শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬
বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ভেন্টিলেটর (কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস) সহায়তায় থাকা এক ব্রেইনস্টেম গ্লিওমা রোগীর সফল চিকিৎসা সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম। ১৮ বছর বয়সী এক তরুণ রোগীকে সক্রিয় ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রেখে ৩০টি রেডিওথেরাপি সেশন সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে, যা দেশের ক্যান্সার চিকিৎসায় একটি নতুন মাইলফলক বলে দাবি করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

মঙ্গলবার (২২ জুলাই) চট্টগ্রামে আয়োজিত এক প্রেস মিটে রোগীর চিকিৎসার ইতিহাস, জটিলতা ও চিকিৎসা প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, দীর্ঘদিন ধরে ম্যালিগন্যান্ট ব্রেইনস্টেম গ্লিওমায় আক্রান্ত ওই তরুণের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। একপর্যায়ে শরীরের বাম পাশ দুর্বল হয়ে পড়ে, কথা বলতে সমস্যা দেখা দেয় এবং খাবার গিলতে গিয়ে শ্বাসনালিতে খাবার ঢুকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
উন্নত চিকিৎসার জন্য পরিবারের সদস্যরা তাকে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি তীব্র কার্ডিওরেসপিরেটরি ফেলিউরে আক্রান্ত হলে জরুরি ভিত্তিতে তাকে মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশনে নেওয়া হয়। পরে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায়ই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
চট্টগ্রামে ফেরার পর গুরুতর অবস্থায় তাকে এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামের মেডিকেল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (এমআইসিইউ) ভর্তি করা হয়। এ সময় হাসপাতালের রেডিওথেরাপি বিভাগের ভিজিটিং কনসালট্যান্ট ডা. ভাস্কর চক্রবর্তী পরিবারের সম্মতিক্রমে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে থাকা অবস্থাতেই রেডিওথেরাপি শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন।
চিকিৎসকরা জানান, আইসিইউতে থাকা সংকটাপন্ন রোগীকে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রেখে ৩০টি রেডিওথেরাপি সেশন সম্পন্ন করা অত্যন্ত জটিল ও চ্যালেঞ্জিং একটি প্রক্রিয়া। তবে আইসিইউ ও ক্যান্সার চিকিৎসকদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় তা সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, চিকিৎসার পর রোগী ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তাকে সফলভাবে ভেন্টিলেটর থেকে বের করে আনা হয়। পরে ট্র্যাকিওস্টোমি টিউব অপসারণ করা হয় এবং গিলে খাওয়ার সক্ষমতা ফিরে আসায় নাকের এনজি টিউবও খুলে দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি স্বাভাবিকভাবে মুখে খাবার গ্রহণ করতে পারছেন। পাশাপাশি ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের মাধ্যমে ওয়াকারের সহায়তায় হাঁটার সক্ষমতাও ফিরে পেয়েছেন।
চিকিৎসা শেষে কনট্রাস্ট এমআরআই ফিউশন পরীক্ষায় টিউমারের উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে বলে জানিয়েছে হাসপাতালটি।
ডা. ভাস্কর চক্রবর্তী বলেন, ‘লাইফ সাপোর্ট বা ভেন্টিলেটরে থাকা অবস্থায় সম্পূর্ণ আইসিইউ পরিবেশে রেডিওথেরাপি দেওয়া ছিল অত্যন্ত বড় চ্যালেঞ্জ। সফলভাবে ৩০টি রেডিওথেরাপি সেশন সম্পন্ন করে রোগীকে ভেন্টিলেটর থেকে মুক্ত করা এবং স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারা পুরো দলের জন্য বড় সাফল্য।’
এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামের মেডিকেল সার্ভিসেস ডিরেক্টর ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত এবং সমন্বিত চিকিৎসার মাধ্যমে বাংলাদেশেই আন্তর্জাতিক মানের জটিল ক্যান্সার চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।
হাসপাতালের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) সামির সিং বলেন, জটিল ক্যান্সার চিকিৎসায় শুধু প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন দক্ষতা, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসকদের সমন্বিত প্রচেষ্টা।
এই চিকিৎসায় রেডিয়েশন ও মেডিকেল অনকোলজি, ক্রিটিক্যাল কেয়ার, ইন্টারনাল মেডিসিন, রেসপিরেটরি মেডিসিন, কার্ডিওলজি, ইএনটি, ফিজিওথেরাপি, নিউট্রিশন ও নার্সিং বিভাগের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা যুক্ত ছিলেন।
প্রেস মিটে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসকরা উপস্থিত ছিলেন। রোগীর পরিবারও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
