• প্রতিবেদন

April 21, 2014 6:04 pm

প্রকাশকঃ

” নিরাপদ কর্মস্থল চাই “

বিকেল চড়ুই

গতকাল আম্মা ফোন করে বলছিলেন, আহারে ঢাকার ঐ ডাক্তার মেয়েটাকে নাকি অমানুষগুলা মেরে কিছু রাখে নাই? আম্মার কন্ঠস্বরে একটা শংকা টের পেয়ে চুপ হয়ে গিয়েছিলাম। আম্মা হয়ত কল্পনায় সিনিয়র ঐ আপুটার জায়গায় আমাকে বসিয়ে সারাদিন ছটফট করতে করতে শিউরে উঠছিলেন। আমি যখন ডাক্তার হয়ে বের হব তখন জানিনা এদেশে ডাক্তারদের অবস্থা কতটুকু শোচনীয় থাকবে।

শুধু জানি আর যাই হোক আমি কোথাও কোন উদাহরণ হতে চাইনা। আমরা আমাদের বাবা মায়ের বড় আদরের ছেলেমেয়েরা পরিবারের সবার স্বপ্ন আর নিজেদের ইচ্ছে টাকে এক কাঠামোয় ফেলতে অমানুষিক অমানবিক পরিশ্রম করে যাচ্ছি। সমাজ যদি আমাদের মূল্যায়ন ঠিকমত করতে না পারে একদিন সমাজটাকেই পস্তাতে হবে।
আমাদের গায়ে হাত তোলা, আমাদের কে জনসাধারনের সামনে নিম্নতর থেকে নিম্নতম শ্রেণীর প্রাণী হিসেবে তুলে ধরা এই সাংবাদিকেরা সেদিন কলম ভেঙ্গে ফেললেও পিছনে লাগার মত একটা ডাক্তার খুঁজে পাবেনা। দেশে ডাক্তারি ছেড়ে কেউ ব্যবসা শুরু করবে ,কেউ ব্যাংকে চাকরি শুরু করবে , ডাক্তারির নেশায় কেউ বিদেশে চলে যাবে হতাশা নিয়ে । সাদা এপ্রনের মানুষগুলো যখন থাকবেনা কোথাও তখন এই মানুষগুলো কি করে আমার খুব দেখার ইচ্ছে।
এত মমতা নিয়ে বিশ্বের আর কোন দেশের ডাক্তার মনে হয়না তার রোগীর গায়ে হাত দেয়। এ হাত কখনো হয়ে ওঠে বাবার হাত কখনো বা মায়ের হাত। এ হাত শুধু কমার্শিয়াল হলে এদেশের সরকারী হাসপাতালগুলো মুখ থুবড়ে পড়ত অনেক আগেই।

 

আমাদেরকে যারা মানবসেবার দিকটা দেখাতে চায় তাদের দিকে তাকানর মত ক্লান্তিটুকুও আমাদের চোখে থাকেনা। কারন তাদের বহু বহু বহু আগে জগতের সবচেয়ে বড় ফিলোসফিটাই আমরা দেখে ফেলি খুব কাছ থেকে। আমরা জানি জীবনের অনিশ্চয়তা কী। খুব কাছ থেকে মানুষের কষ্ট যন্ত্রণা মানুষের হাসিমুখ এসব দেখতে কেমন লাগে। এখানকার মানুষগুলো অসহায় আমরা জানি। একই আবহাওয়ায় খেয়ে পরে মানুষ আমরা তাই একটু বেশিই জানি। ন্যূনতম সম্মানীর (ভিজিট কিংবা পেমেন্ট বলবনা। যে আপনার জীবন বাঁচায় কত টাকায় আপনি সেটুকুর মূল্য দিতে সক্ষম। আপনার জীবনের মূল্যমানের সাপেক্ষে একে আমি সম্মানী বলব।) বিনিময়ে ঘাম ঝরানো সেবা দিয়ে, চূড়ান্ত ক্রাইসিসের পেশেন্টকে নিজেদের শরীরের রক্ত দিয়ে,অনেক সময় নিজের পকেটের টাকা খরচ করে ওষুধের ব্যবস্থা করে দিয়ে তাই একটা থ্যাংকলেস জব পালন করে চলেছি সবাই। আমরা সবাই স্কুল কলেজের ভাল মানুষ ছাত্রছাত্রী ছিলাম। নিয়মিত ফার্স্ট বেঞ্চে বসতাম,নিয়মিত স্কুলের হোমওয়ার্ক করতাম,স্যারদের প্রতিটা কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতাম, ধুলোয় মলিন পুরনো ব্ল্যাকবোর্ডগুলোয় খুঁজলে এখনো প্রথম সারিতে আমাদের নাম খুঁজে পাওয়া যাবে , আমাদের কৃতিত্বের সাক্ষর স্কুলের মাঠ কলেজের বারান্দা। আমরা আমাদের শিক্ষকদের প্রিয় ছাত্র ছাত্রী ছিলাম । তাঁরা আমাদেরকে দেশটাকে আর দেশের মানুষকে ভালবাসতে শিখিয়েছিলেন। আমরা হাসিমুখে ভালবাসতে শিখেছি। তাই হাজারটা লাথি খেলেও দেশের মানুষই তো দিয়েছে ভেবে মনে মনে কষ্ট নিয়ে সান্ত্বনা খুঁজে বেড়াই। সদ্য যার জীবন বাঁচালাম তার কাছ থেকে অশালীন ব্যবহার ,চড় থাপ্পড় লাথি খেতে কেমন লাগে তাও আমরা ভাল জেনে ফেলেছি। আমাদের যোগ্যতা নিয়ে অজ্ঞরা কলম ভেঙ্গে ফেলে আমরা দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে গেছি। আমাদের টলারেন্স ডেভেলপ করে গেছে। করতে করতে করতে করতে আমরা আবার সেন্সিটাইজড হয়ে গেছি। আমাদের রক্তাক্ত চোখ মুখ শক্ত হয়ে আছে,আমরা হাত মুঠো করে অপেক্ষায় আছি। আঘাতের পাল্টা আঘাত নরম্যাল হিউম্যান রিফ্লেক্স। ফিজিক্সের জনপ্রিয় সূত্র। সবকিছু সহিষ্ণুতা দিয়ে হয়না । দু এক জায়গায় ধাক্কা দিয়ে ,চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয়। এখন সবকিছু নষ্টদের দখলে যাওয়ার আগেই আমরা আমাদের সমস্ত টুকু দিয়ে এসব প্রতিহত করব।
সাদা এপ্রনের সৌম্য মূর্তির মানুষগুলো এমনি এমনি খেপে নি ।
এদের আজকের রুদ্রমূর্তির আড়ালে গত কয়েক দশকের একরাশ গ্লানি আর অপমান মিশে আছে। এদেশের মানুষ সেটা বুঝলে ভাল। না বুঝলে আরো ভাল। তখন অকৃতজ্ঞ এবং অমানুষের কাতারে এ না বোঝা মানুষগুলোকে আমি এগিয়ে রাখব। তারা প্রাপ্য সেবাটুকু ঠিকই পেতে থাকবে কিন্তু এদেশের কোন চিকিত্‍সকের হাত আর কখনোই পরম মমতায় বাবা কিংবা মায়ের হাত হয়ে উঠবেনা। ৩০২ ধারা ভাল থাকুক। আদালত পাড়া ভাল থাকুক। নষ্ট মানসিকতা ভাল থাকুক। সাংবাদিকের বিষাক্ত কলম সেও ভাল থাকুক সেদিন।

বার্ডেম ডাক্তারের রক্ত রঞ্জিত হোয়াইটকোট

বার্ডেম ডাক্তারের রক্ত রঞ্জিত হোয়াইটকোট

শেয়ার করুনঃ Facebook Google LinkedIn Print Email
পোষ্টট্যাগঃ ডাক্তার নির্যাতন, বার্ডেম,

পাঠকদের মন্তব্যঃ ( 0)




Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

Advertisement
Advertisement
Advertisement
.