বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসার পদে কমিশনের যোগ্যতা নিরুপনের অন্যতম ধাপ হলো আইএসএসবি। এইখানে একজন পরীক্ষার্থীর শারীরিক এবং মানসিক সক্ষমতার পরীক্ষা নেওয়া হয়। এই যোগ্যতা আলাদা ভাবে কোচিং করে বা কসরত করে আয়ত্বে আনা বেশ দুরূহ। এর চে সবচেয়ে সোজা পদ্ধতি হলো নিজস্বতা প্রকাশ। কোচিং করা বা অন্যান্য প্রস্তুতি আপনাকে এগিয়ে দিতে কিছুটা সহায়তা হয়ত করতে পারে তবে সবচেয়ে উত্তম উপায়, “নিজের আত্নবিশ্বাস কাজে লাগানো।“
আজকে আইএসএসবির কিছু পরীক্ষা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেবার চেষ্টা করছি। এটি নিছকই আমার অভিজ্ঞতা থেকে লেখা। বর্তমানে আইএসএসবির পরীক্ষায় বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। আমি জতটুকু সম্ভব এখানে জানানোর চেষ্টা করছি। কোন ভুল থাকলে, নতুন তথ্য থাকলে কমেন্টে শেয়ারের অনুরোধ করছি। পরে পোস্টে এড করা হবে।
১) দৌড়ঝাপের অভ্যাস না থাকলে একটু দৌড়ঝাপ করুন। লং জাম্প, পুশ আপ, বিম এগুলো চেষ্টা করে দেখুন।
২) ফুলস্লিভ শার্ট( চাখরাপাখড়া না), টাই, প্যান্ট, সু, শাদা হাফপ্যান্ট, সাদা টি শার্ট, ভেস্ট, সাদা মোজা, কেডস, তিনরাত থাকার প্রস্তুতি নিয়ে রাখুন।
৩) মোবাইল আইএসএসবির গেটে রেখে দিবে। সুতরাং না নেওয়াই উচিত।
৪) স্বাভাবিক ছাটের চুল থাকলেই হবে। আর্মি ছাট দিয়ে যেতে হবে এমন কথা নেই। অবশ্যই ক্লিন শেভ করবেন।
৫) প্রথমদিন ইন টাইম যাওয়ার চেষ্টা করবেন।
আইএসএসবি অবস্থানকালীন করণীয় এবং পরিত্যাজ্যঃ
১) আইএসএসবির গেটে ঢোকার পর হতেই আপনার এক্সাম শুরু হয়ে যাবে। সুতরাং নিজের ব্যবহার, কথাবার্তা, আচরণ হিসেব করে করুন। আইএসএসবির অফিসার, সাইকোলজিস্ট, স্টাফ থেকে শুরু করে ডাইনিং এর মেসবয় সবাই আপনার আচরন নোট করবেন।
২) সময়ানুবর্তিতা। যে সময়ে ফলইন দেওয়া হবে অবশ্যই তার আগেই প্রস্তুত হয়ে জায়গামত উপস্থিত হবেন। স্টাফের কথামত চলবেন। ইচ্ছে হলো করে ফেললাম এই কয়েকদিনের জন্য পরিহার করুন।
৩) লাইটস অফের টাইমে অবশ্যই রুমের লাইট অফ করে শুয়ে পড়বেন। ডাইনিং এ অযথা উচ্চস্বরে গল্প বা কোন স্টাফের সাথে কড়া ভাষায় কথা বলবেন না। আপনার জন্য যথেষ্ট খাওয়া সাপ্লাই থাকবে। হুড়োহুড়ির কারন নাই।
৪) কোন এক্সামে নকল, বা কথা বলাবলির চেষ্টা করবেন না। সোজা বাসায় পাঠায়ে দেওয়া হবে।
৫) আইএসএসবির প্রতিটি এক্সামের আগে বিস্তারিত ব্রিফিং দিয়ে দেওয়া হয়। কিভাবে উত্তর লেখা লাগবে, কি করা লাগবে সব বলে দেয়া হয়। প্রতিটি ব্রিফিং ভালমত শুনে নিতে হবে।
প্রথম দিনঃ ব্যাগ সহ রিপোর্টিং এর পর মেসে নেওয়া হবে। চেস্ট নম্বর দেওয়া হবে। লাল নীল হলুদ বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করা হবে। রুম এ ব্যাগ রেখে সকালের ব্রেকফাস্ট খাওয়ানো হবে। আইএসএসবির পক্ষ থেকে ওয়েলকাম এড্রেস দেওয়ার পর আইকিউ এক্সাম শুরু হবে।
আইকিউ এক্সামঃ স্ক্রিন্ড আউটের প্রথম ধাপ হলো আইকিউ এক্সাম। ওএমআর উত্তরপত্রে এটি হয়ে থাকে। ১০০টি আইকিউ প্রশ্ন ত্রিশ মিনিটে এবং ৩৮টি ম্যাট্রিক্স ২২ মিনিটে সমাধান করা লাগে। আইকিউ প্রশ্নের কিছু নমুনা ডিফেন্স গাইডে পাওয়া যাবে। কয়েকটি নমুনা দেই-
ক। Complete the series: 71, 65, 61, 55, 45,?,?
খ। Air is to Bird as Sea is to-Fish/Ship/Boat/Snake.
গ। Rearrange the jumble word: INWE (Name of a Drink)
ঘ। Moscow/London/New York/Paris/Dhaka. (Find the Odd)
ম্যাট্রিক্স হলো নন ভার্বাল এক্সাম। একই রকম প্যাটার্ন বা সিকোয়েন্সের সাথে মিলিয়ে উত্তর থেকে সঠিক প্যাটার্নটি খুজে বের করা। যেমন কয়েকটা একই টাইপের স্কয়ার দেয়া থাকতে পারে। উত্তরে আয়তকার, কোণ, স্কয়ারের মধ্য থেকে একই প্যাটার্নের স্কয়ার খুঁজে বের করতে হবে।
টিপসঃ আইকিউ টেস্টে সময় খুব কম পাওয়া যায়। খুব দ্রুত উত্তর করতে হবে। কোনটাতে আটকে গেলে বসে না থেকে পরেরটা আন্সার করে যেতে হবে। উত্তরের সিকোয়েন্স যেন আবার ভুল না হয়ে যায় খেয়াল রাখা লাগবে।
পিপিডিটিঃ পিকচার পারসেপশন এন্ড ডেস্ক্রিপশন টেস্ট। আইকিউ টেস্টের স্ক্রিন্ড আউটদের বাদ দিয়ে একই পরীক্ষা হলের প্রজেক্টরে অস্পষ্ট একটি ছবি দেখানো হবে। ছবি দেখে ছবির বর্ণনা দেওয়া লাগবে, ছবিতে কতজন আছে, তাদের জেন্ডার কি, এবং তারা কি করছেন। এরপর সামঞ্জস্যপূর্ন একটি গল্প তৈরি করতে হবে। মোট সময় ৪ মিনিট।(কম বা বেশি হতে পারে) গল্প অবশ্যই পজেটিভ এবং মোরাল ও যুক্তিযুক্ত হওয়া লাগবে।
লেখা শেষ হলে সবাইকে গ্রুপ অনুযায়ী গ্রাউন্ডে নেয়া হবে। সাইকোলোজিস্ট, জিটিওর উপস্থিতিতে হবে গ্রুপ ডিস্কাশন। সবাই একবার করে নিজের স্টোরি বলবেন এবং নিজের স্টোরির পক্ষে যুক্তি দেখাবেন। এরপর ওপেন ডিস্কাশন। একজন আরেকজনের যুক্তি খন্ডানোর চেষ্টা চালাবেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে একজন আরেকজনকে নেগেটিভলি আক্রমন করবেন না। অন্যের যুক্তি উড়ায়ে দেবার চেষ্টা করবেন না। যাই পারুন মুখ খুলবেন। ডিস্কাশনের সময় অফিসারের দিকে তাকাবেন না। ইংরেজিতে কথা বলবেন। অফিসার একসময় একটি ডিসিশনে আসতে বলবে তখন সবাই মিলে একজনের গল্পকে সাপোর্ট দিবেন। যদি পুরো গ্রুপ একমত না হতে পারেন হতে পারে পুরো গ্রুপ আউট হয়ে যাবেন। সুতরাং এখানে সাপোর্টিভ রোল দেখাতে হবে।
পিপিডিটি শেষে রেজাল্ট দিবে। সেকেন্ড স্ক্রিন্ড আউট শেষে বাকি সবাইকে লাঞ্চে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। পরবর্তী তিনদিনের এক্সাম এবার শুরু।
সাইকোলজিক্যাল এন্ড পার্সোনালিটি টেস্টঃ বিকেল থেকে রাত অবধি এই টেস্ট চলবে। পুরোটাই লেখালেখি। তবে এর মধ্যে সতর্কতা আবশ্যক।
ক। ওয়ার্ড এসোশিয়েশন টেস্টঃ প্রজেক্টরে একটির পর একটি শব্দ যেতে থাকবে আর সেই শব্দ দিয়ে আপনি একটি বাক্য তৈরি করবেন। প্রতিটির জন্য দশ সেকেন্ড। ৬০ টি ইংরেজি ২০ টি বাংলা। বাক্য তৈরির সময় পজেটিভ চিন্তা প্রকাশ করবেন অবশ্যই। নির্দেশনা মূলক কথা লিখবেন না। যেমন You should not lie না লিখে lying is a sin লেখা উত্তম।
খ। গল্প লেখাঃ বাংলা ও ইংরেজিতে দুটি গল্প লেখা লাগবে। প্রজেক্টরে ছবি দেখানো হবে। সেটি সম্পর্কে পজেটিভলি গল্প তৈরি করবেন।
গ। নিজের ভাল ও খারাপ গুণ সম্পর্কে লিখতে হবে। নিজের জীবনের সুখের এবং কষ্টের স্মৃতি লিখতে হবে।
ঘ। বিস্তারিত দুটি বায়োডাটা পূরণ করতে হবে। চাচা, মামা, খালু, দাদা নানা সবার সম্পর্কে জানতে চাওয়া হবে। কে কি করে, কোথায় চাকরি করে, দাদা নানার নানী দাদীর বয়স পূর্ন নাম ঠিকানা সব কিছু জেনে যাবেন।
টিপসঃ আপাতদৃষ্টিতে এই এক্সাম সোজা লাগলেও এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে আপনার প্রদত্ত তথ্যগুলোকে বারবার যাচাই করা হয়। আপনি সত্য বলছেন না মিথ্যে বলছে ধরা যায়। ডিপি ভাইভাতেও আপনার এই খাতাগুলো পরীক্ষকের সামনে থাকে। উনি নানা প্রশ্নের মাধ্যমে আপনার লেখা তথ্যগুলো ক্রস চেক করবেন।
ক। গ্রুপ ডিসকাশন। বাংলা এবং ইংরেজি দুটি টপিক্স দেওয়া হবে। গ্রুপের সবাই মিলে আলোচনা করা লাগবে। চুপ করে বসে থাকবেন না। সবার সাথে আলোচনা করুন। স্পষ্ট উচ্চারনে কথা বলবেন যেন অফিসার শুনতে পায় ঠিকমত।
খ। এক্সটেম্পোর স্পিচঃ লটারিতে একটি বিষয় দেওয়া হবে। মিনিট পাঁচেক ভাববার সময় পাবেন। এরপর সেই বিষয়ের উপর বক্তৃতা দিবেন।
গ। প্রগ্রেসিভ গ্রুপ টাস্ক। গ্রুপের সবাই মিলে কয়েকটি বাধা অতিক্রম করবেন। এটি শুরুর আগেই বিস্তারিত ব্রিফিং দেওয়া হবে। দড়ি, ড্রাম, লগ ইত্যাদির সাহায্যে বাধা অতিক্রম করবেন। সময় সীমিত। চেষ্টা করবেন এই টাস্কের সময় নিজের প্ল্যান সবাইকে জানাতে। একটিভলি টাস্কে সবাইকে হেল্প করবেন। গ্রুপের কর্তৃত্ব নিজে নেবার চেষ্টা করবেন তবে ঝগড়া করে নয়। নিজে সুন্দরভাবে সমস্যার সমাধান দিয়ে।
ঘ। হাফ গ্রুপ টাস্ক। প্রগ্রেসিভের মতই। এখানে পুরো গ্রুপকে অর্ধেক বানিয়ে বাধা অতিক্রম করতে দেওয়া হবে।
ঙ। ইন্ডিভিজুয়াল অবস্ট্যাকলঃ প্রত্যেক প্রার্থিকে সাতটি আইটেমে অংশ নিতে হবে। ফিমেল প্রার্থিদের টেস্ট কিছুটা আলাদা। এই এক্সামের জন্য আইএসএসবি কর্তৃক আপ্লোডকৃত ভিডিও-
চ। ডেপুটি প্রেসিডেন্ট ভাইভাঃ আলাদা আলাদা ভাবে সবার এই ভাইভা হয়ে থাকে। নির্দিষ্ট কোন সময় নাই। যতক্ষণ প্রয়োজন আপনাকে জাজ করতে ততক্ষন যাবত ভাইভা হবে। আপনার ফ্যামিলি, পড়াশোনা, ইচ্ছা অনিচ্ছ্ স্বপ্ন, পার্সোনাল জীবন, প্রেম,সেক্স সবকিছুই আসতে পারে এই ভাইভায়। পার্সোনালিটি টেস্টে লিখে আসা তথ্যগুল ঘুরিয়ে পেচিয়ে জানতে চাওয়া হবে। রাজনীতি, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দিতে বলবে। কোন পক্ষপাতদুষ্ট মন্তব্য করবেন না। সর্বদা সত্য কথা বলার চেষ্টা করবেন। ইতস্তত করবেন না। রুমে কি কি আছে, কে কে আছে দেখার চেষ্টা করবেন না। অফিসারের চোখে চোখ রেখে কথা বলবেন। মাথা নিচু করে বসবেন না। পা ঝাকাবেন না। হাত নেড়ে কথা বলবেন না। রেগে যাবেন না। উলটো প্রশ্ন করবেন না। একেবারে পরিচিত মানুষের মত কথা বলুন।
তৃতীয় দিনঃ
ক। প্ল্যানিং এক্সারসাইজ। একটি ম্যাপ ও সমস্যা দেওয়া থাকবে। সমস্যায় আপনাকে ম্যানপাওয়ায় ,ইকুইপমেন্ট, সময়, রিসোর্স উল্লেখ করে দিবে। সেই অনুযায়ী সমস্যার সমাধান করবেন। প্রথমে রিটেন এক্সাম হবে। পরে গ্রাউন্ডে গ্রুপে বড় ম্যাপে সেই বিষয়ক আলোচনা হবে। রিটেনে একেকজন একেক সমাধান লিখলেও গ্রুপ ডিস্কাশনে একেকজন একেক সমাধান না দিয়ে সবাই মিলে একটি সমাধান নির্বাচন করুন। একজন বা দুইজনকে সেই সমাধান পরীক্ষকের সামনে উপস্থাপনের দায়িত্ব দিন।
খ। কমান্ড টাস্কঃ আপনাকে কমান্ডার বানিয়ে আপনার আন্ডারে অন্য কয়েকজন পরীক্ষার্থীকে দেওয়া হবে। আপনার নির্দেশনায় সবাই মিলে একটি বাধা অতিক্রম করবেন। সময় সীমিত থাকবে। লক্ষ্য রাখবেন আপনার আন্ডারকমান্ড যেন আপনার নির্দেশ শোনেন। আগেই গ্রুপের সবার সাথে ভাল সম্পর্ক রাখবেন। আপনি কাদের সিলেক্ট করবেন তাদের আগেই জানিয়ে রাখবেন। ধরুন গ্রুপে এগারোজন আছেন। সবাই একবার করে কমান্ডার হবে। সে অন্যদের মধ্য থেকে তিনজনকে সিলেক্ট করবে আন্ডারকমান্ড হিসেবে। আপনাকে যদি কেউই আন্ডারকমান্ড হিসেবে ডাক না দেয় তবে তা আপনার ডিসক্রেডিট। সুতরাং গ্রুপের সবাই যেন সমান ডাক পায় সে ব্যবস্থা আগেই করে নিবেন। কমান্ডার হিসেবে বাধা অতিক্রমের সময় নিজে আগে বা শেষে পার হবেন না। মাঝামাঝি সময়ে পার হবেন।
গ। মিউচুয়াল এসেসমেন্টঃ আপনাকে আপনার গ্রুপ সম্পর্কে মিউচুয়াল এসেসমেন্ট করতে দিবে। কাকে আপনি কত পজিশনে রাখতে চান সেটি সিরিয়াললি লিখবেন। এইখানেও একটু নজর রাখবেন যেন আপনি কারো না কারো লিস্টে যেন এক নম্বরে থাকেন নিজের লিস্ট বাদে। এই এক্সামে আপনার এসেসমেন্ট করার সক্ষমতা দেখা হবে।
ঘ। ভাইভাঃ আগের দিনের যাদের ভাইভা বাকি ছিলো তাদের ভাইভা শেষ করা হবে।
ঙ। মুভিঃ রাত্রে একটি ইংরেজি মুভি দেখানো হয়। অনেকেই মুভি দেখার সময় ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু মুভি দেখা শেষ রাত্রে এক্সাম হলে নিয়ে যেয়ে মুভির সারমর্ম, গল্প সম্পর্কে লিখতে বলা হয়। সুতরাং মুভি দেখবেন মনোযোগ দিয়ে।
আপনার এক্সাম তৃতীয়দিনেই শেষ। চতুর্থদিন কোন এক্সাম হয়না। সকাল থেকে সিলেকশন বোর্ড বসে। তিনদিনের পারফর্মেন্স আলোচনা হয়। কারো সম্পর্কে অনিশ্চয়তা থাকলে তার পুনরায় ভাইভা হতে পারে। সব চূড়ান্ত হলে রেজাল্ট দিয়ে দেওয়া হয় গ্রিন বা রেড কার্ড।
লিখেছেন ঃ ডাঃ শামস , বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
Dr. der jnne ISSB ta nki aktu easy hoy sune chilam,
a bapare kichu bolben ? 🙂