• ভাবনা

October 5, 2016 11:27 pm

লিখেছেনঃ ডাঃ রাজীব দে সরকার

স্বাস্থ্যখাতে প্রকৃত পরিবর্তন ও সংস্কার অন্য গোত্রের মানুষ দিয়ে কোন ক্রমেই সম্ভব না। ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’ কিন্তু এক রমণী অন্য রমণীর সংসারে সুখ বয়ে আনতে পারেন কতোটুকু?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন দিন বদলের সনদ নিয়ে উন্নয়নের রোডম্যাপ ঘোষণা করলেন তখন তিনি তরুণ নেতৃত্বের উপর অনেকখানি আস্থা রেখেছিলেন। বিসিএস দিয়ে একজন নবীন চিকিৎসক যখন ইউনিয়ন বা উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা দিতে যান, তখন প্রচলিত সিস্টেম তাকে সিস্টেমে নিয়ে আসতে চেষ্টা করে। ইচ্ছা সত্তেও স্বাস্থ্যখাতের পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা সম্ভব হয় না এই বিসিএস কর্মকর্তার।

অথচ প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে তার একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বা সহকারী সচিব এর সমান ক্ষমতা ও দায়িত্বপ্রাপ্তির কথা ছিলো। কিন্তু শুধু আউটডোরে বসে প্যারাসিটামল, মেট্রো আর গ্যাসের বড়ি লিখেই একজন নবীন সরকারী কর্মকর্তার মেধা, মনন ও শ্রমের অপচয় করা হয়।এটাই সিস্টেম। অথচ দেশকে দেবার ছিলো তার অনেক কিছুই।

একটু পরিষ্কার করে বলা প্রয়োজন।

আমাদের অনেকেরই জানা যে উপজেলা বা গ্রাম পর্যায়ে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য অনিরাপদে পড়ে থাকে কোয়াক এবং ফার্মেসীর দোকানদারদের হাতে। অ্যান্টিবায়োটিক, দামী স্যালাইন, ব্যাথানাশক, স্টেরয়েড এর যথেচ্ছ ব্যবহার, যেন তেন করে সেলাই,  দুঃসাহসিক শল্যচিকিৎসা ইত্যাদি করে গ্রামের মানুষের ভয়ানক স্বাস্থ্যঝুঁকির অবস্থা তৈরী হয়েছে বহু বছর ধরে। অথচ কেউই এর প্রতিকার বিধানের কোন প্রচেষ্টা করেনি। এদের অপচিকিৎসার কি কখনো বিচার হয়েছে? কখনোই না।

আবার একজন গরীব অসুস্থা মানুষ উপজেলা হাসপাতালে, ইউনিয়ন সাবসেন্টারে বা কমিউনিটি ক্লিনিকে গেলেন সেবা নিতে। কিন্তু তিনি প্রত্যাশিত সেবা পেলেন না। হয় তার সাথে স্বাস্থ্যকর্মী বা সেবিকারা দুর্ব্যবহার করলেন, কিংবা যেকোন সেবার জন্য তার কাছ থেকে প্রয়োজনের বেশী মূল্য নেওয়া হলো, অথবা অ্যাম্বুলেন্স এর চালক রোগী নিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানালো – অব্যবস্থাপনা যেটাই হোক না কেন ভুক্তভোগী কিন্তু কোন বিচার পান না।

চিকিৎসকেরা এ সময় অসহায় অনুভব করেন। কারন তিনি একজন সাধারণ ক্ষমতাহীন মেডিকেল অফিসার। কেউ তার আদেশ না শুনলে বিধিমালা যাই বলুক প্র্যাকটিকালি তার কিছুই করার নেই। কারন কর্মচারীরা তাদের কাজের জন্য ব্যবহারিক অর্থে কেবল একজন ইউএইচএফপিও কিংবা সিভিল সার্জনের কাছে দায়বদ্ধ। আর এই পদের আসীন আমাদের স্যাররা এতো দায়িত্বে জর্জরিত থাকেন যে এসব বিচার-জবাবদিহিতার লোড তারা নিতে চান না। আর একজন কর্মচারীর এসিআর (বাৎষরিক গোপনীয় প্রতিবেদন) এ স্বাক্ষর করেন তারাই। কর্মচারীরা চিকিৎসকদের খুব একটা তোয়াক্কা করার কথা মনে করেন না। তাই কোন কর্মচারীর অন্যায়কে সহ্য করে নেওয়া ছাড়া একজন সরকারী চিকিৎসক এর আর কিছুই করার থাকে না।

দিন শেষে যা হয় তা হলো নবীন একজন চিকিৎসক যিনি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে অনেক খানি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতেন, নিজেই ট্রেডিশনের পুতুলে পরিণত হন। এক সময় তিনি উপজেলা লেভেল ছেড়ে পোস্টগ্রাজুয়েশন বা অন্যান্য কারনে জেলা পর্যায়ে বদলী হন। ফলে অপচিকিৎসা আর অব্যবস্থাপনার আকড় হয়ে পড়ে থাকে উপজেলা/ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যখাত। বছরের পর বছরে ধরে এভাবেই চলে এসেছে। এই অন্ধকার কাটেনি আজো।

অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে চাইলে উপজেলা পর্যায়ে একজন চিকিৎসককে আর “নিধিরাম সর্দার’ করে রাখা চলবে না।

“মেডিকেল অফিসার” পদবীর পরিবর্তে উপজেলা পর্যায়ে একজন সরকারী চিকিৎসকের পদের নাম করতে হবে “উপজেলা চিকিৎসা কর্মকর্তা ও নির্বাহী স্বাস্থ্য ম্যাজিস্ট্রেট” (Upazila Medical Officer and Executive Health Magistrate। কেবল চিকিৎসা প্রদান করার জন্য সরকার একজন চিকিৎসককে উপজেলা পর্যায়ে পাঠাননি। চিকিৎসা প্রদানের সাথে সাথে জনগণের স্বাস্থ্যখাতের সাথে জড়িত প্রতিটি বিষয়ে তিনি তদারকি করার ক্ষমতা রাখবেন। চিকিৎসার সাথে জড়িত ধাপগুলোর অনিয়ন-দুর্নীতি প্রতিকারে তিনি প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নিতে ও দন্ড দিতে পারবেন। তাকে ইউএইচএফপিও কিংবা সিভিল সার্জনের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে না। এই ম্যাজিস্ট্রেসী ক্ষমতা প্রতিবিধানে সরাসরি ইউএনও মহোদয় ও স্থানীয় পুলিশ স্টেশনের ওসি তাকে সহযোগিতা করবেন।

দেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়, কিছু কিছু পরীক্ষা হলে পরিদর্শককেও ম্যাজিস্ট্রেসী ক্ষমতা দেওয়া হয়। অথচ চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যের মতো এতো সংবেদনশীল একটি সেক্টর আমরা প্রায় সম্পূর্ণ অরক্ষিত রেখে চলেছি।

১৮৯৭ সালে প্রণীত ‘GENERAL CLAUSES ACT 1897’ অনুযায়ী ফৌজদারী আইন সম্পর্কে জানা ও তার প্রয়োগের ক্ষমতাই ম্যাজিস্ট্রেসী। এই দায়িত্ব মেডিকেল সায়েন্সে অভিজ্ঞ একজন সরকারী চিকিৎসকের হাতে পৌছালেই তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যখাতের পরিবর্তন আনা সম্ভব। কোন চিকিৎসক যদি কোন কারনে এই অর্পিত দায়িত্ব নিতে না চান তবে তিনি তা সারেন্ডার করতে পারবেন। কিন্তু উপজেলা পর্যায়ে একাধিক নির্বাহী স্বাস্থ্য ম্যাজিস্ট্রেট থাকতে হবে।

আমার ঘরের কোথায় ডিফেক্ট আমিই ভালো জানবো। বাইরের মানুষ বা অন্য ঘরের মানুষ এসে আমার ঘরের সমস্যা ঠিক করে দিয়ে যেতে পারবে না। ইচ্ছাশক্তি ও বিচক্ষণতা দিয়ে উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যখাতে বিপ্লব ঘটাতে পারেন তরুণ চিকিৎসক কর্মকর্তারা। আসুন এই বৃহৎ ক্যাডারের ঐক্য ও প্রতিভাকে দেশের কাজে নিয়োজিত করার প্রয়াস নিই।

জয়তু বাংলাদেশের চিকিৎসক সমাজ।

পাঠকদের যেকোন লেখা প্রকাশের জন্য পাঠান: [email protected] ঠিকানায়।

শেয়ার করুনঃ Facebook Google LinkedIn Print Email
পোষ্টট্যাগঃ চিকিৎসক,

পাঠকদের মন্তব্যঃ ( 14)

  1. এতদিনে সবচেয়ে সময়োপযোগী লেখাটি পাওয়া গেল.. চিকিৎসক নেতাদের ভূমিকা চাই।

  2. বাহ্ ! শুধু অান্দোলন দরকার এখন ক্যাডারদের।

  3. বিদ্যমান আইনেই সব সম্ভব।শুধু প্রয়োগ নেই। যখন সিএস, টিএইচএ সকল অন্যায়ের উপর নির্বিকার থাকেন, তখন কি ভাবে বুঝলেন যে তারা তাদের জুনিয়র ডাক্তারদের স্বাধীন ভাবে ম্যাজিস্ট্রএসি ফলাতে দিবেন!!!!!!

  4. Authentic. ..
    Amra koto ta pesiye asi ei post tai bole dibe ..
    But kotha holo .. pesiye kno thakbo … ??
    Nijer ghorer kotha knoi ba amra nijerai vabsina .?

  5. ডাঃ রাজীব দে সরকার ভাল লিখছেন…

  6. ডা. শামীম says:

    লেখাটি পড়ে মনে হলো খুবই অপরিপক্ক্ব একটা লেখা (লেখকের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে বলছি)। লেখক ম্যাজিস্ট্রেসিকে গুলিয়ে ফেলেছেন জেনারেল ক্লজেস এক্ট এর রেফারেন্স দিয়ে। মূলত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এসেছে CrPC,1898 থেকে।

    একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটককে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এর অধীনে থেকেই কাজ করতে হয়। আপনি খেয়াল করেছেন হয়ত যে, বিভিন্ন বিভাগে প্রেষনে এখন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ কাজ করছেন। যেমন, পরিবেশ, বিদ্যুৎ, ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন ইত্যাদি। প্রতি ম্যাজিস্ট্রেটকেই জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এর আওতায় থেকেই কাজ করতে হয়। এটাই আইনের বিধান। আপনি কি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এর অধীনে যেতে চান?? মনে হয় চান না।

    আপনি যে ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেন না, সে ক্ষমতার মূল্য কী?? ধরুন, আপনি স্বাস্থ্য ম্যাজিস্ট্রেট হয়েই গেলেন। আপনি পুলিশ বিভাগের কতটুকু সাপোর্ট পাবেন? তাদের ও জনবল সীমিত। এত্তগুলা ডাক্তারকে যদি পুলিশ দিতে হয় তাহলে দেশে আর জনগন থাকবেনা, শুধু পুলিশ সদস্য থাকবে। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, আপনি ওই ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারবেন না। কারন একজন পিয়ন/ ওয়ার্ড বয়ের চাকরি শেষ করে দেয়ার ক্ষমতা অফিস প্রধানের রয়েছে। আপনি হিসাব করে বলুন তো আপনার কয়জন বেয়াদব অলস ওয়ার্ড বয়ের চাকরি গেছে?? চাকরি যাওয়া বাদ দেন, কয়জন সাস্পেনশন এ আছে?? যে ক্ষমতা ব্যবহৃত হয় না, তার মূল্য নিয়ে আমি সন্দিহান।

    বরং আসুন পরিষ্কার মাথায় চিন্তা করি। যে ফ্যাসিলিটি অন্যদের আছে, ডাক্তারদের নাই সেগুলা আদায়ে সচেষ্ট হই। একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ যদি ডাক্তারদের ব্যবহারের জন্য যদি ২ টি মাইক্রোবাস থাকে তাহলে কেমন হয়? তাদের সাপোর্ট দেয়ার জন্য কিছু অফিস সহায়ক পদ সৃজিত হতে পারে। আরো এমন কিছু দাবি যা আপনার ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স কমাতে পারবে তা আদায়ে সচেষ্ট হোন।

    আমি একটা বিষয় উপলব্ধি করি সবসময় হৃদয় দিয়ে। শক্তিশালী শত্রুর চেয়ে দুর্বল মিত্র অনেক ভাল। তাই দয়া করে শক্তিশালী কাউকে শত্রু বানাবেন না ( এই লেখায় বিষয়টা আসেনি, তবে আমরা প্রায়ই অন্য বিভাগের কর্মকর্তাদের হেয় করতে চেষ্টা করি, বিশেষত প্রশাসন ক্যাডারের লোকদের)। বরং তাদের বন্ধু বানাই। তাদের কাজে লাগাই বন্ধুর মত। তাদের ক্ষমতা দাবি করাটা যৌক্তিক নয়।

    • Roney says:

      ডা: শামীম ভাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ। এই অর্বাচীন লেখকের মতামতকে খন্ডন করার জন্য। আমরা কোন সার্ভিসকেই হেয় করি না বা করতে যাই না।দুই একজন ভুল করতেই পারে।
      CPC & General Clauses এ ম্যাজিস্ট্রেট এর সংগা আছে।
      মনে হয় ডা: কনক বাবু অতিমাত্রায় আবেগী হয়ে লিখেছেন। জ্ঞানের গভীরতা সীমিত। আচ্ছা, আপনার কথামত সরকার সবাইকে(ডা:, পুলিশ, কৃষি,ইঞ্জিনিয়ার মোট ২৮ ক্যাডারকে-আপনার দাবী অনুযায়ী যৌক্তিক) সরকার ম্যাজিস্ট্রেট বানিয়ে দিলো তাহলে কি দাঁড়ালো?? ২৮ ভাইকি ম্যাজিস্ট্রেসী চাইবে না? না কি শুধু আপনি ম্যাজিস্ট্রেট হলেও হলো, অন্য ভায়েরা কী করবে বসে থাকবে?
      আবার mob control করতে পুলিশ, বিজিবি, আনসার, আর্মি লাগে। তাহলে আপনি কেনো পু,বি,আ ও আর্মি হবেন না একই সাথে?
      আবার আপনার পড়ালিখার জন্য শিক্ষক প্রয়োজন।
      তেমনি আপনার আমার খাবার যোগায় কৃষি। তাহলে
      আপনি একই সাথে যদি ম্যাজিস্ট্রেট, ডা:, শিক্ষক, কৃষি, পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও আর্মির ভুমিকা পালন করতে পারবেন? এটা আপনার কাছে প্রশ্ন?
      আমি জানি আপনি পারবেন না!
      তাহলে রাজনীতিবিদরা কি দোষ করলো? তারাও রাজনীতিবিদ + ম্যাজিস্ট্রেট
      আসলেই আমরা সবাই বিচারক, নিজের বিবেকের কাছে, কর্মের কাছে।
      আপনি যেই হোন না কেনো ” আপনি নিজের বিবেকের কাছে দায়ী থাকবেন”
      আপনার সুস্বাস্থ্য কামনায়।

  7. অত্যন্ত সময়োপযোগী লেখা…. কিন্তু কিভাবে শুরু করা যায় এটা??

  8. Dr. Kamaluddin says:

    In upz. Level : Uno ( agriculture), Uno ( Health), Uno ( Lovestock.), Uno ( Secondary edu.)…….so on…
    In district level: Dc ( agriculture), Dc ( Health), DC ( Livestock ), Dc ( Secondary edu.)
    Dist. Judge ( Health), Dist. Judge (agriculture), CJM ( Health) CJM ( Livestock)…. ………..so on
    Division level : Div. com ( agriculture), Div. Com ( Health), Div. com( Livestock .), Div. com ( Secondary edu.)……….
    Cabinet Secretary ( agriculture), Cabinet Secretary ( Health), Cabinet Secretary ( Livestock .), Cabinet Secretary ( Secondary edu.)
    Though they are powerful so they can made different PM Like as..
    PM ( Agri.), PM ( health) PM ( Livestock)… if they are not satisfied then they made President ( Health)…….. and creat another post….. like chief justice ( health) chief justice ( agriculture), / Igp ( health), Igp( agriculture)/ they can creat chief of army ( health)/ BGB/ NAVY/ Air force/….
    out of country they can introduce secretary general ( health) of UN,……chief justice ( health)……. of international court…..




Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Advertisement
Advertisement
.