• অতিথি লেখা

May 1, 2017 9:00 am

প্রকাশকঃ

#প্লট_১…..

২০১৩।আমি তখন অনারারী মেডিকেল অফিসার(HMO) হিসেবে DMCH এর মেডিসিন ডিপার্টমেন্টে।দুষ্ট লোকেরা “#অনারারী মেডিকেল অফিসার” এর স্থলে আমাদের ডাকে “#অনাহারী মেডিকেল অফিসার”। নামটা যুতসই, যে ব্যক্তির মাথায় প্রথমে অনাহারী শব্দটা এসেছিলো, তার তাচ্ছিল্য ও রসবোধের প্রশংসা করতে হয়….

কাজের কথায় আসি।কথায় বলে, “পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে”। আমার পাখা গজালো।এমনিতেই অনাহারী মেডিকেল অফিসার, তার উপর নিজের ইচ্ছায় মেডিসিনের যে ইউনিটে ঢুকেছি-সে ইউনিট থেকে অধিকাংশ ট্রেইনি ডাক্তার দূরে দূরে থাকে।”ডে- অফ” বলে কোন বিষয়ের বালাই সে ইউনিটে নেই….

যেহেতু রোস্টার ডিউটি বেশী পড়ে, একবার সব HMO মিলে চেষ্টা করলাম, কোনভাবে সপ্তাহে একটা ডে অফ ম্যানেজ করা যায় কিনা, শরীরে কুলায় না । সিএ ভাই, ইউনিট হেড- কিংবদন্তীতুল্য শ্রদ্ধেয় স্যারের সাথে দেখা করে এসে জানালেন, “স্যার বলেছেন, তোমাদের রোস্টার ডিউটি বেশী পড়লে, এখন থেকে রোস্টারে উনার নামটাও রাখতে”….

#কড়া_মেসেজ, এরপরে আর ডে অফ নিয়ে কথা বাড়ানো চলে না।আমি অবশ্য ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি ট্রেনিং এমনই হওয়া উচিত।যাই হোক, মোটামুটি অঘোষিত ‘#মার্শাল_ল’ সিস্টেমের ভিতর দিয়ে রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছি, একেবারে বিনে পয়সায়….

একদিন নাইট ডিউটি, একটু দেরী হওয়াতে হাতে Stethoscope নিয়ে দ্রুত বাসা থেকে বের হয়ে রিকশা নিয়ে DMCH এর ইমার্জেন্সী গেইটে নেমে রিকশাওয়ালাকে ৬০ টাকা দিয়ে হাঁটা শুরু করা মাত্র রিকশাওয়ালা পেছন থেকে ডাক দিলোঃ

–এই যে, কত দিলেন?
–কেন, ৬০ টাকা!
–৭০ টাকা দেন দেহি…
–৭০ টাকা কেন? ডেইলি ৬০ টাকা দিয়ে আসি…..

এই কথা বলে আমি আবার হাঁটা দিলাম।পেছনে শুনলাম আমার রিকশাওয়ালা তার পাশের রিকশাওয়ালাকে বলছে, “খাডাশের দল, লাখ লাখ ট্যাহা কামায়, আর আমাগো ১০ ট্যাহা দিবার চায় না”…

থমকে দাঁড়ালাম, একবার ভাবলাম বলি, “তুমি রিকশা চালাও, পরিশ্রমের সেই টাকাটা পাও, আমি সকাল, দুপুর এমনকি রাত্রে জেগে থেকেও ডিউটি করি, একটা পয়সাও জোটে না”। কথাটা বলা হয়নি….

#প্লট_২

আবারও অনারারী ট্রেনিং পিরিয়ডের কথা। ডিউটি সেরে প্রতিদিন রিকশা করে বাসায় ফিরি।রিকশার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো-নিজেকে রাস্তার পরিবেশ থেকে আলাদা মনে হয় না, চারপাশের দৃশ্য ভালোমত দেখতে দেখতে যাওয়া যায়, গাড়ীতে সে সুযোগ নেই, গাড়ীতে অদৃশ্য পর্দা থাকে, পরিবেশের সাথে মেশা যায় না….

যে ইউনিটে ট্রেনিং করি, সেই ইউনিটের অসম্ভব Punctual একজন HMO বড় ভাইকে আমি মনে মনে যথেষ্ঠ শ্রদ্ধা করতাম, এখনোও করি।আমি পরপর কয়েকদিন বাসায় ফেরার সময় রিকশা থেকে লক্ষ্য করলাম ডিউটি শেষে ওই সিনিয়র ভাই রাস্তা দিয়ে হে্ঁটে হেঁটে বাসায় ফেরেন। প্রায় দুই কিলোমিটার রাস্তা, হসপিটাল ডিউটি কমপ্লিট করে দুপুরের রোদে দুই কিলোমিটার হেঁটে যাওয়াটা মুখের কথা না, মনের আনন্দে কেউ এই কাজ প্রতিদিন করবে না….

আমি একদিন ক্যান্টিনে চা খেতে খেতে ভাইকে কথায় কথায় বললাম যে উনি ইচ্ছা করলে আমার সাথে যেতে পারেন। ভাই একটু উদাস হয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলেন।কয়েকদিন গিয়েও ছিলেন আমার সাথে।তারপর বাদ দিলেন, বোধ হয় -লজ্জায়….

শুনেছিলাম তাঁর কিছু করুণ কাহিনী। উনি আমার থেকে বছর পাঁচেকের বড়।নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। বাবা-মা অনেক আশা করে প্রচুর ঋণ নিয়ে প্রাইভেট মেডিকেলে পড়িয়েছিলেন, ছেলে ডাক্তার হলে এসব ঋণ কোন বিষয় হবার কথা না….

সেই ঋণের বোঝা টানতে গিয়ে তিনি ৪ বছর ক্লিনিকগুলোতে ডিউটি করেছেন।এক মেয়েকে পছন্দ করতেন, মেয়েও করতো, সেই সম্পর্ক নিজেই ধ্বংস করেছেন।নিজের এহেন দৈন্যহীন অবস্থায় প্রেম-ভালোবাসার মত বিলাসী জিনিস তার শোভা পায় না। অন্যদিকে পোষ্ট গ্রাজুয়েট ট্রেনিং এর সময় তো থেমে থাকেনা।বাবা-মা যখন আশা করছেন ছেলে ডাক্তারী পাশ করে প্রাচুর্য নিয়ে আসবে, তখন তিনি ট্রেনিং এ ঢুকলেন।তাঁর পিতা, পুত্রের ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে আবারও এখন কষ্ট করে প্রতি মাসে টাকা পাঠাতে শুরু করলেন।নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে মধ্য-মধ্যবিত্তরা তাদের ছেলেমেয়েকে ডাক্তার বানাতে চাইলে এদেশের প্রেক্ষাপটে তাদের খেসারত দিতে হবে বৈ কি!…

একদিন পেশেন্ট ফলো আপ দিচ্ছি। হঠাৎ ভাই কোথা থেকে যেন এসে আমার পাশে দাড়ালেন।ভাইয়ের চেহারায় আলো ঝলমল করছে।অত্যন্ত আনন্দ নিয়ে ভাই আমাকে বললেন,

“জানো কনক, আমি রেসিডেন্সীতে চান্স পেয়েছি, প্রতি মাসে ১০,০০০(দশ হাজার) টাকা করে পাব”….

ভাইয়ের সে আনন্দ দেখে বুঝেছিলাম, ১০,০০০ টাকাটা নিছক একটা সংখ্যা ছিলো না, সেটি ছিলো দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত এক মানুষের জীবনে হঠাৎ কালবোশেখীর এক শীতল হাওয়া…

#অ্যনালাইসিস_এবং_দীর্ঘশ্বাস

এই যে, অনারারী প্রথা এখনও চলছে, আমি জানি না, এই অযৌক্তিক বর্বর প্রথা কবে, কে শুরু করেছিলেন।আপনি কি কখনোও চিন্তা করতে পারেন, আপনি একটা অশিক্ষিত লোককে ৭ দিন খাটাবেন, অথচ একটা পয়সাও দিবেন না; কোন সভ্য সমাজ এর স্বীকৃতি দিবে? প্রশ্নই আসে না। তবে কোন যুক্তিতে একজন উচ্চ শিক্ষিত চিকিৎসককে ৩ থেকে ৫ বছর, আই রিপিট, ৩ থেকে ৫ বছর, বিনা পয়সায় খাটাবেন? পোষ্ট গ্রাজুয়েশনের কোন নিশ্চয়তা তো নেই। অনেকে বলতে পারেন, কিছু তো শিখছে। আমি তাদের বলি, মেডিকেল সায়েন্সে আজ যিনি অধ্যাপক, উনিও প্রতিনিয়ত শিখছেন। মোস্ট প্রবাবলি, #William_Osler বলেছিলেন, ‘যেদিন কোন চিকিৎসক মনে করবেন তিনি আর নতুন কিছু শিখবেন না, বুঝতে হবে, চিকিৎসক হিসেবে ওইদিন তার মৃত্যু হয়েছে’।কাজেই শিখানো হচ্ছে এই ধোয়া তুলে এই বর্বর প্রথা সমর্থন যোগ্য নয়। যেখানে বর্বর প্রথার সমাপ্তি হবার কথা, সেখানে এই দেশে এই প্রথার আপসার্জ হচ্ছে…..

অনারারী ট্রেইনি যারা, তারা না ট্রেনিং এ মনোযোগ দিতে পারে, না ক্লিনিকে মনোযোগ দিতে পারে।যেহেতু একটি পয়সাও আয় নেই, অথচ তার সমতুল্য বন্ধুরা তখন কম করে হলেও হাজার পঞ্চাশেক টাকা কামিয়ে চলছে, এমন অবস্থায় ক্লিনিক এ ঢু মারতে গিয়ে ট্রেনিং এর বারোটা বাজে। ক্লিনিকগুলোতে ঢু না মারলেও তো চলে না, এই বয়সে বাসা থেকে টাকা চাওয়া যায়? বিয়ে করে ফেললে তো গোদের উপর বিষফোঁড়া….

রেসিডেন্সীটা সে হিসেবে ভালো। হাজার দশেক টাকা পাওয়া যায় যে! হাজার দশেক টাকায়( কেটেকুটে সাড়ে আট এর মত) ডাল-ভাত আর শাহবাগের আজিজ এ এক খাট ফেলে ঘুমটা তো নিশ্চিন্তে করা যায়! হাজার দশেক টাকা! চিন্তা করতে পারেন কত অগুণিত পয়সা! সুশীল সমাজকে একটা প্রশ্নঃ ‘এই টাকায় পাহারা দেবার জন্য একজন দারোয়ান পাওয়া যাবে তো?’….

এবার কোর পয়েন্টে আসি।অনারারী ট্রেইনী ও রেসিডেন্সীদের ভাতা দিতে হবে। সব সভ্য দেশই দেয়, বাংলাদেশ ব্যতিক্রম । প্রশ্ন হলো, টাকাটা আসবে কোথা থেকে? রেসিডেন্সী হিসেবে যারা আছেন, সেই সাড়ে চার’শ মত চিকিৎসক কে তাদের ভাতা দিতে খরচ হবে বছরে মাত্র ৫.৮ কোটি টাকা।এই টাকাটা BSMMU কেই কেন দিতে হবে? যদি অনারারী সহই ধরি, তবে প্রতি বছর খরচ হবে ২০-৩০ কোটি টাকা( ধরে নিলাম)। এই টাকাটা দেয়া উচিত #সরকারের। আমাদের দেশতো বর্হিবিশ্বে স্বাস্থ্যখাতে রোল মডেল।যদি তাই হয়, তবে চিকিৎসক নেতৃবৃন্দরা অনারারী ও প্রায় বিনা বেতনে যে রেসিডেন্সী প্রোগ্রাম চলে তার যবনিকাপাতে ব্যবস্থা নিতে পারেন না? …

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী আমরা এখন মধ্যম আয়ের কান্ট্রি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪৪ তম বাজেটের আকার প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। প্রতিবছর ২০-৩০ কোটি টাকা সেখানে নিতান্তই ক্ষুদ্র একটি সংখ্যা। এই টাকার অনুমোদন কি সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া যায় না? অপ্রয়োজনীয় বিলাস বহুল গাড়ী কিনতে হর্তাকর্তারা কোটি কোটি টাকা শুল্কমুক্ত সুবিধা পান। যে সমস্ত নবীন চিকিৎসকদের ব্যবহার করে তাদের রক্ত পানি করে জনগণকে বিনাপয়সায় স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হচ্ছে, তাদের দিকে কি সরকার এই সহানুভূতির হাতটি প্রসারিত করতে পারে না? একটি দেশ কি তার নিজের সন্তানের সাথে এমন প্রতারণা করতে পারে? এরা কি বাইরের কেউ?….

১৮৬৩ সালে Abraham Lincoln মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাস প্রথার অবসান ঘটান এবং #মুক্তি_ঘোষণা (Emancipation Proclamation) এর মাধ্যমে দাসদের মুক্ত করে দেন। প্রায় ১৫০ বছর পর সভ্য সমাজের মানুষ হয়েও আমরা সমাজের বিভিন্ন জায়গায় নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এই প্রথাকে বিভিন্ন রঙের মুখোশ পরিয়ে টিকিয়ে রেখেছি….

“If slavery is right, it ought to be extended ; if not, it ought to be restricted, there is no middle ground.” আমরা দাসপ্রথাকে Restricted করতে পারিনি, আমরা Extended করেছি।আমরা সভ্য হতে পারিনি, আমরা জাতিগতভাবে অসভ্য হয়েছি।আমরা প্রকৃত পক্ষে আধুনিক হতে পারিনি, আমরা মধ্যযুগীয় মানসিকতাকে চর্চা করে চলছি। হাজারখানেক চিকিৎসক পোষ্টগ্রাজুয়েশনের মায়াবী হাতছানির শিকলে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর বিনে পয়সায় দাসত্ব চালিয়ে যাবে। এদের দীর্ঘশ্বাসের করুণ কাহিনী অরণ্যে রোদনের মত আকাশে বাতাসে মিলিয়ে যাবে, কেউ কর্ণপাত করবে না, কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসবে না। আহারে!….আহারে!…..

……

লিখেছেনঃ
ডা. জামান অ্যালেক্স

শেয়ার করুনঃ Facebook Google LinkedIn Print Email
পোষ্টট্যাগঃ

পাঠকদের মন্তব্যঃ ( 0)




Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Advertisement
Advertisement
.