বুধবার, ১৯ আগস্ট
বিশ্বের প্রায় সব দেশেই চিকিৎসকদের একটি সম্মানজনক পেশাজীবী হিসেবে দেখা হয়। কারণ একজন চিকিৎসক মানুষের জীবন রক্ষার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও দায়িত্বের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করেন। একজন রোগী অসুস্থ হলে তার চিকিৎসার দায়িত্ব চিকিৎসকের ওপর অর্পিত হয়। কিন্তু চিকিৎসক সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেই যে প্রতিটি রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হবে, এমন নিশ্চয়তা পৃথিবীর কোনো চিকিৎসাব্যবস্থাই দিতে পারে না। অথচ বাংলাদেশে রোগীর মৃত্যু বা চিকিৎসায় সামান্য বিলম্ব হলেই অনেক সময় চিকিৎসককে অপমান, গালাগালি এমনকি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটছে। ফলে দেশের চিকিৎসক সমাজ আজ এক কঠিন ও নাজুক সময় পার করছে।
একজন চিকিৎসকও একজন মানুষ। তারও সীমাবদ্ধতা আছে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অনেক দূর এগিয়ে গেলেও সব রোগের চিকিৎসা এখনো সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে ক্যানসার, হৃদ্রোগ, গুরুতর সংক্রমণসহ অনেক জটিল রোগে চিকিৎসকের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও রোগী মারা যেতে পারেন। তাই কোনো রোগীর মৃত্যু হলেই চিকিৎসককে দায়ী করা যুক্তিসঙ্গত নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, চিকিৎসায় কোনো অবহেলা বা ভুল হয়েছিল কি না। যদি সত্যিই চিকিৎসায় গাফিলতি থাকে, তাহলে তা নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারণ করা উচিত, মারধরের মাধ্যমে নয়।
সম্প্রতি মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে কয়েকজন ডিউটি চিকিৎসককে মারধরের ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চিকিৎসকদের ওপর হামলা করা হয়। একজন গুরুতর অসুস্থ রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করা চিকিৎসকদের ওপর শুধু রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে হামলা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রোগীকে বাঁচানো চিকিৎসকের দায়িত্ব, কিন্তু মৃত্যুকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কোনো চিকিৎসকের নেই।
এ ধরনের আরও ঘটনা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ঘটছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নাক, কান ও গলা বিভাগের প্রধানের ওপরও কথিত ভুল চিকিৎসাকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। কোনো চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ থাকলে তার সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণের আগেই একজন চিকিৎসককে মারধর করা আইনের শাসনের পরিপন্থী। অভিযোগের সত্যতা তদন্ত করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আইনগত প্রতিষ্ঠান, সাধারণ মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নিতে পারে না।
রাজশাহীতে অবস্থিত ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে রোগীর আত্মীয় স্বজনের অব্যবস্থাপনায় এক শিশু মৃত্যু হয়েছে। সেইর মৃত্যু দায়ী নাকি ডাক্তারকে কেন্দ্র করে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও নার্সকে মারধর করে রোগীর আত্মীয় স্বজনেরা। পরবর্তীতে তারা পালিয়ে যায়। কিছুদিন আগে কোন এক স্বনামধন্য হাসপাতালে এক মহিলা ডাক্তারের উপর যৌন হয়রানি করানো হয়। যদি এসব চলে ডাক্তার কীভাবে রোগীর চিকিৎসা দিতে পারবে এবং কীভাবে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঠিকে থাকবে।
চিকিৎসকদের ওপর হামলার পেছনে রোগী ও স্বজনদের হতাশা, ভুল বোঝাবুঝি, চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার অভাব এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার নানা দুর্বলতা কাজ করতে পারে। অনেক সময় রোগীর স্বজনরা চিকিৎসকের কাছে এমন ফলাফল প্রত্যাশা করেন, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আবার হাসপাতালের দীর্ঘ অপেক্ষা, চিকিৎসকের স্বল্পতা, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বিলম্ব কিংবা চিকিৎসা ব্যয় নিয়েও মানুষের ক্ষোভ তৈরি হতে পারে। এসব সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব শুধু চিকিৎসকের নয়, বরং পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার।
তবে এর অর্থ এই নয় যে চিকিৎসকের কোনো ভুল হলে তা উপেক্ষা করতে হবে। চিকিৎসায় অবহেলা, অনৈতিক আচরণ বা ভুল প্রমাণিত হলে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসকদেরও রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ, পরিষ্কারভাবে রোগের অবস্থা ব্যাখ্যা এবং চিকিৎসার সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে জানানো উচিত। রোগী ও চিকিৎসকের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ছাড়া একটি ভালো স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, হাসপাতাল যদি চিকিৎসকদের জন্য নিরাপদ কর্মস্থল না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই পেশার প্রতি মেধাবী তরুণদের আগ্রহ কমে যেতে পারে। একজন তরুণ পাঁচ-ছয় বছর বা তারও বেশি সময় কঠোর পরিশ্রম করে চিকিৎসক হওয়ার পর যদি কর্মস্থলে অপমান ও হামলার আশঙ্কায় থাকেন, তাহলে এটি শুধু চিকিৎসকদের সমস্যা নয়, পুরো জাতির জন্য একটি সংকেত।
তাই এখনই চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি সব হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রোগী ও স্বজনদেরও বুঝতে হবে, চিকিৎসক কোনো অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী নন। তিনি রোগীকে সুস্থ করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন, কিন্তু প্রতিটি রোগীর জীবন-মৃত্যু তার হাতে নয়।
চিকিৎসকের ভুল থাকলে আইন কথা বলুক, কিন্তু রোগীর মৃত্যু হলে প্রতিশোধ নয়, সত্যের অনুসন্ধান হোক। চিকিৎসক ও রোগী একে অপরের প্রতিপক্ষ নন। তারা একই পক্ষের মানুষ, যেখানে একজন জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেন এবং অন্যজন সুস্থতার আশায় চিকিৎসকের কাছে আসেন। এই সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও মানবিকতা। চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু একজন চিকিৎসককে নিরাপদ রাখা নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নিরাপদ রাখা।
প্ল্যাটফর্ম প্রতিবেদক: এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন

