লেখকঃ ডাঃ মোঃ মারুফুর রহমান
“Like cures Like” (অর্থাৎ যা রোগ সৃষ্টি করে তাই রোগ সারায়) এবং লঘুকরনেই শক্তি এই দুই মন্ত্রে শতাব্দীব্যাপী শত বিতর্কের পরেও টিকে আছে “হোমিওপ্যাথি”। সাম্প্রতিক গবেষনায়, আসলে সাম্প্রতিক বলা ভুল হবে, দীর্ঘদিনের বহু গবেষনা, প্রকৃত বৈজ্ঞানিক “ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল”, গবেষনা সামারি, রিভিউ সব কিছুই করা হয়েছে ক্ষীণ আশায় যে হয়ত হোমিওপ্যাথির কার্যকারীতা প্রমানিত হবে। যুক্তরাজ্যের University of Exeter এ কমপ্লিমেন্টারি মেডিসিন এর প্রফেসর Edward Ernst যিনি হোমিওপ্যাথির উপর ১০০ এর ও বেশি গবেষনা প্রবন্ধ রচনা করেছেন, কিছুদিন পূর্বে তার গবেষনার সামারি প্রকাশ করেন এবং সেখানে তিনি দেখানঃ
- Placebo (প্রকৃতকার্যকারীতা বিহীন বস্তু যেটা রোগী গ্রহনের সময় জানেনা) এর চেয়ে হোমিওপ্যাথির কার্যকারীতা বেশি নয়।
- রিভিউয়ে দেখা যায় হোমিওপ্যাথির উপর করা সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য ২৩০ এরও বেশি “ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে”ও একই ফলাফল।
- মানুষের উপরে হোমিওপ্যাথির কার্যকারীহীনতার প্রমাণ অন্য প্রানীর উপরেও পাওয়া যায়।
- সার্ভে এবং কেস রিপোর্টে দেখা যায় হোমিওপ্যাথি ভয়ংকারভাবে ক্ষতিকারক হতে পারে।
- হোমিওপ্যাথি ক্যান্সার, এজমা এমনকি ইবোলা সংক্রমন ও সারাতে পারে এ ধরনের দাবী সম্পূর্ন “Bogus”!!!
- হোমিওপ্যাথির প্রচারনা ইথিক্যাল নয়।
আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত ও অন্যতম বিখ্যাত গবেষনা প্রতিষ্ঠান Australian National Health and Medical Research Council হোমিওপ্যাথির উপর করা ২২৫টি রিসার্চ পেপার রিভিউ করেও একই সিদ্ধান্ত দেয় যে, হোমিওপ্যাথির Placebo ইফেক্ট ছাড়া কোন ধরনের রোগ নিরাময়ে কোন ভূমিকা নেই এবং যারা হোমিওপ্যাথি গ্রহন করে অন্যকোন স্বীকৃত ও প্রমানিত কার্যকরী চিকিতসা নিতে বিরত থাকছেন বা দেরি করছেন তারা মারাত্নক স্বাস্থ্যঝুকিতে আছেন। অস্ট্রেলিয়ার NHMRC Homeopathy Working Committee এর Professor Paul Glasziou বলেন, ২০১০ সালে যুক্তরাজ্যে একই ধরনের স্টাডিতে হোমিওপ্যাথির অকার্যকারীতা প্রমানিত হবার পরে সেখানে হোমিওপ্যাথির ব্যাবহার অনেকাংশে কমে গেছে এবং তিনি আশা করেন এই রিপোর্টের পর অস্ট্রেলিয়াতেও এটা কমবে।
২০১০ সালে যুক্তরাজ্যের হাউজ অফ কমন্সও একই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে হোমিওপ্যাথি কোন অংশেও প্লাসিবো এর চেয়ে বেশী কার্যকারী নয় এবং সরকারীভাবে এটাতে অর্থসংস্থান করা অর্থহীন।
হোমিওপ্যাথির অকার্যকারীতার প্রমান নতুন নয়, বরং এ বিতর্ক ২০০ বছরের পুরোনো। প্রায় সব গবেষনাতেই এই অকার্যকারীতা প্রমান হবার পরেও বিশ্বব্যাপী লক্ষ কোটি মানুষ হোমিওপ্যাথি গ্রহন করে প্লাসিবো ইফেক্ট (বিশ্বাসে মিলায় বস্তু!) এর কারনে।
শুধু যুক্তরাজ্য বা অস্ট্রেলিয়া নয়, Swiss government‘s Program for Evaluating Complementary Medicine এর রিপোর্টেও হোমিওপ্যাথির অকার্যকারীতা প্রমানিত হয়। সরকারি পর্যায়ে গবেষনা ছাড়াও, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত সিসেটেমিক রিভিউ, মেটা এনালাইসিস, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রায় সব ক্ষেত্রেই হোমিওপ্যাথির প্লাসিবো ইফেক্ট ছাড়া অন্য কোন কার্যকারীতার প্রমান পাওয়া যায়নি এবং অল্প কিছু ট্রায়ালে হোমিওপ্যাথির আংশিক কার্যকারীতা পাওয়া যায় পরবর্তী ঐ গবেষনার পদ্ধতিগুলো রিভিউ করে এর দূর্বল মান নিয়ন্ত্রনের কারনে বাতিল করা হয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্বাস্থ্যসংস্থা যেমন যুক্ত্রাজ্যের National Health Service, যুক্তরাষ্ট্রের American Medical Association এবং FASEB ও অস্ট্রেলিয়ার National Health and Medical Research Council ঘোষনা করে যে হোমিওপ্যাথির কোন ধরনের রোগ নিরাময়ে কোন ভূমিকা নেই।
এত প্রমান থাকার পরেও এ বিতর্কের শেষ হয়না, মানুষ হোমিওপ্যাথিতে কাজ হবার পক্ষে প্রমান দেখায় যার সম্ভাব্য কয়েকটি কারন বলা যেতে পারেঃ
- প্লাসিবো ইফেক্টঃ হোমিওপ্যাথি সেবাদাতার পরামর্শ প্রদানের দক্ষতা ও মানুষের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস (এক্ষেত্রে প্লাসিবো হিসেবে হোমিওপ্যাথির বদলে অন্য যেকোন জড় পদার্থ দিলেও একই কাজ হবে যদি রোগী তা বিশ্বাস করে)
- সেবাদাতার পরামর্শ দক্ষতাঃ চিকিতসাসেবার একটি বড় অংশ রি-এসিউরেন্স বা রোগীকে আশ্বস্তকরণ। হোমিওপ্যাথি সেবাদাতাগণ তাদের চিকিতসা ধরনের কারনে এবং বিশেষত এই উপমহাদেশে তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধার্মিক ও সম্মানিত ব্যাক্তি হবার কারনে রোগীরা চিকিতসাসেবায় আশ্বস্ত হয়।
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাঃ শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারনে রোগী সুস্থ হয় নির্দিষ্ট সময় পর।
- পরিবেশগত চিকিতসাঃ খাদ্যভ্যাস এর পরিবর্তন, এক্সারসাইজ, পরিচ্ছন্নতা এবং এধরনের অন্যান্য পরিবেশগত উপাদান এর পরিবর্তন সুস্থতায় ভূমিকা রাখে।
- ন্যাচারাল হিস্টোরি অফ ডিজিজঃ প্রায় প্রতিটি রোগের বিশেষ করে জীবানু ঘটিত রোগের একটি স্বাভাবিক রোগ সৃষ্টি ও নিরাময় চক্র থাকে। অসুস্থ ব্যাক্তি সাধারনত অসুস্থতার চুড়ান্ত পর্যায়ে চিকিতসা সেবা গ্রহন করে। চূড়ান্ত অবস্থার পরের ধাপেই রোগের স্বাভাবিক চক্র অনুসারে রোগী সুস্থ হয় কোন চিকিতসা গ্রহন করুক বা না করুক।
- অন্যান্য চিকিতসাঃ অনেক রোগীই হোমিওপ্যাথি চিকিতসার পাশাপাশি একই সাথে অন্যান্য প্রমানিত কার্যকর চিকিতসাপদ্ধতি গ্রহন করে এবং সুস্থ হয়।
- অন্যান্য চিকিতসা বন্ধ করাঃ যেসকল চিকিতসা রোগীর জন্য অস্বস্তিকর যেমন সার্জারি, কেমোথেরাপি, বা অন্যান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াযুক্ত ঔষধ সেগুলো প্রায়শই হোমিওপ্যাথ চিকিতসকেরা বন্ধ করে দিতে বলেন যার ফলশ্রুতিতে রোগী সাময়িক অস্বস্তি ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মুক্ত হয়ে “সুস্থ” হন যদিও তার মূল রোগ সুপ্তাবস্থায় থেকে যায়।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি রাষ্ট্রে প্রমানিত হবার পরেও হোমিওপ্যাথিসহ প্রাচীন ঝাড়ফুক, মালা, তাবিজ, মন্ত্র, ক্রিস্টাল বল ইত্যাদি নানা রকম “চিকিতসা পদ্ধতি” মানুষ এখনো গ্রহন করে এবং ভবিষ্যতেও করবে। তারপরেও এসব দেশে গবেষক ও স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তাগন মনে করেন এই রিপোর্টগুলো প্রকাশের কারনে শিক্ষিত সমাজের একটি বড় অংশ এ ধরনের অকার্যকর চিকিতসাপদ্ধতি গ্রহন করা থেকে বিরত থেকে সঠিক চিকিতসা নেবে। দেশগুলোতে “ফ্রিডম অফ চয়েস” এবং “শিক্ষা গ্রহনের স্বাধীনতা” এর কারনে রাষ্ট্রীয়ভাবে এখনো হোমিওপ্যাথি সেবা নিষিদ্ধ এবং এ বিষয়ে শিক্ষাগ্রহন নিষিদ্ধ করা সম্ভব হয়নি।
সবরকম বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় হোমিওপ্যাথির অকার্যকারীতা প্রমানিত হবার পরেও আধুনিক চিকিতসার অপর্যাপ্ততা, চিকিতসা ব্যায়, শিক্ষার অভাব ইত্যাদি কারনে বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথি এবং কলকাতা হারবাল গোত্রের অপচিকিতসা ব্যপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করেছে। দুখঃজনকভাবে বাংলাদেশে সরকারিভাবে সরকারি হাসপাতালগুলোতে হোমিওপ্যাথি চিকিতসকদের নিযুক্ত করা হচ্ছে এবং হোমিওপ্যাথি মেডিকেল কলেজ চালানো হচ্ছে। সময় এসেছে সরকারি নীতিনির্ধারক পর্যায়ে তথ্য প্রমানাদি হাজির করে হোমিওপ্যাথিসহ অন্যান্য অপচিকিতসার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেবার।
হোমিওপ্যাথির অকার্যকারীতার একটি সহজ বাংলা বিশ্লেষনঃ
হোমিও-প্যাথেটিক গাঁজাবিজ্ঞান
তথ্যসূত্রঃ The Guardian, The Guardian, wikipedia, Lancet Journal, Medical Journal of Australia
হোমিও চিকিৎসায় আমার গলায় আটকে থাকা মাছের কাটা দূর হয়েছে। কিভাবে হোমিও ঔষধে মাছের কাটা দূর হলো তার কার্যকরন চিন্তা করে বের করেছি। কিন্তু বলবো না কারন এটা ডাঃদের গ্রুপ আমজনতার না।আমজনতাকে বুঝায় বলতে হয়।নাহয় ওরা আবার হোমিওপ্যাথিকে জাদু বিজ্ঞান মনে করে।বাই দ্যা ওয়ে বর্তমানে হোমিওপ্যাথি নিয়ে একটা রিসার্চ করতেছি।কারা হোমিও পেশেন্ট,কারা ডাক্তার,ওদের সিলেবাস,ঔষধ ফার্মাকোপিয়া ইত্যাদি। অনেক ইন্টারেস্টিং ইনফো জানতে পারতেছি। সমস্যা হলো লোকবল আর অলসতা এই দুইয়ের কারনে আটকায় আছি।বড্ড অলস মানুষ আমি।