২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ; শনিবার
নরসিংদী-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও নবনিযুক্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর দিনই নরসিংদীতে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার দপ্তরে বসার প্রথম দিনই তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে মেডিকেল কলেজের প্রয়োজনীয়তা, যৌক্তিকতা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চিকিৎসা শিক্ষা-১ শাখা থেকে জারি করা এক পত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
গতকাল শুক্রবার নরসিংদীর মনোহরদীতে নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “নরসিংদীতে একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি। আপনারা দোয়া করবেন দ্রুত মেডিকেল কলেজ নরসিংদীতে করতে পারি। এ ছাড়া দেশে আরও যেখানে যেখানে মেডিকেল কলেজ দরকার হবে সবখানে করা হবে। নরসিংদীর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল দ্রুত চালু ও দুটি আইসিইউ ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এলাকাসহ সাত জেলায় নতুন সরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের আবেদন এসেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আবেদনের ভিত্তিতে বিষয়গুলো যাচাই করছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে দুটি জেলায় সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী নরসিংদী, ঠাকুরগাঁও, শেরপুর, লক্ষ্মীপুর, ভোলা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও মুন্সীগঞ্জ— এই সাত জেলায় মেডিকেল কলেজ স্থাপনের দাবি জানিয়ে আবেদন করা হয়েছে। এর মধ্যে মুন্সীগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন ও সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বাকি জেলাগুলোর প্রক্রিয়া চলমান। প্রস্তুতি ছাড়া অনুমোদন নয়
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, যেসব জেলায় মেডিকেল কলেজ নেই, সেসব জেলা থেকে জনপ্রতিনিধিরা আবেদন করেছেন। অধিদপ্তর মাঠপর্যায়ে যাচাই-বাছাই করে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দিচ্ছে।
তিনি জানান, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার আবেদনটি মন্ত্রী নিজে করেননি। অন্য জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে এসেছে। তিনি আরও বলেন, অতীতে প্রস্তুতি ছাড়া যেভাবে বিভিন্ন জেলায় মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা হয়েছিল, এবার সে ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পরই নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হবে।
শিক্ষক সংকটে নড়বড়ে শিক্ষা
দেশে বর্তমানে ৩৭টি সরকারি ও ৭২টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ৩৭টি মেডিকেল কলেজে অনুমোদিত ছয় হাজার ৪৪৬টি পদের মধ্যে দুই হাজার ৭০০টি পদ শূন্য অর্থাৎ ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ চিকিৎসক (শিক্ষক) পদ খালি। অধ্যাপক পদে শূন্যতার হার ৬৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ, যা সবচেয়ে বেশি।
নতুন কলেজ স্থাপনের উদ্যোগের পাশাপাশি বিদ্যমান কলেজগুলোর মান ও শিক্ষক সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে চিকিৎসা শিক্ষার গুণগত মান আরও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন কমিটির চেয়ারম্যান ডা. রশিদ-এ-মাহবুব বলেন, শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। এটি সমাধান না করে নতুন কলেজ অনুমোদন দিলে দক্ষ চিকিৎসক তৈরি হবে না। তাঁর ভাষায়, একটি মানহীন মেডিকেল কলেজ শুধু নিম্নমানের চিকিৎসকই তৈরি করে না; এতে ভবিষ্যৎ কয়েক দশক ধরে রোগীরা ঝুঁকিতে থাকেন।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন মেডিকেল চিকিৎসা শিক্ষার মান উন্নয়নে পরিকল্পনা নেওয়া হয়। শুরুতে মানহীন মেডিকেল কলেজ বন্ধের পরিকল্পনা থাকলে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে ওই সরকার। পরে মানহীন প্রতিষ্ঠানের মান উন্নয়নে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। কার্যকর উদ্যোগের মধ্যে সরকারি-বেসরকারি মিলে ৫ শতাংশ আসন সংখ্যা কমাতে পেরেছে। এর বাইরে দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন চোখে পড়েনি।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের পর নির্মিত মাগুরা, নীলফামারী, হবিগঞ্জ, চাঁদপুর, নওগাঁ ও নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজের মান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এসব কলেজের অনেকগুলোর স্থায়ী ক্যাম্পাস নেই, হাসপাতালের সঙ্গে পূর্ণ সংযুক্তিও হয়নি, রয়েছে শিক্ষক সংকট। এগুলো বন্ধে আলোচনা ছিল।
গত ১ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জে একটি নতুন সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপনের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। অবকাঠামো উন্নয়ন শেষ হলে একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর অনুমতি দেওয়া হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া গত বছরের ৯ নভেম্বর ঢাকার জুরাইনে অবস্থিত ব্যারিস্টার রফিক-উল হক মেডিকেল কলেজ নামে একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজকে ৫০ শিক্ষার্থী নিয়ে পাঠদান শুরুর অনুমোদন দেয় সরকার।
