• ভাবনা

August 23, 2014 11:01 am

প্রকাশকঃ

লেখকঃ ডাঃ মোঃ মারুফুর রহমান

মেডিকেল প্রফেশনালদের এডিকশনের উপরে একটা লেখা লিখেছিলাম কিছুদিন আগে। লেখাটা আসলে কারো উপকারে এসেছে কিনা, কেউ মোটিভেটেড হয়ে কাজ করেছে কিনা আমার জানা নেই। আজকে একটি গ্রুপে একজন জানালেন তিনি ধুমপান ছাড়তে চাচ্ছেন কিন্তু পারছেন না, উপায় কি (আপনি মিয়া সিগারেট ছাড়তে পারেন না আর আমি বহুবার সিগারেট ধরার চেষ্টা করেও পারিনাই!) ।
আসুন একটু চেষ্টা করে দেখি উপায় বের করা যায় কিনা।
প্রথম, কথা হল ধুমপান কি এডিকশন? এর উত্তর হচ্ছে এর এটি এডিকশন সৃষ্টি করে এবং অন্যান্য এডিকটিভ ড্রাগগুলোর মতই দীর্ঘদিন ধুমপানে অভ্যস্ত কেউ হঠাত ছেড়ে দিলে উইথড্রয়াল সিনড্রোম দেখা দিতে পারে।
তাহলে শুধু ইচ্ছা শক্তি দিয়েই কি ধুমপান ছেড়ে দেয়া সম্ভব? এর উত্তর হচ্ছে সম্ভব, আগের লেখাতেও বলেছিলাম শরীরের নাম মহাশয় যাহা সহাইবেন তাহা সয়, সিগারেট ছেড়ে দেয়ার ধাক্কাটাও সেভাবে শুধু ইচ্ছাশক্তি দিয়ে দমন করা সম্ভব। কিন্তু ঐ যে মানব মস্তিষ্কের বদমাস অংশ লিম্বিক সিস্টেম মাঝে মাঝে চিন্তাশীল অংশ প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে কাবু করে ফেললে ইচ্ছাশক্তির শক্তিটা অনেকের ক্ষেত্রেই কমে যায় আর কি।

আমার এই লেখাটা যারা ধুমপান ছেড়ে দিতে চান সরাসরি তাদের জন্য না, লেখাটা যারা ধুমপান ছাড়ার ব্যাপারে ডাক্তার হিসেবে প্রফেশনালি হেল্প করতে চান, তাদের জন্য।

একজন ধুমপায়ীর প্রতি একজন ডাক্তারের এপ্রোচঃ
১) আপনার কাছে যেসব রোগী আসছে তাদের কতজন ধুমপায়ী এবং কত বছর ধরে সেটা বের করুন।
২) ধুমপান বন্ধ করতে উৎসাহিত করুন, ধুমপান বিরোধী বিভিন্ন পোস্টার, লিটারেচার দিয়ে সাহায্য করুন, স্বাস্থ্য ঝুকি সম্পর্কে জানান এবং সবশেষে প্যাসিভ স্মোকিং কিভাবে পরিবারের সদস্যদের, ছোট শিশুদের ক্ষতি করছে সেটা জানান।
৩) এবার যাদের এসব কথা বললেন তাদের নিজেদের ইচ্ছার কথা শুনুন। কেন তারা ধুমপান ছাড়তে চায় বা চায় না সে সম্পরকে তাদের নিজেদের অভিমত শুনুন।
৪) এবার আসুন পরিকল্পনা অংশেঃ
* ধুমপায়ীর জন্য একটি প্ল্যান তৈরী করে দিন। যদি ধুমপানের মাত্রা খুব বেশি না হয় এবং বেশি দিনের না হয় সেক্ষেত্রে রোগীকে ১ মাস এর একটি প্ল্যান দিন ধুমপান থেকে সম্পূর্ন বিরত থাকার, সফল হলে ৩ মাস, সেটাও সফল হলে ৬ মাস। ফলোআপে রাখুন। যখনই সিগারেট খাবার তীব্র ইচ্ছা জাগ্রত হয় তখন অন্যকিছুতে নিজেকে ব্যাস্ত রাখতে বলুন, এক্ষেত্রে সবথেকে ভাল কাজ করে শরীরচর্চা এবং খেলাধুলা, এছাড়াও মেডিটেশন, রান্না, নার্সারী, ক্রিয়েটিভ ওয়ার্ক এগুলোও সাহায্য করবে। আরেকটি ব্যাপারে পরামর্শ দিন সেটা হল যারা নিয়মিত সিগারেট খাচ্ছে তারা সিগারেট খাবার সময় পারতপক্ষে সামনে না থাকা।
* ক্রনিক এবং হেভি স্মোকারদের ক্ষেত্রে এভাবে কাজ নাও হতে পারে। উথড্রয়াল সিন্ড্রম এদের মধ্যে প্রবলভাবে দেখা দেয়, বিশেষ করে ডিপ্রেশন। এসব ক্ষেত্রে ফিজিশিয়ানরা নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি ব্যাবহার করতে বলেন, এগুলোর মধ্যে আছে নিকোটিন গাম, প্যাচ ইত্যাদি। কিন্তু এগুলো বাংলাদেশে সাধারনভাবে পাওয়া যায় না। তাই এর বিকল্প হিসেবে ক্রনিক স্মোকারদের ক্ষেত্রে গ্রাজুয়াল রিডাকশন পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে (যদিও এটি খুব বেশি ইফেকটিভ না, রোগীর ইচ্ছা থাকলে এটা সম্ভব)।
প্রতি মাসে অর্ধেক করে কমিয়ে ৩ মাস বা ৬ মাসে সম্পূর্ন ছেড়ে দেয়ার টার্গেট দেয়া যায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ন ব্যাপার হল গ্রুপ ডিসকাশন, যারা সিগারেট ছেড়ে দেবার সংগ্রাম করছেন তারা অনলাইনে অফলাইনে রেগুলার গ্রুপ ডিসকশনে বসে নিজেদের নিয়ন্ত্রন করতে পারেন। হাতে “I dont smoke” কিংবা “I am strong enough to quit smoking” এই ধরনের অংকিত রিস্ট ব্যান্ড, কিংবা ট্যাটু হাতে একে রাখতে পারেন। যেসব স্থানে গেলে সিগারেট খাবার সম্ভাবনা বেশি সেসব স্থান এড়িয়ে চলুন।
ক্রনিক রোগীদের ক্ষেত্রে উইথড্রয়াল ইফেক্ট কমাতে কিছু মেডিকেশন দেয়া যেতে পারে, এরমধ্যে বাংলাদেশে পাওয়া যায় এমন দুটি ওষুধ হচ্ছে Bupropion এবং Nortriptyline।
Bupropion এন্টি ডিপ্রেসেন্ট হিসেবে কাজ করে পাশাপাশি ধুমপান করার ইচ্ছাকেও কমায়। বাংলাদেশে আমার জানা মনে বেক্সিমকো এটা Zybex SR নামে বাজারজাত করে। ১৫০ মিলিগ্রাম। এডাল্ট ডোজ হল ৩০০ মিলিগ্রাম অর্থাৎ ১৫০ করে দিনে দুবার। তবে শুরুতে ১৫০ করে ১বার প্রেসক্রাইব করা হয়, প্রথম কিছুদিন কোন সমস্যক্সা না হলে দিনে দুবার ডোজ। অন্যান্য এন্টিডিপ্রেসেন্ট এর মতই এটিও কাজ করতে সময় নেয় বেশ কিছু দিন (২৮ দিন)। ১৪ তম দিন পর্যন্ত ধুমপান করা যেতে পারে, ১৫ তম দিন থেকে ধুমপান পুরোপুরি বাদ দেবার পাশাপাশি ওষুধ চালিয়ে যেতে হবে, ২৮ তম দিনে এর পরিপূর্ন ফলাফল শুরু হবে। কতদিন খেতে হবে সে ব্যপারে আলাদা কোন ইন্সট্রকশন নেই। এটি রোগীর ইচ্ছাশক্তি, টলারেন্স এর উপর নির্ভর করে। সাধারনত মাসখানেক খেতে বলা হয়। গুরুত্বপূর্ন ব্যাপার হচ্ছে এটি এপিলেপ্সি, হৃদরোগ, লিভার ডিজিজ এর রোগীদের ক্ষেত্রে ঝুকিপূর্ন। সাইড ইফেক্ট এর মধ্যে আছে ইনসোমনিয়া এবং মুখ শুকিয়ে যাওয়া।
৫) সব শেষ ধাপ হচ্ছে ফলোআপ, স্মোকাররা ছেড়ে দেয় খুব সহজেই কিন্তু আবার ধরে ফেলে আরো তাড়াতাড়ি তাই কিছুদিন পর পর এদের ফলোআপে রাখা জরুরী, সেটা সামনাসামনি হলে সবচেয়ে ভাল, না পারলে ফোনে, না পারলে ইন্টারনেট কাউন্সিলিং। যারা সফলভাবে এই নেশা ছাড়তে পেরেছেন তাদের নিয়ে ডিসকাশন গ্রুপ, এওয়ারনেস গ্রুপ, কাউন্সিলর গ্রুপ ইত্যাদি কাজে নিযুক্ত করে দিয়ে রিলাপ্স আটকানো সম্ভব।

** অনেকে সিগারেট ছাড়ার সহায়ক হিসেবে ইলেক্ট্রনিক সিগারেট, পান ইত্যাদি বিকল্পের কথা বলেন। বাস্তবতা হল একটি নেশাকে ছাড়ার জন্য আরেকটি নেশা ধরার কোন মানে নেই। ইলেক্ট্রনিক সিগারেট একটি বিজ্ঞাপনী ভাওতা, রিসার্চে এর বিশেষ কোন ইফেক্টিভিটি পাওয়া যায় নি। আর পান ওরাল ক্যান্সার এর জন্য একটি বড় ফ্যাক্টর। হিপনোসিস এবং মেডিটেশন এর গুরুত্বপূর্ন কোন প্রভাব পাওয়া যায় নি সিগারেট এডিকশন দূর করার ব্যাপারে। সিগারেট হঠাত ছেড়ে দিলে মোটা হয়ে যাবার একটি প্রবনতা লক্ষ্য করা যায়, তাই এই সময়টাতে সবজি, ফল জাতীয় খাবার বেশি খেতে বলা হয়, লো ক্যালরি খাবার এবং শরীরচর্চার পরামর্শ দেয়া হয়।

তথ্যসূত্রঃ National Isntitute of Drug Abuse, USA

শেয়ার করুনঃ Facebook Google LinkedIn Print Email
পোষ্টট্যাগঃ smoking counselling, ডাক্তার, ধূমপান, সিগারেট, সিগারেট ছেড়ে দেয়া,

পাঠকদের মন্তব্যঃ ( 0)




Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Advertisement
Advertisement
Advertisement
.