০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভুটানকে কুকুরের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়ানো জলাতঙ্ক (Rabies) জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে নির্মূল করার স্বীকৃতি দিয়েছে। এ অর্জনের মাধ্যমে ভুটান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের প্রথম দেশ হিসেবে এই স্বীকৃতি লাভ করল।
জলাতঙ্ক একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যার উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার পর প্রায় সব ক্ষেত্রেই মৃত্যু অনিবার্য। তবে এই রোগে মৃত্যু সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধযোগ্য। একদিকে কুকুরকে টিকা দেওয়ার মাধ্যমে রোগের উৎস নিয়ন্ত্রণ করা যায়, অন্যদিকে কামড়ের পর দ্রুত পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস (PEP) গ্রহণ করলে ভাইরাসটি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে পৌঁছাতে পারে না। PEP-এর মধ্যে রয়েছে ক্ষতস্থান ভালোভাবে ধুয়ে ফেলা, মানব জলাতঙ্ক টিকার পূর্ণ ডোজ গ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন (RIG) ইনজেকশন নেওয়া।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ড. টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস বলেন,
“এই ঐতিহাসিক অর্জনের জন্য আমি ভুটানকে অভিনন্দন জানাই। এটি ২০৩০ সালের মধ্যে কুকুরের মাধ্যমে সংক্রমিত জলাতঙ্কে মানুষের মৃত্যু বন্ধ করার আমাদের বৈশ্বিক লক্ষ্যের দিকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।”
তিনি আরও বলেন,
“ভুটানের সাফল্য প্রমাণ করে যে মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্য একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। স্বাস্থ্যকর্মী, পশুচিকিৎসক এবং সাধারণ মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে জলাতঙ্কের বিরুদ্ধে লড়াই সফল হয়।”
ভুটানের সাফল্যের মূলভিত্তি: ‘ওয়ান হেলথ’ পদ্ধতি
ভুটানের এই অর্জনের পেছনে রয়েছে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ওয়ান হেলথ (One Health) পদ্ধতিতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ। এই ধারণা অনুযায়ী মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্য পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এসব সম্পর্কের পরিবর্তনের ফলে মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই বিভিন্ন খাতের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে মানব, প্রাণী, উদ্ভিদ ও পরিবেশের স্বাস্থ্য সুরক্ষাই এই পদ্ধতির মূল লক্ষ্য।
এই উদ্যোগের আওতায় ভুটান সম্পদের সঠিক ব্যবহার, সমন্বিত নজরদারি ব্যবস্থা এবং কৌশলগত পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। কোনো সন্দেহজনক জলাতঙ্কের ঘটনা রিপোর্ট হলে মানব ও প্রাণী স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ একসঙ্গে সম্ভাব্য সংস্পর্শ শনাক্ত করে এবং প্রয়োজনে যৌথ মাঠ পর্যায়ের তদন্ত পরিচালনা করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ড. নিলেশ বুদ্ধ বলেন,
“শক্তিশালী জাতীয় নেতৃত্ব, পরিপক্ব ওয়ান হেলথ ব্যবস্থা এবং জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণ থাকলে কুকুরের মাধ্যমে সংক্রমিত মানব জলাতঙ্ক নির্মূল করা সম্ভব। স্বাস্থ্যকর্মী, পশুচিকিৎসক এবং ‘গার্ডিয়ানস অব পিস’ নামে পরিচিত দে-সুং স্বেচ্ছাসেবকদের নিষ্ঠা দেশের প্রতিটি এলাকায় কুকুরের টিকাদান, কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।”
কঠোর মূল্যায়নের পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী কঠোর মূল্যায়নের পর ভুটান এই স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশ্ব প্রাণী স্বাস্থ্য সংস্থা এর সহযোগিতায় গঠিত আঞ্চলিক ডসিয়ার রিভিউ গ্রুপ দুই ধাপে মূল্যায়ন সম্পন্ন করে। প্রথমে নথিপত্র পর্যালোচনা করা হয় এবং পরে ২০২৬ সালের ১৭ থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত ভুটানে সরেজমিন পরিদর্শন পরিচালিত হয়।
এই সফরে দলটি জাতীয়, আঞ্চলিক ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিদর্শন, পরীক্ষাগার মূল্যায়ন, কর্মসূচির নথি ও তথ্যব্যবস্থা যাচাই, ভুটান-ভারত সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিভিন্ন খাতের অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রমাণ যাচাই করে। ভুটান ২০২৩ সালের জুন থেকে কুকুরের মাধ্যমে সংক্রমিত জলাতঙ্কে মানুষের মৃত্যুহার শূন্যে ধরে রেখেছে।
ভুটান সরকারের প্রতিক্রিয়া
ভুটানের স্বাস্থ্য মন্ত্রী বলেন,
“এটি আমাদের দেশের জন্য গর্বের ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত। মহামান্য রাজা জাতীয় পর্যায়ে দ্রুতগতির কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি শুরু করেছিলেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, অংশীদার প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার এবং জনগণের সমন্বিত ওয়ান হেলথ উদ্যোগ এই সাফল্য সম্ভব করেছে।”
তিনি জানান, ভবিষ্যতেও পিইপির সহজলভ্যতা, ব্যাপক কুকুরের টিকাদান, কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, জনসম্পৃক্ততা এবং শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
ভবিষ্যতেও সাফল্য ধরে রাখার পরিকল্পনা
ভুটান এই অর্জন ধরে রাখতে দেশের ২০টি জংখাগ (জেলা)-এ বিনামূল্যে পিইপি সেবা চালু রাখবে। পাশাপাশি ন্যাশনওয়াইড অ্যাক্সেলারেটেড ডগ পপুলেশন ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড র্যাবিস কন্ট্রোল প্রোগ্রাম এবং ইন্টার-মিনিস্টেরিয়াল কমিটি অন ওয়ান হেলথ এর মাধ্যমে কুকুরের গণটিকাদান, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং সমন্বিত মানব-প্রাণী নজরদারি অব্যাহত থাকবে। এছাড়া ভারতের পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোর সঙ্গে সীমান্ত সহযোগিতাও আরও জোরদার করা হবে।
ভুটানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ড. ভূপিন্দর কৌর আউলাখ বলেন,
“ভুটানের এই স্বীকৃতি বহু বছরের ওয়ান হেলথ উদ্যোগ এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগের ফল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই যাত্রায় ভুটানের পাশে থাকতে পেরে গর্বিত এবং ভবিষ্যতেও এই অর্জন টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে যাবে।”
এই সাফল্যে ভুটানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, দে-সুং জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী এবং স্থানীয় জনগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কারিগরি সহায়তা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য প্রাণী সংস্থা, আর অর্থায়ন করেছে ভুটান স্বাস্থ্য ট্রাস্ট তহবিল এবং প্যানডামিক তহবিল সহ অন্যান্য অংশীদার প্রতিষ্ঠান।
প্ল্যাটফর্ম প্রতিবেদকঃ এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন
রেফারেন্স: https://www.who.int/news/item/04-09-2026-who-validates-bhutan-for-eliminating-dog-transmitted-human-rabies

