মনে করি-১ প্রশ্নপত্র সহজ হয়েছে। এবং প্রশ্নপত্র সহজ করার জন্য বিরাট অংকের অর্থ লেনদেন হয়েছে। প্রশ্ন সহজ হলে কার লাভ? শিক্ষার্থীদের না কি সেই সব ব্যবসায়ীদের যাঁদের কোটি কোটি টাকার ব্যবসা গত দু এক বছর ধরে মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে মন্দা যাচ্ছে। মেডিকেল শিক্ষার মান বজায় রাখতে একটা নির্দিষ্ট নাম্বারের কম পেলে শিক্ষার্থীরা ভর্তির জন্য অযোগ্য ঘোষণা করায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ব্যতীত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে আসন ফাঁকা ছিল। তাই সেই বিশেষ পক্ষ চাইছিল এবার জন্য প্রশ্ন সহজ হয়। প্রশ্ন সহজ এই অর্থে প্রতিবার ভর্তি পরীক্ষায় একদম আনসিন/আনকমন ১০-১২টা প্রশ্ন থাকে কিন্তু এবার সব হয় কমন টপিক অথবা একদমই সহজ। প্রশ্ন প্রণয়নের সাথে প্রশাসক, শিক্ষক প্রত্যেকেই একেকজন চিকিৎসক। এখানেই আমার লজ্জা, একারণেই পুড়ে যাচ্ছি কিন্তু তাঁদের বলতে পারছি না স্যার আপনারা অস্বীকার করুন যে প্রশ্ন সহজ হওয়ার পেছনে কোন যোগসাজশ ছিলো না। কিন্তু দু’বার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে অস্বীকার করা হয়েছে প্রশ্ন ফাঁস হয়নি। বিশেষ কোন শ্রেণীকে সুবিধা করে দিতে গিয়ে পূর্ব পরিকল্পনা করে প্রশ্ন সহজ করা কি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না? যারা সুবিধা পেতে যাচ্ছিল তারা প্রত্যেকই অন্তর ২০-৪০ লাখ টাকা খরচ করার সামর্থ্য রাখে। কিন্তু যারা এর ফলে বঞ্চিত হচ্ছে তারা কেউ কৃষকের ছেলে, কেউ স্কুল মাস্টার বা মধ্যবিত্ত বাবার কষ্টের টাকায় মানুষ হওয়া মেয়ে। হ্যাঁ তাঁদের অভিশাপে পুড়ে যাচ্ছি, কারণ তাঁদের জন্য আমার কিছু করার ক্ষমতা নেই।
মনে করি-২, ফলাফল প্রকাশে ত্রুটি ছিল। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার মত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের আগেই অনলাইনে পাওয়া যেতে থাকে গভীর রাতে। ফলাফল অনলাইনে উন্মুক্ত থাকার ঘন্টা তিনেক পর সেটি বন্ধ করা হয়। তবে আশ্চর্যজনক ভাবে আগের ফলের সাথে তার দু তিন ঘন্টা পর পরীক্ষার্থীদের মোবাইলে পাঠানো ফলাফল মেধাক্রম এবং সুযোগ পাওয়া মেডিকেল কলেজের হিসেবে একই থাকে শুধু প্রাপ্ত মোট নম্বর ৪-৫ কমে যায়। ফলাফল অফিসিয়ালি প্রকাশের আগে এরকম ঘটনা নজিরবিহীন। পরীক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা টেক্সট বুক(যেগুলো সরাসরি বই থেকে এসেছে) মিলিয়ে প্রশ্ন সলভ করে অনুমিত যে নম্বর পাবার কথা মূল ফলাফলে প্রায় সব পরীক্ষার্থীরই ৫-৬ নাম্বার কম ছিল। আবার মূল ফলাফলে সর্বোচ্চ নম্বর ফুল মার্কস থেকে ৫-৬ নম্বর কম। তার মানে উত্তরসহ প্রশ্ন ফাঁস যদি আসলেও হয়ে থাকে যুক্তিসংগত ভাবে একজনের নাম্বার কখনোই ১০০ তে ১০০ বা তার কাছাকাছি হবে না। কিন্তু প্রথম প্রকাশিত ফলাফলে সেরকমই ছিল পরে অফিসিয়াল ফলাফলে যেটা কমে আসে। আবার প্রাপ্ত নম্বরের সাথে অনেকের মেধাক্রম অনুযায়ী প্রাপ্য মেডিকেল কলেজের জন্য বিবেচিত হয়নি। ধারাবাহিকভাবে ভালো প্রস্তুতি নেয়া অনেক শিক্ষার্থী ভর্তির নূন্যতম যোগ্যতাই অর্জন করেনি। শেষ দুটো ঘটনা তখনোই ঘটবে যখন পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের কার্যক্রমে তড়িঘড়ি করা হয়। এতগুলো অসংগতি এবার এক সাথে ঘটলো যখন ব্যাপক হারে প্রশ্ন ফাঁসের কথা সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছিল। এরকম একটি পরীক্ষার ফলাফল যখন মানুষের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে সেখানে আরেকটু যত্নশীল না হওয়াটা প্রশ্নের জন্ম দেয়।
মনে করি-৩, ব্যাপক হারে প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। এর আগে আরো কয়েকটি শিক্ষাবর্ষে প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে কিন্তু কোনটি এবারের মত ব্যাপক হারে হয়নি। অন্যান্য বার যে উপায়ে প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর বেড়িয়েছে সেখানে দেখা গেছে এ অপকর্মটি একক উৎস থেকে পরীক্ষার আগের রাতে ঘটে, যে সকল অসৎ পরীক্ষার্থী এর ক্রেতা/গ্রহীতা তারা একটি নির্দিষ্ট জায়গায় অন্তরীন থাকে যেখান থেকে মোবাইলে বা অন্য উপায়ে যোগাযোগ করা যায় না এবং অবশ্যই অবশ্যই এই হস্তান্তর প্রক্রিয়ার জন্য তাদের একটি বড় অংকের টাকা দিতে হয়েছে। আগের বার যখন বড় আকারে প্রশ্ন ফাঁস হয় তখন ঢাকার কোচিং পাড়ার ফটোকপির দোকানে দোকানে “একটি ভালো সাজেশন” হিসেবে বিক্রি হয়েছিল। কিন্তু এবার সম্ভবত সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম সহজলভ্যতা বা অল্প টাকায় পাওয়া যায় অথবা বিভিন্ন উৎস থেকে ছড়িয়ে পড়া বা পরীক্ষার ঠিক পূর্বাহ্নে না ফাঁস হয়ে বেশ আগে আগেই ঘটেছে। দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের বার বার সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী প্রশ্ন ছাপানো এবং পরীক্ষা কেন্দ্রে পাঠানোর সময় কোন অবস্থাতেই ফাঁস ঘটেনি। হ্যাঁ সত্যি সত্যিই ছাপানো এবং পাঠানোর সময় ঘটলে এত ব্যাপক হারে ফাঁস হত না সম্ভবত তারও আগের ধাপে প্রশ্ন ও তার উত্তর প্রস্তুত করার পর হয়ত ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। যদি এই ধাপেই এ হীন কাজটি করা হয়ে থাকে তবে অবশ্যই কর্মচারী শ্রেণী বা মধ্য শ্রেণীর চাকুরে দিয়ে এটা ঘটেনি(কেঁচো নয় বড় ঢোঁড়া সাপ যে জড়িত তার পরোক্ষ প্রমাণ গ্রেফতারকৃত কর্মকর্তার আইন শৃংখলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু) । তার মানে শুধু টাকা দিয়েই এবার প্রশ্ন পাওয়া যায় নি অন্যান্য প্রার্থীর অন্যান্য যোগ্যতা (অবশ্যই বাবা-চাচার মামার জোর ভূমিকা রেখেছে-প্রমাণ ২৯ তারিখ স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে ২০১৫-১৬ শিক্ষা বর্ষে ভর্তি হতে আসা ২৪ জন শিক্ষার্থীরা ২২ জনই ব্যক্তিগত গাড়ি চড়ে এসেছে)।
প্রশ্ন ফাঁসের ফলে যারা বঞ্চিত হয়েছেন তাদের প্রতিবাদ করার খুব বেশি সময় নেই। সামনে বুয়েট, বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ভর্তি পরীক্ষা। চান্স না পাওয়ার হতাশা যতটা বেশি তার চাইতে বেশি কষ্ট এত অল্প বয়সেই তারা সমাজের কাছ থেকে কি মেসেজ পেলো-পড়াশোনার চাইতে অর্থ-বিত্ত-ক্ষমতা-কানেকশন বড় মেডিকেলে ভর্তি হতে। যারা প্রথম বারের মত ভর্তি পরীক্ষা দিল তাদের জন্য যতটা না যন্ত্রণার যারা দ্বিতীয়বার দিয়েছিল তাদের সামনে অন্ধকার ছাড়া আর কিছু নেই। শিক্ষার্থীদের পর আসি চিকিৎসকদের কথায়। এত দিন চিকিৎসক ছিলো কসাই, এখন থেকে সাধারণ মানুষের কাছে চিকিৎসক মানে চোর। চিকিৎসক সমাজ এত কলঙ্কিত এর আগে কখনো হয়নি। মেডিকেল কলেজের একেক জন শিক্ষক-শিক্ষিকা যতটা ক্ষুব্ধ, অসন্তুষ্ট যে এই ব্যাচের শিক্ষার্থীদের যখন ক্লাস নিতে হবে তাঁদের কাছে এর চেয়ে অপমানের কিছু নেই। মেডিকেলের পড়াশোনায় মেধা যতটুকু লাগে তার চেয়ে বেশি লাগে ধৈর্য, একাগ্রতা আর লেগে থাকার মানসিকতা। এক রাতের ফেসবুক-হোয়াটস অ্যাপ-আর বাবার টাকার জোরে যে মেডিকেলে চান্স পেলো সে হয়ত অনায়াসে মেডিকেলের হাজার টাকার বই কিনতে পাড়বে কিন্তু সেই বই পড়ে আইটেম-কার্ড-টার্ম-প্রফের অগ্নিপরীক্ষা পার করতে পারবে না। কষ্ট করে যেহেতু সে এখানে আসেনি, তার উপর প্রশ্ন ফাঁসের ওপেন সিক্রেট সবাই জানে, সিনিয়র সকল ব্যাচের শিক্ষার্থী, শিক্ষকদের ঘৃণার মানসিক চাপ নিতে পারবে না। কিন্তু এই একটা ব্যাচ মেডিকেল কলেজের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করবে, জুনিয়রদের করবে বিপথগামী। সেগুলো অনেক পরের কথা,আগে এই তিনটি বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কাছে সবিনয় অনুরোধ করছি-
১ প্রশ্ন পত্র সহজ হওয়া
২ ফলাফল প্রকাশ সংক্রান্ত ত্রুটি
৩ প্রশ্ন ফাঁস কোন পর্যায় থেকে ঘটেছে এবং কেন?
স্বাস্থ্য খাতে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নতুন না। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য সেবা ধ্বংসে এর আগে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে শুরু করে তৃণমূল উপজেলা পর্যায়ে এমনকি টারশিয়ারি হাসপাতালকেও টার্গেট করা হয়েছে। চিকিৎসকেরা সব সময়ই সফট টার্গেট, তাই এবার টার্গেট করা হলো চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে। একটা অযোগ্য ব্যাচ-একটা প্রশ্নবিদ্ধ ব্যাচ সব কিছু ধ্বংস করতে পারে, পুরো চিকিৎসক সমাজের প্রতি সাধারণ জনগণের মাঝে ইতিমধ্যে সন্দেহ ঢুকে গেছে। হয় এই সন্দেহ দূর অথবা এই প্রশ্ন ফাঁসের ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করে আবার সুষ্ঠ পরীক্ষা না নেয়া হলে মেডিকেল সেক্টর কলুষিত হয়েই থাকবে যার পচনের শুরু ২০১৫-১৬ ব্যাচের লুকিয়ে ভর্তি কার্যক্রমের মাধ্যমে।
No news covering on Prothom Alo !