সিজারিয়ান অপারেশন-বাংলাদেশ মিথ

3
নিউজটি শেয়ার করুন

বেশ কিছুদিন ধরেই দেখছি বাংলাদেশে সিজারিয়ান অপারেশন এর হার নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও ফেসবুকে অনেক নেতিবাচক কথাবার্তা চলছে। বলা হচ্ছে সারা বিশ্ব যখন সিজারিয়ান অপারেশন এর হার কমিয়ে ফেলেছে, উন্নত দেশগুলো যেখানে সিজারিয়ান অপারেশন প্রায় করেই না বললে চলে সেখানে বাংলাদেশে ডাক্তারেরা অর্থের লোভে বেশি বেশি সিজারিয়ান অপারেশন করছেন।

বাংলাদেশের পরিসংখ্যানে যাবার আগে চলুন দেখে নিয়ে উন্নত বিশ্বের অবস্থা। ফোর্বস ম্যাগাজিনের একটি রিপোর্ট অনুসারে ২০১৩ সালে তুরস্কে প্রতি ১০০জন জীবিত বাচ্চা জন্মে সিজারিয়ান অপারেশন এর হার ৫৮.৪। একই বছরে ইতালি, ইউএসএ, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, কানাডা, স্পেন ও ইউকে তে এই হার যথাক্রমে ৩৬.১%, ৩২.৫%, ৩২.১%, ৩০.৯%, ২৬.৩%, ২৫.২% এবং ২৩%। একই বছরে বাংলাদেশে এই হার কত জানেন? ইউকে এর চেয়েও কম, ২২.৯% (Bangladesh Demographic and Health Survey 2014)

FB_IMG_1490286091249

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিকমেন্ডেশন অনুযায়ী সিজারিয়ান অপারেশন এর হার হওয়া উচিত ১০-১৫% তবে এই রিকমেন্ডেশন নিয়ে অনেক মতপার্থক্য আছে। WHO নিজেই বলেছে এ বিষয়ে আরো গবেষনা প্রয়োজন এবং এটাও বলেছে
“Every effort should be made to provide caesarean sections to women in need, rather than striving to achieve a specific rate.”
অর্থাৎ এই নির্দিষ্ট রেট অর্জনের দিকে মনযোগ দিতে যেয়ে যার দরকার তাকে অবহেলা করা যাবেনা বরং প্রতিটি মায়েরই যার দরকার তার জন্য অবশ্যই সিজারিয়ান অপারেশন করতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিকমেন্ডেড এই রেট নিয়ে অনেক মতপার্থক্য আছে। এই রেট টি ২০১২ সালের গবেষনা অনুসারে নির্ধারন করা হয়, সে সময় বিশ্বের অনেক দেশেরই সিজারিয়ান অপারেশন এর তথ্য জানা ছিলো না। পরবর্তী হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল এবং স্ট্যানফোর্ডের গবেষকগণ একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন আমেরিকান মেডিকেল এসোসিয়েশন এর জার্নালে ২০১৫ সালে http://jamanetwork.com/journals/jama/fullarticle/2473490। সে গবেষণায় দেখা যায় ১৯% এর বেশি সিজারিয়ান অপারেশন মার্তৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যূর হার কমানোর ক্ষেত্রে বিপরীত আনুপাতিক অর্থাৎ ১৯% এর যত বেশি সিজারিয়ান অপারেশন মাতৃমৃত্য ও শিশুমৃত্যুর হার ততই কম। এছাড়া এটাও দেখে গেছে যে ৩০% এর বেশি সিজারিয়ান রেট এর ক্ষেত্রেও মায়ের বা শিশুর ঝুকির কোন সম্পর্ক নেই। এই গবেষণা অনুসারে ১৯% এর বেশি সিজারিয়ান অপারেশন হওয়া রিকমেন্ডেড যা WHO এর রেট এর তুলনায় বেশি।

সুতরাং বোঝা গেলো সিজারিয়ান এর রেট কত হলে বেশি বলা যেতে পারে। এবার আসি বাংলাদেশ এর কথায়। বাংলাদেশ এর ১০০জন জীবিত শিশু জন্মে সিজার অপারেশন এর ২২.৯। BDHS 2014 এ৪ রিপোর্ট অনুসারে বাংলাদেশে ৩৭% ডেলিভারি হয় হাসপাতালে এর মাঝে ১৩% ডেলিভারি হয় সরকারি হাসপাতালে। সুতরাং এই ১৩% এর বাচ্চা জন্মে কোন অর্থলিস্পার ব্যাপার নেই যেহেতু সরকারি হাসপাতালে এ ধরনের চিকিৎসা হয় নামমাত্র মূল্যে। ২২% ডেলিভারি হয় প্রাইভেট হাসপাতালে। এই ২২% এর মাঝে সবই সিজারিয়ান নয়, এর মাঝে নরমাল ডেলিভারিও আছে। যদি এর অর্ধেক ও সিজার হয় সেক্ষেত্রেও অনেকে বলবেন “বেশিরভাগই অপ্রয়োজনীয়”। সিজার অপ্রয়োজনীয় কিনা এটি রোগীর চিকিৎসকই একমাত্র বলতে পারেন। এই বিষয়েও ২০১৩ সালে Biomed Central জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় http://bmcpregnancychildbirth.biomedcentral.com/articles/10.1186/1471-2393-14-130 দেখা যায় সিজারিয়ান অপারেশন এর সবচেয়ে বড় কারন আগে সিজারিয়ান অপারেশন হওয়া (২৯.৪%), এরপর মায়ের পেটে বাচ্চার আশংকাজনক অবনতি (১৫.৭%) এরপর বাচ্চার আকার ও মায়ের পেলভিসের আকার এর অসামঞ্জস্যতা (৮.৩%)। উল্লেখ্য আগে সিজার অপারেশন হয়ে থাকলে পরবর্তীতে নরমাল ডেলিভারি হবার ক্ষেত্রে অনেক সময়েই ঝুকি থেকে যায়।

BDHS 2014 এর তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে সিজারের সবচেয়ে বড় কারন বাচ্চার পজিশন ঠিক না থাকা (৪১.৫%), এরপর প্রসব প্রক্রিয়া ঠিক মত না হওয়া (২১.৯%)। এছাড়াও একটি বড় অংশ রয়েছে ঐচ্ছিক সিজার। যেখানে ডেলিভারি এর তারিখ পার হয়ে যাওয়া সবচেয়ে বড় কারন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। Biomed Central এর প্রকাশিত গবেষণাপত্র অনুসারে একটিমাত্র আশংকাজনক তথ্য পাওয়া যায় সেটি হলো সকল সিজারিয়ান অপারেশন গুলোর মাঝে ১৬% ক্ষেত্রে অপারেশন ছাড়াও অন্য প্রক্রিয়ায় ডেলিভারি করানোর উপায় ছিলো। যদিও অনেক ক্ষেত্রেই এই সিদ্ধান্ত নেবার মত প্রয়োজনীয় উপকরণ চিকিৎসক এর কাছে থাকে না এবং রোগীর লোকজন এর চাপে ঝুকি এড়াতে অপারেশন এর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।

বাংলাদেশে প্রাইমারি হেলথ কেয়ারে সারা বিশ্বে দারুনভাবে সফলতার প্রমাণ রেখেছে, জিতেছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃত মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমানোয়। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সেবার মাঠকর্মীদের অবদানের পাশাপাশি হাসপাতালে দ্রুততম সময়ে সিজারিয়ান অপারেশন করতে পারাও অন্যতম বড় অবদান রেখেছে। একটি কুচক্রী মহল বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতকে সফল দেখতে চায় না তাই তারা এদেশের স্বাস্থ্য খাতের দুর্নাম রটিয়ে ভিনদেশে চিকিৎসা ভ্রমণের ব্যবসা শুরু করেছে। এদেশে একসময় সাশ্রয়ী খরচে সফলভাবে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট হতো। অপসাংবাদিকতার প্রচারনায় সেটা বন্ধ হয়ে লাখ লাখ কিডনি রোগীর জীবন বিপন্ন হয়েছে। একইভাবে এদেশে এখন অন্যন্য ক্ষেত্রে চলছে সেবার দুর্নাম করে বন্ধ করার পায়তারা। সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এসব প্রতিহত করুন। আপনার চিকিতসার ব্যাপারে আপনার চিকিৎসক কে সরাসরি প্রশ্ন করুন এবং সম্ভবপর ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালে নামমাত্র মূল্যে সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা সেবা নিন।

তথ্যসূত্রঃ
১) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ওয়েবসাইট
২) জার্নাল অফ আমেরিকান মেডিকেল এসোসিয়েশন
৩) Biomed Central জার্নাল
৪) Bangladesh Demographic and Health Survey 2014
৫) National Health Bulletin 2016

 

লিখেছেন: ডা. মারুফুর রহমান অপু, প্ল্যাটফর্ম এডমিন

3 thoughts on “সিজারিয়ান অপারেশন-বাংলাদেশ মিথ

  1. পরিসংখানে সব আসে না এবং এটাই সত্য। অামাদের দেশে c/s হার অনেক বেশি।

    1. পরিসংখ্যানে সব আসেনা তেমনি চোখের দেখাতেও সব আসেনা। বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে পরিসংখ্যান এর গুরুত্ব বেশি। এই ডাটা শহর গ্রাম সব মিলিয়ে হিসাব করা। আমরা শহরের ডাটা বেশি দেখি, শহরে বেশি সিজার হয় তাই মনে হয় না জানি কত সিজার হচ্ছে। গ্রামে গিয়ে দেখুন তারা সময়মত ডাক্তার পর্যন্ত দেখায় না, সিজার পরের কথা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Next Post

প্রস্তাবিত চিকিৎসাসেবা আইন ২০১৬ (খসড়া) প্রত্যাখান করলো বিএমএ

Thu Mar 23 , 2017
প্রসঙ্গ:চিকিৎসা সেবা আইন ২০১৬(খসড়া) বিষয়ে বিএমএ’র বর্ধিত সভার মিটিং- আজ সকল জেলা বিএমএ’র সভাপতি ও সেক্রেটারী দের উপস্থিতিতে সকল জেলা শাখা বিএমএ চিকিৎসা সেবা আইন ২০১৬ স্পষ্ট ও জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে: ………………………………………………………………………… মিটিংয়ে সকল জেলা বিএমএ’র সভাপতি ও সেক্রেটারীর উপস্থিতিতে সকল বিএমএ শাখা চিকিৎসা সেবা আইন ২০১৬ কে একবাক্যে প্রত্যাখ্যান […]

Platform of Medical & Dental Society

Platform is a non-profit voluntary group of Bangladeshi doctors, medical and dental students, working to preserve doctors right and help them about career and other sectors by bringing out the positives, prospects & opportunities regarding health sector. It is a voluntary effort to build a positive Bangladesh by improving our health sector and motivating the doctors through positive thinking and doing. Platform started its journey on September 26, 2013.

Organization portfolio:
Click here for details
Platform Logo