষা দেবার মত আপনাকে এই কেন’ এবং কিভাবে ‘র (??) উত্তর দিতে হবে।

বাচ্চার বাবাদেরকে খালিবালি মানে হাবিজাবি বলে কিছুটা বুঝানো যায়। কিন্তু মা দেরকে বুঝানো সত্যিই খুব কঠিন ব্যাপার। উনাদের কৌতুহলের কোন শেষ নেই। পৃথিবীর সব মায়েরা একইরকম। সন্তানের ব্যাপারে ভীষণ সিরিয়াস। কিছু সময় পর পর উনারা শুধু লেশ লেশ (কেন কেন??) করতে থাকেন !!

প্রেসক্রিপশন লেখা শেষে উনারা জিজ্ঞেস করেন কোন এন্টিবায়োটিক দিয়েছি কিনা। এন্টিবায়োটিক না দিলে আবার জিজ্ঞেস করবে, লেশ?.. মানে কেন দেয় নাই?

তখন বলতে হবে, মুদাদ মোলাযেম.. মাফি ইলতিহাব। মানে হলো কোন ইনফেকশন নেই.. এন্টিবায়োটিক লাগবে না।।

এন্টিবায়োটিক দিলেও জিজ্ঞেস করবে, শুন মুদাদ?? .. মানে কি এন্টিবায়োটিক?? এন্টিবায়োটিকের নাম বলার পর আবার সেই একই প্রশ্ন, লেশ হাদা (এটা কেন দিলে)?? বাকিটা আপনিই জানেন উনাকে কিভাবে বুঝাবেন..!!!

লেখকঃ

ডাঃ জহির সাদিক

চাইল্ড স্পেশালিস্ট,

জাবের আল আহমেদ আর্মড ফোর্সেস হাসপাতাল,কুয়েত।

 

 

অনুলিখনঃ জামিল সিদ্দিকী

শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Next Post

ডেঙ্গুঃ ভয়াবহতা ও বাস্তবতা

Fri Sep 14 , 2018
জায়ান, বয়স বছর দশেক, কলেজিয়েট স্কুলে তৃতীয় শ্রেনীতে পড়ে। অদ্ভুত এক লক্ষী বাচ্চা। এই সেদিন জায়ান, আমার ছেলে অহন ভর্তি পরীক্ষা দিচ্ছে আর দিবা, আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছি। দিবা, জায়ানের মা, জগন্নাথের এডমিনেস্ট্রেটিভ অফিসার। আমাকে আন্টি আন্টি ডাকে। খুব আন্তরিক। আমরা পারিবারিক ভাবে এটাচড্। ‘ আন্টি, বাচ্চাদের কেনো পরীক্ষা […]

সাম্প্রতিক পোষ্ট