আজকের রাত কতটা দূর্বিষহ কাটবে একজন চিকিৎসকের কল্পনা করতে পারেন? জামিন অযোগ্য গ্রেফতারী পরোয়ানা অপেক্ষা করছে তাঁর জন্য। সারা দিনে একবার শোনেন চিকিৎসায় ইচ্ছাকৃত সময়ক্ষেপণ জনিত অবহেলায় রোগীর প্রাণনাশের চেষ্টার অভিযোগ দায়ের করা হচ্ছে, আরেকবার শোনেন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও রোগীর এটেন্ডেন্টকে অপহরণ চেষ্টায় যুক্ত থাকার অভিযোগ, সাথে চিকিৎসায় অবহেলা এবং রোগীর এটেন্ডেন্টসহ রোগীকে অপদস্থ করায় অভিযুক্ত হতে যাচ্ছেন তিনি। কিন্তু কেন? রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ স্বাভাবিক করার পর ডিসচার্জ দেবার পর, শুধু তাই নয় রোগীর অসুস্থতার খবরে কর্তব্যরত অবস্থায় রোগীর বাসায় গিয়ে চিকিৎসা দিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে পরামর্শ দেবার পরও কেন একজন চিকিৎসককে এত সব অবিশ্বাস্য অভিযোগের ভয় করতে হয়? আসুন শুনি বাংলাদেশের একজন ভিআইপি রোগীর গল্প এবং বেচারা চিকিৎসক ও তাঁর বায়বীয় সিস্টেমের গল্প।
রোগিনী বাংলাদেশের সংবিধানের বিধিবদ্ধ একটি স্বায়ত্বশাসিত মৌলিক প্রতিষ্ঠানের জেলা পর্যায়ের দ্বিতীয়/তৃতীয় সর্বোচ্চ চাকুরে। গত রাতে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। জেলা সদর হাসপাতালের চিকিৎসক স্বয়ং সর্বোচ্চ চিকিৎসা কর্মকর্তার ফোনে তাঁর অসুস্থতার কথা জানতে পারেন। সদর হাসপাতালে তখন মাত্র দুজন চিকিৎসক কর্মরত(অফিস আওয়ারের বাইরে এটাই স্বাভাবিক), একজন ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার আরেকজন ইনডোর মেডিকেল অফিসার। এটাও বলে রাখি তাঁদের কারোরই স্থায়ী কর্মস্থল সদর হাসপাতাল নয়, হাসপাতাল চালাতে তাঁদের বিভিন্ন উপজেলা থেকে ডিউটি করতে আনা হয়। হেভিওয়েট রোগিনীর জন্য সরকারি মেডিকেল অফিসারের জব ডেস্ক্রিপশনের বাইরে ইমার্জেন্সিতে দায়িত্বরত অফিসারকে তাঁর বাসায় চিকিৎসা দিতে যেতে হয়(এরকম হরহামেশাই হয়, যেতে না চাইলে চিকিৎসককে থাপড়ায়ে ৩টা দাঁত ফেলে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে সপ্তাখানেক আগে সাতক্ষীরায়)। রোগীনীকে দেখে চিকিৎসক ডায়াগনসিস করেন হাইপারটেনশন উইথ একিউট গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস উইথ ডিহাইড্রেশন(খাঁটি বাংলায়…)। বাসায় ম্যানেজমেন্ট সম্ভব নয় এ কারণে রোগিনীকে হসপিটালাইজড করতে বলা হয়। সঙ্গে সঙ্গে রোগিনীকে গাড়িতে করে হাসপাতালে নেয়া হয়, বেচারা চিকিৎসক একা একা রিকশায় হাসপাতালে ফেরত আসেন।
নাটকের শুরু যেভাবেঃ রোগিনীকে প্রথমে সদর হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে নেয়া হয়। ইমার্জেন্সিতে তখন সদর হাসপাতালের একমাত্র চিকিৎসক ভর্তির জন্য ব্যবস্থা করেন। ইমার্জেন্সিতে আসার পর থেকেই রোগিণী এবং সঙ্গে আসা দেহরক্ষী ও কর্মচারীদের উন্নাসিকতার শুরু। তাঁরা শুরু থেকেই বলতে থাকেন কেন তাঁদের সরাসরি ভর্তি দেয়া হলো না, কেন আবাসিক মেডিকেল অফিসারের রুমে বসিয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হলো। সে রুমের পরিবেশ ভালো না, বসার চেয়ার ভাঙ্গা, নোংরা এখানে বসায় তাঁরা অপমানিতবোধ করেছেন, কোন সাহসে চিকিৎসক তাদেরকে আবাসিক মেডিকেল অফিসারের রুমে বসালো। সম্ভব দ্রুততার সাথে চিকিৎসক তাঁদের মহিলে মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি করার ব্যবস্থা করলো। এখানেই ঘটল বিস্ফোরণ-কেন রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ পদস্থ চাকুরে(মহিলা) কে মহিলা ওয়ার্ডের মত একটা জায়গায় রাখার কথা চিকিৎসক চিন্তা করলো, কেন তাঁকে আলাদা কেবিন দেয়া হবে না। যে সে কেবিন হলে হবে না এসি কেবিন হতে হবে। তিনি কোন অবস্থাতেই এসি রুম ছাড়া হাসপাতালে থাকবেন না। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্দিষ্টকৃত কেবিন ছাড়া আর কোন কেবিন (মোট ৬টা কেবিন) খালি ছিলো না। ততক্ষণে একটানা চিকিৎসক, ওয়ার্ড বয়, চিকিৎসা সহকারী কে ধমকানো, শাসানো, গালিগালাজ চলছে। দ্বিতীয় চিকিৎসক ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুজন চিকিৎসকই আলোচনা করে চিকিৎসকদের বিশ্রাম কক্ষটিতে সাময়িকভাবে সেই রোগিনীকে চিকিৎসা নিতে অনুরোধ করেন। শুরু হয় উন্নাসিকতা রাউন্ড টু, এই সেই কক্ষে এসি নেই, এসি ছাড়া রুমে থাকা সম্ভব নয়। ইতিমধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কেবিনের চাবি আনতে(এই কেবিনের চাবি জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমাণ্ডারের কাছে থাকে) লোক পাঠানো হচ্ছে, অন্য আরেকটা বিশেষ ব্যবস্থা করা হচ্ছে ভিআইপি রোগিনীর জন্য। চিকিৎসক, ওয়ার্ড বয়, স্যাকমো, এলএমএসএস সবাই উর্ধশ্বাস দৌড়াচ্ছে কত দ্রুত আরেকটা কেবিন রোগিনীর জন্য বাস যোগ্য করা যায়। যত সময় যাচ্ছে রোগিনীর সাথে আসা ব্যক্তিরা তত চড়াও হচ্ছে, একজন চিকিৎসা সহকারীকে চড় থাপ্পড় মেরে কলার ধরে টেনে হিঁচড়ে পাশেই আইন শৃংখলা বাহিনীর কাছে সোপর্দ করা হয়েছে, অশ্রাব্য গালি গালাজে টিকতে না পেরে চিকিৎসক যখন থামতে অনুরোধ করেছে তার জবাবে রোগীর সাথে আসা একজন অধীনস্থ কর্মচারী বলে হুমকির সুরে বলেন- “চাকরি করি নইলে আজকে মারতাম তোরে”।
ইতিমধ্যে হাসপাতালের কর্মচারিরা তাৎক্ষণিক কর্মবিরতিতে যায়-ইমার্জেন্সি রুমে তালা দিয়ে দেয়া হয়। উচ্চপদস্থ চিকিৎসা কর্মকর্তার সাথে আলাপ করে কর্তব্যরত চিকিৎসক ১০ মিনিটের মধ্যেই আবার কাজ করা শুরু করে। এসময় তাঁদের আইনশৃংখলা বাহিনীর দ্বিতীয় শ্রেণী বা তদনিম্ন কর্মকর্তারা এসে জিজ্ঞাসাবাদ করে সে তথ্য লিখে নিয়ে যায়, চিকিৎসকদের চাকরির কোড নাম্বার, ফোন নাম্বার সব কিছু নিয়ে যাওয়া হয়। কর্মরত চিকিৎসকেরা একশনে যেতে চাইলেও চিকিৎসক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সিদ্ধান্তের জন্য তাঁরা অপেক্ষা করতে থাকেন, ঘটনার পর ২৪ ঘন্টা পাড় হয়ে গেলেও দফায় দফায় মিটিং চলতে থাকে।
পরদিন সকালে ঐ রোগিনী সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র নিয়ে চলে যান। এর মাঝে বিক্ষুব্ধ হাসপাতাল কর্মচারি এবং ঐ রোগিনীর অধীনস্থ সরকারি কর্মাচারিদের মাঝে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলে। চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে কর্মবিরতি না চললেও সে রোগিনীর সহকর্মীরা কর্মস্থলে ৩ ঘন্টা কর্মবিরতি শেষে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইনগত অভিযোগ দায়ের করে। রোগিনী সর্বশেষ পোস্ট অপারেটিভ কেবিনে চিকিৎসা পায় যা মূলত অপারেশন পরবর্তী রোগীর জন্য বরাদ্দ থাকার কথা। এরকম ঘটনাগুলোর ব্যাখ্যা দিনের পর দিন লিখেছি, আজ শুধু একটা কবিতার লাইন লিখবো-”জন্মই যার আজন্ম পাপ”। বাংলাদেশকে কেউ নিজের দেশ মনে করে না, বাংলাদেশের মানুষকে আত্মীয় মনে করে না, বাংলাদেশ হচ্ছে এক শ্রেণীর মানুষের অর্থ সম্পদ বানানোর মেশিন, এ দেশের মানুষক হল দাস। দাসদের উপর প্রভাব খাটাতে হয়, দাসদের চাবুকের উপর রাখতে হয়। দাস হিসেবে সেরা দাস চিকিৎসক কারণ চামড়া ছিলে লবণ লাগায় দিলেও এরা টু শব্দটি করবে না কারণ তাঁদের টাকা বানানোর মেশিন হচ্ছে চেম্বার, চেম্বার ঠিক সব ঠিক বাকি সব নগণ্য। হাসপাতালে এসি কেবিন নাই কেন? এই অপরাধে বাংলাদেশের সকল চিকিৎসকের ফাঁসি চাই! খবরের পেছনের খবর, STOOL আলোর(হলুদ) খবরের শিরোনাম এরকম, “চিকিৎসকসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা”
সর্বশেষ সংবাদ মিটিং চলছে 🙂
Thnx nirob