মাউন্ট এলিজাবেথ ও আমার শিক্ষক

4

২০ থেকে ২২ বছর এর এক মধ্যবয়সী যুবক স্যার এর চেম্বার এ এসে বলতেছে স্যার আমি আর বাচব না,স্যার একটু বিস্মিত হয়ে গেলেন,কারন চেম্বার এ তো অনেক রোগী আসে কিন্তু কেউ এ কথা বলে না,স্যার জিজ্ঞেস করলেন,তোমার কি হয়েছে,যুবকটি বলল,স্যার বাংলাদেশ এর ডাক্তাররা বলছে,যে লিভার চেঞ্জ না করলে,আমি আর বাঁচবনা।

মুল ঘটনায় আসি, দুই তিন বছর আগে হঠাৎ করে ছেলেটি দেখতে পায় যে তার পেটে পানি আসছে,মোটামুটি শিক্ষিত এবং সচেতন ছেলে বলেই,সে প্রথম থেকে একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এর সরনাপন্ন হয়,কিন্তু পেটে পানি মাঝে মাঝে আসে, যাই হোক সেখানে চিকিৎসা নিয়ে সে সন্তুষ্ট না হয়ে,ইউনাইটেড হাসপাতাল এ যায়,সেখানে সে চার পাচ মাস ফলোআপ এ থাকে, কিন্তু পেটে পানি মাঝে মাঝে আবার আসে,এর ফলে সে ইউনাইটেড এর চিকিৎসা বাদ দিয়ে সে একজন নামকরা লিভার বিশেজ্ঞ এর সরনাপন্ন হয়,অন্য একজন ডাক্তার এর পরামর্শে, স্যার অনেক পরীক্ষা করে বললেন, যে তোমার লিভার এ সমস্যা আছে, লিভার চেঞ্জ করতে হবে, কি আর করা,ছেলেটি অগ্যাতা উপায় না পেয়ে স্যার দেয়া প্রেসক্রিপ্সন অনুযায়ী ওষুধ খেতে থাকল এবং লিভার চেঞ্জ করার জন্য টাকা পয়সা জোগাড় করতে লাগল, কিন্তু বিধি বাম, কোন এক চাদনী পশর রাতে ছেলেটির বাবা তাকে না জানিয়ে হারিয়ে যায় অন্য এক ভুবনে,যেখানে চাদের আলো মৃয়ম্মান।

মধ্যবিত্ত পরিবার যেখানে দিনের ক্ষুধা মিটতে না মিটতেই রাত চলে আসে, সেখানে চিকিৎসা তো শুধুই মরীচিকা আর মরীচিকা। এখন ও মাঝে মাঝে স্যার এর চেম্বার এ যখন আসে স্যারকে দেখাতে ভিজিট না দিতে পেরে বাসা থেকে নিজের গাছের ফল নিয়ে আসে,শেষ যে বার আসল স্যার এর জন্য তার মায়ের হাতে বুনন করা একটি গেঞ্জি নিয়ে এসেছিল। দারিদ্রতার ভালবাসা এমনই হয়,যেখানে স্নেহ, মমতা জানলা দিয়ে আছরে পড়ে। বারবার দারিদ্র্যের কশাঘাতে জজর্জরিত হয়েও পিতৃকূলের সব সম্পদ বিক্রি করে দিয়ে পাড়ি জমালো জীবন মৃত্যুর শেষ নিবাস সিংগাপুর মাউন্ট এলিজাবেথ হসপিটাল। সেখানে যেয়ে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হল। ফলাফল ডাক্তাররা মৃদূ হাসি দিয়ে,কিছুটা দীর্ঘনিঃশাস ফেলার ভংগিতে তাকে বলে দিল আপনার লিভার এ সমস্যা আছে, বেচে থাকতে হলে আপনার লিভার চেঞ্জ করতে হবে,বাংলাদেশ এর ডাক্তাররা ঠিকই বলেছেন। কি ভংয়কর কথা অথচ আমরা কি হাসি মুখেই না বলি। অগ্যতা রোগীর প্রস্থান এবং সদেশ যাত্রা

দেশে আসার অনেকদিন পর হঠাৎ করে তার পরিচিত একজনের সাথে দেখা হয়, সে তাকে আমার স্যার এর কথা বলে, শেষ একবার তাকে দেখান।চেম্বারে এসে যখন স্যার কে বলল যে স্যার আমি আর বাচব না, স্যার তখন তার দিকে গভীরভাবে তাকালেন এবং সব শুনলেন, বিশেষ করে লিভার এর সমস্যার কথা,আপনি আমি হলে কি করতাম সিংগাপুর থেকে যে রোগী চলে আসছে, একবার ভাবুন তারপরে পড়ুন,স্যার শুধু চোখ টা দেখলেন এবং USG, CT Scan সহ সব রির্পোট একবার এ দেখে ফেললেন, সব জায়গায় লিভার সিরোসিস এর কথা বলা আছে, তার মানে দুই দেশের রির্পোট তো আর ভুল হতে পারেনা, অর্থাৎ সমস্যা অন্য জায়গায় তার মানে ডায়োগনোসিস এ সমস্যা। প্রথমেই চোখ দেখে স্যার ধারনা করলেন চোখে kayser-fleishcher ring আছে। এইরকম একটা যুবক বয়সের রোগীর সিটি স্ক্যান, আল্ট্রাসোনোগ্রাম বলছে Chronic Liver dis, স্যার তখন চিন্তা করলেন Wilson’s dis. কিন্তু তার মানে অন্যরা কি এই রোগ চিন্তা করে নাই!! পরের দিন স্যার এর চেম্বার এ রোগী আসল চোখের slit lamp examination করে যেখানে kayser -Fleischer ring এর কথা বলা আছে, তারমানে Wilson’s dis হওয়ার একটা সম্ভাবনা আছে,এরপরে স্যার চলে গেলেন বাদবাকি রির্পোট এর দিকে রির্পোট দেখে যা বোঝা গেল,বাংলাদেশ এবং সিংগাপুর এর ডাক্তাররাও Wilson’s dis ধারনা করছেন এবং এর জন্য টেস্ট ও করিয়েছেন কিন্তু রির্পোট নেগেটিভ,এবার একটু Wilson’s dis এর ব্যাপারে বলি,
its a disorder of copper metabolism,সহজ ভাষায় Excessive Copper in d body is called Wilson’s dis, এবং এদের চোখে হাল্কা সবুজ বাদামী একধরন এর রিং থাকে যা kayser Fleischer রিং নামে পরিচিত, আমরা অনেকেই এইসব রোগী ওয়ার্ডে দেখেছি,আমি নিজেই চতুর্থ বর্ষে থাকতে এই রোগী দেখেছি, সুতরাং Wilson’s dis miss করে যাবে সবাই তা কি করে হয়। স্যার রোগীর আরো পরীক্ষার কাগজ দেখলেন, সেখানে দেখতে পেলেন যে Wilson’s এর জন্য টেস্ট করানো হয়েছে।

A low caeruloplasmin is the best single labratory clue to the diagnosis(Davidson -974).
সিংগাপুর এ তাকে এই টেস্ট করানো হইছে কিন্তু রির্পোট নেগেটিভ। তার মানে তার Wilson’s নাই। কিন্তু অন্য যেসব কারনে লিভার সিরোসিস হয় তার সবগুলোই দেখা হইছে, কিন্তু কোন কিছুই পাওয়া যায়নি। কি আর করা স্যার তবু ও কেন জানি ক্লিনিক্যাললি মনে করলেন এর অন্যকিছু দারা সিরোসিস হওয়ার চান্স খুবই কম, তাইতো স্যার wilsons দেখার জন্য 24 hrs urinary copper করতে দিলেন,পরে স্যারকে যখন জিজ্ঞাস করলাম যে স্যার single ceruloplasmin test negative হওয়ার পর ও আপনি কেন urinary copper করতে দিলেন,স্যার রোগীর সাম্নেই তখন বললেন, যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে উইলসন ডিজেজে serum ceruloplasmin নরমাল থাকতে পারে, এক্ষেত্রে আমাদের উচিত লিভার বায়োপ্সি করা,যা গোল্ড স্টানর্ডাড,কিন্তু আমাদের পক্ষে এই টেস্ট করা সম্ভব নয় বলে, আমরা urinary copper করি,আসলেই আমি এটা কখনই জানতাম না, স্যার বলার পরে রুমে এসে বই খুলে দেখলাম তাই লেখা আছে,এবং আমি এই লাইন পড়ছি কিন্তু বুঝতে পারি নাই,তখনই বুঝলাম স্যারদের কাজ হল বই এবং রোগীর সাথে আমাদের সর্ম্পক তৈরী করে দেয়া, এরএক দিন পরেই urinary copper এর রিপোর্ট চলে আসল, এবং রিপোর্ট পজেটিভ।তার মানে তার উইলসন ডিজেজ, এবং এই ডিজেজ এ লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করা লাগে না, শুধু zinc দিলেই ভাল হয়, এখন সবাই বলবে সমস্যা কপারে দিব জিংক তা কি করে হয়,এত কিছু এখন লিখতে ইচ্ছা করছে না, শুধু বলব দয়া করে বই পড়ে নেন, এবং এরকম রোগী পেলে ফ্যামিলি এর সবাইকে স্ক্রিনিং করান। তাও বলতে হবে কেন??? এই রোগীকে স্যার উইলসনস ডিজেজ এর ট্রিটমেন্ট দিয়েছে এবং রোগী এখন ভাল আছে।

লেখা শেষ করার আগে বলব,স্যার আপনারা আছেন বলেই আমাদেরকে মাউন্ট এলিজাবেথ এ যেতে হয়না,কারন আপনাদের এক একটা ক্লাস মাউন্ট এলিজাবেথ এর সমান,শুধু একটাই সমস্যা আমাদের, পর্বতের উপরে দাড়িয়ে আমরা পর্বতের উচ্চতার কথা ভুলে যাই। স্যার ভুলে গেলে ও ক্ষতি নেই কারন অন্য কেউ জানুক বা না জানুক আমরা জানি আপনার উচ্চতা পর্বতের উচ্চতা থেকে অনেক বেশি।
শুধু বলতে চাই,স্যার
আপনার হাতের ছোয়ায় বেচে থাকুক অসংখ্য লিভার।

লেখাটি উৎসর্গ করা হলো অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ স্যারকে।
(মেডিসিন বিভাগঃ বিএসএমএমইউ)
…..

লেখকঃ
ডা.মনিরুল ইসলাম পোলেন

drferdous

4 thoughts on “মাউন্ট এলিজাবেথ ও আমার শিক্ষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Next Post

ঢাকা মেডিকেলের দুই ছাত্রীর স্কুটিতে দেশ ভ্রমণ

Thu Apr 13 , 2017
মেডিকেলের ক্লাস, আইটেম, প্রফ পরীক্ষার মাঝে সময় পেলেই ঘুরে বেড়ানোর ঝোঁক থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের কে-৬৯ ব্যাচের দুই ছাত্রী সাকিয়া হক ও মানসী সাহা মিলে গড়ে তুলেছে ভ্রমণপ্রিয় নারীদের সংগঠন ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ। এবার তারা বেড়িয়েছে সারা দেশ ঘুরতে। তাঁদের ভ্রমণ-স্লোগান ‘নারীর চোখে বাংলাদেশ’। সাকিয়া ও মানসীর সঙ্গে এই ভ্রমণের […]

সাম্প্রতিক পোষ্ট