X

মেডিকেলিও যন্ত্রপাতিঃ ইসিজি

একবার ভাবুন তো, ডাক্তারবাবুর চেম্বারে আপনি নুনগোলা জলে ভর্তি চারটি গামলায় আপনার হাত পাগুলো ডুবিয়ে বসে আছেন। বিষয়টা অস্বস্তিকর হলেও প্রথমদিকের ই.সি.জি. মেশিনগুলো এমনই ছিল। যন্ত্রটা তৈরি করেছিলেন নেদারল্যান্ডের চিকিৎসাবিজ্ঞানী উইলিয়াম আইন্থোভেন, যাকে ই.সি.জি. এর জনক হসেবেও অভিহিত করা হয়। তিনি ১৯০৬ সালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি নিজের তৈরী এমন একটা মেশিনে করা ই.সি.জি. এর আলোকে Left and right ventricular hypertrophy, left and right atrial hypertrophy, the U wave (প্রথমবারের মতো), notching of the QRS, ventricular premature beats, ventricular bigeminy, atrial flutter এবং complete heart block এর বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছিলেন- ভাবা যায়? তাঁর আবিষ্কারের জন্যে ১৯২৪ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

অবশ্য ই.সি.জি. এর ইতিহাস দেখতে গেলে আমাদের আরো একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে, ১৮৪৩ সালে যখন জার্মান শরীরতত্ত্ববিদ এমিল ডু বয়েস রেমন্ড ‘action potential’ এর ধারণা দেন এবং বলেন যে প্রতিবার পেশী সংকোচনের সাথে ভোল্টেজের পরিবর্তন হয়। কিন্তু এ সামান্য পরিমাণের ভোল্টেজ পরিবর্তনে সৃষ্ট তড়িৎপ্রবাহ মাপার জন্য তখনকার প্রচলিত গ্যালভানোমিটারগুলো যথেষ্ট ছিল না। এজন্য তিনি ‘রিওটোম’ নামে একটি নতুন ধরণের গ্যালভানোমিটার তৈরি করেন। ১৮৬৮ সালে তাঁর ছাত্র জুলিয়াস বার্নস্টেইন একে আরো উন্নত করে দুটো স্টিমুলাস এর মধ্যবর্তী সময় সনাক্ত করতে সক্ষম ‘ডিফারেন্সিয়াল রিওটোম’ তৈরি করেন, যার সাহায্যে তিনি ব্যাঙের হৃদপিণ্ডে ইলেকট্রোড স্থাপন করে তার ইলেক্ট্রিক্যাল একটিভিটি রেকর্ড করতে সক্ষম হন। কিন্তু রিওটোমগুলো যথেষ্ট সংবেদনশীল ছিল না এবং এর ইলেকট্রোডগুলো সরাসরি হৃদপিন্ডে স্থাপন করতে হতো।


১৮৮৭ সালে লন্ডনের সেন্ট মেরি হাসপাতালের চিকিৎসক অগাস্টাস ওয়ালার পদার্থবিজ্ঞানী গ্যাব্রিয়েল লিপম্যানের আবিষ্কৃত ‘ক্যাপিলারি ইলেক্ট্রোমিটার’ (১৮৭২) ব্যবহার করে প্রথমবারের মতো হৃদয় উন্মোচন না করে তার ইলেক্ট্রিক্যাল একটিভিটি রেকর্ড কতে সক্ষম হন; যদিও এর প্রথম চেষ্টাটা করেছিলেন সেন্ট বার্থোলোমো হাসপাতালের চিকিৎসক আলেকজান্ডার মুরহেড। ওয়ালার প্রথমে এর নাম দিয়েছিলেন ‘ইলেক্ট্রোগ্রাম’ কিন্তু পরে নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘কার্ডিওগ্রাম’।

‘ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম’ কথাটির প্রবর্তন করেন উইলিয়াম আইন্থোভেন এবং তিনিই প্রথম ই.সি.জি. ওয়েভকে P, Q, R, S, T দিয়ে চিহ্নিত করেছিলেন (১৮৯৫)। ১৯০১ সালে তিনি নিজের আবিষ্কৃত স্ট্রিং গ্যালভানোমিটারের সাহায্যে রেকর্ডকৃত ই.সি.জি. প্রকাশ করেন, যার কার্যকারিতা ছিল ক্যাপিলারি ইলেক্ট্রোমিটার বা প্রচলিত স্ট্রিং গ্যালভানোমিটার এর চেয়ে বেশি। ১৯০৬ সালে তিনি তাঁর বিস্তারিত গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। ১৯১২ সালে লন্ডন ক্লিনিক্যাল সোসাইটি এর সভায় তিনি lead l, ll, lll এর সমন্বয়ে গঠিত ‘Einthoven’s triangle’ এর বিবরণ দেন। তাঁর ই.সি.জি. মেশিনের প্রথম বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে জার্মানির Edelmann and Sons কোম্পানি এবং পরবর্তীতে লন্ডনের Cambridge Scientific Instrument Company, Ltd.।

যুক্তরাষ্ট্রে ই.সি.জি. মেশিন ব্যবহার শুরু হয় ১৯০৯ সালে আলফ্রেড কোন এর হাত ধরে। তিনিই প্রথম ১৯২০ সালে ইলেকট্রোডে লবণজল ভরা সিলিন্ডারের বদলে স্ট্র্যাপ ববহার করেন। ১৯৩০ সালে Cambridge Instrument Company জার্মান সিলভারের তৈরী direct-contact plate electrodes বাজারে আনে। ১৯৩২ সালে প্রিকর্ডিয়াল লিডের জন্যে সাকশন ইলেকট্রোড ডিজাইন করেন রুডলফ বার্গার। পরবর্তীতে ওয়েলশ এর আরো সংস্কার সাধন করেন এবং বর্তমানে 12 lead মেশিনে ব্যবহৃত সাকশন কাপের রূপ দেন। ১৯৩৭ সালে টারো টাকেমি প্রথম বহনযোগ্য ই.সি.জি. মেশিন তৈরি করেন। ই.সি.জি. মেশিনের পরবর্তী উল্লেখযোগ্য সংস্কার হলো লিডের সাথে বিবর্ধক হিসেবে ভ্যাকুয়াম টিউব এবং পরে ক্যাথোড রে টিউবের ব্যবহার। এর ফলে ই.সি.জি. রেকর্ডের physical characteristics আরো উন্নত হয় এবং direct-writing instruments তৈরিতে আরো একধাপ অগ্রগতি সাধিত হয়।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের অতি গুরুত্বপূর্ণ এ আবিষ্কারের উত্তরোত্তর উন্নতি ঘটেই চলেছে। সম্ভবত খুব শীঘ্রই স্মার্টফোনের সাথে সংযুক্ত ইসিজি ট্র্যাকার বাজারে আসতে চলেছে। আর তখন রোগীদের হৃদয়ঘটিত বিষয়গুলো আরো অনেক সহজেই চিকিৎসকদের দৃষ্টিগোচর হবে।

drferdous:
Related Post