নামের সামনে ডা. বসিয়ে এবং নিজেদের ডাক্তার পরিচয় দিয়ে নজিরবিহীনভাবে চিকিৎসা দিচ্ছে বাংলাদেশী ফিজিওথেরাপিস্টরা। স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশে এলোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, ইউনানী এবং আযুর্বেদ চিকিৎসা পরিচালিত হয়। প্রত্যেক চিকিৎসা পদ্ধতি পরিচালনার জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি দ্বারা অর্ডিনান্সকৃত আইন রয়েছে। এরমধ্যে বাংলাদেশ হোমিওপ্যথিক প্রাকটিশনার অর্ডিন্যান্স ১৯৮৩ দ্বারা হোমিওপ্যাথ, বাংলাদেশ ইউনানী এন্ড আয়ুর্বেদীক প্রাকটিশনার অর্ডিন্যান্স ১৯৮৩ দ্বারা ইউনানী এবং আযুর্বেদ এবং বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০ দ্বারা এলোপ্যাথি চিকিৎসা পরিচালিত হয়। নামের আগে ডা. পদবী এবং নিজেকে “মেডিকেল ডাক্তার” হিসাবে কে কে পরিচয় দিতে পারবে সরকার কর্তৃক নির্দিষ্ট আইন দ্বারা তা উল্লেখিত রয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের জারিকৃত আইন অনুসারে কেবলমাত্র MBBS এবং BDS পাশকৃত চিকিৎসকগণ নামের আগে ডা. পদবী এবং পরে ডিগ্রী লেখার অনুমতি বহণ করেন। হোমিওপ্যাথ চিকিৎসকগণ “হোমিওপ্যাথ” পদবী ব্যবহার করবেন, ইউনানী চিকিৎসকগণ “তাবিব” বা “হাকিম” পদবী ব্যবহার করবেন এবং আয়ুর্বেদ চিকিৎসকগণ “বৈদ্য” বা “কবিরাজ” পদবী ব্যবহার করবেন। [সূত্র: হোমিও অর্ডিন্যান্স, ইউনানী এন্ড আয়ুর্বেদ অর্ডিন্যান্স ১৯৮৩]. ফিজিওথেরাপিস্টদের জন্য আলাদা কোন অর্ডিন্যান্স নেই এবং পদবী সংক্রান্ত কোন নির্দেশনা নেই। ফিজিওথেরাপীস্টদের অান্তর্জাতিক সংগঠন World Confederation for Physical Therapy এর ওয়েবসাইট থেকে জানা যায় বিশ্বজুড়ে এ পেশাজীবীদের “ফিজিক্যাল থেরাপিস্ট” বা “ফিজিওথেরাপিস্ট” নামে ডাকা হয়। পৃথিবীর কোন দেশেই ফিজিওথেরাপিস্টটা নামের আগে ডা. পদবী ব্যবহার করেন না। “পাশ্ববর্তীদেশ ভারতেও ফিজিওথেরাপিস্টরা ডা. পদবী ব্যবহার করে” – বাংলাদেশী ফিজিওথেরাপিস্টদের এমন দাবীর বিপরীতে কোন সত্যতা পাওয়া যায়নি। World Confederation for Physical Therapy এর নিবন্ধন অনুসারে ভারতীয় ফিজিওথেরাপিস্টরা “ফিজিওথেরাপিস্ট” পদবী নিয়েই সদস্যপদের জন্য আবেদন করেন। [সূত্রঃ WCPT ডাউনলোড লিংক] সরকারী কোন নির্দেশনা এবং অনুমতি না থাকলেও পৃথিবীর একমাত্র দেশ হিসাবে বাংলাদেশী ফিজিওথেরাপিস্টরা নামের আগে ডা. এবং পরে PT যোগ করে WCPT এর সদস্য হবার আবেদন জমা দেয়। সরকারী কোন প্রজ্ঞাপন ছাড়া আন্তর্জাতিক মহলে ডা. পদবীর এমন অবৈধ ব্যবহারে বিষ্মিত দেশের চিকিৎসকগণ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসা, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন) ডা. আবদুর রশিদ ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিষয়ের অধ্যাপক। তাঁর বক্তব্য অনুসারে, “মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) আইন অনুযায়ী, এমবিবিএস ও বিডিএস কোর্স সম্পন্ন করা ছাড়া অন্য কেউ নামের আগে ডাক্তার লিখতে পারবেন না। কিন্তু ফিজিওথেরাপিস্টরা নামের আগে ডাক্তার লেখেন। তারা ডাক্তারদের সমমর্যাদা চান। এটা হতে পারে না।” [সূত্র: সমকাল]
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. মঈনুজ্জামান বলেন, “ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার সঙ্গে যুক্তরা কেউ এমবিসিএস কোর্সে পড়াশোনা করেননি। তারা ফিজিওথেরাপি কোর্সে পড়াশোনা করেছেন। এই কোর্স থেকে পাস করে বেরিয়ে নিজেকে ডাক্তার দাবি করা অনৈতিক।” [সূত্র: সমকাল]
বিএমডিসি সূত্রে জানা যায়, পৃথিবীর অনেক দেশে Doctor শব্দটি Noun বা কমনটার্ম হিসাবে ব্যবহৃত হয় এবং চিকিৎসা দেয় (হোমিও, আয়ুর্বেদ, কবিরাজ) এমন সবাইকেই Doctor বলা হয়। পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে এই নীতি অনুসারণ করা হয়। তবে বাংলাদেশের বিষয় ভিন্ন। বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে কে কে “Dr.” টাইটেল ব্যবহার করতে পারবেন যা একটি পেশাগত পদবী কোন কমনটার্ম নয় যে যার খুশি সে ব্যবহার করতে পারবে।
বিএমডিসির সূত্রানুসারে, প্রত্যেক দেশের আইন আলাদা। অন্য দেশের মেডিকেল কাউন্সিল কাকে কে কি উপাধী দেয় তা এদেশের জন্য প্রযোজ্য নয়। এদেশের সরকারী আইনে যা আছে সেটাই এদেশের প্রাকটিশনারদের জন্য প্রযোজ্য। এমনকি বিদেশ থেকে অর্জিত ডিগ্রীও এদেশে পেশাগত কাজে ব্যবহার করতে চাইলে বিএমডিসির অনুমোদন ছাড়া অবৈধ, সেটা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জিত ডিগ্রী হলেও।
জানা যায়, ১৯৬০ সালে অধ্যাপক আবুল হোসেনের হাত ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে স্বতন্ত্র পেশা হিসেবে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা পেশা আত্মপ্রকাশ করে। ওই বছরই রাজধানীর সেগুনবাগিচায় প্রথম প্রতিবন্ধী শিশুদের পুনর্বাসনের জন্য ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে অর্থোপেডিকস বিশেষজ্ঞ ডা. আর জে গারস্ট যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ফিজিওথেরাপি বিভাগ ও স্নাতকোত্তর অর্থোপেডিকস কোর্সের সঙ্গে ফিজিওথেরাপি বিষয়ে স্নাতক কোর্স চালু করেন। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারিভাবে দেশের সাতটি প্রতিষ্ঠানে ফিজিওথেরাপি বিষয়ে স্নাতক কোর্স চালু আছে। এসব প্রতিষ্ঠানে দুই হাজার শিক্ষার্থী ও প্রায় তিন হাজার পেশাদার স্নাতক ফিজিওথেরাপিস্ট রয়েছেন।
ইন্ডিয়াতে নাকি ব্যবহার হয়!