• প্রতিবেদন

October 21, 2017 12:07 pm

প্রকাশকঃ

294549_633968744161398750
ছোট্ট শিশু আশা। বয়স ৪৫ দিন। সকালের নাস্তা শেষ করেই বাবা-মা প্রস্তুত হচ্ছেন। আজ যে তাদের আসার টিকা দেয়ার দিন। সকালেই এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। যে করেই হোক পৌঁছুতে হবে টিকা দান কেন্দ্রে। এভাবেই সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) পৌঁছে গেছে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে। প্রথমদিকে যক্ষা, পোলিও, ডিপথেরিয়া, টিটেনাস, হুপিংকাশি ও হামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেও পরবর্তীতে হেপাটাইটিস বি (২০০৪), নিউমোনিয়া (২০০৯) ও মেনিনজাইটিস (মস্তিষ্কে প্রদাহ) এর বিরুদ্ধে শক্ত দেয়াল গড়ে তুলেছে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি। যেখানে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের মাত্র ৬৮ ভাগ জেলায় টিকাদান কর্মসূচি পৌঁছেছে ৮০ ভাগ, সেখানে বাংলাদেশের প্রত্যেক জেলায় এই কর্মসূচি পৌঁছে গেছে ৯০ ভাগের উপর। এর স্বীকৃতি স্বরূপ দুই দুইবার (২০০৯ ও ২০১২) “GAVI Best Performance Award” পেয়েছি আমরা।

হেপাটাইটিস বি ভাইরাস

একজন শিশু-লিভার এর চিকিৎসক হিসেবে আমার দৃষ্টি সবসময় হেপাটাইটিস বি টিকার দিকে। আমি এমন একটি মরণব্যাধি ভাইরাসের কথা বলছি যেটা একবার যদি শরীরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে, এমন কোনো চিকিৎসাই এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি যা হেপাটাইটিস বি এর মূল উৎপাটন করতে পারে। আমরা শুধু দমিয়ে রাখতে পারি মাত্র, তাও সব সময় নয়। পৃথিবীতে প্রতিবছর ৮,৮৭,২২০ জন মানুষ মৃত্যুবরণ করে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস জনিত জটিলতায়। কাজেই এর চিকিৎসা থেকেও অনেক অনেক জরুরি হচ্ছে প্রতিরোধক টিকা।

হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের সংক্রমণ। কিভাবে ছড়ায় এই বিপদজনক ভাইরাস?

আমরা সবাই জানি অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক ও এই ভাইরাস যুক্ত রক্ত-সঞ্চালনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে নিমেষে। তবে প্রাপ্তবয়স্কদের শরীরে এর নিবাস এত সহজ নয়। প্রায় ৯০ ভাগ ক্ষেত্রেই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিজ থেকেই ভাইরাস এর বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে; একে বলা হয় Natural Immunity. আর যেটা নিয়ে আমাদের মাঝে আলোচনা কম, সেটা হলো মা থেকে বাচ্চাতে সংক্রমণ। মা এর শরীরে যদি হেপাটাইটিস বি এর অস্তিত্ব থাকে তাহলে তা সহজেই বাচ্চাতে সংক্রমিত হতে পারে এবং ৯০ ভাগ ক্ষেত্রেই স্থায়ীভাবে (Chronicity) বসবাস শুরু করে। এদের প্রায় ২৫ ভাগ ভবিষ্যতে লিভার এর কর্মক্ষমতা কমে গিয়ে অথবা ক্যান্সারজনিত সমস্যায় আগেই মৃত্যুবরণ করে। জন্মের পর পরই প্রথম ডোজ ছাড়া এ সংক্রমণ রোধ করা সম্ভব নয়।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন ও আমাদের টিকার সময়সূচিঃ

জন্মের সময় ও জন্ম পরবর্তী সময়ে সংক্রমণ, এ দুটো বিষয়কে মাথায় রেখেই আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো টিকার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। The Advisory Committee on Immunization (ACiP), American Academy of Pediatrics (AAP), American College of Family Physicians (ACFP), American College of Obstetricians & Gynecologist (ACOG), Hepatitis B Vaccination for Australia, Asian Liver Centre, National Immunization Schedule in India, World Health Organization (WHO), WHO SEAR (South East Asian Region), Centre for Disease Control & Prevention (CDC) সহ অনেক আন্তর্জাতিক সংগঠনের মতে, ২৪ ঘন্টার মধ্যেই অথবা মা হাসপাতাল থেকে ছুটির আগেই নবজাতক পাবে এই টিকার প্রথম ডোজ। তারপর প্রথমটি থেকে ১ মাস (দ্বিতীয়) ও ৬ মাস (তৃতীয়) পর অথবা এক মাস পর পর দিতে হবে তিনটি ডোজ। বিশ্বের সকল উন্নয়নশীল (ভারত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর) ও উন্নত ( যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ) দেশগুলো এটা অনুসরণ করলেও আমরা কিন্তু এখনো জন্মের পর এই টিকা শুরু করতে পারিনি। ছয় সপ্তাহ বয়স থেকে ১ মাস পর পর আমরা হেপাটাইটিস বি এর ৩ টা টিকা দিয়ে থাকি। এ বয়স থেকে টিকা শুরু করলে ভবিষ্যতের সংক্রমণ রোধ করা সম্ভব, মা থেকে নয়। আর জন্মের সময় মা থেকে যদি আগেই সংক্রমিত হয়ে যায়, তাহলে পরবর্তীতে টিকা দেয়ার কার্যকারিতা থাকবে না বললেই চলে।

হেপাটাইটিস বি প্রবন অঞ্চলঃ

হেপাটাইটিস বি এর প্রাদুর্ভাবের (Prevalence) উপর নির্ভর করে পুরো পৃথিবীকে WHO ৩টি ভাগে ভাগ করেছে। যেসব অঞ্চলে Prevalence ৮ ভাগের উপর উচ্চ হেপাটাইটিস বি প্রবন অঞ্চল, ২-৮ ভাগ হলে মধ্যম এবং ২ ভাগের কম হলে নিম্ন হেপাটাইটিস বি প্রবন অঞ্চল বলা হয় থাকে। উচ্চ ও মধ্যম হেপাটাইটিস বি প্রবন অঞ্চলে মা হতে বাচ্চার মধ্যে সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে সবচাইতে বেশি। এ কারণেই এসব অঞ্চলে জন্মের ডোজের গুরুত্ব অপরিসীম। ২০১১ সালের আগে পর্যন্ত বাংলাদেশ ও ভারত উভয়েই মধ্যম হেপাটাইটিস বি প্রবন অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। উক্ত বছর থেকে উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে ভারত এখন আগের সময়সূচির পাশাপাশি জন্মের ডোজ যুক্ত করেছে। ফলশ্রুতিতে ২০১৫ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (Lancet) প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভারত নিম্ন হেপাটাইটিস বি প্রবন অঞ্চলে (১.৪৬%) উন্নীত হয়েছে, আর বাংলাদেশ মধ্যম হেপাটাইটিস বি প্রবন অঞ্চলেই (৩.১০%) রয়ে গেছে।

গর্ভবতী মা ও হেপাটাইটিস বি ভাইরাসঃ

উত্তর ভারতে ২০১১ সালে হেপাটাইটিস বি দ্বারা আক্রান্ত গর্ভবতী মা ছিল ৩.৭ ভাগ। বর্তমানে ২০১৭ সালে এসে সেটা হয়েছে ১-২ ভাগ। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ভারত থেকে খুব অভিন্ন নয়। বর্তমানে বাংলাদেশে ১০ মিলিয়ন মানুষ হেপাটাইটিস বি দ্বারা আক্রান্ত। প্রায় ১৮০০ পাবলিক হাসপাতালে গর্ভবতী মহিলাদের উপর চালানো সমীক্ষায় দেখা গেছে ৩.৫ ভাগ মা হেপাটাইটিস বি দ্বারা আক্রান্ত (Rumi et al. 1998). গাইবান্ধায় আরেকটি সমীক্ষায় ২১.৫ ভাগ মার শরীরে হেপাটাইটিস বি এর Core Antibody এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে (Aktaruzzaman et al. 2011). রাজশাহীর আরেকটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, মা থেকে নবজাতকে সংক্রমণের হার ৪৩.৩ ভাগ। ২০১৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্যবিদ্যালয়ের রক্ত সঞ্চালন বিভাগের বিভিন্ন সমীক্ষায় পাপ্ত ফলে দেখা যায়, ওই সময়ে যারা রক্ত দিতে এসেছিল তাদের রক্তে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের Core Antibody ছিল শতকরা ২০.৬ ভাগ এবং ১১.৭ ভাগ। এতে বোঝা যাচ্ছে ২০১৬ যে এসেও আমরা অনেকজন হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের মুখোমুখী হচ্ছি। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, EPI কর্মসূচিতে হেপাটাইটিস বি যুক্ত হয়েছে ২০০৪ সালে। আর এখন যারা মা হচ্ছেন তাদের অধিকাংশই কিন্তু হেপাটাইটিস বি এর টিকা পাননি। অনেকেই হয়তো বলবেন তখন নিজস্ব উদ্যোগে অনেকেই এই টাকা নিয়েছেন, তবে বাস্তবতা হলো ঢাকার বাইরে মফস্বলের এক বিরাট জনগোষ্ঠী রয়ে গেছে এ সুবিধার বাইরে।

হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের স্ক্রিনিং (HBsAg)-ঃ

সবাই হয়তো বলবে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের স্ক্রিনিং (HBsAg) তো গর্ভবতী মায়েদের করাই হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, সবার কি আদৌ করা হচ্ছে? আর যাদের করা হচ্ছে তাদের পরীক্ষা পদ্ধতি ELISA নয়, স্ট্রিপ (বিশেষ করে ঢাকার বাইরে). ELISA পদ্ধতিতে প্রাপ্ত ফলাফল গুনাগুনসম্পন্ন হওয়ায় তা অন্তর্জাতি ভাবে স্বীকৃত। অপরদিকে স্ট্রিপ এর ফলাফল এ বহুলাংশে ফলস পজিটিভ অথবা ফলস নেগেটিভ হবার সম্ভাবনা থেকে যায়। এক একটি ELISA মেশিন অনেক ব্যায়শাপেক্ষ হওয়ায় ঢাকার বাইর মফস্বলে মাত্র ৩০ টাকার স্ট্রিপ এ এক একজন গর্ভবতী মার হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের ভাগ্য নির্ধারিত হয়।

লুকায়িত হেপাটাইটিস বি ভাইরাসঃ

হেপাটাইটিস বি ইনফেকশনের কিছু নিৰ্দিষ্ট সময় যেমন Incubation Period (ইনফেকশন শুরুর প্রাথমিক পর্যায়), Window Period (একটি নির্দিষ্ট সময় যখন হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ভেতরে থেকেও HBsAg এর ফলাফল নেগেটিভ দেখাবে), Occult infection (হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের সংখ্যা ১০০০ কপি/মিলি এর নিচে থাকলে HBsAg এর ফলাফল নেগেটিভ দেখাবে এবং Mutant to surface antigen (প্রায় ১০ ভাগ মানুষের জিন এমনভাবে তৈরি যে HBsAg এর ফলাফল সবসময় নেগেটিভ দেখাবে) হলে বি ভাইরাস ভেতরে থেকেও নেগেটিভ ফলাফল আসবে। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, আগে মনে করা হতো হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের DNA সংখ্যা ১ লাখ কপি/মিলি না হলে মা থেকে বাচ্চার শরীরে প্রবেশ করবে না। কিন্তু ভারত, জার্মানি সহ বিভিন্ন দেশের সমীক্ষায় দেখা গেছে, HBsAg নেগেটিভ হয়েও শূধুমাত্র কোর এন্টিবডি এবং DNA পজিটিভ হওয়ার কারণে মা থেকে বাচ্চার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে এই ভাইরাস। কাজেই আমরা অনবরত হেপাটাইটিস বি ভাইরাস মিস করছি নাতো? জন্মের সময় একটি ডোজ কমিয়ে দিতে পারে ৮০ ভাগ সংক্রমণ।

জন্মের ডোজের পক্ষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শক্ত অবস্থানঃ

এ বছর জুলাই মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের অবস্থান আরো দৃঢ় করেছে। জন্মের ২৪ ঘন্টার মধ্যেই দিতে হবে প্রথম ডোজ। আর কোনো কারণে যদি তা সম্ভব না হয়, স্বাস্থ্যকর্মীর সংস্পর্শে আশা মাত্রই প্রথম ডোজ নিশ্চিত করতে হবে। এরপর পরবর্তি টিকাগুলো পূর্বের সময়সূচী অনুযায়ী চলবে।
জন্মের ডোজ শুরুর ক্ষেত্রে প্রধান বাঁধা ।
বাংলাদেশের নবজাতকের একটি বড় অংশ ডেলিভারি হয় বাড়িতে। আবার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত টিকাদানকর্মী এবং টিকার শীতল বন্ধন বা Cold Chain (২-৮ ডিগ্রির মধ্যে) ঠিকভাবে বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে ভারতকে আমরা অনুসরণ করতে পারি। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি প্রথমদিকে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারির ক্ষেত্রে জন্মের ডোজ শুরু করা যেতে পারে।

জন্মের সময় একই সাথে বিসিজি, হেপাটাইটিস বি দেয়া ও পোলিও টিকা খাওয়ানো সম্ভব?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিশ্চিত করেছে, একই সাথে জন্মের সময় এই তিনটি টিকা যথেষ্ট নিরাপদ এবং রোগ প্রতিরোধ শক্তি গড়ার ক্ষেত্রে একটি আরেকটিকে প্রভাবিত করে না।

সকলের পর অনুরোধ
এ বছরের বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের স্লোগান ছিল “Eliminate Hepatitis” (হেপাটাইটিস সমূলে উৎপাটন করা)। টেকসই উন্নয়নের লক্ষমাত্রা (২০৩০ সাল) অর্জনে হেপাটাইটিসের বিরুদ্ধে
যুদ্ধে জয়ী হওয়াও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। জন্মের ২৪ ঘন্টার মধ্যে হেপাটাইটিস বি এর টিকা শুরু না করলে কোনোটাই ফলপ্রসূ হবে না। এই টিকার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকেই একটু ভেবে দেখার অনুরোধ রইলো।

……………………
লিখেছেনঃ

22540143_1182295555203397_8405752693198909586_n
ডাঃ সালাহউদ্দিন মাহমুদ
সহকারী অধ্যাপক
শিশু পুষ্টি, লিভার ও পরিপাকতন্ত্র বিভাগ
ঢাকা শিশু হাসপাতাল

শেয়ার করুনঃ Facebook Google LinkedIn Print Email
পোষ্টট্যাগঃ

পাঠকদের মন্তব্যঃ ( 0)




Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Advertisement
Advertisement
Advertisement
.