শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩, ২০ রবিউস সানি ১৪৪৮
Sponsored
▶
ADVERTISEMENT
Image • Video • Banner Demo Area
সংবাদ

দুই কিংবদন্তী চিকিৎসক শিক্ষক ও আমি

সংসারের নানা ঝক্কি-ঝামেলা সয়ে, বলতে গেলে একটু বেশি বয়সেই গিয়েছিলাম পিজি’তে (এখনকার বি,এস,এম,এম,ইউ,) এনেসথেসিয়ায় এম,ডি, করতে।
৩য় পর্বের (থিসিস পার্ট)শেষ দিকে থাকাকালীন একাডেমিক রুটিন অনুযায়ী ‘বাই রোটেশন’ পাঠানো হয় পিজির মেডিসিন বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট, মহাখালি বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ইত্যাদি’তে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য। রোটেশন পেয়ে আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। পি,জি’র এনেসথেসিয়া ও আই,সি,ইউ,’র একঘেয়ে, কষ্টকর ‘নাইট’ থেকে কিছুদিনের মুক্তিতে আমরা খুশী (যদিও ব্যাজার মুখ হলেন আমাদের রুটিন বানানোর দায়িত্বে থাকা শ্রদ্ধেয় কনসাল্টেন্টগন)। আমি এই ‘প্লেসমেন্ট’টা পুরোপুরি কাজে লাগাতে আপ্রাণ চেষ্টা করলাম। ‘কোর্স কো-অর্ডিনেটর’ এর নির্দেশ মতো একটা ‘লগবুক’ও তৈরী করে ফেললাম।

পিজি’তে তখন মেডিসিনের হেড ছিলেন প্রফেসর এম,এন, আলম স্যার আর উনার এসোসিয়েট ছিলেন এবিএম আবদুল্লাহ স্যার। এম,এন,আলম স্যারকে বলা হয় ‘সেকেন্ড নুরুল ইসলাম’।আর চিকিৎসক হিসেবে আবদুল্লাহ স্যারের খ্যাতি তো এখন দেশে বিদেশে। আন্ডার গ্রাজুয়েটে এম, এন, আলম স্যার এস,এস, এম, সি’তে আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। আবার উনাকে এখানে পেয়ে আমি যারপরনায় প্রীত। দুইজন মহাজ্ঞানী লোকের মাঝে এমন সুন্দর শ্রদ্ধাপূর্ণ সমঝোতা আমি আগে কমই দেখেছি। দুইজনই মানুষ হিসেবে মহান। নিরহংকারি, সাদাসিধে, জ্ঞানপিপাসু, ডাক্তার ও শিক্ষক।

আব্দুল্লাহ স্যারের পড়ানোর স্টাইলটা ফাঁকিবাজদের ভাল্লাগবেনা। অনবরত নূতন নূতন পয়েন্ট বলে পড়িয়ে যান, সাথে পড়া ধরেন। কারো নিস্তার নেই। মেডিসিনের পোলাপানও (এম,ডি, এফ,সি,পি, এস,) কম যায় না। কয়েকজন তো সাথে সাথে প্রশ্নের ঝটপট উত্তর দিয়ে দেয়।পরে জেনেছি ওরা স্যারের বই পড়ে।

মেডিসিন ‘কমন’ এমন ডিসিপ্লিনের ছেলে মেয়েরা আব্দুল্লাহ স্যারের ক্লাশ করার জন্য পাগল হয়ে থাকতো।আমি প্রশ্নের জ্বালায় ক্লাশে যেতে লজ্জা পেতাম কিন্তু এমন জ্ঞানগর্ভ ক্লাস ‘মিস’ করতেও মন চাইতো না। একদিন স্যারের এমন এক টিউটোরিয়েল ক্লাসে ‘লেট’ করে ঢুকলাম (ঢুকবো কি ঢুকবো না দ্বিধায় ছিলাম)। দেখি পড়া ধরা হচ্ছে। প্রমাদ গুনলাম। পড়বি তো পড় মালির ঘাড়ে!

“আপনি বলেন!”
“কি স্যার?” আমতা আমতা করে আমি একটু ধাতস্থ হতে সময় নেই।”
“লিউকোনাইকিয়া’র কারণ।”
“এটা একটা প্রিকেনসারাস কন্ডিশন, টাংগ, লিপ্স,ভালভা…।”

হো হো করে হেসে উঠলো সারা ক্লাস।আমি মারাত্মক ব্লান্ডার করে, বোকা বনে চুপ মেরে গেলাম। এমন উল্টা-পাল্টা উত্তর বলে বা লেখে আগেও রাম- ধরা খেয়েছি। পরীক্ষায় এসেছে ‘ ব্রাকিয়েল প্লেক্সাস’। আমি খাতায় সুন্দর ছবি এঁকে, ডেভেলাপমেন্ট সহ ‘ব্রানকিয়েল আর্চ’ লেখে ফেলেছি। ধরা পড়ে রিভিশন দিতে গিয়ে!

“আপনি কোন ডিপার্টমেন্টের?”
“এনেসথেসিয়া স্যার।”
“ওহ! মেডিসিন না। তাইলে চিন্তা নাই, চলবে। পড়তে হবে।”

তিনি এখন একে একে সবাইকে প্রশ্ন ধরলেন। যে না পারে তার পরের জনকে জিজ্ঞেস করেন। সেও না পারলে সবার কাছে ‘থ্রো করেন। এভাবে অনেক অসুখের নাম বলা হলো। মাথার চুল ছিড়তে ইচ্ছে করছে। প্রায় সবই আমার জানা।

“এগুলো ছাড়া আর কেউ কিছু বলবেন?”

হাত উঠালাম। এতোক্ষণে ব্রেন ‘স্পার্ক’ করছে।

“সাইকোজেনিক স্ট্রেসেস, জিংক ডিফেসিয়েন্সি, রেয়ার সাইড এফেক্টস অফ সিস্টেমিক কেমোথেরাপি।”
“ভেরি গুড! আগে কি ঘটেছিলো?
“লিউকোপ্লাকিয়া ভেবেছিলাম স্যার”
“পরীক্ষার হলে সাবধানে দেখে বা শুনে জবাব দেবেন।”

পরে একদিন সুদে আসলে সারা ক্লাসের বিদ্রুপের জবাব দিয়ে ছিলাম।

“কার্ডিওমায়োপ্যাথি’র রোগী। ট্রিটমেন্ট?”

ছেলে-মেয়েরা ঠাস ঠাস করে বলে যাচ্ছে। শেষ হলো সার্জারি দিয়ে (সেপটাল মাইয়েকটোমি)।

“অপারেশনের কন্ট্রেইন্ডিকেশন?”

দুই একজন কিছু বললো যা স্যারের মন:পূত হলো না। সারা ক্লাস চুপ।

“মাইয়োকার্ডাইটিস?”

আমি ভয়ে ভয়ে বলি, কারণ স্যার কোনটা মনে ধরে বসে আছেন কে জানে?

“আমাদের সাথে এমন ব্রিলিয়ান্ট এনেসথেসিওলজিস্ট থাকলে অপারেশনে ভয় কি?”
স্যারের হৃদয় উজাড় করা প্রশংসা।

প্রতিদিন দুই জাঁদরেল স্যারের একসাথে রাউন্ড ও অনেক উঁচুমাত্রায় ‘কেস ডিসকাশন’ আমরা মনোযোগ দিয়ে উপভোগ করি।
একদিন রাউন্ডে আমরা একজন মহিলাকে পেলাম কোট্রাইমোক্সাজল হাইপারসেন্সিটিভিটির (Stevens- Johnson Syndrome) মারাত্মক উপসর্গ নিয়ে। বিভৎস তার চেহারা। সারা শরিরের চামড়া ও মিউকাস ‘ব্লিস্টার’ পূর্ণ, যার কোন কোনটা বিশ্রিভাবে ‘ব্লিডিং ও ওজিং’। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা রোগীর মুখমন্ডল।গলা, নাক,মুখ, ঠোট দগদগে ঘাতে পরিপূর্ণ। ‘এটেন্ডিং’ ডাক্তার তাকে ‘এঞ্জিও টিউব’ ও আই, ভি, ‘ক্যানুলা’ দিতে পারেন নি।
প্রফেসর সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন,
“কি করা যায় বলুনতো?”
“স্যার, অনুমতি দিলে আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি।”

আমি পেছন থেকে আওয়াজ দেই।

“পারবেন আপনি? দেখুন চেষ্টা করে।
নাহলে তো রোগীর ‘নিউট্রিশন’ ও ‘ফ্লুইড বেলানস’ ঠিক রাখা মুশকিল। ব্লাড ট্রান্সফিউশনও লাগবে।”

“ইনশাল্লাহ পারবো স্যার।”

ওয়ার্ডে যন্ত্রপাতি কিছুই পেলাম না (আশাও করিনি)। চলে গেলাম দশ তলায় আমাদের ডিপার্টমেন্টে। এঞ্জিও দিয়ে দিলাম অল্প চেষ্টাতেই। ড্রেসিং দিয়ে তাতে ‘ফিক্স’ করলাম। ক্যানুলা দেবার সব ‘পেরিফারেল ভেইনে’র উপরের ত্বকেই ঘা।সেন্ট্রাল ভেইনের ও একই অবস্থা। সেই সময় সি, ভি, ক্যানুলা সহজলভ্য ছিলোনা দেশে। অনেক ভেবে অবশেষে ডানদিকের ‘ইন্টারনাল জাগুলার ভেইনে’ একটা ১৮ জি(সবুজ) আই, ভি, ক্যানুলা সহজেই ঢুকানো গেলো। ‘ফিক্স’ করলাম ‘সাবকিউটেনিয়াসলি’ কেনুলার দুই পাখার ছিদ্র বরাবর ‘সার্জিকেল সুচার’ দিয়ে। ‘গজ-ব্যান্ডেজ দিয়ে সুন্দর ড্রেসিং করে দিলাম।

দুইদিন পরে ডিপার্টমেন্টে আমাদের হেড, প্রফেসর কে,এম, ইকবাল স্যার ডেকে পাঠালেন।

“প্রফেসর এম,এন,আলম আপনার ‘এক্সসিলেন্ট’ কাজের জন্য প্রশংসা করেছেন। আমার মাধ্যমে আপনাকে তার ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। ওয়েল ডান ডক্টর। আমি নিজেও গর্বিত।”
লজ্জিতভাবে আমি বলি,
“স্যার, নো মেনশন প্লিজ! দোয়া করবেন।”

হায় প্রিয় স্বদেশ! কি লজ্জার বিষয়! বাংলাদেশের চিকিৎসা জগতের এই দুই ‘জীবন্ত কিংবদন্তি পুরুষ’ এর বিরুদ্ধে আজ কিছু গন্ডমূর্খ এনেছে “ভুল চিকিৎসা”র অপবাদ।তাদের বিরুদ্ধে করেছে “রোগী মারার” কেস! আরে অর্বাচীনের দল।

লিখেছেন:
প্রফেসর ডা. মো: রফিকুল ইসলাম
জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

সাম্প্রতিক সংবাদ

[bd_prayer_times]

সম্পর্কিত সংবাদ

World Health Organization

কলেরা, মেনিনজাইটিস ও প্লেগের সর্বশেষ বৈশ্বিক প্রবণতা প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

প্ল্যাটফর্ম প্রতিবেদক: এস এম এম মুসাব্বির উদ্দিন বিশ্ব  স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী কলেরায় মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে প্রতিবেদন করা কলেরা আক্রান্তের সংখ্যা কমেছে। সর্বশেষ Weekly Epidemiological Record-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কলেরায় মৃত্যুর সংখ্যা ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালে

বিস্তারিত পড়ুন
ফাইল ছবি
আন্দোলন

বিসিএসের বয়সসীমা ৩৪ করা ও নতুন পে-স্কেলের আলোকে ভাতা বৃদ্ধিসহ ৫ দফা দাবিতে চিকিৎসকদের মানববন্ধন

বিসিএসের বয়সসীমা ৩৪ নির্ধারণ করে ঘোষিত ৫১তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার সংশোধিত সার্কুলার জারি, নতুন পে-স্কেলের সমন্বয়পূর্বক রেসিডেন্সি, এফসিপিএস, ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের ভাতা বৃদ্ধিসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছেন চিকিৎসকগণ এবং ডক্টরস মুভমেন্ট ফর জাস্টিস (ডিএমজে)। আজ সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধনে এ দাবি

বিস্তারিত পড়ুন
রোগ বিষয়ক তথ্য

বিষাক্ত বালাইনাশক প্যারাকোয়াট আমদানি বন্ধ, তবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি গ্লাইফোসেট নিয়ে

রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিষাক্ত বালাইনাশক প্যারাকোয়াট গ্রুপের আমদানি, নতুন নিবন্ধন ও লাইসেন্স নবায়ন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রাখা সিদ্ধান্ত নিয়েছে বালাইনাশক কারিগরি উপদেষ্টা কমিটি। দেশে মজুত থাকা প্যারাকোয়াট গ্রুপের বালাইনাশক ছয় মাসের মধ্যে শূণ্য করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে গ্লাইফোসেট নিয়ে তেমন কোনো সিদ্ধান্ত আসি নি। চলুন আমরা জানি প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধ

বিস্তারিত পড়ুন
প্রথম পাতা

বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে বিনামুল্যে ৬ টি সফল লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্পন্ন, প্রস্তুত আরও ৪ টি

২৩ সেপ্টেম্বর, বুধবার, ২০২৬ বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হস্পিটালে বিনামূল্যে ছয়টি লিভার (যকৃত) প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। এখন থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়মিত এই জটিল অস্ত্রোপচার করা হবে। বছরে অন্তত ২৪টি লিভার প্রতিস্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আজ মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এফ এম

বিস্তারিত পড়ুন
ডেঙ্গু

ঢাকা শহর ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত, মানুষ সচেতন হলে ঢাকা শহর সুস্থ হবে

মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ঢাকা শহরে ডেঙ্গু এখন আর শুধু একটি মৌসুম নয়, এটি একটি জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর বর্ষা ও বর্ষা পরবর্তী সময়ে রাজধানীতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দ্রুত নগরায়ন, জনসংখ্যা ঘনত্ব বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগর পরিকল্পনা, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জমে থাকা পানিতে এডিস

বিস্তারিত পড়ুন
প্রথম পাতা

দেশে প্রথমবারের মতো ‘ইমোশনাল ডোনার’ এর মাধ্যমে কিডনি প্রতিস্থাপন করলো বিএমইউ

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দেশে প্রথমবারের মতো ‘ইমোশনাল ডোনার’ বা আবেগগতভাবে সম্পৃক্ত স্বেচ্ছাদাতার মাধ্যমে সফলভাবে কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ)। এর মধ্য দিয়ে দেশে কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে নতুন একটি সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালে বিএমইউতে

বিস্তারিত পড়ুন

One thought on “দুই কিংবদন্তী চিকিৎসক শিক্ষক ও আমি”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

🔔 নোটিফিকেশন
নতুন খবর ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট পেতে নোটিফিকেশন চালু করুন।