X

মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধ

প্রতিটি মানুষের যেমন শারীরিক কাঠামো আছে, তেমনই তার আছে একটা ‘মন’, যা আমরা দেখতে পাইনা কিন্তু এর উপস্থিতি আমরা সবাই উপলব্ধি করি। তাই আমরা আনন্দে হাসি, রাগ আসলে রাগী, ঘৃণা করি, ভালোবাসি, কষ্ট লাগলে কাঁদি। এইসবই আমাদের মনের অস্থিত্বকে জানান দেয়। এই মনের সুস্থতাই মানসিক স্বাস্থ্য।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, “মানসিক স্বাস্থ্য বলতে এমন এক অবস্থাকে বুঝায় যেখানে প্রতিটি মানুষ তাঁর কর্মদক্ষতাকে বুঝতে পারবে, প্রত্যাহিত জীবনের চাপ সামলাতে পারবে, লাভজনক ও সফলভাবে কাজ করতে পারবে এবং সমাজে সে কার্যকরভাবে অবদান রাখতে পারবে”। মানসিক স্বাস্থ্য আমাদের ‘স্বাস্থ্যের’ একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র “স্বাস্থ্য” সংজ্ঞার মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ‘স্বাস্থ্য’ বলতে সামগ্রীক শারীরিক, মানসিক, সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্য অবস্থাকে বুঝায় এবং শুধুমাত্র রোগের অনুপস্থিতি বা অক্ষমতাকে বুঝায়নি।

তাই শুধু মানসিক রোগ বা মানসিক প্রতিবন্ধিতা না থাকলেই তাকে ভাল মানসিক স্বাস্থ্যের অধিকারী বলা যায় না। সামাজিক, মনোঃস্তাত্বিক এবং জৈবিক নানা প্রভাবেই একজন মানুষের কোন এক নির্দিষ্ট সময়ে তার মানসিক স্বাস্থ্য নির্ধারিত হয়।

পারিবারিক সংহিংস্রতা, সর্বদা সামাজিক-অর্থনৈতিক চাপ, দ্রুত সামাজিক পরিবর্তন, কর্মক্ষেত্রে চাপ, লিঙ্গ বৈষম্য, সামজিকভাবে একঘরে করা, অস্বাস্থ্যকর জীবনধারা, শারীরিক অসুস্থতা এবং মানুষের অধিকার বঞ্চিত করা রুগ্ন বা অস্বাভাবিক মানসিক স্বাস্থ্যের কারণ।

২০১৩ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে “সামগ্রীক মানসিক স্বাস্থ্য কর্মপন্থা ২০১৩-২০২০” অনুমোদিত” হয়েছে। ডাব্লিউএইচও (WHO) সদস্য দেশগুলো মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে এবং বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে।

এই “সামগ্রীক মানসিক স্বাস্থ্য কর্মপন্থায়” লক্ষ্যগুলো হলোঃ
১) মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন
২) মানসিক রোগ প্রতিরোধ
৩) মানসিক রোগীর সেবা প্রদান
৪) রোগমুক্তি বাড়ানো
৫) মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা
৬) মানসিক রোগীর অসুস্থতা, প্রতিবন্ধিতা এবং মৃত্যুহ্রাস করা।

এই কর্মপন্থা নিম্নলিখিত ৪টি উদ্দেশ্যকে কেন্দ্রকরে সম্পন্ন হবেঃ
ক) মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে কার্যকর নেতৃত্ব ও কার্যপ্রনালী জোরদারকরণ
খ) প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য কমিউনিটি বেজড সামগ্রীক, সূশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীল মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সেবা প্রদান
গ) মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন ও প্রতিরোধে কৌশলপএ বাস্তবায়ন
ঘ) মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে তথ্য আদান-প্রদান এবং প্রামানিক তথ্য এবং গবেষনা জোরদারকরণ

মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে নিম্নলিখিত প্রদক্ষেপগুলো আমরা গ্রহন করতে পারিঃ
১। শিশুদের শৈশবে করণীয়ঃ ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ প্রদান যা বাচ্চাদের স্বাস্থ্য্ সংবেদনশীল এবং পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করবে, যেকোন ধরণের হুমকি মোকাবেলা করা, শিশু শিক্ষা নিশ্চিত করা, শিশুর বিকাশকে সহায়তা করা এবং আবেগগতভাবে সংবেদনশীল করা।
২। শিশু-কিশোরদের সহোযোগীতাঃ জীবনভিত্তিক দক্ষতা অর্জন্মুলক কার্যক্রম, শিশু ও কিশোর বিকাশ সম্পর্কিত কর্মপ্ররিকল্পনা।
৩। নারীর সামাজিক ও অর্থনৈ্তিক ক্ষমতায়নঃ শিক্ষার সুযোগ প্রদান, ক্ষুদ্রঋণ আওতায় আনার সুযোগ প্রদান।
৪। বিদ্যালয় কেন্দীক মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নঃ মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশে বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং পরিচর্যা করা।
৫। কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যঃ মানসিক চাপ ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম।
৬। বয়োঃবৃ্দ্ধদের মানসিক স্বাস্থ্যঃ বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ এবং ডে কেয়ার সেন্টার ব্যবস্থা করা।
৭। বাসস্থান নীতিমালাঃ বাসস্থানে পরিবেশ উন্নতিকরণ।
৮। দারিদ্র্য জনগোষ্ঠীর দারিদ্রতা হ্রাস এবং সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান ।
৯। সামজিক উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড।
১০। সংহিংস্রতা প্রতিরোধ কার্যক্রমঃ মদ-নেশা জাতীয় বস্তুর সহজপ্রাপ্যতা বন্ধ করা এবং অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ন্ত্রন।
১১। পারস্পারিক সামাজিক গ্রামের উন্নয়ন।
১২। মানসিক রোগীর আধিকার, সুযোগ-সুবিধা এবং সেবা গ্রহন উন্নতিকরণ।

আত্মহত্যা কি?
স্ব-ইচ্ছায় নিজের জীবন শেষ করাকে আত্মহত্যা বলে। প্রতিবছর প্রায় ৮০,০০০০ মানুষ আত্মহত্যায় মারা যায়, যা প্রতি ৪0 সেকেন্ডে ১জন আত্মহত্যার সমান। গবেষনায় দেখা গেছে, প্রতিটি আত্মহত্যার পাশাপাশি ২০ জনের বেশি আত্মহত্যায় চেষ্টা করে থাকে। আত্মহত্যা সারাজীবনের যেকোন সময় যে কারো হতে
পারে। ১৫-২৯ বছর বয়সী যুবকদের মৃত্যুর দ্বিতীয় অন্যতম কারণ হলো আত্মহত্যা। বৈশ্বিক আত্মহ্ত্যার ৭৯% হয়ে থাকে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত দেশগুলোতে।

আত্মহত্যার পদ্ধতিসমূহঃ
গলায় ফাঁসি দেওয়া, কিটনাশক বা ঘুমের ঔষধ খাওয়া, বিষ খাওয়া, আগ্নেয়াস্ত্রের মাধ্যমে নিজেকে শেষ করা আত্মহত্যার প্রধান পদ্ধতি, এছাড়াও উচুস্থান থেকে লাফ দেওয়া, গাড়ী সামনে লাফ দেওয়া, নদী বা সমুদ্রে লাফ দেওয়া, চাকু বা ধারালো অস্ত্রের মাধ্যমে গলা কাটা, পেটে স্টেপ করা, নিজেকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া আত্মহত্যার পদ্ধতি যা আমরা সমাজে দেখতে পাই।

আত্মহত্যার কারণসমূহঃ
বিষন্নতা আত্মহত্যার প্রধান কারণ। মাদকাসক্তি (গাঁজা, ইয়াবা, মদ), ব্যাক্তিত্বের সমস্যা, সিজোফ্রেনিয়া, মুড-ডিসঅর্ডারের রোগী আত্মহত্যার করে থাকে। কোন কোন সময় জীবনের বিভিন্ন চাপে যা ব্যাক্তির সামলাতে না পেরে হটাৎ করে ইম্পালসিভ্লি আত্মহত্যা করে থাকে। আর্থিক সমস্যা, সম্পর্কের ব্যর্থতা, দীর্ঘমেয়াদী ব্যাথা, বা অসুখ, সহিংস্রতা, মহামারী, যৌন-সহিংসতা, কোন কিছু হারানো, একাকিত্ব আত্মহত্যার প্রবনঅতা বাড়িয়ে দেয়।

কাদের আত্মহত্যা বেশী হয়ঃ

নারীদের আত্মহত্যার প্রবনতা পুরুষের চেয়ে ৩ গুণ বেশী কিন্তু প্রকৃ্ত আত্মহত্যা নারীদের চেয়ে পুরুষেরা ৩ গুণ বেশী করে থাকে। গবেষনায় দেখা গেছে, অবিবাহিতদের আত্মহত্যার হার বিবাহিতদের চেয়ে বেশী। একাকী বসবাসরত পুরুষ বা মহিলা, বিধবা, বিপত্নীক, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, অভিবাসী, মহামারী, আন্তঃকোন্দল বা অন্তঃকোন্দলে আক্রান্ত জনগোষ্ঠী, সমকামী, ট্রান্সজেন্ডার, ইন্টারসেক্স জনগোষ্ঠী আত্মহত্যা বেশী করে থাকে।
পুর্বে যার আত্মহত্যার চেষ্টা করার ইতিহাস আছে তার আত্মহত্যার সম্ভাবনা বেশী। পরিবারে আত্মহত্যার ইতিহাস থাকলে বা বার বার আত্মহত্যার হুমকি দিলে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
যারা আত্মহত্যার পূর্বে সুইসাইড নোট রাখে (আমার আত্মহত্যার জন্য কেউ দায়ী নয়), পূর্বপ্রস্তুতি পূর্বক আত্মহত্যার চেষ্টা (যেন কেউ উদ্ধার করতে না পারে), ভায়োলেন্ট (ভয়ংকর) পদ্ধতিতে আত্মহত্যার চেষ্টা, অন্যের কাছে আত্মহত্যার ইচ্ছার কথা বলা আত্মহত্যার প্রবল ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ।

আত্মহত্যা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধঃ

আত্মহত্যা প্রতিরোধ যোগ্য। আত্মহত্যা একটি জটিল প্রক্রিয়া যা প্রতিরোধ করার জন্য বিভিন্ন বিভাগের সমন্নয় ও সহযোগীতা প্রয়োজন। শুধু স্বাস্থ্য বিভাগ নয় পাশাপাশি শিক্ষা, শ্রম, কৃষি, বানিজ্য, আইন, প্রতিরক্ষা, ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া সর্বোপরি আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।
কারও একার প্রচেষ্টায় আত্মহত্যা রোধ করা অসম্ভব। কার্যকর আত্মহত্যা প্রতিরোধ ব্যাবস্থা নিতে হবে,মানসিক রোগের চিকিৎসা ও প্রতিরোধ, স্মৃতিভ্রংশতা রোগ এর চিকিৎসা ও প্রতিরোধ এবং মাদকাশক্তির চিকিৎসা আত্মহত্যা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্রীয়, সামাজিকভাবে প্রতিটি স্তরে ব্যাক্তি প্রর্যায়ে আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টা প্রতিরোধ করত্ হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা “মানসিক স্বাস্থ্য কর্মপন্থা ২০১৩-২০২০” এ সদস্য দেশগুলো ২০২০ সালের মধ্যে ১০% আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সাস্টেইনাবল উন্নয়ন লক্ষ্য ২০১৩ অনুযায়ী আত্মহত্যাজনিত মৃত্যু ৩.৪ নামিয়ে আনতে হবে।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ নিতে হবেঃ
১। আত্মহত্যার উপকরণ যেমন- কীটনাশক, বিষ, আগ্নেয়াস্ত্র, ঘুমের ঔষধ সহজপ্রাপ্যতা হ্রাস করতে হবে।
২। ইলেক্ট্রিক, প্রিন্ট মিডিয়াকে আত্মহত্যার খবর অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সচেতনতার সাথে প্রচার করতে হবে যাতে অন্যরা এতে উৎসাহিত না হয়।
৩। বিদ্যালয়কেন্দ্রিক আত্মহত্যা সচেতনতা বা প্রতিরোধমূলক প্রোগ্রাম করা।
৪। মাদকদ্রব্য যেমন মদ, গাজা, ইয়াবা ফেন্সিডিল ইত্যাদি নিয়ন্ত্রন এবং নিয়ন্ত্রনে নীতিমালা প্রণয়ন।
৫। মানসিক রোগে আক্রান্ত বা নেশাগ্রস্তরোগীর রোগ দ্রুত নির্ণয় এবং চিকিৎসা প্রদান।
৬। তীব্র আবেগ প্রদর্শন বা দীর্ঘমেয়াদি ব্যাথা সঠিক নির্ণয় ও সুচিকিৎসা করা।
৭। আত্মহত্যামূলক আচরণের সঠিকভাবে পর্যবেক্ষন এবং চিকিৎসা করার জন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ট্রেনিং য়ের ব্যবস্থা করা।
৮। আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছে এমন রোগীর যথাযথ ফলোয়াপ এবং সামাজিক সহযোগীতার ব্যবস্থা করা।
৯। সময়মত আত্মহত্যার রেজিস্ট্রেশন এবং রেগুলার মনিট্রিং-ই জাতীয় পর্যায়ে আত্মহ্ত্যা প্রতিরোধের কার্যকর কর্মপন্থা।

শেষাংশেঃ
আত্মহত্যা একটি আচরণ যার পরিনতি জীবনের পরিসমাপ্তি। একটু সতর্ক হলে, একটু সহানুভুতিশীল আচরণ একজনের জীবন বাঁচাতে পারে। আমাদের সবাইকে জানতে হবে আত্মহত্যা কোন ছোঁয়াচে রোগ নয়, এটা কোন জ্বীন-ভূতের আচড়ে হয়না। আত্মহত্যা একটি অনাকাংখীত আচরণ যা প্রতিরোধযোগ্য।
আসুন আমরা সবাই মিলে আত্মহত্যা প্রতিরোধ করি এবং জীবনকে হ্যাঁ বলি।

ডাঃ মোঃ রশিদুল হক
সহকারী অধ্যাপক, মানসিক রোগ বিভাগ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল

Platform:
Related Post