• অতিথি লেখা

March 13, 2017 4:17 pm

প্রকাশকঃ

লিখেছেন: ডা. জামান অ্যালেক্স

১…….

যে এলাকাটায় আমার পোস্টিং সেখানে সাধারণত দুপুর একটার পর আউটডোরে আর কোনো রোগী আসেনা, যারা আসে সেগুলো ইমার্জেন্সী কেস, ইমার্জেন্সীতে দায়িত্বরত ডক্টর সেটা ম্যানেজ করেন…..

দুপুর দুইটা, আউটডোরে বসে বসে Black magic এর উপর একটা ইন্টারেস্টিং বই পড়ছি, আড়াইটা বাজলে চেম্বারে যাবো, এই হলো প্ল্যান……

অদ্ভুত একটা বই।যে অংশটা এখন পড়ছি, সেখানে লেখা আছে পানিতে ডুব দিয়ে নানা কঠিন কলাকৌশল মেনে কিভাবে একজন শত্রুকে মেরে ফেলা যায়….একটা পিঁপড়ার জীবন সৃষ্টি করার ক্ষমতা আমাদের নেই, অথচ একটা মানুষের জীবন কেড়ে নেয়ার কত না চেষ্টা!…….

পড়াতে ছেদ পড়লো।দরজার মুখে কাঁচুমাচু করে এক মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ কথা বলার জন্য দাঁড়িয়ে আছে।আমি কোম্পানিটির কোনো প্রোডাক্ট লিখি না।প্রেসক্রিপশনে ওষুধ লেখার ব্যাপারে আমি অনেকটা অটিস্টিক টাইপের,নিজের পছন্দে বিশ্বাস করি, কোয়ালিটি মেনটেইন করে এমন ৭-৮ টা কোম্পানি বাদে অন্য কোনো কোম্পানির প্রোডাক্ট আমি লিখি না, অনেক প্রলোভনের পরও আমি এই নীতি থেকে বিচ্যুত হই নাই।নিজের মায়ের ওষুধ কেনার সময় কোয়ালিটিফুল প্রোডাক্ট আমি সার্চ করি, কাজেই পেশেন্টকে প্রেসক্রাইব করার সময় এর ব্যতয় ঘটানোরও কোনো সুযোগ আমি দেখি না….

যাই হোক, রিপ্রেজেন্টেটিভটি মাথা নিচু করে জানালো এই মাসে এলাকায় সে যদি তার কোম্পানির দেয়া টার্গেট অনুযায়ী প্রোডাক্ট বিক্রি করতে না পারে তবে তার চাকরী চলে যাবে।মানবিক কারণে আমি কিছুটা কনভিন্সড্ হলাম।লোকটি চলে যাবার পর নেট ঘেটে দেখি দেশে আধুনিক ওষুধ উৎপাদন করে এমন ১৯৯ টি কোম্পানির মধ্যে রিপ্রেজেন্টেটিভ লোকটির ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির Ranking ১০-২০ এর মাঝে। আমি কোম্পানির প্রোডাক্ট লেখার ব্যাপারে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম…..

পরবর্তী ঘটনা আমার জন্য খুব একটা সুখকর নয়।রিপ্রেজেন্টেটিভ লোকটির মানবিক দিক বিবেচনা করে তিনজন হাইপারটেনসিভ পেশেন্টকে সরকার অনুমোদিত কোম্পানিটির অ্যান্টিহাইপারটেনসিভ প্রোডাক্ট দিয়ে দুই সপ্তাহ পর ফলো আপে আসতে বলেছিলাম।সমস্ত নিয়মকানুন মেনে চলার পরও তিনজনের একজনেরও ব্লাড-প্রেসার ১ মিলিমিটার মার্কারীও কমেনি……

২…..

এবার আরেকটা ঘটনা বলি…..

৮-৯ বছরের এক বাচ্চা সাইকেল চালাতে গিয়ে পায়ের একটা অংশ কেটে ফেলে।ইনফেকশন হয়ে যাবার পর বাচ্চাটিকে প্রথমে নাম না জানা অখ্যাত এক কোম্পানির মুখে খাবার অ্যান্টিবায়োটিক (Cefixime) ও পরে ইনজেক্টেবল অ্যান্টিবায়োটিক( Ceftriaxone) প্রেসক্রাইব করা হয়।ইনফেকশন কন্ট্রোল হচ্ছে না বুঝতে পেরে বাচ্চাটিকে নিয়ে তার পিতা আমার চেম্বারে আসলেন…..

আপনারা বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা–যে বাচ্চাটির ইনফেকশন অখ্যাত কোম্পানির তৃতীয় প্রজন্মের ইনজেক্টেবল অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েও কন্ট্রোল করা যায়নি, সে বাচ্চাটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয় শুধুমাত্র ভালো একটি কোম্পানির মুখে খাবার সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকে(Flucloxacillin)….

৩……

আমার অভিজ্ঞতা বাদ দেই, আমাদের দেশের এক ইন্টারন্যাশনাল কেলেঙ্কারীর কথা বলি…

কালাজ্বরের রোগীদের উপর Miltefosine এর কার্যকারীতা নিয়ে আমাদের দেশে একটি ট্রায়াল চলছিলো।ট্রায়ালটির উপর ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারেস্টও ছিলো ব্যাপক।Miltefosine ট্যাবলেট সাপ্লাই দেয়ার দায়িত্ব ছিলো এদেশেরই এক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির।ট্রায়াল চলতে লাগলো…..

লজ্জার ব্যাপার কি আর বলবো! Dutch doctor রা ইনভেস্টিগেট করে বের করলেন-আমাদের দেশের যে কোম্পানিটি Miltefosine ট্যাবলেটটি সাপ্লাই দিয়েছিলো-সেখানে Miltefosine ওষুধটির নামগন্ধও নেই।ডাচ পত্রিকায় খবর উঠলো, “Dutch doctors uncover fake Bangladesh medicine….”

৪….

এবার এক শোনা ঘটনা বলি…..

Azithromycin একটি বহুল প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক, বিভিন্ন কোম্পানি বিভিন্ন নামে এটিকে বাজারজাত করে।বাজার থেকে Randomly বিভিন্ন কোম্পানির এই ওষুধটির ৫০০ মিলিগ্রাম স্যাম্পলটি যোগাড় করা হলো…..

পরীক্ষা করার পর দেখা গেলো শুধুমাত্র দুইটি কোম্পানি ব্যতীত আর কোনো কোম্পানিই ৫০০ মিলিগ্রাম পরিমাণটি ঠিক রাখতে পারেনি…..

৫….

আগেই বলেছি-দেশে আধুনিক ওষুধ উৎপাদন করে ১৯৯ টি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি।আমি ৩০ টির বেশী কোম্পানির নামও বলতে পারবো না, বাকীগুলো এতটাই অখ্যাত…..

১৯৯ টি কোম্পানি কি একই কোয়ালিটি মেনটেইন করে? আপনাদের কি মনে হয়? কোম্পানিগুলোর কোয়ালিটির পার্থক্য উনিশ-বিশ হলেও চলে।কিন্তু আমি যা বুঝি-সেটা উনিশ-বিশ না, সেটা দুই-বিশ।জীবন রক্ষাকারী যে ওষুধ, সেখানে কোয়ালিটির এত পার্থক্য কি মেনে নেয়া যায়? কোয়ালিটি কন্ট্রোল করা যাদের দায়িত্ব, তারা আসলে করেন টা কি?

৬….

একটা কথা ক্লিয়ার করি, অধিকাংশ কোম্পানিই আজেবাজে। এরা কিভাবে এদেশে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যায়-সেটা আমরা বুঝি….

ঢাকায় আজেবাজে কোম্পানি খুব একটা ভাত না পেলেও ঢাকা থেকে একটু বাইরে গেলেই বোঝা যায়-এদের দাপট কতখানি।প্রান্তীয় অঞ্চলগুলোর ফার্মেসীতে আজেবাজে কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসা বেশ ভালো ভাবেই চালিয়ে যাচ্ছে…..
অনেকে বলেন, এইসব কোম্পানি আটা ময়দা দিয়ে ওষুধ বানায়। আমিতো বলি, সেটা করলেও ভালো, এটলিস্ট মানুষগুলো না হয় টাকা দিয়ে আটা ময়দা খেতো, বিষ তো আর খেতে হতো না! এক কোম্পানির প্যারাসিটামল ওষুধ খেয়ে তো শত শত শিশু মারাই গেলো….
আরেকটা ব্যাপার–আমার অভিজ্ঞতা বলে কিছু ব্যতিক্রম বাদে অধিকাংশ ডাক্তার প্রেসক্রিপশন লেখার ব্যাপারে একটা লেভেল পর্যন্ত কোয়ালিটি মেনটেইন করেন, সেটা ঢাকা বা প্রান্তীয় অঞ্চল যেটাই হোক না কেনো।ঢাকায় যে ওষুধ লেখা হয়, ফার্মেসী থেকে রোগীদের সাধারণত সেটাই দেয়া হয়, তবে প্রান্তীয় অঞ্চলের অবস্থা ভয়াবহ।লেখা হয় ভালো কোম্পানির ওষুধ, ফার্মেসীওয়ালা ধরিয়ে দেয় আউল-ফাউল কোম্পানির ওষুধ নামক বিষগুলো। গরীবগুলো এমনেও মরে, টাকা দিয়ে ওষুধ কিনে খেয়েও মরে…….
দেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করে যারা প্রেসক্রিপশনে কোম্পানির ট্রেড নেইম বাদ দিয়ে জেনেরিক নাম লেখার ব্যাপারে চিৎকার চেঁচামেচি করেন-তারা আসলে প্রান্তীয় অঞ্চলের অবস্থাটা কখনোও অনুভব করেন নি…..

৭….
এই সেগমেন্টটি সম্পূর্ণভাবে একদম সাধারণ মানুষদের জন্য লেখা…..
The Last Samurai মুভিটি কি আপনারা দেখেছিলেন? তৎকালীন জাপানের সম্রাটের এক ভুল সিদ্ধান্তের খেসারতে দেশটির এক বীর মারা যান, সম্রাট পরে তার ভুল বুঝতে পারেন।অনুশোচনা নিয়ে লজ্জিত সম্রাট বীরের মৃত্যুর সময় উপস্থিত মুভিটির নায়কের কাছে জানতে চান, “Tell me, how he died…” মুভিটির নায়ক উত্তরে বলেছিলো, “I will tell you how he lived…”–আসল কথা বলি, আজে বাজে কোম্পানির ওষুধ খেয়ে মারা যাওয়া কোনো কাজের কথা না, কিভাবে এই নৈরাজ্যে আমরা বেঁচে থাকতে পারি সেটা জানতে হবে…..
কোয়ালিটি কন্ট্রোল করা যাদের দায়িত্ব, তারা যদি তাদের দায়িত্বের কিয়দংশও সঠিকভাবে পালন করতেন তবে এ ছোট দেশে ১৯৯ টি কোম্পানি তো দূরের কথা শুধু ৯৯টি কোম্পানিও তাদের ব্যবসা পরিচালনা করতে পারার কথা না।তাদের ঘুম কবে ভাঙবে জানিনা, তবে তাদের ঘুম ভাঙার আগে সাধারণ মানুষ কি করতে পারে সেটা বলি…..
আমি সম্পূর্ণ নির্মোহভাবে ৮ টি কোম্পানির একটি লিস্ট দেই।আপনারা যারা চিকিৎসক নন তারা ওষুধ ক্রয়ের সময় লক্ষ্য রাখবেন যাতে আপনার ক্রয়কৃত ওষুধটি এই কোম্পানিগুলোর ভেতর থাকে।এই কোম্পানিগুলো সব ধোয়া তুলসী পাতা সেটা আমি বলি না, তবে এই কোম্পানিগুলোর ওষুধ প্রেসক্রাইব করে আমি পেশেন্ট রেসপন্স ভালো পেয়েছি, অন্য ডাক্তাররা তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করলে ভালো হতো ।যাই হোক, লিস্টটা এরকমঃ
1. Roche/Radiant pharma
2. Healthcare pharma
3.Sandoz
4.Sanofi Aventis
5. Square
6.Beximco
7.Incepta pharma
8.Reneta Ltd….

৮…..
এক দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে লেখাটা শেষ করি।এদেশে সত্যিকার দেশপ্রেমী লোকের সংখ্য নগণ্য।দুই-একজন ব্যতিক্রম ছাড়া এদেশকে নিয়ে আগেও কেউ ভাবেনি, এখনও কেউ ভাবেনা।যদি ভাবতো তবে এদেশে সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের এত সাফারিংস হতো না, ওষুধ খাতে এত নৈরাজ্যও আমাদের দেখতে হতো না…..
চিকিৎসক হিসেবে আমরা রোগ ডায়াগনোসিস করার চেষ্টা করি, ওষুধ প্রেসক্রাইব করি।কিন্তু যে ওষুধ আমরা প্রেসক্রাইব করি সেগুলো যদি আমাদেরকেই গ্রাস করে তবে আমরা কোথায় যাবো? ‘শর্ষে’ দিয়ে নাকি ভুত ছাড়ানো হয়।যদি ‘শর্ষে’র মাঝেই ভুতকে লুকিয়ে রাখা হয়, তবে সেই ‘শর্ষে’ দিয়ে আমরা করবো টা কি?……
মার্টিন লুথার কিং বলেছিলেন, “Our lives begin to end the day when we become silent about things that matter….” আমাদের আর চুপ থাকাটা কতটা শোভনীয়?….

শেয়ার করুনঃ Facebook Google LinkedIn Print Email
পোষ্টট্যাগঃ ঔষধ হউক জীবন রক্ষায়,

পাঠকদের মন্তব্যঃ ( 2)

  1. The second comment was may not be very justified. Cefixime and Ceftriaxone, both are 3rd generation cephalosporin. It has little coverage over Staphylococcus more on gram negative spectrum. The infection was possibly due to Staph that’s why it responded to Flucloxacillin.
    I fully agree with the his other points raised.




Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Advertisement
Advertisement
Advertisement
.