ঝি ঝি ধরা বা Paresthesia সম্পর্কে কিছু কথা

প্রিয় পাঠক, আপনার সাথে কখনও কি এরকম হয়েছে যে আপনি হঠাৎ করে শরীরের কোনো অংশে বোধ শক্তি পাচ্ছেন না বা সুচালো কিছু দিয়ে অনবরত খোঁচা দেয়ার মতো কোনো অনুভূতি বা অনুভূতিটা এরকম যে আপনি সেই অঙ্গটা আর নাড়াতেই পাড়ছেন না? যদি এরকম কিছু আপনার সাথে হয়ে থাকে, তাহলে আপনার ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই, এতটুকু জেনে রাখুন আপনি প্যারালাইজড হচ্ছেন না! এই মেডিকেল কন্ডিশানটি আমাদের কাছে “ঝি ঝি” ধরা হিসেবেই বেশি পরিচিত। তবে, মেডিকেল সাইন্স এর একটা সুন্দর নাম দিয়েছে। নামটি হচ্ছে “Paresthesia”. তাহলে চলুন, আজ আপনাদের Paresthesia র সাথে পরিচয় করিয়ে দেই।

Paresthesia বলতে আমরা আসলে কি বুঝি?
Paresthesia হচ্ছে আপনার শরীরের অস্বাভাবিক কিছু অনুভূতি যেমন ধরুন, সুচালো কিছু দিয়ে খোঁচা দেয়ার মতো অনুভূতি, শরীরের কোনো অংশে সাড়া না পাওয়া অর্থাৎ স্পর্শ করলে কোনো অনুভূতি না পাওয়া। কারো কাছে মনে হতে পারে ছোট কোনও পোকা চামড়ার ভিতরে হেটে যাচ্ছে বা ভিতরে জ্বালা পোড়া হচ্ছে। এই অবস্থাটি Paresthesia যা সাধারণত হাতে ও পায়ে অনুভূত হয়ে থাকে। তবে শরীরের অন্য জায়গায়ও হতে পারে। আপনার সাথে এরকম তখনই ঘটবে যখন আপনি বেকায়দায় কিছুক্ষণ বসে থাকবেন বা ঘুমানোর সময় হাতটা মাথার অথবা শরীরের নিচে চাপা পরবে। Paresthesia কে ইংরেজি তে “Fall asleep” ও বলা হয়।

কাদের Paresthesia হওয়ার সম্ভাবনা বেশি ?
Paresthesia( ঝি ঝি ধরা) যে কারো হতে পারে। তবে কয়েক ধরণের মানুষের ঝি ঝি ধরার হার অন্যদের থেকে বেশি, যেমনঃ যারা ছোট সাইজ এর জুতো পড়ে, যারা পায়ের উপর ভর করে বেশি সময় ধরে বসে থাকে। এছাড়া যাদের Back pain আছে অথবা Diabetes আছে।

আপনার কত ধরনের Paresthesia হতে পারে?
আপনার দু ধরনের Paresthesia হতে পারে।
এক, Temporary or Transient Paresthesia (সচারচর আপনার হাতে বা পায়ে যে ধরণের ঝি ঝি ধরে সেটাই Temporary Paresthesia)
দুই, Chronic Paresthesia ( এটা জটিল ধরণের Paresthesia)

আপনার হাতে বা পায়ে Temporary Paresthesia (ঝি ঝি ধরার)’ র কারণ কি?
অনেকে মনে করে থাকেন, ঝি ঝি ধরার সাথে আমাদের রক্তনালির সম্পর্ক আছে। তাদের ধারনা, যখন কোনো অংশে চাপ পরে, ওই অংশে সাময়িক সময়ের জন্য রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। যার জন্য ঝি ঝি ধরার মতো অভিজ্ঞতা হয়। কিন্তু, এটা সঠিক নয়। ঝি ঝি ধরার পিছনে কারণটা রক্ত নালিতে চাপ পড়ার কারণে নয়, মূলত হয় সেই স্থানের স্নায়ু র উপর চাপ পড়ার কারণে এবং যখন চাপ অপসারিত হয় তখন আস্তে আস্তে আর ঝি ঝি ধরাও থাকে না। একটু ব্যাখ্যা করি তাহলে, স্নায়ু হচ্ছে আপনার শরীরের বিশেষায়িত কোষ যাকে নিউরনও বলা হয়। এরা শরীরের যেকোনো ধরণের বার্তা, এক স্থান থেকে আরেক স্থানে তড়িৎ সংকেতের মাধ্যমে পরিবহন করে। স্নায়ু গুলো একটা আরেকটির সাথে বিশেষ ভাবে যুক্ত থাকে এবং তথ্য এক স্নায়ু থেকে আরেক স্নায়ুতে অতি দ্রুত গতিতে পাঠিয়ে থাকে। যে কোনো ধরনের বার্তা শরীরে ছড়িয়ে থাকা স্নায়ুর মাধ্যমে আপনার মেরুদণ্ডের ভিতরে থাকা সুষম্নাকান্ড হয়ে মস্তিস্কে পৌছায়। যেমন ধরুন, আপনি আগুনে হাত দিয়েছেন, হাত দেয়ার সাথে সাথে উত্তাপ অনুভব করবেন এবং সাথে ব্যথাও পাবেন। কেন পাবেন? কারণ আপনার হাতের চামড়ার নিচে থাকা সেন্সরী রিসেপ্টর সেই উত্তাপ আর ব্যথার বার্তাকে স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিস্কে পাঠিয়ে দেয় এবং তখন বুঝতে পারেন যে আপনার গরম লাগছে এবং ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। ঠিক Paresthesia তেও এরকম ঘটনা ঘটে। যখন স্নায়ুর উপর চাপ পড়ে তখন আর কোনো ধরনের বার্তা সাময়িক সময়ের জন্য মস্তিস্কে যেতে পারে না, ফলে আপনি কোন অনুভুতিও পান না। যখনি চাপ অপসারিত হয়, আবার সব কিছু চালু হয় এবং এই অস্বাভাবিক অনুভূতি স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিস্কে যায় আর আপনি ঝি ঝি ধরার মতো অস্বাভাবিক অনুভূতি পেয়ে থাকেন। কিছু সময়ের মধ্যে এই অনুভূতি আর থাকে না।

কি কি কারণে আপনার Chronic Paresthesia হতে পারে?
Chronic Paresthesia সাধারণত অন্যকোনো স্নায়ুবিক অসুখের লক্ষণ। কিছু Central Nervous System (CNS) এর disorders এর জন্য ঘটতে পারে। যেমনঃ
• Stroke { এক কথায় বললে ‘Brain attack’. যখন মস্তিস্কের কোনো অংশে রক্ত চলাচল বন্ধ হয় তখন তাকে Stroke বলে। এতে মস্তিস্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়}
• Transient Ischemic Attacks (TIA) { যদি সাময়িক সময়ের জন্য মস্তিস্কে রক্ত প্রবাহে বাধাগ্রস্ত হয়, তাকে TIA বলে। অনেকে এটাকে ‘Mini-Stroke বলে। তবে ভুললে চলবে না এটা অনেক বড় ধরনের একটা বিপদ সংকেত। কারণ TIA পরবর্তীতে বড় ধরনের Stroke হওয়ার পূর্ব লক্ষণ হতে পারে}
• Multiple Sclerosis (MS) { দীর্ঘমেয়াদি অসুখ, যেটা আপনার মস্তিষ্ক, সুষম্নাকান্ড এবং চোখের Optic nerve কে আক্রমণ করে}
• Transverse Myelitis { একটি স্নায়ুবিক অসুখ}
• Encephalitis { মস্তিস্কের টিস্যুর প্রদাহ}….ইত্যাদি।

আরও কিছু কারণ হচ্ছেঃ
• যকৃত অথবা বৃক্কের অসুখ
• Trauma { শারীরিক বা মানুষিক আঘাত}
• মস্তিস্কে Tumor হওয়া
• Carpal Tunnel Syndrome (CTS) { এটা অনেক পরিচিত Condition যাতে আপনার হাত অথবা হাতের কিছু অংশে ব্যথার সাথে অস্বাভাবিক অনুভূতি হয়ে থাকে। এটা Peripheral nerves কে damage করে, এর জন্য Paresthesia হতে পারে}
• Autoimmune disease { এটা এমন একটা অবস্থা যখন আপনার নিজের শরীর আপনার নিজেরই টিস্যু গুলোকে আক্রমণ করে। বাইরের জীবাণুকে কি মারবে! উল্টো মনে করে আপনার ভালো কোষ গুলই হয়ত খারাপ}
• Diabetes { রক্তে Glucose এর level বেড়ে যাওয়া}
• Fibromyalgia { দ্বিতীয় পরিচিত Medical condition যেটার মাধ্যমে আপনার হাড় এবং মাংসপেশি আক্রান্ত হয়}
• Deficiency of Vitamin B-1, B-3 (niacin), B-6, B-12
• অনেক বেশি ভিটামিন-ডি গ্রহণ করা
• কিছু ঔষুধ এর কারনে হতে পারে যেমনঃ Chemotherapy drugs…..ইত্যাদি।

মেনোপজ (menopause) এর সময় Paresthesia হওয়ার কারণ কি?
মেয়েদের স্থায়ী ভাবে Menstrual period বন্ধ হওয়াকে মেনোপজ বলে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সে Menopause( রজঃবন্ধ) হয়ে থাকে। মেয়েদের Menopause এর সময় অথবা Post menopause এর সময় Paresthesia হয়ে থাকে। শুধু হাতেই নয়, পায়েও হতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটা দ্বারা কোন serious কিছু indicate করে না। তবে শুধু ঝি ঝি ধরার সাথে অন্যকোনো লক্ষণ থাকলে ডাক্তার দেখানো উচিত। এরকম অনুভূতি হওয়ার সাধারণ কারন হচ্ছে Hormone fluctuation . সহজ করে বললে hormone এর level ঠিক না থাকা। বিশেষ করে Oestrogen hormone. এই Hormone, Central Nervous System (CNS) এ ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তাই যখন, Oestrogen Hormone এর level সঠিক থাকে না, তখন ঝি ঝি ধরার মতো অভিজ্ঞতা হয়।

Paresthesia র ক্ষেত্রে কখন আপনি ডাক্তার দেখাবেন?
Temporary Paresthesia র ক্ষেত্রে ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজন নেই। তবে, যদি এই অস্বাভাবিক অনুভূতিগুলো দীর্ঘ সময় ধরে থাকে আর খুব বেশি পরিমাণে হয়, তাহলে অবশ্যই ডাক্তার এর কাছে যেতে হবে।

Paresthesia কি ভাবে diagnose করা হয়ে থাকে?
প্রথমে ডাক্তার আপনার কাছ থেকে পুরো বর্ণনা শুনবেন এবং এর পরে কিছু প্রশ্ন করতে পারেন। হয়তো আপনার কিছু Physical examinations করবেন এবং প্রয়োজনে Laboratory tests-ও দিতে পারেন। যেমনঃ কিছু neurological tests, EMG (Electromyography), MRI (Magnetic Resonance Imaging), Ultrasound ইত্যাদি।

Paresthesia র চিকিৎসা কি হতে পারে?
Paresthesia এর চিকিৎসা ব্যাবস্থা নির্ভর করবে আপনার লক্ষণের উপর। যদি আপনার Paresthesia অন্যকোনো অসুখের কারনে হয়ে থাকে, তাহলে সেই অসুখের চিকিৎসা করলে Paresthesia থেকে সুস্থ হওয়া যায়। আপনার ডাক্তার এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন মতো ব্যাবস্থা নিবেন।

কিছু টিপস আপনাদের জন্যঃ
• সঠিক ভাবে বসতে হবে যেন স্নায়ু তে চাপ না লাগে।
• মাঝে মাঝে কাজ করার সময় বিরতি নিতে হবে।
• যদি আপনার দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে হয়, তাহলে কাজের মাঝে চেয়ার থেকে উঠে একটু হাঁটাহাঁটি করে নিবেন।
• সবসময় ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখবেন এবং নিয়মিত ব্যায়াম করবেন।
• রাতে Paresthesia থেকে রক্ষা পেতে আপনার হাতে “Wrist Splint” ব্যবহার করতে পারেন।
• যদি আপনার diabetes অথবা অন্য কোনো chronic disease থেকে থাকে, তাহলে সেটাকে নিয়ন্ত্রণ এ রাখতে হবে।
• সর্বোপরি ডাক্তার এর পরামর্শ অনুযায়ী চলবেন।

আজ এতটুকুই, ধৈর্য সহকারে লিখাটি পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

লেখক:

আকিব নিয়াজ জোহা
JINZHOU MEDICAL UNIVERSITY (CHINA)
Session: 2016-2017

ফয়সাল আবদুল্লাহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Next Post

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীনে সিনিয়র মেডিকেল অফিসার পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি

Sat Jun 2 , 2018
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীনে সিনিয়র মেডিকেল অফিসার পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি। আবেদনের শেষ সময়: ১৯ জুন ২০১৮। প্রাথমিকভাবে এ নিয়োগ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত প্রযোজ্য হবে। বিস্তারিত ছবিতে।   60 SHARES Share on Facebook Tweet Follow us Share Share Share Share Share

Platform of Medical & Dental Society

Platform is a non-profit voluntary group of Bangladeshi doctors, medical and dental students, working to preserve doctors right and help them about career and other sectors by bringing out the positives, prospects & opportunities regarding health sector. It is a voluntary effort to build a positive Bangladesh by improving our health sector and motivating the doctors through positive thinking and doing. Platform started its journey on September 26, 2013.

Organization portfolio:
Click here for details
Platform Logo