শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬
বাংলাদেশের শিশুদের ডায়রিয়ার চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত একটি প্রোবায়োটিক তার আমদানিকারকের জন্য হয়েছে অস্বাভাবিক মুনাফার উৎস; কিন্তু তা পণ্যের চিকিৎসাগত গুণের কারণে নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ বিধিমালার ফাঁক-ফোকরের কারণে।
সম্প্রতি বাংলা আউটলুকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়– আমদানিকারক কোম্পানিটির কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এক হুইসেলব্লোয়ারের অভিযোগ, ওষুধটিকে ‘খাদ্য সম্পূরক’ (ফুড সাপ্লিমেন্ট) হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করে আদায় করা হচ্ছে ৬০০ শতাংশ মুনাফা।

বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের সাবেক এই কর্মীর তোলা অভিযোগ – এই ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে ইতালির-তৈরি প্রোবায়োটিক ‘এন্টারোজার্মিনা ওরাল সাসপেনশন’। বাংলাদেশে এটি আমদানি করে সিনোভিয়া ফার্মা পিএলসি— যা বেক্সিমকো গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। পণ্যটিকে ফার্মাসিউটিক্যাল ওষুধ (যে শ্রেণিতে মূল্যনিয়ন্ত্রণ ও কঠোর তদারকি প্রযোজ্য) হিসেবে নিবন্ধন না করে কোম্পানিটি একে খাদ্য সম্পূরক হিসেবে নিবন্ধন বাজারজাত করছে। কারণ এক্ষেত্রে নীতিমালা শিথিল এবং সরকারি হস্তক্ষেপও কম থাকায় কোম্পানির মর্জিমাফিক মুনাফা আদায় করা যায়।
হুইসেলব্লোয়ারের মতে, এই শ্রেণীবিভাগই এর খুচরা মূল্যকে প্রায় নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে।
হুইসেলব্লোয়ারের প্রদত্ত আমদানি নথি, শুল্ক ও ব্যাংকিং কাগজপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, এন্টারোজার্মিনার ঘোষিত আমদানি মূল্য প্রতি প্যাকেট ১ ডলারেরও কম। ১০টি ভায়ালের একটি বাক্সের মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ০.৭৮ মার্কিন সেন্ট , যা বাংলাদেশের টাকায় প্রায় ৯৭ টাকা। অথচ এই প্যাকেটই দেশের বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে ৭০০ টাকায় (প্রতি ভায়াল ৭০ টাকা হিসেবে)।
বেক্সিমকোর সাবেক কর্মীর ভাষ্যমতে, গত দুই বছরে খুচরা দাম ৫০০ থেকে বেড়ে ৭০০ টাকা হয়েছে—অর্থাৎ ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে—কিন্তু ভোক্তা বা স্বাস্থ্য সেবাদাতাদের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা সরকারি বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি।
হুইসেলব্লোয়ার আরো জানান, যেহেতু পণ্যটি খাদ্য সম্পূরক হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ এবং তদারকির অভাব বিদ্যমান, তাই আমদানিকারক ৬০০ শতাংশের বেশি মুনাফা ধরে রাখতে পেরেছে।”
সম্প্রতি প্ল্যাটফর্ম টুডের হাতে আসে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক গত বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী Enterogermina সংক্রান্ত তথ্য প্রদানের একটি নথি। নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চারটি তথ্যের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল।
ক) প্রোবায়োটিক পণ্যসমূহ শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের ডায়রিয়ার চিকিৎসায় চিকিৎসকদের মাধ্যমে নিয়মিত প্রেসক্রাইব করা হয়, সেগুলোকে কোন বৈজ্ঞানিক ও আইনি ভিত্তিতে খাদ্য সাপ্লিমেন্ট হিসেবে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে?
খ) ১. প্রতি ইউনিট পণ্যের আমদানি মূল্য (CIF)
২. পরিশোধিত শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য কর
৩. পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার কমিশন
৪. সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (MRP) এবং কোম্পানির নিজস্ব মার্ক-আপ
৫. আন্তর্জাতিক বাজারে একই পণ্যের বিক্রয়মূল্যের তুলনামূলক তথ্য (এই তথ্যগুলো কোম্পানি কর্তৃক অফিসিয়ালি সরবরাহকৃত হতে হবে)
গ) খাদ্য সাপ্লিমেন্ট হিসেবে নিবন্ধিত পণ্যের ক্ষেত্রে উৎপাদক বা আমদানিকারকের লাভের হার ও মূল্য নির্ধারণের যৌক্তিকতা যাচাই করার কোনো বিধান আছে কি? থাকলে সংশ্লিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করা হয়েছে কিনা, তা জানানো হোক।
ঘ)ঔষধ প্রশাসন উক্ত কোম্পানিকে “এন্টারোজার্মিনা” (Enterogermina) কত মেয়াদের জন্য আমদানির অনুমতি দিয়েছে।
নথিতে প্রথম তিনটি জিঙ্গাসার সদুত্তর পাওয়া না গেলেও চতুর্থ তথ্য অনুযায়ী গত ৩০ জুন, ২০২৬ তারিখে Enterogermina এর আমদানির অনুমতির মেয়াদ শেষ হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, এন্টারোজার্মিনায় রয়েছে ‘ব্যাসিলস ক্লসি’ (Bacillus clausii) ব্যাকটেরিয়ার স্পোর, যা চিকিৎসকেরা পরিপাকতন্ত্রের নানা সমস্যায় (বিশেষ করে শিশুদের ডায়রিয়ায়) প্রচুর পরিমাণে প্রেসক্রাইব করে থাকেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে শিশুদের জন্য উপযোগী তরল প্রোবায়োটিকের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় পণ্যটি অস্বাভাবিকভাবে লাভজনক এবং একইসাথে এর অপব্যবহারের ঝুঁকিও রয়েছে।
এছাড়াও, শুধু মূল্যই নয়, আমদানি প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। ‘বাংলাদেশের ড্রাগস অ্যান্ড কসমেটিকস আইন –২০২৩’ অনুযায়ী, খাদ্য সম্পূরক আমদানির জন্য ফ্রি-সেল সনদ, বিশ্লেষণ সনদ (সিওএ), উৎপাদন নথি ও স্থিতিশীলতার তথ্য (স্ট্যাবিলিটি ডেটা) জমা দিতে হয়। হুইসেলব্লোয়ারের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে এই বাধ্যতামূলক কাগজপত্রের বিস্তারিত নিয়ন্ত্রকদের কাছে জমা দেওয়া হয়নি।
আরও উদ্বেগের বিষয়, ২০২২ সালে মাত্র এক বছরের মেয়াদে দেওয়া একটি অনুমোদনের ভিত্তিতেই সিনোভিয়া এখনও পণ্যটি আমদানি করে চলেছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ফার্মাসিউটিক্যাল আমদানির জন্য ‘নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট’ সাধারণত আরও স্বল্প মেয়াদে (প্রায় ছয় মাস) দেওয়া হয়, যদিও পণ্য ও কর্তৃপক্ষ ভেদে শর্ত ভিন্ন হতে পারে।
হুইসেলব্লোয়ার আরও উল্লেখ করেন, এন্টারোজার্মিনার স্থানীয় বিকল্প প্রোবায়োটিক ইতোমধ্যে বাংলাদেশে উৎপাদিত হচ্ছে। তাঁর যুক্তি, একবার দেশীয় সমতুল্য পণ্য পাওয়া গেলে আমদানি করা প্রস্তুত পণ্যের ওপর কঠোর তদারকি হওয়া উচিত।
এন্টারোজার্মিনা ঘিরে গুরুতর আরো অভিযোগ এর শুল্ক মূল্যায়নকে ঘিরে। হুইসেলব্লোয়ার জানান, ২০২২ সালেই শুল্ক কর্মকর্তারা এন্টারোজার্মিনার ঘোষিত চালান মূল্য (ইনভয়েস ভ্যালু) নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। যা ইঙ্গিত দেয়, আমদানিকারক আন্ডার-ইনভয়েসিং (কম দাম দেখানো) করে থাকতে পারে। কর্মকর্তারা জানান, পাইকারি ক্রয়মূল্যের মাপকাঠিতেও প্রতি প্যাকেটের ঘোষিত দাম অযৌক্তিকভাবে কম।
এক্ষেত্রে ঘোষিত দাম ও প্রকৃত দামের ব্যবধান আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরেও নিষ্পত্তি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। যা প্রমাণিত হলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা বিধিমালা ও মানিলন্ডারিং বিরোধী কাঠামো লঙ্ঘনের মতো ঘটনাও ঘটে থাকতে পারে।
জানা গেছে, বাংলা আউটলুকে প্রকাশিত এ বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, সিনোভিয়া ফার্মা কিংবা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কেউই এ বিষয়ে বারবার মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
